দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি দুই বছর আগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশ হয়েছিল। পাবনার ১৯৮ বছরে এসে লেখার দ্বিতীয় পর্ব তুলে ধরা হলো।

মোসতাফা সতেজ
ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ১৭৯০ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের সময় দশশালা বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী কালীন পাবনার ভূসম্পত্তি নাটোর রাজ রামকৃষ্ণের সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়। তখন এ জেলায় অন্য কেউ জমিদার মর্যাদায় ছিলেন না। হ্যামিলটনের লেখা ইন্ডিয়া গেজেটিয়ারে উল্লেখ করা হয়, ‘হান্ডিয়ালের পাশবর্তী এলাকার বন জঙ্গলে ডাকাতেরা লুকিয়ে থাকত। তাই নৌপথের যাত্রীদের রক্ষাকল্পে ষোল দাঁড়ের এক খানা দ্রুতগামী নৌকাসহ জনৈক জমাদার নিযুক্ত করা হয়।’ সে সময় পাবনায় সরকারের দায়িত্বপূর্ণ কর্মচারিদের অভাব, পুলিশের অযোগ্যতা এবং জমিদারদের পক্ষ থেকে ডাকাতি ঘটনার তথ্য গোপন রাখা বা এড়িয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা দলে দলে গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। কালীনাথ চৌধুরী লেখেন, ‘রাজশাহী ও পাবনায় এক শ্রেণীর ভদ্র হিন্দু চৌর্যবৃত্তি করিয়া অঢেল ধন সম্পত্তির মালিক হইয়া উঠিয়াছিল। এমন কি শেষ পর্যন্ত তাহাদের অনেকেই জমিদারি ক্রয় করিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। পরে তারা কুলীন ব্রাক্ষণ বলিয়া নিজেদের মহিমা প্রচার করিত। পাবনার সলপের স্যান্নাল পরিবার প্রভৃতি এই শ্রেণীর জমিদার।’ প্রমথনাথ বিশী লেখেন, ‘এই চলনবিলে রাজশাহী পাবনা অঞ্চলের বহু লোক ডাকাতি ব্যবসা করিত। তাঁর মধ্যে বহু জমিদার বংশের পূর্ব পুরুষ ছিল। তাদের দশটা ব্যবসার মধ্যে ইহাও একটা ব্যবসায়।’ এদের প্রতিরোধ করতে ও জমিদারদের শান্তি রক্ষাসহ শাসনতান্ত্রিক সুবন্দোবস্তের জন্য কোম্পানি সরকারের মন্তব্য অনুসারে পাবনাকে উন্নীত করা হয় জেলায়। তখন পশ্চিম বাংলার মালদহ জেলার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট এ ডব্লিউ মিলস এ জেলায় নিযুক্ত হন। স্বপদে দায়িত্ব পালন করেন ১০ বছর। ১৮৩২ সালে এ পদ স্থায়ী করে নিয়োগ করা হয় স্বতন্ত্র ডেপুটি কালেকটর। মোগল আমলে (১৬৭৩-১৭৭৩) মাহামুদাবাদ পাঁচ বলতে বুঝাত বেলকুচি, পাবনা, সলঙ্গাহাট, সুজানগর, লাহিড়ী ও পোতাজিয়া।

যেভাবে গড়ে ওঠে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান : ইছামতি নদী বার মাস প্রবাহিত থাকা কালে পাবনা একটি সমৃদ্ধশালী বন্দর বলে গণ্য হতো। এখানে ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগিজ ও অন্যান্য ব্যবসায়ীদের যাতায়াত ছিল।
১৮১৫ সালের ভেতরে পাবনায় নীলকুঠি গড়ে ওঠে। জেলায় ৮০টি কারখানা ছিল নীলের। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নীল বাণিজ্য ছিল পাবনাতেও। ১৮৫৯ সালে নিম্ন বাংলায় নীলকরের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫শ। প্রতিষ্ঠান ছিল ১৪৩টি। ১৮৫৯ সালে পাবনা জেলা রাজশাহী হতে আলাদা হয়ে যায়। যোগ্যতর ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর জি ব্রাইটকে পাবনায় নিয়োগ করা হয়। নীল বিদ্্েরাহের কারণেই এ বছর পাবনা সম্পূর্ণভাবে জেলার মার্যাদা লাভ করে। পদ্মা ও যমুনা নদীর সৃষ্টি করা এই জনপদের প্রাগৈতিহাসিক রাস্তা ঘাটও এখন কিংবাদন্তি হওয়ায় যোগ্য। এ কথা মানতেই হয় যে ব্রিটিশেরা এখানে পা রাখার পর থেকেই আধুনিক পাবনার পত্তন হয়েছে।
জেলাবাসীর সমৃদ্ধি দেখে, উর্বর মাটি দেখে ইউরোপিয়ানেরা ব্যবসায় নেমে পড়ে। অন্যেরা নীল ব্যবসায় বিনিয়েগে করেন। গড়ে ওঠে নীল কুঠি। ১৮৫৭ সালে নীল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে! এসময় পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কুমারখালি থানা নিয়ে গঠিত হয় কুমারখালি মহকুমা। থাকে পাবনার অধীনে।
১৮৭২-৭৩ এর কৃষক আন্দোলন চলাকালে আইন শৃংখলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পার্শবর্তী জেলাসমূহ থেকে চল্লিশ জন অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়। লেফটেনান্ট গভর্নরের আদেশে রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে। গ্রেফতার করা হয় ৩০২ জনকে। এদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও অবৈধ সমাবেশ করার অভিযোগ ছিল। বন্দিদের একমাস থেকে দুবছর পর্যন্ত কঠোর দন্ড দেয়া হয়।

