বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই লেখায় অতীত দিনের স্মৃতিকথা তুলে ধরার মাধ্যমে লেখক তখনকার জীবন-যাপন, সামাজিক পরিবেশ, চারপাশের চালচিত্রের বর্ণনা করেছেন। তিনি তাঁর জন্মস্থান থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ের এমন সব বিষয়কে উপস্থাপন করার লক্ষ্য নিয়ে এই ধারাবাহিকটি লিখেছেন- যার মধ্যদিয়ে উঠে এসেছে ষাটের দশকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার খন্ডচিত্র। ফলে ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা, এবং অতীত জানার ক্ষেত্রে বর্তমান-ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ লেখা নিঃসন্দেহে মূল্যবান। এ বিবেচনা থেকেই সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর ওয়েবসাইটের জন্য লেখাটি নির্বাচিত হয়েছে। লেখকের গ্রন্থ থেকেও এতে প্রয়োজনীয় অংশ যোগ করা হয়েছে। এর আগে লেখার কিছু অংশ লেখকের নিজস্ব ব্লগে প্রকাশ হয়েছে। ধারাবাহিক লেখাটি কয়েক পর্বে রচিত। এ দফায় প্রথম পর্ব তুলে ধরা হলো। এতে লেখকের শৈশবের কথা উঠে এসেছে। লেখায় ব্যবহৃত কাল্পনিক ছবিটি এ আই দিয়ে তৈরি করা। -স/প

আবুল হোসেন খোকন

জানি না কতো দূরের অতীত মনে রাখা যায়। কারণ নিজের অতীত খুঁজতে গিয়ে এটা বুঝেছি। হামাগুড়ি দিয়ে চলার দু’একটি কথা যেমন এক ঝলক করে মনে করতে পেরেছি, পাশাপাশি এখন থেকে ১০ বছর আগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও মনে করতে পারি না। কতো দূরের অতীত দেখতে পাই, আর কতো কাছের অতীত দেখতে পাইনা- এসব নিয়ে তাই বেশ বিব্রত হতে হয়। তারপরেও অতীত তো অতীতই, মনে পড়ুক না পড়ুক, সেটা ছিল- এটাই সত্যি। এরকম গোলকধাঁধায়ই অতীত স্মৃতির কথায় হাত দিতে হলো।

বিধিবদ্ধ জন্ম তারিখ ৯ নভেম্বর ১৯৬২। তার মানে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল ৭ এবং ৮। অর্থাৎ ৯ নভেম্বরের আগে পর্যন্ত ছিল ৭ বছর, আর ৯ নভেম্বরের পর থেকে ছিল ৮ বছর। দুটোই ১৯৭১ সময়কালের বয়স। এই মাইল ফলক ধরেই শুরু করা যাক স্মৃতির জানালা খুলে দেখা।

**********

দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায় জন্ম। এটা মজুমদার পাড়া। তখন ছিল রায়টের সময়। অর্থাৎ, ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর থেকে একটানা চলছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়গতভাবে হিন্দু-মুসলমানের বসতিকে এপার-ওপার করার পালা। এপার মানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে, অত্যাচার-নির্যাতন করে- হিন্দু বাসিন্দাদের ভারতে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছিল। একইভাবে ওপার বা ভারত থেকেও মুসলমানরা এদেশে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ওপার থেকে আসাদের বলা হতো বিহারী।

আমাদের এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। বসতি একেবারেই হাতে গোনা। ঘন জঙ্গলে ভর্তি জায়গায় বেশ দূরে দূরে এক-একটি বাসিন্দার কাঁচা বা মাটির তৈরি ঘরবাড়ি। এই জনপদে মানুষের পাশাপাশি জঙ্গলে বাস করতো মেছো বাঘ, সাজারু-শেয়াল থেকে শুরু করে বহু জাতের বন্য পশু। এসব নিয়েই গরিব বাসিন্দারা অনেকটা বন্য পরিবেশে বাস করতেন। এখানেই শেষ কথা নয়। এ পরিবেশও তছনছ করে দেয় দেশবিভাগ। রায়ট এবং দমন-পীড়নের মুখে হিন্দুরা ভয়ে-আতঙ্কে এখান থেকে বসতি ছাড়ছিলেন। অল্প পয়সায় বাড়ি-ঘর, জমি-জমা বিক্রি করে তারা অনেকটা পালিয়ে যাওয়ার মত ভারতে চলে যাচ্ছিলেন।

জ্ঞান হবার বয়স পর্যন্ত কোন কথা মনে পড়ে না বললেই চলে। তবে পরবর্তী সময়ে বাবা-মায়ের মুখ থেকে শুনে এবং নানাভাবে জেনে কিছু স্মৃতি তৈরি হয়। যেমন, শুনেছি আমাকে নাকি ঘরে বারান্দায় বসিয়ে রেখে মা একদিন সাংসারিক কাজ করছিলেন। আমি তখন হামাগুড়ি দেওয়া অবস্থায় বসতে পারি। বারন্দার মাটির উপর মা আমাকে বসিয়ে রেখেছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান- একটা গোখরো সাপ বিরাট ফনা তুলে আমার সামনে। আর আমি সাপের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছি। সাপ ছোবল মারছিল না, কিন্তু আমার হাসির সঙ্গে দুলে দুলে মজা করছিল। আমি নাকি হাত বাড়িয়ে সাপের লেজ ধরে টানাটানি করছিলাম। তাতেকরে সাপ মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল, আবার উঠে ফনা তুলছিল। এসব দেখে মা আর্তনাদ করতে থাকেন। তখন আশপাশের কেউ কেউ ছুটে আসেন। ততোক্ষণে সাপটি পালিয়ে যায়।

মনে পড়ে আমরা যে মাটির ঘরে থাকতাম, সেটার ভেতরে ডালপালা দিয়ে বানানো একটা খাট (মাঞ্চা) ছিল। বারান্দায় একদিক যাতায়াতের পথ রেখে মাটি দিয়ে একটা নিচু দেওয়াল ছিল। তার এক কোনায় মাটির চুলায় রান্নার কাজ করতেন মা।

আমাদের এই পরিবারকে দেখতে মাঝে মধ্যে গ্রাম থেকে আসতেন আমার নানা। তিনি আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। হাত ধরে আস্তে হাঁটিয়ে দূরের পুকুরে নিয়ে যেতেন। এও মনে পড়ে, বিকেল বেলার দিকে বাবা আমাকে কোলে নিয়ে দূরে ইছামতি নদীর দিকে যেতেন। তখন ওই নদী ছিল শুকনো। সেখান দিয়ে আমার মাকে সাহায্য করা এক বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে ওপারে নিজের বাড়িতে যেতেন। এইটুকুই। আর কিছু মনে পড়ে না।

**********

আরও পরের কথা। সময়টা ছিল একাত্তর পূর্ববর্তী। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ হতে পারে। তখন পাবনা শহরে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা ছিল না। রাতে মানুষ কেরোসিন তেলের হ্যারিকেন অথবা মাটির কুপিবাতি ব্যবহার করতেন। ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালতে পর্যন্ত এর ব্যবহার হতো। শহরের সড়ক পথগুলোতেও কেরোসিন বাতির ব্যবস্থা ছিল। রাস্তার ধারে বেশ দূরে দূরে ছিল মানুষ সমান উঁচু ল্যাম্প পোস্ট। তার মাথায় ছিল কাঁচের বাক্সের মধ্যে বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা। মিউনিসিপ্যালিটির কর্মীরা বাইসাইকেলে এসে সন্ধ্যে বেলা ওই বাক্সের মুখ খুলে পরিমাণমত কেরোসিন তেল দিয়ে যেতেন। ম্যাচ জ্বালিয়ে সলতেয় আগুন দিতেন। এই বাতি সারারাত ধরে মিটমিট করে জ্বলতো। ভোরের দিকে তেল ফুরিয়ে গেলে আপনা-আপনি নিভে যেতো। শহরের বেশিরভাগ রাস্তাঘাটে এভাবেই সরকারিভাবে আলোর ব্যবস্থা করা ছিল। তবে ঝড়-বৃষ্টির সময় এসব বাতি কাজ দিতো না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিভে যেতো।

তখন শহরের প্রায় সব রাস্তা ছিল কাঁচা বা মাটির। শুধু মাত্র প্রধান সড়ক, যেটা নগরবাড়ির দিক থেকে শহরের ভেতর দিয়ে ঈশ্বরদী দিকে চলে গেছে- সেটার কোন কোন অংশ ছিল পিচের, কোন অংশ ঢালাই। এই সড়ক পথের ধারে মিউনিসিপ্যালিটির দেওয়া কিছু সুবিধা ছিল। যেমন মানুষজনের জল পানের জন্য প্রথম দিকে ছিল টিউবওয়েল, পরে হয়েছিল ট্যাংকি থেকে সরবরাহ করা ট্যাপকলের পানি।

