সৈয়দ মুসতাফী বৃত্তা
প্রকৃতির নিয়মেই আমাদের জীবনে গ্রীষ্ম বর্ষা আসে। সঙ্গে আসে নানা রকম ফল ফলারি। কিন্তু ফলসার দেখা পাওয়া যায় না। এ প্রজন্মের খোকা-খুকুদের হাতে ফলসা তুলে দেবার সৌভাগ্য হয় না অভিভাবকদের। যারা জীবনে ফলসা দেখেনি, এনসাইক্লোপিডিয়া যাদের ধ্যান জ্ঞান- তাদের জীবনে ইংরেজি মতে গ্রীষ্মকাল আসে, আম, লিচু, কাঁঠাল আসে, ফলসা আসে না। পাবনা পৌর এলাকায় ৪০ বছর আগেও প্রায় সকল মহল্লায় মিনি বাগান ছিল। এখন সে সব ইতিহাস। বাগান উচ্ছেদ করে বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। সমঝদার মানুষেরা গত হয়েছেন। কেউ শহর ছেড়েছেন। এসেছেন বনিককুল। গড়ে উঠেছে মার্কেট। কাঁচা পাকা বাড়ি। তাই বাগানের শোভা উঠে গেছে। আঙিনাতেও তেমন ফলগাছ নেই। এসেছে স্থাপত্য শিল্প। এসবে বঞ্চনা আছে। কিন্তু রোমাঞ্চ নেই। আজকালকার শিশুরা অনেকে ফলসার নাম পর্যন্ত শোনেনি। খাওয়াতো স্বপ্নের কথা। ফলসাকে এযাবৎ পাবনার মূল ফলস্্েরাতে অন্তর্গত হতে না দেয়ায় অবহেলা-অনাদরে বিলুপ্ত প্রায়। জেলার সংবাদপত্রে, জীবন যাপনে, বাগান চর্চায় অপ্রচলিত ফলসা একটুও স্থান পায়নি। এই হারিয়ে যাওয়া ফলের কথা এখন আর কে ভাবে!

গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে বর্ণসমারোহ আর অন্যান্য ফল দেখে চোখের আরাম আর মনের শান্তি। কিন্তু যখন ফলসার নাম মনে আসে তখন উদ্ভিদ প্রেমী মন যাদের, তারা বিচলিত হয়ে পড়েন। সমস্যাদীর্ন এই শহর এলাকায় বা তার উপকণ্ঠে তেমন ফল গাছ নেই। মনোরম বর্ণনা দেবার মত বাবুর বাগান ছাড়া আর নেই। খাঁড়ির পানির মত ফলসা গাছ কোথাও কোথাও হয়তো রয়ে গেছে। কারোর তেমন নজরে আসেনি। যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে। পলাতক আসামি যেমন থাকে।
ফলসার ছড়ানো পাতা সবুজ মাখানো অনেকটা ডুমুর পাতার মত। গাছে আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে থাকে হলুদ হলুদ ফুল। যেন নাকছাবি। এ সময় গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ালে মাথায় পাপড়ি ঝরে পড়ে। কচি কচি রেনুও। থোকা থোকা ফলের সব গুলো একসঙ্গে পাকে না। তাই থোকা থেকে পাকা ফল বেছে পাড়তে হয়। পাকা ফলসার বঙ অনেকটা খয়েরি। শাঁস বেশ মিষ্টি লালাময় অম্ল মধুর।
ফলসা শব্দটি এসেছে ফারসি থেকে। আকারে বেত ফলের মত। তবে অমন মসৃন নয়। বিলেতি গাবের মত গা। পাকা ফল একদিনের বেশি রাখা যায় না। জামের মত এ ফল বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। আষাঢ় মাস পর্যন্ত এ ফল পাওয়া যায়। রাধানগর মজুমদার পাড়ায় সিদ্দিক মিঞার বাগানে ছিল বেশ বড় একটি ফলসা গাছ। ত্রিশ বছর আগে গাছতলায় শিশুদের ভিড় লেগেই থাকতো গ্রীষ্ম কালে। বানী সিনেমা হলের সামনের দিকে লাহিড়ী পাড়ায় একটি ফলস গাছ আছে। পাকা করা পরিচ্ছন্ন আঙিনায় ফল পড়ে টুপ টাপ করে। পেকে কালচে হয়ে যাওয়া ফলসা পড়ে ছড়িয়ে থাকে। শানের ওপর পড়েই ফেটে যায়। বৃষ্টির পানি লাগলে পাকা ফলে পচন ধরে। জামের মত আর কি। অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে একটি ফলসার গাছ আছে। পুরাতন বাঁশ বাজার মসজিদের পিছনেও একটি ফলসা গাছ ছিল, এখন আর নেই। সাধুপাড়া চাঁদা খাঁর বাঁশতলায় ফটোগ্রাফার রাতুল ইসলাম সুমনের বাড়িতে একটি ফলসা গাছ আছে। পৌর এলাকায় এদিক সেদিক আরও দু’চারটে ফলসা গাছ জানার বাইরে থাকতে পারে। আমাদের জীবন তো শহুরে জীবন। সমাজ থেকে খসে গেছে বাগান। বাড়ছে কেবল অনৈসর্গিক আবহ।
জেলার উপজেলা সমুহে পানি সংকট কালের নাম গ্রীষ্ম। এ সংকট উত্তোরনের পর আসে বড় রসের কাল। প্রকৃতিও ঋতুকে ভোগ করার মত মানুষেরা এ সময় নানা ফলের স্বাদটুকু শোষণ করে। দাবদাহে যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ বা ফ্রিজের শীতল জল পান করে, আর বিত্তবাসনায় জীবনগাছের দিনে পাতা ঝরাতে থাকে- একটি একটি করে তাদের কাছে উদ্ভিদের কোন দাম নেই। আসলে ভুলে যাওয়ারই কথা, বাতাসকে উত্তপ্ত করে পৃথিবীর বুকে রচনা করতে হয় শূন্যতা। ছোটাতে হয় ঝড়। এই শূন্যতার কারণেই পাবনা কি তাহলে ফলসা শূন্য হয়ে পড়েছে?

প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় মফস্বলে নারীদের অবদান ও তাদের স্বীকৃতির অভাব ঘোচাতে হবে। যাদের গাছ লাগাবার মত জাগয়া আছে তাদের উৎসাহ দেওয়া ও বৃক্ষ রোপন দিবসে অন্যান্য চারার সঙ্গে ফলসা চারা বিতরণের ব্যবস্থা নিলে এ ফলের স্বাদ দুলর্ভ হবে না শিশুদের কাছে। শরীরের জন্য খাবার উপযুক্ত সকল ফলই উপকারী। এ কথা যত পালন করা যায় ততই ভালো। পরিবেশ সংরক্ষণে ফলগাছের ভূমিকাও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই বসত বাড়ির আঙ্গিনায় দুর্লভ হয়ে যাওয়া ফলবৃক্ষের চারা রোপণ করা দরকার প্রত্যেকেরই। চিকিৎসকেরা বলেন, অপ্রচলিত ফল না খাওয়ার কারণেই শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।
সূত্র : সম্প্রীতি বাংলাদেশ অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত