স্বাদ বিস্মৃতির অতলে

হা-মীম আবদুস সবুর
কদবেল, কৎবেল বা কয়েতবেল বেশ শক্ত খোসাযুক্ত ২- ৫ ইঞ্চি ব্যাসের অনেকটা টেনিস বল আকৃতির হালকা টকস্বাদ বিশিষ্ট ফল, তবে এটি মিষ্টি স্বাদেরও হতে পারে। গাছ সাধারণত ২০-৫০ ফুট উঁচু হয়। কাঠ শক্ত ও পর্ণমোচী, মানে এর পাতা প্রতিবছর শীতের শেষে ঝরে যায়। এর আদি নিবাস এই বাংলাদেশ, ভারত (আন্দামান দ্বীপপুঞ্জসহ) এবং শ্রীলঙ্কা (সূত্র: উইকিপিডিয়া)। ফলে এটি একটি খাঁটি দেশীয় ফল।
পাকা কদবেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ, শর্করা, চর্বি, খাদ্য আঁশ (ফাইবার), লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১ (থায়ামিন), বি২ (রিবোফ্লেবিন), বি৩ (নায়াসিন) ও সি রয়েছে। এক সময়ের জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত (প্রকাশের তারিখ: ৯ অক্টোবর, ২০২১) “স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় কদবেল” শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে “পুষ্টিগুণে ভরপুর কদবেল। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে আলসার ও কিডনির সমস্যায় কদবেল কতটা উপকারি ফল। বিশেষ করে কাশি, সর্দি, হাঁপানি, ও যক্ষ্মা রোগ নিরাময়ে খুবই কার্যকর। সুগারে কুপোকাত? ওষুধের লম্বা লিস্ট নিয়ে দোকানে ছুটছেন? কদবেল খান। কারণ কদবেল- ডায়াবেটিস প্রতিরোধে, পেটের রোগ নিরাময়ে, বদহজম নিরাময়ে, কোষ্ঠবদ্ধতা ও আমাশয় নিরাময়ে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে, কিডনি সুরক্ষায়, ক্যান্সার নিরাময়ে, দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধিতে, রূপচর্চায় সহায়ক, যকৃত্ ও হৃদপিন্ডের জন্যও উপকারি।”
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের! যতই উপকারী ফল হোক বাস্তবে আমরা পথে ঘাটে হাজারে হাজারে যে কদবেল দেখি সেগুলো সবই অপুষ্ট ও কাঁচা। ফলে চাটনির অবস্থাও তথৈবচ। কপালের ফেরে গ্রাম বা কদবেল গাছের সাথে সম্পর্কবিহীন আমরা ভুলেই গেছি পাকা কদবেলের আসল রং, গন্ধ, স্বাদ।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়লো; দুই হাজার চার কি পাঁচ সালের দিককার ঘটনা, আমার ছোট শ্যালক তখন তার বড় বোনের ঢাকার বাড়িতে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। চাটমোহরের বাড়ি থেকে ঢাকায় আসার সময় ওর ছোট বোনের শশুর বাড়ি থেকে পাঠানো দুটো কদবেল সাথে করে বড় বোনের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। যার একটা দুতিনদিন আগে গাছ থেকে পড়া আর একটা সেদিনেই গাছ থেকে পড়েছে মানে টাটকা পড়া। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে, পাকার উপযুক্ত হলেই কেবল কদবেল গাছের বোঁটা থেকে খুলে পড়ে এবং সেই কদবেল দুচার দিন ঘরে রাখলে তবেই পাকে, অপোক্ত কদবেল সাধারণত গাছ থেকে পড়ে না আর গাছ থেকে কাঁচা কদবেল পাইকারিভাবে পেড়ে কখনোই নেচারালি পাকানো যায় না- আর সেই কাঁচা কদবেলের বোঁটা টাটকা অবস্থায় কোনমতেই কদবেলের গোড়া থেকে নিখুঁতভাবে খুলে নেয়াও য়ায় না। তার আরেকটা মানে হচ্ছে বোঁটা ওয়ালা কদবেল মানেই অপোক্ত- কাঁচা, যদি সেটাকে কোন কৃত্রিম উপায়ে পাকানোও হয়, তবে সেটা হবে “ইঁচড়ে পাকা” কদবেল! এখন বাজারে বেচতে আনা কদবেলগুলোর প্রায় সবই থাকে বোঁটা ওয়ালা- মানে কাঁচা।
