[লেখাটি সম্প্রীতি’র প্রস্তুতিমূলক (১৪ এপ্রিল ২০২৩) সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।]

শিবজিত নাগ
মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবাংলায় মাত্র একবার দেখা হয়েছিল বাদশা ভাইয়ের সাথে। কলম ধরতেই জানি না। কেন সেই দিনের সবকিছু প্রথমেই স্মরণে এলো! তারিখ মনে নেই, আমি কৃষ্ণনগর স্টেশনে যখন পৌঁছাই, তখন রাত প্রায় নয়টা হবে। স্টেশনেই দেখা পেলাম প্রসাদ কাকা ও বাদশা ভাইকে একসাথে। প্রসাদ কাকার তাড়া সত্ত্বেও কথা বলতে বলতেই দুটো ট্রেন ছেড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আমাদের তিনজনেরই সেই রাতটা কেটেছে দুই স্টেশন পরের বাদকুল্লায়, আমার এক কাকার বাসায়। মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলিতে মুক্তিযুদ্ধের অনেক খবর শুনেছি, জেনেছি তাঁদের কাছ থেকে। ঐদিন সন্ধ্যায় প্রথম জেনেছিলাম, জাফর ভাইয়ের ভগ্নিপতি আবদুুস সামাদ আজাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হচ্ছেন, টরিক ভাইয়ের কথায়ও সেই দিন ভালো খবর ছিল। টরিক ভাইয়ের বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. ফারুক আজিজ খান (মনজু) যে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব হয়েছিলেন, তা জেনেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে। প্রসাদ কাকাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, তিনি কিছুই বলছেন না। সেই রাতে শুধুই বাদশা ভাইয়ের কথা শুনেছি। ভালোভাবে বুঝেছি, বাদশা ভাই তাঁর সাথীদের নিয়ে মরণপণ করে পৃথক এক মুক্তিযোদ্ধা-ক্যাম্প পরিচালনায় অন্যতম সংগঠকের কাজ নিরলসভাবে করে চলেছেন। স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বৈষম্য-শোষণ মুক্তির আন্দোলন সংগ্রাম ছাডা আর কোন ভাবনা বাদশা ভাইয়ের ছিল বলে কখনও মনে হয়নি। স্বজন ছেড়ে, সম্পদ হারিয়ে, বিদেশের মাটিতে বসেও তাঁর কোন কষ্ট নেই, নিজের ভবিষ্যতের কোন ভাবনা নেই, দুঃখ-হতাশা নেই, হারানোর বেদনা নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা বাউলা ভাইয়ের একটি ভারতীয় পোস্টকার্ডের লেখায় বাদশা ভাই সম্পর্কে কিছু কথা ছিল।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা, আমি তখন ৮ম বা ৯ম শ্রেণির জেলা স্কুলের ছাত্র। তখন থেকেই বাদশা ভাইকে জানতাম, তাঁর ¯েœহধন্য হতে পেরেছিলাম। তাই বাদশা ভাইয়ের আড্ডায়, একান্ত কথা-বার্তায় আমার উপস্থিতি ছিল। একেবারে খোলামেলাভাবে। সেই থেকে তাঁর কত কথা শুনেছি, তবে ব্যক্তিগত কারও বিরুদ্ধে কোন কথা শুনিনি কখনও। অবশ্য ঐ দশকেরই কোন একদিন প্রসঙ্গক্রমে অত্যন্ত পরিচিত একজনের নাম বলে তিনি বলেছিলেন, ‘ও তো সাম্প্রদায়িক।’ আমি বলেছিলাম, না না তা হতে পারে না। এমনভাবে আরেকবার বলতেই তিনি বললেন, ‘দেখ এ কথা আমি বাদশা বলছি।’ ধর্মনিরপেক্ষতা আদর্শের নাম। হিন্দু-মুসলমানের মিলে মিশে চলতে দেখলেই অসাম্প্রদায়িক বলা যায় না। ধর্মনিরপেক্ষ হতে হলে মনুষ্যত্বের শিক্ষা অর্জন করতে হয়। ঠিকই তাই, রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, মনুষ্যত্বের শিক্ষাই পরম শিক্ষা। আর সব শিক্ষা তার অধীন।
স্কুলের ছাত্র থাকতেই তাঁকে জানতাম, কথাটা যে ভাবে বলেছি, প্রকৃতপক্ষে তেমনভাবে বলা যায় না। সেকালটায় খুব ভয়ে ভয়ে সবকিছু দূরে থেকে দেখতাম। সাম্প্রদায়িক নানা ঘটনা, অনেকের কথায় মন খারাপ করা আবহে বয়স বাডলেও, সাহস বাড়তে আরও সময় লেগেছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের সময় শহরে নিষ্প্রদীপ মহডা চলতো, সাইরেন বাজতেই আলোর সব সুইচ অফ করতে হত। সাধনা ঔষধালয়ের ফনি কাকা এক সন্ধ্যায় সুইচ অফ করতে যেয়ে অন করে ফেলেছিলেন। একটা জিপ সাথে সাথে এসে গেল। চোখের সামনে ধমক দিয়ে, সাম্প্রদায়িক গালি দিয়ে, ভারতের চর বলে ঐ জিপে তুলে নিল একজন। জিপে পুলিশ দেখিনি। পরে শুনেছি ফনি কাকাকে জেলে দেওয়া হয়েছে। সাধনা ঔষধালয়ের পাবনা শাখা তখন আমাদের দ্বিতল বাড়ির সেসময়ের একতলা অংশে মাসিক ভাড়ায় চলতো। বাদশা ভাই ফনি কাকার খোঁজ-খবর নিতেন শুনেছি। তবে জেলের মধ্যে নাকি বাইরে থেকে তা বুঝতে পারিনি। সেসময় বাদশা ভাই হিন্দু-মুসলমানের সমঅধিকারের কথা বলতেন, ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুদের পাশে দাঁডাতেন। খুব ভালো লাগতো আমার। একটু একটু করে সেই থেকে বুঝতে শিখেছি, রাজনীতির চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের কাজ করা যায় না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না।
’৬০-এর দশকে বাদশা ভাইদের এক মিছিলে ‘মণি সিংহের মুক্তি চাই’ লেখা ফেস্টুন দেখে জানতে চেয়েছিলাম, মণি সিংহ কে তিনি কি ন্যাপ করেন? বাদশা ভাই বললেন, ঠিক ন্যাপ না, আচ্ছা এ দেশে কি কমিউনিস্ট পার্টি থাকতে পারে না, কমিউনিস্ট পার্টির কাজ কি নিষিদ্ধ করে দেওয়া যায়। সেই দিন তিনি এমনভাবে বলতে থাকলেন, তাতে আমার মনে হয়েছিল বাদশা ভাইও কমিউনিস্ট পার্টি করেন। প্রসাদ কাকাকে তখন সকলেই কমিউনিস্ট বলতো। বাদশা ভাইয়ের কথায় প্রসাদ কাকাদের ভাইয়েরাও যে কমিউনিস্ট ছিলেন, তাও জানতে পারলাম। বাদশা ভাই, প্রসাদ কাকাদের কারও পুরো নাম ধরে বলতেন না। রুনু, ঝুনু এমন ডাক নামে তাঁদের সম্পর্কে অনেক কথা বলতেন। কথা শুনে বুঝেছি, ব্রিটিশ আমলেই স্কুলের ছাত্র থাকাকালে বাদশা ভাই কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন।
’৭০-এর দশকে স্বাধীন বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় পাবনার ভাষা আন্দোলন নিয়ে কিছু লেখালেখি হয়েছে। হাজার মাইল ব্যবধানের অবিভক্ত ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমের দুই অংশ নিয়ে পাকিস্তান নামের দেশের জš§ হওয়ার এক বছর যেতে না যেতেই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালেই দেশের সব জেলায় না হলেও, পাবনাসহ কয়েকটি জেলায় সংগঠিত হয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছে। একটি লেখায় আমি লিখেছিলাম, বাদশা ভাই ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তখন তিনি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বাদশা ভাই বললেন, তারিখটা ২৯ ফেব্রুয়ারি হবে। ২৯ ফেব্রুয়ারি সব সালে থাকে না । এ জন্য ভুলটা অনেকেই করে। আমার পরের আরেকটি লেখায় গ্রেফতারের সালটা ১৯৫২ লিখেছিলাম। সেই বারে বাদশা ভাই নন, অন্য একজন হাতে ধরে ভুলটা দেখিয়ে বলেছিলেন, বাদশা ভাই তো অনেক আগে থেকে পুরো ১৯৫২ সালটাতে জেলেই ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং ১৯৫২ সালের শেষের মাস পর্যন্ত জেলেই কাটিয়েছেন। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ উভয় সালেই ২৯ ফেব্রুয়ারি আছে।

কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস নিয়ে কারও কোন কথা শুনলে বাদশা ভাই প্রতিবাদ না করে থাকতে পারতেন না। একদিন আমাদেরই একজনের কুসংস্কারের কী কথা শুনে হনুমানের গান গাওয়ার সাথে মিলিয়ে বাদশা ভাই কী যে বললেনÑ শুনে আমি এমনভাবে হেসেছিলাম যা আসরটাকে করল মাটি। স্থানীয়ভাবে টিনের তৈরি ট্রেতে কাঠের টুলের ওপর রাখা কয়েকজনের চা নষ্ট করে দিয়েছিল আমার সেই হাসি। অন্যরা গম্ভীর হয়ে গেলেন, বাদশা ভাইয়ের মিষ্টি মিষ্টি হাসি আর কথা তখনও চলছিল। বাদশা ভাই তাঁর জীবনের শেষের দিকে পাবনার আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস লেখার কথা বলতেন, শুনেছি তিনি কিছু লিখেছেন। এসব নিয়ে আলোচনার সময়ও তিনি শুধুই অন্যদের ত্যাগের কথা বলতেন, নিজের কথা কিছুই বলতেন না।
বাদশা ভাইয়ের অসাধারণ স্মৃতি শক্তি ছিল। কথা বলার সময় অনেকের নাম, তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম, পরিচয়, সাল-তারিখ কোন কিছু না দেখে বলে যেতেন। আর কতদিন পরে বাদশা ভাইয়ের জীবনের সবকথা বই-পুস্তকের পাতায় দেখতে পাব, তা জানি না। তবে পাবনার আটচল্লিশ- বাহান্নর ভাষা ভান্দোলন, সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইতোমধ্যে বই-পুস্তক, পত্র পত্রিকা, ইতিহাস, প্রবন্ধ, রচনা, মুক্তিযুদ্ধের বই যা প্রকাশিত হয়েছে, তার সবগুলোতেই বাদশা ভাইয়ের অবদানের কথা কম-বেশি শ্রদ্ধার সাথে বলা হয়েছে। তাই হয়তো মনে হয়, তিনি আমাদের মাঝেই এখনও আছেন। মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস পূর্বে, সম্ভবত ঢাকায় শেষ বারের মতো যখন বাদশা ভাইয়ের সাথে আমার কথা হয়েছিল, তখনও তাঁকে এমনই দেখেছি। ঐ হাসিমুখে শুনেছি দেশ, সমাজ, রাজনীতির কথা। আত্মপ্রচার নেই, নিজের কথা যেন কিছুই নাই। একেবারে আমার সেই স্কুল জীবনের বাদশা ভাইকেই দেখতে পেয়েছিলাম।
সেই কালের এ পাবনা শহরটিকে দুভাগ করা ইছামতি নদীর পশ্চিমপাড থেকে কৃষ্ণপুরের (বর্তমানের মোকছেদপুর) বাদশা ভাই গঙ্গা-পদ্মা-যমুনা হয়ে ইছামতি নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে যেতে দেখেছেন। ভোলগা থেকে গঙ্গার অনেক শোষণ, শাসন, পরাধীনতা থেকে মুক্তির বিপ্লব, আন্দোলন, সংগ্রামের ইতিহাসের পাঠ নেওয়া সেরেছেন তিনি স্কুল বয়সেই। তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন। যাঁকে সামনে পেতেন, তাঁকেই বইয়ের কথা শুনিয়ে ছাড়তেন, বই পডার কথা বলতেও ভুলতেন না।
পাবনার এ হামিদ রোডের ধারে দাঁড়িয়ে, লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডারে, প্রেসক্লাবে, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীতে, ‘বইঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার, ভালো লাগা রাজনীতির সেই পরম শ্রদ্ধেয় মানুষটি আজ আর নেই। তাঁর মতো আর কেউই বুঝি নেই। আবার আছেনও তিনি আমাদের মাঝেই। তিনি এক রাজনীতির আদর্শিক পথের জীবন্ত পথপ্রদর্শক হয়েই আমাদের মাঝে আছেন। তাঁর মতো রাজনীতিককে এখন বড় প্রয়োজন আমাদের। ‘যে নদী মরুপথে হারালো ধারা, জানি হে জানি তাও হয়নি হারা।’ পরম শ্রদ্ধেয় বাদশা ভাইকে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করলাম।