তখন মানুষের মল ত্যাগের জন্য বাড়িতে বাড়িতে কাঁচা পায়খানা ছিল। মল ত্যাগ করতে হতো মাটির চারিতে। হরিজন পল্লীর লোকেরা প্রতিদিন সকালে এক ধরনের বড় পাত্রে সেই চারি থেকে মল ঢেলে নিয়ে যেতেন। সেগুলো তারা মাথায় করে নিয়ে কিছু দূর গিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা গরুর গাড়ির বিরাট ড্রামের মত পাত্রে ঢেলে দিতেন। ড্রাম বোঝাই হলে তা গরু দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হতো নগরবাড়ি যাওয়ার পথে ময়লাগাঢ় এলাকায়। রাস্তার ধারে থাকা সেই ময়লাগাঢ়ের মাঠে মানুষের মল জমা করা হতো। দুর্গন্ধ এড়াতে ওই পথ দিয়ে যানবাহন চলাচলের সময় যাত্রীদের নাক চেপে থাকতে হতো।

তখনকার সাধারণ মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খালি গায়ে লুঙ্গি পরে চলাফেরা করতেন। পায়ে চটিও থাকতো না অনেকের। যারা একটু ‘ভদ্রলোক মানুষ’ ছিলেন, তারা লুঙ্গির সঙ্গে পাঞ্জাবি বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। তবে আরেক শ্রেণীর মানুষ লুঙ্গি বা পাজামার সঙ্গে কলার এবং বুক পকেটওয়ালা কোমরের নিচ পর্যন্ত নামানো এক ধরনের রঙ্গিন শার্ট পড়তেন। পায়ে রাবারের চপ্পল থাকতো। অনেকে আবার ধুতিও পরতেন।

গ্রামের মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করলেও গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। বাইসাইকেলেরও ব্যাবহার ছিল। এছাড়া তিন চাকার রিকশা ছিল। সেগুলোর ভেঁপু বাজানো হতো রাবারের বল চেপে। এসব রিকশায় মেয়েরা চড়তেন শাড়ি কাপড় পেঁচিয়ে, যাতে পুরুষদের চোখে পড়তে না হয়।

তখন পড়াশুনার জায়গা বলতে ছিল মক্তব। এছাড়া সাধারণ স্কুল বা প্রাইমারি স্কুল ছিল। আর ছিল বিশাল এডওয়ার্ড কলেজ। মেয়েদের হাসপাতাল বলতে ছিল পৈলানপুরের ম্যাটারনিটি হাসপতাল। দোকান-পাট ছিল, কিন্তু একেবারেই হাতে গোনা এবং দূরে দূরে। মানুষ বাজারঘাট করতে শহরের বড় বাজার এবং টেবুনিয়া বা আরিফপুরের হাটে যেতেন।

আমাদের এলাকায় বিক্রেতারা মাথায় করে দুধের হাড়ি নিয়ে আসতেন। কেউ কেউ সাইকেলে টিনের বাক্সে দুধ নিয়ে বের হতেন। এই দুধওয়ালাদের রীতিমত খাজনা দিতে হতো। মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা বাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে এইসব দুধওয়ালাদের পাকড়াও করতেন এবং খাজনা আদায় করে চক দিয়ে তাদের দুধের পাতিলে চিহ্ন দিয়ে দিতেন। অন্যান্য জিনিসপত্র যেমন, শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদিও বেচাকেনা হতো ফেরি করে। ফেরিওয়লারা জোরে জোরে ডাক ছেড়ে পণ্যের প্রচার করতেন। [চলবে]

লেখক পরিচিতি : আবুল হোসেন খোকন

  • ০৯ নভেম্বর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পাবনা শহরে (রাধানগর মহল্লায়) জন্ম। সাংবাদিকতা ও লেখালেখি ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে। ১৯৮৫ থেকে গণমাধ্যমের শীর্ষ পদে কর্ম। জাতীয় পর্যায়ে দৈনিক সংবাদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, আমাদের সময়, দৈনিক ডেসটিনি, দৈনিক মাতৃভূমি; আঞ্চলিক পর্যায়ে দৈনিক করতোয়া, দৈনিক উত্তরবার্তা; জাতীয় পর্যায়ে সাপ্তাহিক পূর্বালোক; এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাপ্তাহিক শরণী, সাপ্তাহিক বিবৃতি, সাপ্তাহিক পাবনা-এর শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন। আশি-নব্বই ও দুই হাজারের দশকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মাধ্যমের কলাম লেখক। মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, সাংবাদিকতা, ভ্রমণ, গল্প-প্রবন্ধভিত্তিক রচিত গ্রন্থ ৮টি। দুই শতাধিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র’র নির্মাতা। জাতীয় মাসিক ট্যাবলয়েড সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর সম্পাদনা পর্ষদ সদস্য। 

লেখক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।