২৮ বছর আগের স্মৃতি

অধ্যাপক ফখরুল ইসলাম
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আমার স্মৃতিকথা কি লিখব ভেবে পাচ্ছিনা, কারণ এই কলেজের দুই বছরের ছাত্রজীবন ও ২৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনের এতো স্মৃতি জমা হয়ে আছে যে তা লিখে শেষ করা যাবে না। প্রাক্তন ছাত্র-সমিতির ঢাকা শাখার স্মরণিকায় আমার ছাত্রজীবনের স্মৃতিকথা কিছু লিখেছি ।
আমরা তিনপুরুষ ধরে এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমার আব্বা, বড় ভাই, ছোট ভাই, আমার তিন ছেলে মেয়ে এই কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ছিল। আমি পাবনার ছেলে। কাজেই আমার অগুণতি আত্মীয়-স্বজন এই কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ছিল।
১৯৪৭ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে এডওয়ার্ড কলেজে আই. এ. ক্লাসে ভর্তি হই। আব্বার মুখে এই কলেজের প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক কাহিনী শুনেছি। সে সময় কলেজের হ-য-ব-র-ল অবস্থা ছিল। তারপরে আমার প্রয়াত বড়ভাই নূরুল ইসলামের কাছে তৎকালীন এডওয়ার্ড কলেজের ভূরি ভূরি কাহিনী শুনেছি। শুনতাম এবং ভাবতাম কবে ঐ কলেজের ছাত্র হব। স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বড়ভাইয়ের সঙ্গে যেতাম। বড় ভাইয়ের মুখে শুনে সে সময়কার অধ্যাপকবৃন্দের নাম আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সর্বশ্রদ্ধেয় আর. বোস, মাখনবাবু, বসন্তবাবু, হরিধনবাবু, তারিণীবাবু, বি.এল. বোস, প্রভাস লাহিড়ী, টি. হোসেন, মওলানা আবদুুল হামিদ- এঁদের নাম শুনেছি। বড় ভাই ও তাঁর বন্ধুরা কলেজের অধ্যাপকদের সম্বন্ধে নানা ঘটনার বিষয়ে রসালো আলাপ করতেন- আমি কাছাকাছি থাকলে সে সব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। বসন্তবাবু সম্বন্ধে একটা কথা এখনও আমার মনে আছে। কবিতায় বসন্তবাবু সম্বন্ধে উনারা বলতেন, ‘তারিণী আমিতো মারিনি, মেরেছে বসন্ত ঘোষ, বল আমার কি বা দোষ।’
সেই এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হবার বহু আকাক্সিক্ষত সুযোগ জুটে গেল ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পরে। আমরাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করা শেষ ব্যাচ। সদর্পে কলেজ অঙ্গনে প্রবেশ করলাম ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে। শ্রদ্ধেয় বি.এল. বোস তখন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। কারণ কিছুদিন আগেই আর. বোস কলেজ ছেড়ে কলকাতা চলে গেছেন। সেজন্য আর. বোসের ছাত্র হবার ভাগ্য হলনা। বি.এল. বোসের সঙ্গে তাঁর চেম্বারে দেখা করলাম। উনি ম্যাট্রিকে আমার রেজাল্ট (দুইটি লেটারসহ) শুনে প্রশ্ন করলেন, ‘প্রথম বিভাগে পাস করে তুমি আর্টসে ভর্তি হবে কেন!’ আমি সরাসরি উত্তর দিলাম, ‘স্যার অঙ্ক আমার ভাল লাগেনা। সেজন্য আর্টস্-এ ভর্তি হব।’ উনি বল্লেন, ‘ঠিক আছে, ভর্তি হয়ে যাও।’ প্রথম দিন থেকেই বি.এল. বোসের নজরে পড়ে গেলাম ।
কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। আমার রোল নম্বর হল ২০। ইংরেজী, বাংলাসহ সাধারণ ইতিহাস, সিভিক্স-ইকোনমিক্স ও কমার্সিয়াল জিওগ্রাফী পাঠ্য হিসাবে নিলাম। ফোর্থ সাবজেক্ট নিলাম না। আমাদের সময়ে সিভিক্স- ইকোনমিক্স এক পেপার ছিল- সিভিক্স ১০০ নম্বর ও ইকোনমিক্স ১০০ নম্বর। কলেজ জীবনে প্রথম ক্লাসটি ছিল বাণিজ্যিক ভূগোলের। স্যার রোল কল করার পরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের মধ্যে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করা কেউ আছ?’ আমি লজ্জায় দাঁড়াতে পারছিলামনা। আমার দুই পাশে বসা সহপাঠীরা ঠেলে দাঁড় করিয়ে দিল। স্যার অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন এবং সহপাঠীদের কান্ড দেখে মিষ্টি হাসি হাসতে লাগলেন। প্রথমদিন উনি আমাদেরকে অনেক নছিহত করলেন। তারপর একে একে অন্যান্য ক্লাসগুলি হল। সিভিক্স-ইকোনমিক্সে কোন শিক্ষক ছিলেননা বলে ঐ ক্লাসটি হলনা।