১৮৫৩ সালের মে মাসে পাবনা সদরে স্থাপন করা হয় ডিসপেনসারি। আংশিক ব্যয় বরাদ্দ করত টাউন ফান্ড। বাকি ব্যয় করা হতো চাঁদার টাকায়। এ বছরেই স্থাপিত হয় জেলা স্কুল। ১৮৫৮ সালে বেড়ায় এবং ১৮৬১ সালে চাটমোহরে বেসরকারি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ চলাকালে তাঁতীবন্দের জমিদার বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী সরকারকে সহায়তা করেন। এ কারণে পরবর্তীতে তাকে বিনা লাইসেন্সে কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি দেন লেফটেনেন্ট গভনর্র অফ বেঙ্গলের এস ডি এইচ জে এস কটন। সে সময় মাছ-মাখন-হলুদ-ধান ও পাট উৎপাদনে পাবনার রমরমা অবস্থা। কলকাতার বাজারে তখন ধন্ধুমার রফতানি বাণিজ্য। ১৮৬০ সালে পাবনার বেগসাবাদ পরগনার জমিদার প্যারীসুন্দরী নীল বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন। ১৮৬৩ সালে মহকুমা ভেঙে দেয়া হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ সালে সিরাজগঞ্জ মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়। ১৮৫৯ সালে কুষ্টিয়াকে পাবনা থেকে কেটে নদীয়া জেলা ভুক্ত করা হয়। ১৮৭৬ সালে মিউনিসিপ্যালটি স্থাপিত হয়। ১৮৭৯তে পাবনা ও বগুড়ার জন্য নিযুক্ত করা হয় সেসন জজ। ১৮৮৪ সালে নির্মিত হয় জজকোর্ট। পরের বছর জেলাবোর্ড প্রবর্তনের পর কাঁচা রাস্তা নির্মাণ শুরু। এই আমাদের বাংলাদেশ গ্রন্থে মুনতাসির মামুন লেখেন, ১৮৬৯ সালের আগে পাবনা শহরে কোনো রাস্তাই ছিল না। ১৮৯১ তে টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপিত। ১৮৯৮ এ এডওয়ার্ড কলেজ। ১৮৭৮ এ জেলার রেলপথ স্থাপিত হয়। ২০১৮ সালে রেলপথ সম্পসারিত করে পাবনা রেল স্টেশন চালু করা হয়। পাবনা জেলা গেজেটিয়ারে উল্লেখ, লর্ড কার্জনের শাসনামলে (১৮৯৯-১৯০৫) বঙ্গ ভঙ্গ হয়। এর ফলে ১৯০৫ সালে পাবনা জেলা নতুন প্রদেশ পূর্ব বাংলা ও আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই বঙ্গ ভঙ্গের মাধ্যমে বাংলার এ অংশের অধিবাসীদের উপকার হতো। এদের প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটতো। ১৯১১ সালে বঙ্গ ভঙ্গ রদ হয়ে যায়। বঙ্গভঙ্গ রোধের সময় থেকেই এ জেলায় বিদ্রোহাত্মক কার্যাবলীর সুত্রপাত ঘটে। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষে (১৯১৪-১৯১৮) এ অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের সময় এ জেলার গর্ব ও গৌরব মাও. ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৯৮০-১৯০১) তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে স্বরাজ আন্দোলনে যোগদান করতে স্বদেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন।