দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি দুই বছর আগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশ হয়েছিল। পাবনার ১৯৮ বছরে এসে সেই লেখার শেষ পর্ব।

মোসতাফা সতেজ
শাহজাদপুরে অন্যান্য উপজেলা থেকে শিক্ষিতের হার বেশি। এখানকার জামে মসজিদ শহীদ মখদুম শাহদৌলা নির্মাণ করান বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এই ধর্ম প্রচারক সম্বদ্ধে পোতাজিয়া গ্রামের ভবানী নাথ রায় তাঁর ‘হিন্দু বিজ্ঞান সূত্র’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘শাহ মখদুম সাহেব ছিলেন পারস্য দেশীয় সামন্ত নরপতি। তিনি সামন্ত হলেও ফকিরের মতন জীবন-যাপন করতেন। সম্ভবত মুসলমান রাজত্বকালের প্রথম দিকে এদেশে তাঁর আগমন ঘটে। আত্মীয় পরিজনসহ তিনি বাংলার রাজধানী গৌড়ে উপস্থিত হন।
এ সময় তাঁর ভাগ্নে খাজা নূরের সঙ্গে পোতাজিয়া গ্রামে ভগু নন্দীর ছেলে মাধবের বংশধরদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই পরিচিতি ধরে পরবর্তী সময়ে শাহ মখদুম ইসলাম ধর্ম প্রচার উপলক্ষে এই অঞ্চলে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। একটি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন।’ রাজশাহীর ইতিহাস প্রণেতা মোহা. মেছের লেখেন, ‘রাজশাহীর শাহমখদুম, পাবনার শাহদৌলা শহীদ ও সিলেটের হযরত শাহজালাল (রাঃ) সমসাময়িক ছিলেন। অধ্যক্ষ শেখ শরফুদ্দিন বলেন, রাজশাহীর শাহমখদুম নোয়াখালির মিরান শাহ ও কুমিল্লার রাস্তি শাহ পরস্পর আত্মীয় ছিলেন।’ খান আবদুুল ওয়ালী এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘ইয়েমেনের সুলতান মোয়াজ ইবনে জবাল এর ছেলে শাহজাদা মখদুম শাহদৌলা, তাঁর তিন ভাগিনা খাজা কলন দানিশ মন্দ, খাজা নূর, খাজা আনোয়ার ও তার ভগ্নি এবং অপর বারজন দরবেশ ও অসংখ্য সহচর নিয়ে ৭ কিংবা ৪০টি জাহাজ যোগে এদেশে ধর্ম প্রচার করতে আসেন। তাদের জাহাজ এই স্থানে ঠেকে গেলে তাঁরা এখানেই অধিপতি বিহার প্রদেশের রাজার সঙ্গে তাঁর বিরোধ ঘটে। রাজা বিদেশীদের বসতি স্থাপন পছন্দ করলেন না। ফলে যুদ্ধ হয়। মখদুম শাহদৌলা পরাজিত ও নিহত হন। আছরের নামাজরত অবস্থা হয়রত মখদুম শাহদৈৗলাকে শিরচ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। কাটা মুন্ডু সেনারা নিয়ে যায় তাদের রাজার কাছে। তাঁর মাথা কেটে রাজার কাছে নিয়ে গেলে রাজা অনুতপ্ত হন।’

এ কথা উল্লেখ আছে বৃহত্তর পাবনার প্রত্নতাত্মিক জরিপ গ্রন্থেও। লেখক পরেশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় তার বাংলা পুরাকৃত’ গ্রন্থে লেখেন, শাহজালাল উদ্দিন তাররেজি নামের দরবেশ রাজা লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে গৌড়ে আগমন করেন। রাজা লক্ষণ সেন তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর প্রতিপালনার্থে তাঁকে অনেক সম্পত্তি দান করেন যা বাইশ হাজারী নামে পরিচিত। শাহজাদপুরে শাহ মুখদুম ও তাঁর ভাগ্নের কবর ছাড়াও তাঁর অনুসারী ১২ জন শহীদ দরবোশর কবরসহ মোট ১৮টি কবর আছে। সমাধি শায়িতরা হলেন শাবসুদ্দিন তাররিজি, শাহ ইউসুফ, শাহ খেনগোয়ার, শাহ আজমত, হাসিলা পীর, শাহ বোদলা, শাহ আহম্মদ, শাহ মাস্তান, শাহ হাবিব উল্লাহ, শাহ মাদার এবং হাদী। অবশিষ্টদের নাম জানা যায় না। মখদুম শাহদৌলা মাজার শরীফের দক্ষিণ পাশে খাজা কালীন দানিশ মন্দের মাজার এবং তাঁর ভাগ্নেদের মাজার রয়েছে। এখানে আরও দুটি শহীদান গণ কবরও রয়েছে। আক্রমণে এর শহীদ হন। মখদুম শাহদৌলার বোন যে জলাশয়ে আতেœাৎসর্গ করেছিলেন তা সতী বিবির খাল নামে পরিচিত ছিল। শাহজাদপুরে একটি নীলকুঠি ছিল। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তা কিনে নেন উনবিংশ শতকের শেষ দিকে। জমিদারি দেখা শোনার দায়িত্ব পেয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে আসেন ১৮৯০ সালে। বাস করতেন কুঠিবাড়িতে। এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়।
উত্তরাঞ্চলের গর্বের প্রতিষ্ঠান শাহজাদপুরের বাঘাবাড়িতে অবস্থিত মিল্কাভিটা। ১৯৫৯ সালে কো অপারেটিভের মাধ্যমে এই দুগ্ধ কারখান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে নেয়া হয়। চালু করা হয়। স্বাধীনতার পর।
সিরাজগঞ্জ জেলার প্রাচীনতম এলাকা রায়গঞ্জ। কাপড় ব্যবসায় জন্যে রায়গঞ্জ হাট ছিল বিখ্যাত। এ হাটে ইংরেজ, ফারসি ও ওলন্দাজ বণিকদের আগমন ঘটত। যোগেষ চন্দ্র বাগল তাঁর মুক্তির সন্ধানে ভারত’ গ্রন্থে লেখেন, ‘ইংরেজি কোম্পানির কর্মচারীরা তাঁতিদের টাকা দাদন দিয়ে কাপড় বুনাতো। কাপড়ের চাহিদা বাড়ায় তাদের ওপর অত্যাপরও বাড়ত। অত্যাচারের কারণে তাঁতিরা নিজেদের বৃদ্ধ আঙ্গুল কেটে তাঁত বুনতে অক্ষমতা প্রকাশ করত।’

তাড়াশ উপজেলার বিনাসরা গ্রামে কিংবাদন্তীর বেহুলা সুন্দরীর পিতা বাছো-বানিয়ার বসত বাড়ি ছিল। এই গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল নিছানীনগর। জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় গোলাকৃতি ঢিবির পাশের পশ্চিমে একটি খাল। এই খালের ওপর দিয়ে বেহুলা নৌকা নিয়ে আসা যাওয়ার সময় নৌকা উল্টে যায়। তা আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গ্রামের মাস খানে বেহুলার কূপ। আগে পানি ছিল। বর্তমানে আবর্জনায় পরিপূর্ণ। ৫ মিটার গভীরের এই কুপের মুখ ৩ মিটারের বেশি। কূপের মধ্যে ছোট ছোট চারটি কূপ ছিল। জঙ্গলে পরিপূর্ণ।
১৮৭২-৭৩ সালের কৃষক বিদ্রোহ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা ইতিহাস কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশহিতৈষীদের চেতনাও জাগ্রত করেছে। পরবর্তী আন্দোলন-সংগ্রামে পুষ্টি যুগিয়েছে। বিদ্রোহের বিষয় বীজ নিয়ে গত শতকের পঞ্চাশ দশকে রাজনীতিকেরা তাঁদের মানস মৃত্তিকায় বপন করেন। এই ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার মতন নয়। এই খাজনা কেন্দ্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শাহজাদপুরের ঈশান চন্দ্র রায়। [সমাপ্ত]
লেখক পরিচিতি :
- মোসতাফা সতেজ : বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক, কবি ও সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর পারিবারিক সদস্য