যাহোক ছোট মামার আনা কদবেল স্কুল পড়ুয়া দুই ভাগ্নির কাছে মহার্ঘ। কিন্তু প্রাপ্তির সাথে সাথে সেই কদবেল ভেঙ্গে তারা দ্বিধান্বিত। একটার ভেতরে পুরোটাই চকলেট কালার এবং কেমন মাতাল করা একটা গন্ধ, আরেকটা গন্ধহীন ক্রিম কালার- যেরকমটা তারা স্কুলের সামনের ভ্যান থেকে প্রায়ই কিনে বান্ধবীরা মিলে খায়। অগত্যা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মামার স্মরণাপন্ন দু বোন। পন্ডিত মামা নিজেও চেনে না কদবেলের কাঁচা- পাকা। বিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, শুঁকে, অনেক ভেবে বিশেষজ্ঞ মতামত দিলেন তিনি- কালো এবং সেই সাথে গন্ধ- মানে ওটা কদিন আগের পড়া বলেছিল বুনি (পাবনার চাটমোহর এলাকায় বোনকে আদর করে ’বুনি’ ডাকে) অর্থাৎ পুরোনো ওটা পঁচে গেছে ফেলে দে। আর এটা আজকেরই পড়া, মানে টাটকা- এটা খা। পন্ডিত মামার পরামর্শে চকলেট কালারের কদবেলটার ঠাঁই হলো ময়লা ফেলার ঝুড়িতে। ঘটনাটি বিকেলের।
আর সকালে রাজশাহী থেকে আমি অফিসের কাজে ঢাকায় এসে কাজ শেষে সেদিন সন্ধ্যায় বড় ভায়রার বাড়ি উঠলাম। ভাগ্নিরা আদর করে একটা চিনে মাটির প্রিচে করে বিকেলে মাখানো কদবেলের চাটনি খেতে দিলে আমি বললাম: মা রে! কাঁচা কদবেলের চাটনি তো খেতে ভাল লাগে না। পাকা হলে খাওয়া যেত।

দুবোন একসাথে বলে উঠলো: মামা যে বললো এটাই পাকা এবং টাটকা।
আমি বললাম: না মা, তোমার মামা আসলে জানে না, পাকা কদবেল তো সব সময় চকলেট কালারের আর চমৎকার সেন্টেড হয়।
দুবোন এক সাথে হায় হায় করে উঠলো: তাহলে আমরা পাকাটাই ফেলে দিয়েছি!
জানতে চাইলাম: কোথায় ফেলেছো?
: ময়লা ফেলার ঝুড়িতে! হতাশা ওদের গলায়।
বললাম: কই নিয়ে আসো দেখি।
দৌড়ে ছোটটা নিয়ে এলো ময়লার ঝুড়ি। ঘর ঝাড়ু দেয়া ধুলো ময়লা আবর্জনার মধ্যে সত্যিই ধুলো ময়লায় জড়িয়ে প্রকৃত পাকা কদবেলটা দুভাগ হয়ে শুয়ে চমৎকার সুগন্ধ ছড়াচ্ছে তখনো। কিন্তু অনেক দিন পর পাকা কদবেল দেখেও আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
পাকা কদবেলের চাটনি ছোট বেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে সকলের একটা অতি প্রিয় আইটেম ছিল। তাই আমার মেয়েদের সেই চমৎকার স্বাদ পাওয়ানোর জন্য প্রতি সিজনেই আমি বাজারে পাকা কদবেল খুঁজি, কিন্তু পাইনা বলে শেষ পর্যন্ত পাকা কদবেল আমার কেনা হয়ে ওঠে না কোন বছরেই। কারণ বাজারে পাকা কদবেল পাওয়া যায় না সেও কয়েক যুগ হলো প্রায়। যে বিক্রেতা ডজন ডজন কদবেল নিয়ে বেচতে বসে। অথবা যে ভ্যান ওয়ালা শতাধিক কদবেল নিয়ে ফেরি করে বেড়ায়- তাদের কাছে তো পাকা কদবেল পাওয়ার আশা করা দূরাশাই বলতে হবে। সামান্য দুচারটে নিয়ে যারা বেচতে বসে বাজারে তাদের কাছেও ঠকেছি কয়েকবার। সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য করে নিজের গাছের অথবা পাশের বাড়ির গাছের পাকা বলে ঠকিয়েছে- আমিও ঠকেছি। তাই মনের ইচ্ছা মনেই থেকে গেছে। পাকা কদবেল মেয়ে দুটোকে আর খাওয়ানো হয়ে ওঠেনি। মেয়েরা স্কুলে গেটে বেচা কাঁচা, আধা পঁচা কদবেলের চাটনি কিনে খায়, বারণ করলেও শোনে না। আসল কদবেলের স্বাদ কী তাই তো তারা জানে না। তাই আমার কথাকে বড়দের অন্যায় বাড়াবাড়ি ধরে নিয়ে স্কুল গেটের অখাদ্য কদবেলের চাটনিই ওরা কিনে মজা করে খায়। শেষ পর্যন্ত আমি ছাদের টবে কদবেল গাছ লাগিয়ে চার/ পাঁচ বছর অপেক্ষা করি ফুল আসে না বলে শেষ পর্যন্ত সেই গাছও কেটে ফেলেছি। আর যথাযথ প্রমানের অভাবে আমার অভিজ্ঞতার কথা কাউকে শুনাতে ভরসা পাইনা। আমি হেরে যাই নিয়তির কাছে।