ছবি : পারিবারিক অ্যালবাম থেকে পাওয়া।
আমরা ১৯৪৭ সালে যখন কলেজে ভর্তি হই তখন কলেজে চরম transitional period চলছে। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা কম। আর্টসের অনেক বিভাগেই শিক্ষক ছিলেননা। বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ অসুবিধা ছিলনা কারণ তারা মাখনবাবু, বসন্তবাবু, হরিধনবাবু, নলিনী বাবুর মত নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক পেয়েছিল- যাঁরা সারাটা জীবন এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যাপনা করেছেন এবং এই কলেজ থেকেই অবসর গ্রহণ করেছেন। আমরা যারা কলা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম বলতে গেলে এক নাগাড়ে শিক্ষকের সহায়তা খুব কমই পেয়েছি। আমার ছাত্র জীবনটাই নানা ঝামেলার মধ্যে কেটেছে। নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে লেখাপড়া করেছি। স্কুল জীবনটা মোটামুটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে কেটেছে। ১৯৩৯ সালে পাবনা জেলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। সেই বছরই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৪৫ সালে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়।
খোদার অশেষ রহমতে খাবার-দাবারের কোন অসুবিধা ছিলনা। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, নদীভরা মাছ ছিল। কিন্তু লেখাপড়ার সরঞ্জামাদি ছিলনা- কাগজ ছিলনা, দোকানে সময়মত বই পাওয়া যেতনা, কেরোসিন তেল পাওয়া যেতনা। কাঠের কলম দোয়াতে চুবিয়ে ক্লাস টেন পর্যন্ত লেখা-পড়া করেছি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশুনা করতে হত।
স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে গেলাম- সেখানে শিক্ষকের নিদারুণ স্বল্পতা। রাত্রে সেই কেরোসিন ও পোকা। ১৯৪৯-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অনার্স ক্লাসে ভর্তি হ’লাম- সেখানেও শিক্ষকের স্বল্পতা। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পরেতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগই প্রায় শিক্ষক শূন্য হয়ে গেল। এক কথায় আমার পুরো ছাত্র জীবনটাই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কেটেছে।
জোড়া তালি দিয়ে কলেজের ক্লাস চলতে লাগলো। ফরিদপুরের রামদিয়া কলেজ থেকে সন্তোষ ভট্টাচার্য নামে একজন অধ্যাপক আমাদের কলেজে এলেন। এক নাগাড়ে অনেক দিন তিনি সিভিক্স, ইকোনমিক্স ও কমার্শিয়াল জিওগ্রাফির ক্লাস নিয়েছিলেন। আজকালকার ছেলেরা হলে তাঁকে থ্রী-ইন-ওয়ান বলতো। স্যার আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। সন্তোষ স্যারের কথা কোনদিন ভুলবনা।

কলেজ চলতে লাগলো। আমরা যারা জেলা স্কুল থেকে পাস করেছিলাম কলেজ ছুটির পরে সবাই একসঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বাড়ি ফিরতাম। আমার বাড়ি কলেজ থেকে প্রায় আড়াই মাইল দূরে ছিল। বড় ভাই এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ডিটিংশন নিয়ে বি.এস.সি. পাস করার পরে ক’লকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন। সেই সুবাদে তাঁর পরিত্যক্ত পুরানো সাইকেলটি পেয়েছিলাম। কখনও ঐ ভাঙ্গা সাইকেলে বা কখনও পায়ে হেঁটে কলেজে আসতাম। সাইকেলটা প্রায়ই ‘হাসপাতালে’ থাকতো। কাজেই পদযুগলই ছিল প্রধান সম্বল। আমার পুরো স্কুল জীবনটাই অর্থাৎ আট বছর রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-বন্যা উপেক্ষা করে স্কুলে যেতাম। তখনতো এখনকার মত রিকশার ছড়াছড়ি ছিলনা।
আমাদের স্কুলে একটা নিয়ম ছিল যে, যদি কোন ছাত্র সারাবছর একদিনও স্কুল কামাই না করতো তাহলে তাকে একটা পুরস্কার দেওয়া হত। ১৯৪৩ সালে যখন আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সেই বছর আমি এই দুর্লভ পুরস্কারটি পেয়েছিলাম। বইটা ছিল কবিগুরুর অমর সৃষ্টি ‘সোনার তরী।’
কলেজে ভর্তি হবার পরে স্যারদের সুনজরে পড়ে গেলাম, কারণ আমার বিচরণ ছিল সর্বত্র। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা- সর্বক্ষেত্রেই আমার অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে ছিলাম। শ্রদ্ধেয় বি.এল. বোস আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। একদিন তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বল্লেন, ‘ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্টের ভিত্তিতে তুমি মাসিক দশ টাকা হারে সরকারি বৃত্তি পেয়েছো। তোমাকে আর বেতন দিতে হবেনা, বরং আগে যে বেতন দিয়েছ সব ফেরৎ পাবে।’ এই খবর শুনার পরে আমার সে কি আনন্দ! জীবনের প্রথম বৃত্তি। আব্বা শুনে আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন। মনে হল আমি আয় করা শিখেছি।
সময় গড়িয়ে যেতে লাগলো। এর মধ্যে এসে গেল রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ কলেজ গেটের সামনের ঐতিহ্যবাহী আমগাছতলায় সমাবেশ কররলাম এবং সিদ্ধান্ত হল আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করব। যে কথা সেই কাজ। বেলা ১১টার দিকে মিছিল বের হল। আমরা মিছিল করে প্রধান পোস্ট অফিসের পাশের ট্রাফিক মোড়ে পৌছলাম। উদ্দেশ্য ছিল জেলা প্রশাসক সাহেবকে স্মারকলিপি দেব। পুলিশ বাধা দিল। সেই বাধা আর অতিক্রম করা সম্ভব হলনা। পুলিশ মিছিলটিকে ঘুরিয়ে সবাইকে পাবনা থানায় নিয়ে গেল। সারাদিন আমরা থানা চত্বরে ছিলাম। সন্ধ্যায় আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হল।
বি.এল. বোস ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন। এক লম্বা ছুটির পরে কলেজে গিয়ে দেখলাম আমাদের নতুন অধ্যক্ষক্ষ এসেছেন- নাম এ. কে. মুখার্জি এম. এ. (ট্রিপল)। বেশ সুটেড-বুটেড। বি.এল. বোস কত সাদাসিধে ছিলেন- আমাদেরকে কত আপন করে নিয়েছিলেন। উনার কাছে যেতে আমি কোন ভয়ই পেতামনা।
মুখার্জীবাবু খুব গম্ভীর প্রকৃতির লোক ছিলেন। ছাত্ররা তাঁর ধারে কাছেই ঘেষতনা। আমি মাত্র একবার চেম্বারে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম কি একটা প্রয়োজনে। চেম্বারে আমার উপস্থিতি ছিল বড়জোর এক মিনিট। ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ। অল্প কয়েকদিন পরেই এ.কে. মুখার্জী কলেজ ছেড়ে চলে গেলেন। আবার বি.এল. বোস ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হলেন- ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো আর কি!
এরইমধ্যে কলেজ সংসদের নির্বাচন হল দেশ বিভাগের পরে প্রথম। আমি ম্যাগাজিন সেক্রেটারি হলাম। আমার সম্পাদনায় ১৯৪৭-৪৮ সালের ম্যাগাজিন পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়েছিল।
দেখতে দেখতে বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল। আমরা বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলাম। কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হল অনেক জাঁকমকের সঙ্গে। Truck events -এ শামছুল ইসলাম (ড. শামছুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং Field events –এ আনসার ভাইয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। আনসার ভাই পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা বিভাগের ডাইরেক্টর হিসাবে চাকুরি করে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি এডওয়ার্ড কলেজের প্রাক্তন ছাত্র সমিতির সভাপতি ছিলেন। সেকালে এডওয়ার্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সকলের নজর কাড়তো।
এরইমধ্যে কলেজের বার্ষিক সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে গিয়েছিল। পাঁচটি বিষয়ে প্রথম হয়ে সে বছর আমি উক্ত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, আমার বড় ছেলে ফয়জুল ইসলাম সুমন এডওয়ার্ড কলেজে আই.এস.সি ক্লাসে পড়ার সময় পরপর দুই বছর সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। পরে সুমন বি.সি.এস পাস করে ঢাকায় প্ল্যানিং কমিশনে রিসার্চ অফিসার হিসেবে কর্মরত হয়েছিল। আমার ছোট ছেলে ফাহিমুল ইসলাম শোভন প্রথম প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। শোভন যে বছর ২য় বর্ষ আই.এ. সি পড়ে, সে বছর বিশেষ কারণে এডওয়ার্ড কলেজে বার্ষিক সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়নি। শোভন বি.সি.এস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডার পেয়েছিল। পরে সে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে চাকুরি করেছে। শোভন অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্কলারশীপ নিয়ে (১৯৯৯) জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক এন্ডমিনিস্ট্রেশনে দুই বছরের এম.এ. কোর্স করার জন্য অস্ট্রেলিয়া যায়। আমার বড় মেয়ে ফারহানা ইসলাম নীলা এডওয়ার্ড কলেজে আই.এস.সি-এর ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাস করে নীলা ঢাকা মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ডাক্তার হয়। নীলা এস.এস.সি পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে বৃহত্তম পাবনা জেলায় প্রথম হবার কারণে প্রথম গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছিল। মাত্র সাত নম্বরের জন্য সে এইচ. এস.সি ফাইনাল পরীক্ষায় কম্বাইন্ড মেরিটলিস্ট মিস্ করেছিল। যেমন শোভন মাত্র পাঁচ নম্বরের জন্য কম্বাইন্ড মেরিটলিস্ট মিস্ করেছিল এস. এস. সি পরীক্ষায়।
ভাগ্যমন্দ আমার ছোট মেয়ে নীতুর। তার আর এডওয়ার্ড কলেজে পড়ার সৌভাগ্য হলনা। কারণ গত বছর থেকে এই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে। পাবনা মহিলা কলেজে মনমত সাবজেক্ট পেলনা বলে আমার বড় ছেলে সুমন নীতুকে ঢাকার ভিখারুন্নেসা কলেজে ভর্তি করে দিয়েছে। সে সুমনের বাসায় থেকেই দ্বিতীয় বর্ষে ক্লাস করেছে। অনেকে হয়তো মনে করবেন আমি ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি। আমার মনে হয় এডওয়ার্ড কলেজ সম্বন্ধে কিছু লিখতে গেলে আমার আব্বা, ভাইদের এবং ছেলে-মেয়েদের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায়।
শ্রদ্ধেয় আজিমুদ্দিন সাহেব যখন এডওয়ার্ড কলেজে যোগদান করলেন অধ্যক্ষ হিসেবে, তখন আমরা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে এম. এ. পাস ছিলেন। স্যার আমাদের Rhetoric Prosody -এর ক্লাস নিতেন। উনার Rhetoric Prosody -এর উপর একটা বইও ছিল। Prosody পড়াবার সময় স্যার বলতেন ÔWater, Water, everywhere; Not a drop to drinkÕ। তাঁর কণ্ঠস্বর আমার কানে বাজে। তিনি খুবই দরদী কিন্তু ভরৎস ছিলেন। আজিমউদ্দিন সাহেব আমাকে পুত্রের মত স্নেহ করতেন। তাঁর শ্যালক আমার অতি প্রিয় বন্ধু সিরাজ হোসেন খান তখন দ্বিতীয় বর্ষ বিজ্ঞানে পড়তো এবং তার দুলাভাই আজিমউদ্দিন সাহেবের বাসাতেই থাকতো। সেই সুবাদে স্যারের বাসায় প্রায়ই যেতাম এবং চিলেকোঠার ঘরে বসে জম্পেস আড্ডা দিতাম। স্যার দেখেও দেখতেন না। তখনই পরিচয় প্রখ্যাত টেলিভিশন উপস্থাপক অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আবু সাঈদের সঙ্গে। তার ডাকানাম ছিল লালু।
বার্ষিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন ধার্য হল। কলেজ মাঠে প্যান্ডেল টানিয়ে দুইদিন ধরে জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠান চললো। অধ্যক্ষ আজিমউদ্দিন সাহেবের বিশেষ অনুরোধে পল্লীকবি জসিমউদ্দিন সাহেব পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন প্রখ্যাত গায়ক বেদারউদ্দিন আহমেদ। আমরা জসিমউদ্দিন সাহেবের হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছিলাম। দুইদিন প্রাণভরে বেদারউদ্দিন সাহেবের গান শুনেছিলাম ।

আজিমউদ্দিন সাহেব সু-সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর লেখা ‘মহুয়া’ নাটকটি মঞ্চস্থ করার জন্য আমরা রিহার্সেল শুরু করলাম। কয়েকদিন রিহার্সেল চলার পরে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ্ সাহেব ১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করার কারণে আমাদের সব আয়োজন ভেস্তে গেল । পরে সে নাটকটি করার সুযোগ পাইনি, যেহেতু দেখতে দেখতে আমাদের টেস্ট পরীক্ষা এসে গেল ।
আমরা যারা পাবনা জেলা স্কুল থেকে পাস করেছিলাম কলেজের সর্বক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্যই ছিল বেশী। যেমন আমিসহ আনসার ভাই, শামছুল ইসলাম, আবুল, আতা, কোরেশী, টিপু, সিরাজুল ইসলাম ও মরহুম বদিউর রহমান বদি। জি.সি. ইনস্টটিউশন থেকে পাস করা গোলাম মোস্তফাও আমাদের নিত্য সঙ্গী ছিল। মোস্তফাকে নিয়ে আমরা অনেক মজা করতাম, কারণ সে ছাত্রাবস্থাতেই বিয়ে করেছিল। আর ছিল সিরাজ খান, যে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এসে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়েছিল। টিপু ক্যানাডায় জিওলজিতে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে প্রায় আট বছর চাকুরী করে দেশে ফিরে আসে। এর আগে টিপু পাকিস্তান জিওলজিক্যাল সার্ভেতে চাকুরী করতো। সিরাজ অর্থাৎ যাকে আমরা ‘বেঁটে সিরাজ’ বলতাম, পরে সে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসর নিয়ে ঢাকার গুলশানে নিজের বাড়িতে বাস করে। বদি ফিসারী বিভাগে চাকুরী করা অবস্থায় অকালে মারা যায়। মোস্তফা পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজার হয়েছিল। সিরাজ খান, যাকে আমরা ‘বড় সিরাজ’ বলতাম, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝড়রষ ঝপরবহপব-এ এম.এস.সি পাস করে কৃষি বিভাগে চাকুরী করে। সিরাজ খান চৌকশ খেলোয়াড় ছিল। ক্রিকেট, ফুটবল ও ভলিবলে সে পারঙ্গম ছিল। সিরাজ খানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সুনাম ছিল।
আমাদের একটা গ্রুপ ছিল। টিপু, সিরাজ, সিরাজ খান, বদি ও মোস্তফা। টিপুকে আমরা ‘ট্যাপা’ বলতাম। আমরা রোজ বিকেলে নতুন ব্রীজের পশ্চিমের ঢালে দক্ষিণ দিকের রেলিং-এ বসে আড্ডা দিতাম। আড্ডার আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল কলেজের বিভিন্ন ঘটনা। সন্ধ্যার আগে ওখান থেকে হামিদ রোডে (তৎকালীন জ্যাকসন রোড) ‘আজাদ রেস্টুরেন্টে’ বসে চপ, সিঙ্গাড়া, চা খেতাম। টিপুর আব্বার নামানুসারে জ্যাকসন রোডের নাম আবদুল হামিদ রোড হয়েছিল। এখনও এই নাম বহাল আছে। তখনতো পাবনায় রেস্টুরেন্ট ছিলনা বললেই চলে। পশ্চিম বাংলা থেকে আসা একজন এই রেস্টুরেন্টের মালিক ছিলেন। আমরা প্রত্যেকে পালা করে বিল পরিশোধ করতাম।