অসাধু মুনাফা লোভী ফরিয়া- ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে গ্রামের কদবেল চাষীরা গোটা গাছের কদবেল একবারে বেচে দিয়ে এককালীন টাকা ঘরে তোলে। প্রতিদিন একটা দুটো বা বড়জোড় তিন চারটে করে পোক্ত কদবেল গাছ থেকে পড়বে, সেটা নিয়ে গ্রামের বাজারে যাবে, গ্রামে কজনেই বা পাকা কদবেল কিনে খেতে চায়? গ্রাম্য ফরিয়ারাও তো একটা দুটো করে কেনে না, কিনবেও না। তারাতো মধ্যস্বত্তভোগী মাত্র। শহুরে বা বড় ব্যবসায়ীদের জন্যই তারা কেনে। কারণ শহুরে ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনেক- দুএকটা গাছ পাকা কদবেলে সে চাহিদা মেটে না। তাদের গোটা গাছের সব ফল চাই একসাথে- সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্পের মত, তাই পাকা কদবেল আর জোটে না কারোরই কপালে । আমরা নিজ দেশে পরবাসী হয়ে যাই। এই মাটির ফসল- দেশীয় ফল কদবেলের পাকা রং, গন্ধ, স্বাদ ভুলে যাই চিরতরে।
আমরা দেখেও দেখি না, সত্যকে ভয় পাই। বুঝেও বুঝতে চাই না। ঢালাও ওয়াকওভার দিয়ে রেখেছি তথা কথিত ফল ব্যবসায়ীদের। নিতান্তই অসময়ে গাছ থেকে লট ধরে পেড়ে আনা সেই কাঁচা কদবেলগুলো আমাদের চোখের সামনে খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন রোদে ফেলে রেখে পাকানোর মহড়া দেয়া হয়, না হয় সেদ্ধ করা হয়। সেই লট থেকে টাটকা টাটকা কিনতে পারলে তা কাঁচা হলেও ভাল। কিন্তু সব চেয়ে দুঃখের বিষয় হলো উপরের শক্ত আবরণের কারণে ভেতরে পচে গেলেও বাইরে থেকে বোঝা যায় না বলে স্টকে থাকা কদবেল এক দুই মাস ধরে বেচা যায় আর সময়ের ব্যবধানে ভেতরে ছত্রাক জন্মানো আধা পঁচা কদবেল কড়া ঝাল মশলায় মেখে সুস্বাদু(!) চাটনি বানিয়ে মানুষকে বিশেষ করে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের খাওয়ানোও যায়- আর আমাদের অভাগা ছেলেমেয়েরা সেটাই অমৃত ভেবে খায় আর প্রশংসা গীত গায়।
তবু অন্তত এই প্রকৃত সত্যটা সবাই জেনে রাখুন যে কদবেল পাকলে চকলেট কালারের হয়, চমৎকার হালকা সুগন্ধীযুক্ত হয়, চাটনিটা মোলায়েম পেষ্টের মত হয়। প্রকৃত পাকা কদবেল কখনোই ক্রিম বা সাদাটে কালারের হয় না, সুগন্ধবিহীন হয় না, কষ্টা (কষাটে) স্বাদের হয় না।
পাকা কদবেল না পেলে অগত্যা কাঁচাটাই খান, মিথ্যেয় আকৃষ্ট হয়ে কাঁচাটাকে অন্তত পাকা মনে করে খাবেন না। আর বেশি পুরোনো টা খাবেন না, পারলে টাটকা পেড়ে আনাটা খান, নাহলে খাবেন না। আর মনে রাখবেন কোন মতেই কদবেলের বোঁটার কাছে ফুটো করে কড়া ঝাল-মশলা দিয়ে কাঠি দিয়ে ভেতরের কদবেলের শাঁসে সময়ের ব্যবধানে অনিবার্যভাবে জন্মানো সাদা তুলোর মত ছত্রাকসহ ঘুঁটে দেয়া চাটনি নামক সেই অখাদ্য ক্রিকেট বলের মত শক্ত খোলসের ছোট্ট ফুটোর মধ্যে (যে ফুটো দিয়ে ভেতরের ভাল-মন্দ কিছুই দেখা যায় না) চিকন-চ্যাপটা কাঠি ঢুকিয়ে সেই কাঠি দিয়ে খাওয়া যতই অভিনব হোক আর যতই স্বাদের মনে হোক খাবেন না- ওটা স্বাস্থ্যসম্মত নয় কোনমতেই।
পরিশেষে ঐ চাটনি খেয়ে উপরের প্রতিবেদনে বর্ণিত কোন উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা আদতেই থাকে কিনা বা থাকলেও কতটুকু তা একটু হলেও ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।