আমাদের সময়ে উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসে বিজ্ঞানে একমাত্র মেয়ে ছিল কামরুন্নেসা, আর আই.এ. তে ছিল খাদিজা খানম বাণী। কামরুন ১৯৪৯ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। পরবর্তীতে পদার্থ বিদ্যায় পি.এইচ.ডি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হয়েছিল। কলেজে থাকতেই শামসুল কামরুনকে ‘বুক’ করে রেখেছিল। কাজেই ওদিকে কারও নজর দেবার উপায় ছিলনা। আর শামসুল খুবই গোঁয়াড় ছিল। বাণীকে নিয়েই আমাদের কয়েকজন সহপাঠী বন্ধু মগ্ন ছিল। আমি ওদের কান্ডকারখানা দেখে গালাগালি করতাম এবং বলতাম, ‘বেল পাকলে কাকের কি! বাণী এমন পাগল নয় যে তোমাদের কারও গলায় মালা দেবে।’ শেষমেষ বাণীর বিয়ে হয়েছিল পাকিস্তানের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মাহ্বুবুল হকের সঙ্গে। ড. মাহবুবুল হক মারা গেলে তাঁর শোকসভায় সদ্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া অমর্ত্য সেনকে দেখেছিলাম (খবরের কাগজে) বাণীকে সান্তনা দিচ্ছেন। ছবিতে বাণীকে ভাল চিনতে পারলামনা। দেখলাম চুল বব ছাঁটা এবং আগের চেয়ে বেশ মোটা হয়েছে। আমার ছয় বছরের সহপাঠী বাণীর ব্যথায় আমিও দারুণভাবে ব্যথিত। এক সঙ্গে আই.এ. পাস করার পরে দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স ও এম.এ. পড়েছি। বাণী ভাল ছাত্রী ছিল। ১৯৪৯ সালে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে বাণী ও আমি প্রথম বিভাগে আই.এ. পাস করেছিলাম এবং দুজনই সরকারি বৃত্তি পেয়েছিলাম।
ছাত্র জীবনের আরও কত টুকরো টুকরো স্মৃতি আজও স্মৃতিপটে অম্লান হয়ে আছে। সেসব থাক। এবার কর্মজীবনের কথায় আসি। এম.এ. পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে আসার পরে প্রায় প্রত্যেকদিনই এডওয়ার্ড কলেজে যেতাম এবং সে সময়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে ওয়েটিংরুমে বসে গল্প-সল্প করতাম। সবার সঙ্গেই ভাল পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নলিনীবাবু তখন অধ্যক্ষ। স্যারের সঙ্গে একদিন দেখা করলাম। স্যার আমাকে বল্লেন, ‘আমাদের একজন অধ্যাপক দরকার, যে অর্থনীতি ও পৌরনীতি পড়াতে পারবে। তোমার রেজাল্ট বের হলে আমার সঙ্গে দেখা কোরো।’ তখন অর্থনীতিতে আমিনুল হক সাহেব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মহিউদ্দিন সাহেব অধ্যাপক ছিলেন। দু’জনের পক্ষে আই.এ. ও বি.এ. ক্লাসে পড়ানো সম্ভব হচ্ছিলনা। কাজেই একজন তৃতীয় ব্যক্তির প্রয়োজন যিনি আই.এ. ক্লাসে সিভিক্স পড়াবেন এবং আই.এ. ও বি.এ. ক্লাসে অর্থনীতি পড়াবেন। আমিনুল হক সাহেব ছিলেন ডাক-সাঁইটে অধ্যাপক। তাঁর পড়ানোর ধরন সব ছাত্র-ছাত্রীকে বিমোহিত করে রাখতো। যেমন তাঁর ব্যক্তিত্ব তেমনি তাঁর শিক্ষক হিসেবে সুনাম। সারাটা জীবন তিনি সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরে কাটিয়েছিলেন। মহিউদ্দিন সাহেব ছিলেন সাদাসিধে গোছের লোক। উনার বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তাঁর উচ্চারণে আঞ্চলিকতা এসে যেত। যেমন তিনি চোরকে ‘চুর’ ছোটকে ‘ছুট’ বলতেন। সবাই এই নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করতো। ঠাট্টা করার কারণে উনি কিছুই মনে করতেন না- শুধু হাসতেন।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরইমধ্যে আমার এম.এ. পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল। হায় খোদা, একি হল! রেজাল্ট শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। বিনামেঘে বজ্রপাত- আমার মোটামুটি সার্থক ছাত্র জীবনে কালিমা পড়লো। সবাই হতভম্ব। একই কথা, এটা কি করে সম্ভব! মাত্র সাত নম্বরের জন্য আমি দ্বিতীয় শ্রেণী পেলামনা। যে ছেলে ম্যাট্রিক ও আই.এ. পরীক্ষায় সরকারি বৃত্তি পেয়েছে, অনার্স পরীক্ষায় ৫৫% নম্বর পেয়েছে- সে কেন এম.এ. তে দ্বিতীয় শ্রেণী পেলনা! থিওরী পেপার আমার খুবই খারাপ হয়েছিল সত্য, কিন্তু ব্যাংকিং পেপারে এতো কম নম্বর পাব- তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। অবশ্য আমার রেজাল্ট খারাপ হবার মাত্র একটা কারণই ছিল- এখানে তা বলা যাবেনা। সেই ব্যথা আমি আমৃত্যু বহন করে যাব- অসহ্য ব্যথা!
রেজাল্ট শুনার পরে আমি সাতদিন বাড়ি থেকে বের হইনি। আব্বার মুখের দিকে তাকানো যায় না। আমার সে কি যন্ত্রনা। বড় ভাইয়ের ব্যথিত মুখ দেখে চোখে পানি এসে যেত। ঘুম-খাওয়া প্রায় বাদই পড়ে গিয়েছিল। আব্বা অবশ্য বলতেন মন খারাপ না করতে। উনি এটাকে একটা দুর্ঘটনা বলে আমাকে প্রবোধ দিতেন। কিন্তু আমিতো জানতাম এটা দুর্ঘটনা নয়- আমার কৃতকর্মের ফল। সেজন্য আরও বেশি ব্যথা পেতাম। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজন সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল আমার রেজাল্ট শুনে ।
এক সপ্তাহ পরে মলিন মুখ নিয়ে কলেজে ঢুকলাম। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল। কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা অধ্যক্ষ নলিনীবাবুর চেম্বারে মাথা নীচু করে ঢুকলাম। স্যার তাঁর স্বাভাবসুলভ হাসি হেসে আমাকে বসতে বল্লেন। তারপর বল্লেন, ‘তুমি একটা দরখাস্ত দাও। সামনের গভর্নিং বডির মিটিং-এ তোমার appointment -এর ব্যাপারটা সেরে নেব।’ গভর্নিং বডির মিটিং-এ আমার নিয়োগ হল পেটকাটা অধ্যাপক হিসেবে অর্থাৎ সিভিক্স ও ইকোনমিক্সের। ১৯৫৪ সালের ২৪ শে জুলাই আমি এডওয়ার্ড কলেজে যোগদান করি। আমিনুল হক সাহেব আমাকে সঙ্গে নিয়ে ১ নং কক্ষে গেলেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
এক নম্বর কক্ষে ক্লাস ছিল। দুরুদুরু বুকে ক্লাসে ঢুকলাম। ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালো এবং পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করল। ক্লাসে প্রায় একশ জন ছাত্র ও দুইজন মাত্র ছাত্রী ছিল। আমিনুল হক সাহেব পরিচয় করিয়ে দিয়েই বের হয়ে গেলেন। রোল কল করলাম। ১নং রোল ছিল আবু হেনার (যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিল)। হেনা খুবই ভাল ছাত্র ছিল। প্রথমেই আবু হেনা আমার নজরে পড়ে গেল, কারণ সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই আমি একটা ক্লাস পরীক্ষা নিলাম। সে পরীক্ষায় হেনা নম্বর পেল। আবু হেনা আই. এ. পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান দখল করেছিল। পরবর্তীতে সে কিছুদিনের জন্য আমার সহকর্মীও ছিল। পরে হেনা পাবনায় এলে আমার সঙ্গে দেখা- সাক্ষাৎ হত। যা হোক, প্রথম দিন ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে পরিচিত হলাম এবং কিছু উপদেশমূলক বক্তব্য দিলাম। পিনপতন নীরবতায় তারা আমার কথা শুনলো। সেদিন থেকেই আমার অধ্যাপনা জীবনের শুরু হল। আই.এ. ক্লাসে সিভিক্স-ইকনমিক্সের ক্লাস ও বি.এ. তে অর্থনীতির ক্লাস নিতাম। রোজ ভাল করে পড়াশুনা করে ক্লাসে যেতাম। আল্লাহর রহমতে আমি fluently ইংরেজি বলতে পারতাম বলে ক্লাসে কোন অসুবিধা হতনা। ছাত্র-ছাত্রীরা গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার বক্তৃতা শুনতো। আমার মনে হল যেন ক’দিনের মধ্যেই আমি তাদের প্রিয় শিক্ষক হয়ে গেলাম। অধ্যক্ষ মহোদয় ও আমিনুল হক সাহেব আমার খুব প্রশংসা করলেন। হয়তো তাঁরা ছাত্রদের কাছ থেকে আমার সম্বন্ধে কিছু শুনে থাকবেন। আগেই বলেছি ক্লাসে মাত্র দুটি মেয়ে ছিল। তাদের একজন ছিল পাবনার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক প্রয়াত রজব আলী মজুমদার সাহেবের মেয়ে। তার নাম ছিল সুফিয়া মজুমদার। ডাক নাম ছিল চমন। আর একটা মেয়ের নাম একদম ভুলে গেছি- শালগাড়িয়ার মেয়ে। পরে সুফিয়া প্রধানমন্ত্রীর কৃষি-উপদেষ্টা আনিসুজ্জামান সাহেবের ঘরণী হন। সুফিয়া তার স্বামীর সঙ্গে এসেছিল পাবনায়। সে আমার ভাঙ্গা বাড়িেেত তার বান্ধবী মেরীর সঙ্গে এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। সঙ্গে তার ছেলেও ছিল। খুব ভাল লাগলো।
কালের চাকা ঘুরতে লাগলো। দেখতে দেখতে পাকাপাকি অধ্যাপক হয়ে গেলাম। সব সহকর্মীর সঙ্গে আমার হৃদ্যতা গড়ে উঠলো। কলেজের সর্বক্ষেত্রে আমার বিচরণ শুরু হল। অধ্যক্ষ মহোদয় আমাকে কলেজ ছাত্র-সংসদের সাংস্কৃতিক বিভাগের শিক্ষক-উপদেষ্টা নিয়োগ করলেন কলেজ যোগদানের প্রথম বছর থেকেই। আমার মনে হয় এই কলেজে ২৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে ২০ বছরের বেশি এই দায়িত্ব পালন করেছি । দীর্ঘ ২৮ বছরে কলেজে পর্যায়ক্রমে আমি সর্বজনাব নলিনী রায়, আমিনুল হক, ড. শামসুদ্দিন মিয়া, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, খোদা বকস্ মিয়া, অমরেন্দ্রনাথ চৌধুরী, ড. আবদুর রহমান, ড. মোসলেমউদ্দিন ও ড. আবদুল জব্বারকে পেয়েছি। তাঁদের সবার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক ছিল খুব ঘনিষ্ঠ।
কেন জানিনা, সবাই আমাকে একটু বেশি গুরুত্ব দিতেন। আমিনুল হক সাহেবকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকতাম এবং উনিও আমাকে ছোট ভাইয়ের মতই স্নেহ করতেন। আমাকে ছাড়া আমিনুল হক সাহেব চলতেই পারতেন না- আমার উপর তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। ঘনঘন আমাকে তাঁর বাসায় ডেকে পাঠাতেন, আর না হয় নিজেই আমার বাসায় চলে আসতেন (প্রধান ছাত্রাবাসের সুপারের বাসা) এবং কলেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে পরামর্শ করতেন। আমার গিন্নীকেও তিনি ছোট বোনের মত স্নেহ করতেন। এক কথায় আমি ছিলাম তাঁর ডান হাত। কলেজে কোন সমস্যা হলে সকল অধ্যক্ষই সবার আগে আমাকে ডাকতেন, কারণ কোন অধ্যক্ষই আমার পরামর্শ নিয়ে কোনদিন ঠকেননি। এটা ছিল আমার বিরল সৌভাগ্য। তাঁদের সবাইকে (জীবিত ও মৃত) আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
বলতে হয়তো অহঙ্কার প্রকাশ পাবে! সত্যি কথা বলতে গেলে ২৮ বছর আমি দাপটের সঙ্গে এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যাপনা করেছি। কোনও দিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি। আমি নীতি নিয়ে চলতাম- কে খুশী হল, বেজার হল, তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা ছিলনা। আমি কাজ করতাম ‘May what come’ এই নীতিতে। আমার মনে পড়েনা যত বড় ছাত্রনেতাই হোকনা কেন- কোন দিন আমার চোখে চোখ তুলে কথা বলেছে। আমি সব সময় ন্যায়ের পক্ষে থাকতাম বলে আপাতত কেউ ক্ষুব্ধ হলেও পরবর্তীতে সে বুঝতে পারতো যে, আমি ঠিকই করেছিলাম। আজও আমার অনেক প্রাক্তন ছাত্র আমাকে একথা বলে এবং শ্রদ্ধ করে। তবুও ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আমার সু-সম্পর্ক ছিল। প্রায় এগার বছর হল অবসর গ্রহণ করেছি। গত এগার বছর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে সব কান্ডকারখানা দেখছি ও শুনছি তাতে মনে হয় এই সময়ে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করাতো দূরের কথা- একজন অধ্যাপকের দায়িত্বও পালন করতে পারতামনা। হয়তো আমার পৈত্রিক প্রাণটাই চলে যেত। আল্লাহর অশেষ রহমত যে, অনেক আগেই কেটে পড়েছি। গত কয়েক বছরে শিক্ষাঙ্গনের ‘বারটা’ বেজে গেছে।
আগেই বলেছি— কলেজের বিভিন্ন ব্যাপারে আমি জড়িত ছিলাম। অধ্যক্ষ সাহেবগণই আমাকে জড়াতেন। বিভিন্ন কমিটির আমি প্রধান ছিলাম- যেমন ছাত্র ভর্তি কমিটি, বিনা বেতনে পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ কমিটি, রাজস্ব কমিটি, পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি, ভর্তি কমিটি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, ছাত্র সংসদ উপদেষ্টা ইত্যাদি। ড. জব্বারের সময় একবার হিসেবে করে দেখলাম আমি সাতটা কমিটির আহ্বায়ক। এক কথায় কলেজে আমি ‘হলুদের গুঁড়ো’ ছিলাম ।
১৯৫৮ সাল থেকে যতদূর মনে পড়ে কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স ক্লাস চালু হয়। এখন দেশে-বিদেশে আমার অনার্সের ছাত্র-ছাত্রীরা সু-প্রতিষ্ঠিত। অনার্সে ক্লাস নিতে হত বলে আমার কাজের চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজে অর্থনীতিতে এম.এ ক্লাস চালু হয়। মাত্র এক বছর এম. এ. ক্লাস চালু ছিল। [চলবে]
সূত্র : অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত