[লক্ষ্য করুণ : লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা (১৪ জানুয়ারি ২০২৪), তৃতীয় সংখ্যা (১৪ ফেবুয়ারি ২০২৪) ও চতুর্থ সংখ্যায় (১৪ মার্চ ২০২৪) প্রকাশ হয়েছিল।]

-মোসতাফা সতেজ
যে বিদ্রোহের বাষ্পকণা ভেসে বেড়িয়েছে যুগ যুগ ধরে, যার তাপে আতঙ্ক সঞ্চারিত হয় জমিদারদের মনে, সংশোধিত হয় বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব¡ আইন, উচ্ছেদ করা হয় জমিদারি ব্যবস্থা, ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে কৃষক সমাজ, সেই প্রজাবিদ্রোহ ঘটনার দেড়শ বছর পূর্তি হলো এই গ্রীষ্মে। পাবনার প্রজাপীড়ক জমিদারেরা স্বেচ্ছাক্রমে উচ্চ হারে খাজনা দাবি করায় তাদের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন পাবনার ইউসুফ শাহী পরগণার ঈশান চন্দ্র রায়। পরে এ পরগণা শাহজাদপুর নামে পরিচিত হয়। এ বিদ্রোহের সুফল কেবল এ জেলারই নয়, সমগ্র বাংলার ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। ধর্মঘটীদের দাবি ছিল, অন্যায্য খাজনা থেকে মুক্তি ও সঠিকভাবে জমি পরিমাপ করা। ঈশান তার পরগণার প্রজাদের পুঞ্জীভূত অসন্তোষকে তাতিয়ে দিতে পেরেছিলেন বলেই তারা অকস্মাৎ একটা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। খাজনা শোষণের জাল থেকে তাদের বেরুবার প্রচেষ্টাই ছিল আন্দোলনের উপজীব্য। মাস দুয়েক যেতে না যেতেই জারি করা হয় সরকারি ফরমান। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। ৫৪টি ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার করা হয় ৩০২ জনকে। ১৮৭৩ সালের জুলাই মাস থেকে বিদ্রোহের জোয়ার চলে যেতে থাকে ভাটার টানে। কিন্তু রেশ থেকে যায়। খাজনা কেন্দ্রিক বিদ্রোহের ইতিহাসে বিস্মৃত হওয়ার মতন নয়। গত শতাব্দীতে বেশ কয়েকজন নেতা ইতিহাসের আলোয় পথ চলেছেন। খাজনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ায় তা রিলে-রেসের মতো চলতে থাকে দশকের পর দশক।
বিদ্রোহীদের ইতিহাস কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশহিতৈষীদের চেতনাও জাগ্রত করে। আন্দোলন সংগ্রামে পরোক্ষভাবে পুষ্টি যোগায়। তেমনি এ ভূখ-ের ঘটে যাওয়া বিদ্রোহের ইতিহাস ও তার বিষয়-বীজটি গত শতকের পঞ্চাশ দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর মানস-মৃত্তিকায় বপন করেন। ১৯৭০ সালে নির্বাচনী ইশতোহারে তিনি ২৫ বিঘা জমির খাজনা মওকুফের ঘোষণা দেন। ভোটে জয় লাভ করেন বাধাহীনভাবে। স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় বসে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পালনে অগ্রাধিকার দেন। বিগত দেড়শ বছরে খাজনা লেনদেনে সংকট উত্তরণে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। প্রজাবিদ্রোহের ইতিহাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনা স্পর্শ করেছিল বলেই তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

আন্দোলনে ঈশান চন্দ্র রায় প্রজাদের কাছ থেকে অনায়াসে সমীহ আদায় করে প্রজাদের মধ্যে সমতা এনে দেন। ইতিহাস তাঁকে মনে না রাখলেও বিপ্লবের যে বীজ তিনি রোপণ করে গেছেন তা মহীরূহ হয়ে ওঠে পরবর্তী শতকে। ঈশানের বসত ভিটেয় প্রশাসন ঘুঘু চড়িয়েছিল কিনা এ ব্যাপারে ইতিহাস নিঃশ্চুপ। বিদ্রোহী নেতারা পরবর্তী দিনগুলি কীভাবে কাটিয়েছেন তা অজানাই থেকে যায়। কিন্তু এই বিদ্রোহ প্রতিবাদী চেতনা গঠন ও শাণিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে যায়। বিদ্রোহী বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ২৬৯টি গ্রাম তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। ইতিহাস এ কথাই বলে। মাটি ও মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর পরেও ভরসা হলো এই মাটির করই হয়ে ওঠে বিদ্রোহের উপদান। অথচ বৃটিশ সরকার খাজনা আদায়কে সামনে রেখে অপশাসন চালিয়েছে। প্রজাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরাবার অপচেষ্টা চালিয়ে তার পরিণামও প্রত্যক্ষ করেছে ১৯০ বছরব্যাপী। ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর (১৭৫৭-১৯৪৭) খাজনা আদায়ের বিষয়টি ধাপে ধাপে সহনীয় করা হয়।
১৮৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে একটা কি দুটো গ্রাম খাজনা পরিশোধে অতটা নতি স্বীকার করেনি। সে সব গ্রামের অধিবাসীরা সিভিল কোর্টে সাফল্য অর্জন করে। আপিলের ফলে বর্ধিত খাজনার কিছু সংখ্যক দাবি বাতিল হয়ে যায়। ছিনতাই করে নেয়া হয় একজন রায়তকে। তাকে মুক্ত করা এবং অপরাধী জমিদারকে শাস্তি প্রদান করা হয়। এ সময় থেকেই বিদ্রোহ দানা বাঁধতে থাকে। এ সকল ঘটনাবলী ক্রমশ পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। বাড়তি খাজনার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রজা সাধারণ দলবদ্ধভাবে বিরোধিতার জন্য নিজেদের গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। ১৮৭৩ সালের মে মাসে বিদ্রোহীদের সংখ্যা বেড়ে যায়। জুন মাসে বিক্ষুদ্ধ হাওয়া সমগ্র পরগণায় প্রসার লাভ করে। বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট গভর্নর ১৮৭২-৭৩ সালের প্রশাসনিক রিপোর্টে লেখেন, ‘প্রজারা যথাযথভাবেই এসব শর্তের বিরোধিতা করতে পারে। ভূমির পরিমাণ সংক্রান্ত বিতর্কিত বিষয়াদি যুক্ত হয়ে সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়। ভূমি পরিমাপের কোনো সুষম মান না থাকায় সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী ভূস্বামী আর প্রজাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের উর্বর উৎস হয়ে দেখা দেয়।’ তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে পাবনা জেলা গেজেটিয়ার লেখে, ‘ধর্মঘটীদের মূল সংঘ ১৮৭৩ সালের মধ্য ভাগ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। ১ জুলাই পর্যন্ত ২৬৯টি গ্রাম সংঘবদ্ধ সমিতিতে যোগদান করেছিল। দলে যোগদানের জন্য অত্যধিক ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়নি। হত্যা ও অত্যাচারের কাহিনি ভিত্তিহীন।’
পাবনার শাহজাদপুরের যে জমিদারিতে প্রথম এই বিশৃংখলা দেখা দেয় সেখানে জনৈক অংশীদার তার অংশ এমন সব লোকদের দর ইজারা (ভাড়া নিয়ে ভাড়া দেয়া) দিয়েছিল যারা অন্যান্য অংশীদারদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল। এই অবস্থা থেকে অনেক বিরোধের জন্ম হয়।
১৮৭২-৭৩ সালে প্রদত্ত বাংলার প্রশাসনিক প্রতিবেদনে উল্লেখ, আইন শৃংখলা পুন: প্রতিষ্ঠার জন্য কমিশনার তৎক্ষণাৎ একজন অভিজ্ঞ জেলা পুলিশ প্রধানের নেতৃত্বে পার্শবতী জেলাসমূহ থেকে ৪০ জন অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়। লেফটেনান্ট গভর্নরের আদেশে অস্ত্রে সুসজ্জিত ফরিদপুর পুলিশের একটি দল গোয়ালন্দ থেকে পাবনার ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে পাঠানো হয়। একশ সশস্ত্র পুলিশের একটি বাহিনী ও অন্যান্য জেলার রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী এনে পরগণায় মোতায়েন করা হয়। তাদের রাখা হয় কুষ্টিয়ার সহকারী পুলিশ প্রধানের অধীনে। এতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর বিক্ষোভ থেমে যায়। ম্যাজিস্ট্রেট ও তার অধীনস্তদের হাতে অনেক লোক গ্রেফতার হয়। লেফটেন্যান্ট গভর্নর ধৃত অপরাধীদের নদীর অপর পাড়ের জেলাসমূহে চালান করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ অন্য কয়েকটি মামলায় জড়িত ছিল। নেতারা ৬ মাসের মধ্যে ধর্মঘট ডাকবেন না এই মুচলেকায় ৫০ টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি লাভ করেন। বন্দীদের এক মাস থেকে দুবছর পর্যন্ত কঠোর সাজা প্রদান করা হয়। বিষয়টি পরে দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। এ সকল তথ্য পাবনা জেলা গেজেটিয়ারের। ১১ সদস্যের সংঘ গঠি ঈশানের লক্ষ্য ছিল অবৈধ খাজনা কমানোর মাধ্যমে আর্থিক সমস্যা দূর করা। কারণ জমিদারদের ধার্যকৃত খাজনা কমাতে পারলে প্রজাদের আর্থিক উৎকর্ষ সাধন করা যাবে। ঋণগ্রস্ত কৃষিজীবীর সংখ্যাও কমবে। তাঁর এই স্বপ্ন পূরণ করতে ১১ সদস্যের রাজসভা বা সংঘ গড়ে তোলা হয়। এই সংঘে বিদ্রোহী রাজা হন ঈশান চন্দ্র রায়। রাজমন্ত্রী-খুদি মোল্লা (যবতলা), নায়েব-রমজান সরকার (ঢালিয়াবাড়ি) গোমস্তা-জাকের জোয়াদ্দার (আড়কান্দি), সুপারিনটেনডেন্ট-শম্ভুনাথ পাল, সর্দার-রহিম প্রামানিক হোড়দিঘুলিয়া), পাইক-হাজারি প্রামানিক (রূপসী), আরবিন মৃধা (পদ অস্পষ্ট) (মহারাজপুর), জরিপ আমিন-নন্দী সরকার (হাতকোড়া) জজ আমিন-জগৎ ভৌমিক (রূদ্রগতি) ও শাসন কর্তা গঙ্গাচরণ পাল (হুরা সাগরের পশ্চিম পাড়)।

গঙ্গাচরণ পালের অধীন কর্মচারীদের নাম এবং বড়াল নদীর দক্ষিণ এলাকার প্রধান কর্মচারীদের পদবি প্রকাশ করা হয়নি। সৈন্যদের মধ্যে কয়েকজনের নাম তালিকা আছে। সাঁথিয়ার নাগ ডেমরার রাজু সরকার ও ছালু সরকার ঐ প্রদেশের শাসন কর্তা ও প্রধান কার্যকারক। এছাড়া চড়া চিথুলিয়ার খরিদা শেখ, ভিটাপাড়ার মানিক শেখ, বাঘাবাড়ীর কাঞ্চিয়া শেখ, উল্লাপাড়ার হরিনাথ বিশ্বাস ও মথুরা সরকার। এরা ছিল সদস্য সংগ্রাহক। খাজনা ছাড়াও আদায়কৃত শুল্কের খাত ছিল ১২ রকম। ডাক খরচা, তাহেরি (খাজনার রশিদ প্রদানকারী কেরানিকে দেয়া অর্থ), নজর (জমিদারের সাথে সাক্ষাতকালীন দেয়া অর্থ) সেলামী (জমি হস্তান্তরের সময়) বিবাহ কর, হাতি খরচা, ভিক্ষা (শ্রাদ্ধ, বিয়ে বা অন্য কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে জমিদারকে দেয় অর্থ), জরিমানা (বিবিধ অপরাধের জন্য), তলাবানা (খাজনা আদায়ের নোটিশ জারিকালে পেয়াদাকে দেয় অর্থ) পার্বনী (জমিদার বা নায়েবকে দেয়া বাৎসরিক উপঢৌকান), রাস্তা তৈরি কর এবং রশদ খরচা (জমিদারের জমিদারি পরিদর্শন উপলক্ষ্যে দেয় অর্থ)।
জমিদারেরা জমা তালিকা বাড়ানোর প্রতি অত্যধিক নজর দেন এবং অবৈধ কর আরোপ করেন যা পরবর্তী সময়ে খাজনার একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়। খাজনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো লিজ প্রদান করা বা কবুলিয়াত করে নেয়া হতো না। প্রজারা স্বেচ্ছামূলক আবওয়াব (নির্ধারিত কর ব্যতীত অতিরিক্ত দেয়া কর) কে পালায় পরিণত করার ব্যাপারে কখনও তাদের লিখিত সম্মত্তি প্রদান করত না যা আইন অনুসারে আদায় করা যেতে পারত। এভাবে কালে কালে সিরাজগঞ্জ মহকুমার ইউসুফ শাহী পরগণাতে বিঘা প্রতি মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্যান্য পরগণা অপেক্ষা অনেক বেশি। সম্ভবত এটা ছিল বড় বাজুর হারের তিন গুণ। জমি ছিল সমানভাবে লাভজনক। কেবল পার্শ্ববর্তীই ছিল না ইউসুফ শাহী পরগণার সঙ্গে পরস্পর সংলগ্ন ছিল। একই সময়ে কোনটা বৈধ এবং কোনটা বৈধ নয় তা ছিল সম্পূর্ণ অনির্দিষ্ট। আদালতের সামনে বিচার কাজে আনীত মামলায় প্রজা ছিল পরস্পরবিরোধী। এমন কিছু কর ব্যবস্থা ছিল যেগুলোকে জমিদার অবৈধ বলে স্বীকার করেন। সেসব কর হলো : বিবাহ কর, আয়কর, স্কুল খরচা, প্রভৃতি। যেখানে পুরোনো খাজনা এক টাকা ছিল সেক্ষেত্রে ১৫ বছর পর আট আনা বর্ধিত করলে এবং শেষের দিকে রীতিমত তা প্রদান করা হয়। সাত বছর আগে ৭ আনা দাবি করা হলো এবং মন্দা মৌসুম ব্যতীত তা প্রদান করা হয়। ১৮৭০ সালে ৪ আনা দাবি করা হয়। অন্যান্যদের পরামর্শের তোয়াক্কা না করে কেবল কয়েকটি গ্রাম মাত্র এক বছর প্রদান করে। এ ব্যাপারে জমিদার বলত যে, খাজনার পরিমাণ ২ টাকা, প্রজা বা রায়ত বলত এক টাকা। অন্যদিকে সম্ভবত কোর্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত যে, খাজনার পরিমাণ এক টাকা আট আনা।
বিদ্রোহের মূল কারণ দু’টি। অন্যান্য পরগণার তুলনায় আদায়ের উচ্চ হার ও দাবিকৃত অর্থের কতটা পাওনা সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। এছাড়া প্রাসঙ্গিক কারণ হলো এজেন্টদের চরিত্রের ঔদ্ধত্য।
১৮৭২ সালে পরগণা ইউসুফ শাহীর জমিদারেরা প্রজাদের কাছ থেকে বর্ধিত হারে খাজনা দাবি করেন। বাংলায় প্রচালিত আইনের অধীনে পূর্ববতী বছরে যথাযথভাবে নোটিশ প্রদানের পর নিয়মিত পদ্ধতির মাধ্যমেই কেবল খাজানা বাড়ানো যেতে পারে। পাবনায় এ রূপ কোনো নোটিশ প্রদান করা হয়নি। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে, ফসলের দাম বাড়লে খাজনা বাড়াবার অধিকার দেয়া হয়েছিল জমিদারদের। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। জমিদারের বা তাদের অনেকে সরাসরি খাজনা বাড়িয়ে দেন। করের সঙ্গে খাজনা যোগ করে অনিয়মিতভাবে মোটা অংকের খাজনা আদায়ের অপপ্রচেষ্টা চালান। এছাড়াও তাঁরা শর্ত আরোপ করেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে আরোপিত হতে পারে এমন সব করও প্রজাদের প্রদান করতে হবে।
ঈশান চন্দ্রের লক্ষ্য ছিল অযৌক্তিক খাজনা ও অযৌক্তিক কর আদায় প্রতিরোধ করা। তারা খাজনা আইন ও প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে ছিল না। তাই তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার করা হলেও মুচলেকা দিয়ে জামিন লাভ করেন নেতৃবৃন্দ। অন্যন্যরা ১ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত দ- ভোগ করেন। ১৮৭৮ সালে একটি কমিশন ন্যায্য বকেয়া খাজনা আদায়ে প্রজাস্বত্ত্ব আইনের সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে। সরকার এই সুপারিশ অনুযায়ী নিয়োগকৃত কমিশন রিপোর্ট পেশ করে। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব¡ আইন প্রণীত হয়। এ আইনের বলে জমিদারি বিক্রি হয়ে গেলেও প্রজার অধিকার জমিতে অক্ষুণœ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। খাজনা বকেয়া পড়লে প্রজাকে উৎখাত করা যাবে না। প্রজা জমি বন্ধক রাখার অধিকার লাভ করে।
এ আইন ৪৩ বছর পর অর্থ্যাৎ ১৯২২ সালে সংশোধন করা হয়। দখলি প্রজা সাধারণ অধিকতর অধিকার ও সুবিধা লাভ করায় নিজেরাই ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। সংশোধনীয় আইনে যাদের মোটেও জমি নেই তাদের ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ইচ্ছা অনুসারে জমি ব্যবহারের অধিকার পায়। এরপর থেকেই জমিদারদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে। তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব কমে যেতে থাকে। প্রজা বিদ্রোহের ঘটনা সম্পর্কে আলাদা আলাদা কারণ জানা যায় ইতিহাসে। বাংলা পিডিয়া লেখে, উরকান্দি গ্রামের ৪৩ জন রায়তের বিরুদ্ধে দমনমূলক মামলা দায়েরের ঘটনাই ছিল কৃষক বিদ্রোহ। শাহজাদপুর কোর্টের মুন্সেফ ১৮৭২ সালের এপ্রিলে জমিদারদের পক্ষে রায় দেন। এ বছর ডিসেম্বরে রাজশাহীর সিভিল জজ জমিদারদের পেশকৃত কাগজপত্র জাল ও বানোয়াট বিবেচনা করে আগের রায় নাকচ করে দেন। এছাড়া প্রাসঙ্গিক কারণ তো আরও আছে। যেমন এজেন্টদের চরিত্রের ঔদ্ধত্য।
বিদ্রোহী প্রজাদের মধ্যে যারা পাট আবাদী ছিলেন তাদের একাংশ জমিদারদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। আন্দোলনের বছরে পাটের দর কমতে থাকে। বেশির ভাগ প্রজা পাট আবাদে ঝুঁকে ছিলেন। তারা ভাবনায় পড়েন। তার ওপর বর্ধিত হারে খাজনা দাবি। কর দাবি। জেলার জনসংখ্যা তখন ছিল ১২ লাখ সাড়ে ১১ হাজার। এর মধ্যে মুসলমান ৮ লাখ ৪৭ হাজার ২২৭ জন। হিন্দু ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩১৪ জন। অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় ৩ হাজার। অন্যান্য পরগণার তুলনায় ইউসুফ শাহী পরগণায় খাজনা আদায়ের উচ্চ হার। দাবিকৃত টাকার কতটা পাওনা সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। এছাড়া প্রাসঙ্গিক কারণ হলো, কয়েকজন জমিদার এজেন্টদের চরিত্রের ঔদ্ধতা ও আইন শৃঙ্খলাহীনতা।

ঈশান চন্দ্র রায়কে বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকবল তাদের কাচারিতে ধরে নিয়ে যায়। এক কথায় বলা যায় তাঁকে অপহরণ করা হয়। টাকা দেয়ার পর তিনি মুক্তি পান। তিনি একজন সামান্য তালুকদার। (জমিদারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত করে নেয়া সম্পত্তির মালিক) তাঁর তালুক ছিল গোপালপুরে। তাঁর যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সাধারণ প্রজার কী হবে? এ সব কথা ভেবে তাঁর গোমস্তা (আদায়কারী) শম্ভুনাথ পালের সাথে পরামর্শ করে প্রজাদের জোটবদ্ধ করতে থাকেন। প্রজারা খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয়। মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট নোলান লেখেন, ‘এই অপহরণের ২০ দিন পরেও আমি স্বয়ং অনুসন্ধান করে ঐ ব্যক্তির আটক স্থান খুঁজে বের করতে পারিনি।’
এই পরগণায় যেখানে ভূসম্পত্তির অংশ অতি মাত্রায় উপবিভক্ত ছিল সেখানেই উৎপীড়ন বেশি হয়েছে। অংশীদারেরা নিজেদের মধ্যকার ঝগড়া বিবাদ বিদ্যমান থাকায় বিদ্রোহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। একটি অবিভক্ত জমিদারিতে আলাদা ভাবে খাজনা আদায় করা প্রত্যেক অংশীদারের জন্য একটি প্রচলিত রীতি।
বিবাদপূর্ণ পরগণায় জনৈক অংশীদার তার অংশ এমন সব লোকদেরকে ইজারা (ভাড়া নিয়ে ভাড়া দেয়) দিয়েছিল যারা অন্যান্য অংশীদারগণের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন ছিল। এই অবস্থা থেকে অনেক বিরোধের জন্ম হয়। পুঞ্জীভূত হতে থাকে ক্ষোভ। একসময় প্রজারা ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হন।
পাবনায় ১৮৫০ সালে মৌজাওয়ারি জরিপ পরিচালনা করা হয়। তাতে ব্যবহার করা হয় লাঠি। এই পরিমাপকে লাঠাকাঠা মাপ বা থাকবস্ত বলা হয়। ১৮৫৩-৮৪ সালে রাজস্ব নির্ধারণ কল্পে যে জরিপ করা হয় তা রেভিনিউ সাথে (আর এস) নামে পরিচিত। প্রজা বিদ্রোহকালে তাদের দাবি ছিল মখদুম শাহর হাতে মাপ দিতে হবে। (৩০ ইঞ্চি হাত)।
সিরাজগঞ্জ মহকুমা জলবায়ুর প্রভাবে কিছুটা পলি অঞ্চল। বিল এবং বিলের পার্শ্ববতী এলাকায় পাট আউশ আমন শন এবং দানা ফসল ভাল জন্মে। এছাড়াও সিরাজগঞ্জ মহকুমা পাট চাষের জন্য খ্যাত ছিল। পাট বিক্রি করেই প্রজা সাধারণ খাজনা-কর ইত্যাদি পরিশোধ করত। ১৮৭২ সালে পাট চাষের আওতাধীন জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার একর। পাবনা জেলার ইতিহাসে উল্লেখ, ১৮৭২ সালে সিরাজগঞ্জ বন্দর হতে ৩২ লাখ ৬ হাজার টাকার (২,৪৫,৬৪৯ মণ) পাট বিদেশে রফতানি করা হয়েছিল।
অভাবগ্রস্ত কৃষক অনেক সময় পাট চাষের শুরুতেই বেপারীর মাধ্যমে মহাজনের কাছ থেকে আগাম টাকা নিত। এই চুক্তির ফলে বাজার দরের চেয়ে সস্তা দরে মহাজনের কাছে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফসল ভাল না হলে বা উৎপাদন কম হলে তারা ঋণে বাধা পড়ে সর্বশান্ত হতে থাকে। এ পরগণায় গোচারণ ভূমিও উল্লেখ করার মতো। বাথান অঞ্চলে প্রায় ৬ মাস পশু বিচরণের উপযুক্ত ছিল। বিল-পুকুর জলাভূমি প্রভৃতিতে মাছের উৎপাদন ছিল পর্যাপ্ত। নৌকা ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। মাছ রফতানি করা দুঃসাধ্য হয়েছিল।
জেলার কৃষকেরা অত্যন্ত দরিদ্র। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায়ই এদের দুভোগ পোহাতে হয়। অর্থনৈতিক অবস্থা এতই শোচনাীয় যে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যেই কঠোর সংগ্রাম করতে হয়। ঋণভারে জর্জরিত প্রজা সাধারণ আর্থিক চিত্রের প্রকৃত পরিচায়ক। অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। গ্রাম্য ফড়িয়া-মহাজন-বা ধনী কৃষকের কাছ থেকে কঠিন শর্তে ঋণ নিয়ে জীবনপ্রবাহ নির্বাহ করে। হান্টার তার লেখায় উল্লেখ করেন, ১৮৭৬ সালে একজন পুরুষ শ্রমিকের মজুরি ছিল ১৯ পয়সা। নারী শ্রমিক পেত ৮ পয়সা। এ সময় ১ টাকায় সাধারণ চাল পাওয়া যেত ২৪ সের ৬ ছটাক। উন্নত মানের চাল ১২ সের ১০ ছটাক। ১৮৭৫ সালে সিরাজগঞ্জের পাটের মিল গুলিতে অদক্ষ শ্রমিকের মাসিক মজুরি ছিল ৮ টাকা। নারী এবং অপ্রাপ্ত শ্রমিকেরা পেত মাসিক ৩ টাকা বার আনা।
যে ভাবে সংঘবদ্ধ করা হতো
রায়ত সংঘের প্রচারিত উদ্দেশ্য খুবই আকর্ষণীয় ছিল। যেমন অল্প খাজনাসহ জমি মাপের ক্ষেত্রে বড় বিঘার ব্যবহার ইত্যাদি। সেই সাথে নতুন নতুন গ্রামের প্রজাদের দলে যোগদানের জন্যে প্রলুব্ধ করতে অত্যধিক ভয় ভীতি প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য রকম ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। সমিতিতে যোগদানের নিমিত্তে এবং অন্যান্যদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি ও তাদেরকে প্রলুব্ধ করার জন্য রাত্রিবেলায় মহিষের শিং ও অন্যান্য বাদ্য যন্ত্র বাজানো হতো। জুন মাসের শেষ দিকে সংঘের শক্তি বাড়ানোর জন্যে গণসংযোগ বাড়াতে চারদিকে লোকজন পাঠানো হয়। এভাবে এক বিরাট সংঘবদ্ধ দলের সৃষ্টি হয়।
কমিশনার লেখেন, ‘গ্রামবাসীদের কাছে যা নির্দেশ করা হতো ও করতে বলা হতো তাই তারা করত। নিঃসন্দেহে যাদের ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল এবং যে সকল খারাপ চরিত্রের লোকেরা লুট করার জন্যে উৎসাহী ছিল-তারা তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এই সংঘ বা দলের সুযোগ পুরো মাত্রায় গ্রহণ করে। ক্রোধানল প্রকাশকারী আসল প্রজাদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে সামান্য সংখ্যক কুঁড়ে ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুট করা হয়। হত্যা ও অন্যান্য অত্যাচারের কাহিনি ভিত্তিহীন’। গেজেটিয়ারে আরও উল্লেখ, ‘আন্দোলন চলাকালে সিরাজগঞ্জ মহকুমার একজন লোকও মারাত্মক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। কোনো জমিদারের বাড়ি বা অফিস আক্রান্ত হয়নি। বিশেষ মূল্যবান কিছু খোয়া বা চুরি যায়নি। সংঘটিত অপরাধের বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা কেবলমাত্র অপরাধী শ্রেণির সৃষ্ট উত্তেজনার সুযোগ গ্রহণ করার জন্যই ঘটেছিল। মূল সংঘ শুধুমাত্র ১৮৭৩ সালের মধ্য ভাগ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।’ বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদার প্রায় ১৪ হাজার কবুলিয়ত পত্র রেজিস্ট্রি করানোর জন্যে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট মি. নোলানের কাছে হস্তান্তর করেন। তিনি মোক্তারের কাছে না দিয়ে প্রজাদের হাতে ফিরিয়ে দেন। এঘটনা থেকেই প্রজারা ভাবেন ম্যাজিস্ট্রেট তাদের পক্ষে আছেন। এরপর থেকেই তারা ধর্মঘটের প্রেরণা লাভ করেন।
১৮৭২ সালে তৎকালীন কালেক্টরের দেয়া আবাদি জমি বিঘা প্রতি খাজনার হার উল্লেখ করে গেছেন ডাব্লিউ ডাব্লিউ হান্টার। এ স্ট্যাটিসটিক্যাল একাউন্ট অফ বেঙ্গল গ্রন্থে লেখেন, বিঘা প্রতি খাজনা ৪ আনা থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত ছিল। ধান-গম-অন্যান্য খাদ্য শস্য এবং পাট ও নীল চাষের উপযোগী উুঁচ জমি ৮ আনা থেকে ১০ আনা। শস্য চাষের উপযোগী নিচু জমি (পাট ব্যতীত) ১২ আনা থেকে ১ টাকা। পলিগঠিত ভূমি বা চরাঞ্চল ৪ আনা থেকে ৮ আনা। আখ চাষের জমি ২ টাকা। হলুদ চাষে ১ টাকা থেকে ২ টাকা। শন চাষের জমি ৮ আনা থেকে ২ টাকা। পান ও বাগানের জন্য ৪ টাকা থেকে ৬ টাকা। জেলায় মোট ২ হাজার ছোট-বড় জমিদারদের ক্ষমতা সীমাহীন। জমিদারির মধ্যে ৬ জন ইউরোপীয়। অধিকাংশ ছিল হিন্দু। মুসলমান জমিদারের সংখ্যা ছিল ১৪৭ জন। অনুপস্থিত জমিদার ছিল ৯৯জন। জমিদারেরা একই শ্রেণির জমির খাজনা প্রজার কাছ থেকে বিভিন্ন হারে আদায় করত। যার কাছে যেমন নেয়া যায়। রাজস্বের হার নির্ধারণের জন্য তারা প্রজার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং বন্দোবস্ত যোগ্য খাস জমি চাহিদার ওপর নির্ভর করত।
সীমাহীন ক্ষমতা ছিল জমিদারদের
১৭৯৯ সালে আইন বলে খাজনা আদায়ে জমিদারদের সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। খাজনা বাকি পড়লে মর্মান্তিকভাবে শারীরিক নির্যাতন, উচ্ছেদ, ঘরবাড়ি ভেঙে দেয়া, কেউ কেউ হাতি নামিয়ে গুড়িয়ে দিতেন। পুড়িয়ে দিতেন। কারণ খাজনা পরিশোধে অপারগ। সূর্যাস্ত আইনের জন্যে যথাসময়ে কোম্পানিকে ধার্য রাজস্বের ৯০ ভাগ জমা না দিলে জমিদারি থাকবে না। স্বাধীনতা থাকবে না। জীবন কাটাতে হবে বন্দিশালায়। জমিদারেরা জানতো না, অবিচ্ছেদ্য সর্ম্পক মাটিও মানুষের। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর পরেও ভরসা মাটি। অথচ সরকার ও জমিদার খাজনাকে সামনে রেখে মাটি থেকে প্রজাদের দূরে সরাবার অপচেষ্টা চালিয়ে সাফল্য লাভ করতে পারেনি। পরিণামও প্রত্যক্ষ করেছে ১৯৪৭ সালে। ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর উচ্ছেদ করা হয় জমিদারি প্রথা। মর্মান্তিক শোষণের মাধ্যম ছিল খাজনা
ইংরেজ আমলে জেলা প্রশাসকেরা খাজনা আদায়ের দিকটাই আগে দেখতেন। এ কারণে তাদের পদবী ছিল ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর। জেলার সার্বিক উন্নয়নে তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। খাজনা আদায় ছাড়া আর কিছুই ভাবতেন না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রজা সাধারণ সর্বশান্ত হয়ে গেলেও খাজনা ছাড়া মুক্তি মিলত না। স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পদ বিক্রি করে হলেও পরিশোধ করতে হতো খাজনা। এ রকম মর্মান্তিক শোষণে প্রজাদের জীবন প্রবাহ অচল হয়ে পড়ে। এ দিকটা বৃটিশ সরকার চোখ মেলে দেখেনি। কৃষক জীবন ছিল উপেক্ষিত। ঔপনিবেশিক আমলের ভূমি ব্যবস্থা, খাজনা ও কর আদায় প্রজা সাধারণকে কালে কালে মাববেতর জীবনের দিকে ধাবিত করেছে। বৃটিশ সরকার এসব না দেখে কেবল রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব দিয়ে গেছে। ইতিহাসে উল্লেখ, নীল আন্দোলন চলাকালে অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে পাবনায় প্রথম একজন পূর্ণ ক্ষমতা সম্পন্ন ম্যাজিষ্ট্রেট ও কালেক্টর নিযুক্ত হন। ১৮৬৬ সালে মহকুমার উন্নীত হয় সিরাজগঞ্জ। প্রজাবিদ্রোহের পর ১৮৭৬ সালে পাবনা মিউনিসিপ্যালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৭৯ সালে স্বতন্ত্র জজের পদ সৃষ্টি করা হলে পাবনা ও বগুড়া জেলার জন্য মিলিত ভাবে ১ জন জেলা ও সেশন জজ নিযুক্ত হন। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা পায় জেলা বোর্ড।
সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ আইন ও রদ
বিদ্রোহ চলকালীন সময়ে বেশ কয়েকটি পরিবার ঢাকা, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা শহরে এসে ওঠেন। কয়েকটি জমিদার পরিবার ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী চলে যান কলকাতায়। সেখানে তারা একত্র হয়ে প্রজাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন পত্রপত্রিকায়। তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। অমৃতবাজার, সোমপ্রকাশ, সাধারণ ভারত, মিহির প্রভৃতিপত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি আপত্তিকর অংশের অনুবাদ বড় লাট লিটনের কাছে পাঠান। তিনি সকল প্রাদেশিক গভর্নমেন্টের কাছে মতামত চেয়ে পাঠালে মাদ্রাজের গভর্নর ডিউক অব বাকিংহাম লেখেন যে, তাঁর মতে এ ধরণের আইনের কোন প্রয়োজন নেই-কেননা প্রজার মুখ বন্ধ করার চেয়ে তাকে স্বাধীনভাবে রাজার কার্যক্রম সম্বন্ধে সমালেচনা করতে দেওয়া সভ্য ও বুদ্ধিমান রাজা মাত্রেরই কতর্ব্য। কেউ কেউ প্রস্তাবিত আইন দেশীয় ও ইংরেজি সংবাদপত্রের উপর অপক্ষপাত প্রয়োগের পরামর্শ দেন। কিন্ত সব কিছু উপেক্ষা করে লর্ড লিটন কেবলমাত্র দেশীয় সংবাদপত্র সমূহের গলা চেপে ধরার অপচেষ্টা চালাতে থাকেন। অ্যাসলি ইডেনের মূল লক্ষ্য ছিল অমৃতবাজার সম্পাদক শিশির কুমারকে দমন করা। কিন্তু শিশির কুমার দ্বিভাষিক অমৃতবাজারকে প্রায় ইংরেজি সাপ্তাহিকে পরিণত করে এই আইনের বেড়াজালের বাইরে চলে যান।

সোমপ্রকাশ মুচলেকা দিতে অস্বীকার করে পত্রিকা বন্ধ করে দেন। পরে ১৮৮০ সালে এপ্রিল থেকে পুন:প্রকাশ ঘটে। এই আইনের প্রতিবাদ ইন্ডিয়ার অ্যাসেসিয়েশনের উদ্যোগে ১৭ এপ্রিল (১৮৭৮) টাউন হলে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্র্রেরিত অনেক সমর্থনসূচক পত্র ও টেলিগ্রাম এই সভায় পঠিত হয়। সভার প্রস্তাব অনুযায়ী এই আইন রদ করার আবেদন জানিয়ে একটি দরখাস্তÍ ইংল্যান্ডের পালার্মেন্টে বিরোধী দলের নেতা গ্লাডস্টোন এর কাছে পাঠানো হয়। তিনি পালার্মেন্টে একটি বিরোধী প্রস্তাব আনলে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ১৫২-২০৮ ভোটে প্রস্তাবটি বাতিল হয়। অবশ্য বিলাতে মন্ত্রিসভা পরিবর্তিত হলে লর্ড রিপনের (১৮৮০-১৮৮৪) শাসন কালে ১৮৮২ সালে এই আইন রদ করা হয় ও দেশীয় সংবাদপত্রগুলি তাদের স্বাধীনতা ফিরে পায়। দেশীয় সংবাদপত্র সংক্রান্ত আইন (র্ভানাকুলার প্রেস য়্যাক্টলর্ড লিটনের শাসনকালের কয়েকটি কলঙ্কের এটি অন্যতম। ১৪ মার্চ (১৮৭৮) বড় লাটের কাউন্সিলের একটি মাত্র অধিবেশনে বিশেষ আলোচনা ছাড়াই আইনটি গৃহিত হয়। এ আইনে মামলা ছাড়াই সংবাদপত্র সংশ্লিষ্টদের শাস্তিÍ দেবার ক্ষমতা লাভ করে।
জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ
প্রজাবিদ্রোহ প্রতিবাদী চেতনা শাণিত, করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে যায়। প্রজা স্বার্থে নেতৃত্ব বদল হলেও বিপ্লবী বীজ সঞ্চারিত হতে থাকে পরবর্তী প্রজন্ম ও প্রজাহিতৈষীদের মধ্যে। নেতৃত্বের আলো-বাতাস অনুকূলে পেলেই তা যেন জেগে উঠতে থাকে। ৫০ বছর পর লাঙল যার জমি তার ঘাম যার দাম তার শ্লোগান ছিল কৃষক প্রজাপাটির। সুবক্তা আবুল কাশেম ফজলুল হক ১৯২৬ সালে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন ও ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রজা সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৭ সালে বঙ্গীয় কৃষকÑপ্রজাÑপার্টি গঠন করে সভাপতি হন। তিনি ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজাÑপার্টি থেকে ১৪ দফা দাবি পেশ করেন। তার মধ্যে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, খাজনার নিরিখ হ্রাস, নজর সেলামি রহিতকরণ, খাজনা, ঋণ মওকুফ, মহাজনি আইন প্রণয়ন, ঋণ সালিসিবোর্ড গঠন, প্রাথমিক শিক্ষা, স্বায়ত্ত্বশাসন, রাজবন্দিদের মুক্তি প্রভৃতি। নির্বাচনে জয়লাভ করে হক মন্ত্রিসভা ১৯৩৯ সালে পাস করে প্রজাস্বত্ত্ব আইন। ১৯৩৮ সালে গঠন করান ঋণ সালিসি বোর্ড। ১৯৪০ সালে শিক্ষাবোর্ড গঠনেও ভূমিকা রাখেন। ফ্লাউড কমিশন গঠন করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও (কৃষিজীবীদের শুভ সূচনা) ভূমি রাজস্ব নিরিখ করবার ব্যবস্থা করেন। ফজলুল হকের ৩ বছরের মন্ত্রিসভা শান্ত বিপ্লব সাধন করে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। যিনি এই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেন তিনি প্রজা বিদ্রোহের (১৮৭৩) বছরে বরিশালে ভূমিষ্ট হন। শিক্ষা নেন কোলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এ. কে. ফজলুল হক কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের একজন দলনেতা হন ১৯৫৩ সালে। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ৫৭ দিন পর মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হয়। অধিকার বঞ্চিত প্রজাদের মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রণীত হয়। এ আইনে জমিদারি উচ্ছেদ করা হলেও পাকিস্তানি শাসকচক্রের অবহেলার কারণে কাঙ্খিত মুক্তি মেলেনি। আইনের মারপ্যাঁচে গরিব প্রজা ভূমিহীনে পরিণত হয়। জমিদারি উচ্ছেদ করা হলেও সৃষ্টি হয় জোতদার। এস এ জরিপের নামে চলে প্রহসন। খাজনার দায়ে ছোট ছোট চাষীদের জমি নিলামে বেচা-কেনার হিড়িক পড়ে যায়।
জমিদার ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের জমি দখল করে দেশব্যাপী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেয় সরকার। তালিকা অনুযায়ী পাবনায় ১ কোটি ১১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৮ টাকা বরাদ্দ দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালের মে মাসে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এ তথ্য রয়েছে পাবনা জেলা গেজেটিয়ারে। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২৫ বিঘা জমির খাজনা মওকুফের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ক্ষমতায় বসে তাঁর দেয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৯৭২ সালে ৯৬ নং আদেশে তিনি কৃষি জমির খাজনা ২৫ বিঘা পর্যন্ত মওকুফ করেন। ‘রাষ্ট্রপতির আদেশ’ নামে কয়েকটি আইন রচিত হয়। জমির সংরক্ষণ সীমা পরিবার প্রতি ১শ বিঘা নির্ধারণসহ কয়েকটি বিধান কার্যকর করা হয়। পরিবর্ততে ১শ বিঘার স্থলে ৩৭৫ বিঘায় উন্নীত করা হয়। ১৯৭২ সালে বাতিল করা হয় ৬০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা। ২৫ বিঘা খাজনা মওকুফের ফলে ৩৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতে সরকার বঞ্চিত হয়। ১৯৭৬ সালে বকেয়া খাজনা, সেস, ট্যাক্স ইত্যাদি বিলোপ করে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ নামে একীভূত রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া হয়। যা দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান থাকে।
‘পাবনা বিদ্রোহের একটি বিশিষ্ট দিক মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণির বিদ্রোহী প্রজাদের সপক্ষে লেখা। বেঙ্গল ম্যাগজিন পত্রিকায় রমেশচন্দ্র দত্ত বিদ্রোহীদের পক্ষ সমর্থন করেন। জমিদারি মুখপত্র হিন্দু পেট্্িরয়ট। পলাতক জমিদারেরা কলকাতায় জড়ো হয়ে তাদের পরিচালিত পত্রিকায় প্রজাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। জমিদার ঠাকুরেরা এবং সলপের সান্যালরা আপোষ মীমাংসা করে নেন। ব্যানার্জিরা লাঠিবাজি এবং মামলা চালিয়ে যেতে থাকেন। প্রজারা আতœসম্পর্ণ করে। জয় পরাজয়ে দুপক্ষেরই আংশিক জিত হয়।’ এ কথা লেখেন চিত্তব্রত পালিত।
ঈশান রায়ের পরিচয় ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
ঈশান চন্দ্র রায় ইউসুফ শাহী পরগণার খুকনি দৌলতপুরে ভূমিষ্ঠ হন। তাঁর পিতা কালীচরণ রায়। পেশায় ছিলেন ব্যবসায়ী। ছোট খোটো তালুকও ছিল। বিত্তশালী (জমিদার) বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের মধ্যে খাজনা কেন্দ্রিক বিবাদের সূচনা হলে তা ক্রমশ: প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রজারা তাদের বাড়তি জমা এবং বাজে জমার বিষয়ে ধর্মঘট ঘোষণা করেন। ঈশান চন্দ্র নিজ বুদ্ধি বলে তাদের নেতা নির্বাচিত হন। ধর্মঘট চলাকালে তিনি সাধারণত বিদ্রোহীদের রাজা বলে অভিহিত হতেন। এ সময়ে রূদ্রগাতির প্রসিদ্ধ অশ্বারোহী গঙ্গাচরণ পাল বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়ে ঈশান চন্দ্রের দেওয়ান নিযুক্ত হন।
বাংলার প্রাক রাজনীতিতে ঈশান চন্দ্র আদৌ অপ্রাসঙ্গিক নন। তাঁর পরিচালনায় আন্দোলন ভাটার টানে চলে গেলেও তার বেশ থেকে যায়। খাজনা কমা-বাড়ার বিষয়টি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকে। ঈশানের কাছে বিভিন্ন জেলার আগ্রহী বিদ্রোহীদের যাতায়াত ছিল। রাজশাহী হতে কয়েক জন বিদ্রোহী মনস্ক যুবক ঈশানের কাছে হুকুম চান। তিনি বলেন, তোরা পর জেলার লোক, আমি হুকুম দিতে পারি না। তোরা আপন জেলায় একটা রাজা বানিয়ে নে গিয়া।’
আন্দোলনে ঈশানের স্বত:স্ফুর্ত আন্তরিকতার জন্যই হাজার হাজার অনুরাগীর কাছ থেকে শুধু সমর্থন নয় পেয়েছিলেন ভালোবাসাও। তাই তারা তাঁকে গঠিত লীগে রাজার পদে বসান। সাংগঠনিক শক্তিহীন এই বিদ্রোহ ছিল খানিকটা অপরিকল্পিত। ছিল না শাসন ¯েœহ পরিচালন ব্যবস্থা। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কেও ভাবিত ছিলেন না। তাই বিদ্রোহ রাজাকে সমাধান বৈঠকে না ডেকে আন্দোলন ভাটার টানে নিয়ে যায় প্রশাসন।
সংগঠন গড়ে তোলা, চাঁদা তুলে মামলা চালানো, গ্রেফতারকৃত প্রজাদের জামিনের ব্যবস্থা করা, বিক্ষোভ প্রদর্শন কর্মসূচি প্রচার এসবই ছিল প্রজাকল্যাণময়। এসকল কর্মতৎপরতা পরিচালনকালে সমাজের কিছু দুবৃর্ত্ত সংঘে অনুপ্রবেশ করে। তারা আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে অপরাধমূলক ঘটনা ঘটাতে থাকে। আন্দোলনকালে পুলিশের চোখ এড়াবার লক্ষ্যে মৎস্য শিকারের ভান করে বিদ্রোহীরা কাঁধে লাঠির আগায় পলো ঝুলিয়ে যাতায়াত করত। এজন্যে তাদের পলো বিদ্রোহী বলা হতো। তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ভি.জি টেলার বিষয়টি অবগত হয়ে বিদ্রোহ দমনে অভিযান পরিচালনা করেন।
গ্রেফতারি পরোয়ানা অনুসারে মৌপুরের আউট পোস্টের হেড কনস্টেবল মদন ঘোষের হাতে ধৃত হন ঈশান। তিনি বাড়িতেই ছিলেন। তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কয়েকটি পত্র পায় পুলিশ। তাতে বিদ্রোহ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা। ছয় মাসের মধ্যে কোনো অত্যাচার করতে পারবে না এই শর্তে ৫০/৫০ টাকা মুচলেকা দিয়ে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এই বিদ্রোহই পরবর্তী প্রজন্মের সমাজমনস্ক দেশ দরদীদের আরওা সচেতন করে তোলে। কালক্রমে বাঁক নিতে থাকে কৃষি সমাজ। কল্যাণ-অকল্যাণের দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। চলতে থাকে খাজনার টানাপোড়েন।
দৃশ্যমান এ বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ ও ক্ষণস্থায়ী হলেও অবৈধ খাজনা বিষয়ক অনুরণন থেকে যায় শতাব্দী কালব্যাপী। শাহজাদপুরের ঈশান চন্দ্র রায় যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তা যেন কালক্রমে রিলে রেসের মতো চলতে থাকে। গ্রামীণ প্রজা সাধারণ তখনও যথেষ্ট পরিমাণে সংগঠিত নয়। সচ্ছল নয়। যতখানি মেধা ও শক্তি ব্যয় করে প্রজাপীড়ক জমিদারদের বিরুদ্ধে বঞ্চনা ও শোষণ প্রতিহত করার মতো ততখানি শক্তিও ছিল না। যোগ্যতাও যথেষ্ট পরিণত নয়। কেবল মনোবল সম্বল। সীমাহীন নির্যাতন সংগঠিত হচ্ছিল বলেই তাঁরা ধর্মঘট ডাকেন। এটা কল্পনা বিলাস নয়। খুব একটিা অপরিকল্পিত নয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে শোষণ মোকাবেলার পবিত্র প্রচেষ্টা মাত্র। ১৮৭৩ সালে বিদ্রোহ পরিচালনাকালে যে সমিতি তাঁরা গঠন করেছিলেন তা পরবর্তীকালের রাজনীতিকদের কাছে পথ প্রদর্শক হয়ে ওঠে। ১৯২৯ সালে গঠিত নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির নাম তো ঈশানকে স্মরণ করায়। ঈশান বুদ্ধিমান, সাহসী ও অহিংস পথিকৃৎ। বিদ্রোহকালে গ্রামে গ্রামে মেঘমালার মতো ভেসে বেড়াতে থাকে তার নাম।
আশ্বর্য তাঁর প্রতিবাদ প্রতিকার। সংঘ গঠন করে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাড়িতে বসেই। পুলিশের ভয়ে কিংবা জমিদারদের লেলিয়ে দেয়া দুর্বৃত্তদের আতঙ্কে আতœগোপন করেননি। নিজের সম্পর্কে বা আতœপ্রচারে মগ্ন হননি। তিনি অযৌক্তিক ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেননি। নিজেকে নিজেরই মধ্যে শান্ত রেখেছেন। কল্যাণ কর্মের মধ্যে নিয়োজিত থেকে বিষয়টাকে চেপে ধরেছেন। ধর্মঘট ডাকার পর থেকেই প্রশাসন ও জমিদারদের ফ্লাড লাইট তার ওপর পড়তে থাকে।

প্রজাবিদ্রোহ শুধু মাত্র একটি বিশেষ দশকের ভূমি নির্ভর প্রজাদের মধ্যে সচেতনতা সঞ্চার করে। যা পরবর্তী প্রজন্মের নেতারা বিষয়টাকে লুফে নিয়ে সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন যুগ যুগ ধরে। তাই বলতে হয় বিদ্রোহের বীজ সুদুরপ্রসারী হয়েছিল। বিদ্রোহ অনেক রকমের হয়। সবাইকে এক আসনে বসানো যায় না। ঈশান নিজের ইমেজকে প্রচার বা প্রদর্শন করতে চাননি। যে ইতিহাস তৈরি করে গেছেন তা প্রেরণাময়। যে বিষয় এবং আদর্শের ওপর আলো ফেলার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তা এখনো অনির্বাণ।
প্রজাদের জাগ্রত করার প্ররেচিত করার কর্মোদ্যোগী করার প্রাণপাত চেষ্টা করেছেন বিদ্রোহী রাজা ঈশান চন্দ্র। তাঁর চিন্তা-চেতনার যেটুকু শ্বাশত তার আগুন ছাই চাপা হয়ে থাকলেও কালক্রমে সংগ্রামী হাওয়ায় ছাই সরে যেতে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিকেরা ছাই সরাতে থাকেন।
তিনি নিশ্চয় অবগত ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বিদ্রোহ সম্পর্কে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের চাকমারা ১৭৭৬ সালে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে, ২য় বার ১৭৮৯ সালে। জুম চাষী বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন চাকমা দলপতি রাজা শের দৌলত খাঁ ও তার সেনাপতি রামুখাঁ। বছর পাঁচেক পর ২য় বার বিদ্রোহ হয়। এবারে নেতৃত্ব দেন প্রয়াত দলপতির ছেলে রাজা জানবক্স খাঁ। তিনি ৩য় ও ৪র্থ বারেও জয়লাভ করেন। এই ‘রাজা’ ও ‘দৌলত’ নামবাচক শব্দ দু’টি পাবনার দৌলতপুরের ঈশান চন্দ্রের জীবনেও গাঁথা হয়ে যায়। তিনি রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩), শেরপুর বিদ্রোহ (১৮২৪ থেকে ১৮৩৩), তিতুমীর বিদ্রোহ (১৮৩৩), সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), বাখেরগঞ্জের তুষখালি বিদ্রোহ (১৮৭২-৭৫) থেকে অনুপ্রাণিত হন বলে ধারণা করা যায়। তাঁদের বিদ্রোহ যেন রিলে রেসের মতো। দৌড় প্রতিযোগিতার সময় দূরত্বের অংশ-বিশেষ দলের প্রত্যেক প্রতিযোগী সদস্য যেমন দৌড়ে থাকে সেরকমই যেন ঈশান চন্দ্র রায়। পরবর্তী প্রজন্মের নেতারা আন্দোলনে গিয়ে ধাপে ধাপে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন। ঈশান চন্দ্রকে গ্রেফতারকালে তাঁর স্ত্রী বলেছিলেন, ‘পরিণামে আপনার এ দশা ঘটবে জানিয়া পূর্বে নিষেধ করিলে শুনেন নাই। এখন দাসীর কথা ফলিল। আপনি চলিলেন কিন্তু এখন দেশে জমিদারগণ যে আমাকে মুসলমানের সঙ্গে নিকা দিবে তাহার উপায় কী?’ এ কথা পাবনা জেলার ইতিহাসে উল্লেখ আছে। আবহাওয়া বিভাগের মোরগ যেমন বাতাসের ইচ্ছেয় ঘুরতে থাকে তেমনি শোষিত জনমত ঈশানের ইশারায় বিদ্রোহ সাগরে জোয়ার বইতে থাকে বর্ষাকালব্যাপী। তাঁর পরিবার নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যান পশ্চিম বাংলার জলপাইগুড়িতে। কবে কোথায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে তা পাঠকের অজানাই থেকে গেছে।
প্রজাদের আর্থিক অবস্থা
পাবনা জেলার কৃষকদের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ১৮৭০ সালে খাজনা কালেক্টরের রিপোর্ট উল্লেখ করে হান্টারের বিবরণে বলা হয়, জনগণের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। অদূর ভবিষ্যতে উন্নতির সম্ভাবনাও কম। তাদের দারিদ্র্যের প্রধান কারণ জমির মালিক এবং কৃষকের মধ্যে বিরাজমান খারাপ সম্পর্ক। অবৈধ কর আদায়ের প্রচলিত প্রথা ও সকল শ্রেণির মধ্যে বিয়ে ও অন্যান্য উৎসবাদিতে অত্যধিক ব্যয় করার প্রবণতা। এ অবস্থায় সুদে কারবারী মহাজনদের উপস্থিতি। কৃষকদের শিক্ষার অভাব। তাদের অজ্ঞতার কারণে খাজনা আদায়কারীদের দয়া ও করুণার ওপর একান্ত নির্ভরশীল। এই অবস্থা পরিবর্তনে তারা অনাগ্রহী। শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। তারা বসবাস করে বেশির ভাগই ঝুপড়ি জাতীয় ঘরে। এই আন্দোলন সম্পর্কে ১৮৭৬ সালে ডাব্লিউ ডাব্লিউ হান্টার লেখেন, ‘তাহারা আইনের মাধ্যমে এক কৃষি বিপ্লব সফল করে তুলেছে।’
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্মানিত শ্রেণি জমিদার। তারা নিযুক্ত হতেন সরকার থেকে। জমি ইজারা নিয়ে প্রজার কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন। কেউ ন্যায্য ভাবে, কেউ অন্যায্য। তাদের অধীনে একটি মধ্যস্বত্ত্ব শ্রেণি বিকাশ লাভ করতে থাকে। বড় বড় জমিদারের ছিল জেলখানা। লাঠিয়াল বাহিনি। তারা সুসংগঠিত। তাদের মাথার ওপর বৃটিশ সরকার।
১৯২৯ সালের জুলাই মাসে পার্লামেন্টারি গ্রুপ হিসেবে প্রজাপার্টি আত্মপ্রকাশ করে। বেঙ্গল প্রজাপার্টি হিসেবে যাত্রা শুরু। বছরের শেষ নাগাদ এটি ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ নামে জনগণের দলে পরিণত হয়। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের অধীনে প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্যে ১৯৩৬ সালে এপ্রিলে ‘কৃষক প্রজাপার্টি’ এই নতুন অভিধা গ্রহণ করে। এ দল বাংলার রাজনীতিতে সৃষ্টি করে নতুন ধারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জমিদারি ব্যবস্থা উৎখাত করা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রচার করে ২১ দফার একটি ম্যানিফেস্টো। তাতে ২য় দফায় ছিল জমিদারি প্রথা বিলোপ করা। এ সকল দাবি উপস্থাপন করেন যথাক্রমে এ. কে ফজলুল হক, (১৮৭৩-১৯৬২), আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯৩-১৯৬৩) ও শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)। সারাদেশ প্লাবিত হয়েছিল যে বছর সেই ১৯২০ সালের মার্চে পদ্মা পারের গোপালগঞ্জে ভূমিষ্ট হন শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন বাস্তবায়নে অগ্রজ নেতাদের সাথে সম্মিলিতভাবে দাবি উত্থাপন করেন।
ক্ষতিপূরণ দেয়া শুরু
এ আইন পাস হওয়ার পর পাবনায় বড় বড় জমিদারিসমূহ দখল করে এবং সকল মধ্যস্বত্ত্ব বিলোপ করে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে অনুসারে ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে বড় বড় জমিদারি দখল করে ১৯৫৬ সালের এপ্রিল থেকে সকল মধ্যস্বত্ত্ব¡ বিলোপ করা হয়। ১৯৬২-৬৩ সালে ক্ষতিপূরণ ও বার্ষিক রাজস্বের তালিকা চূড়ান্ত করে ১৯৬৩ সাল থেকে পঞ্চবার্ষিক কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রদান শুরু করা হয়। এ ভাবে ভূমি দখলের প্রক্রিয়া আইন গত ভাবে সম্পন্ন করতে জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় সেটেলমেন্ট অফিস।
বর্গা আইন
১৯৮৪ সালে ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। যে সকল পরিবারের ৬০ বিঘার বেশি জমি আছে তারা আর নতুন জমি অর্জন করতে পারবে না। যে সকল পরিবারের ৬০ বিঘার কম কৃষি জমি আছে তারা অর্জন করতে পারবেন। কিন্তু নতুন ও পুরাতন কৃষি জমি একত্রে ৬০ বিঘার বেশি হবে না। এই অধ্যাদেশে বর্গা আইন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে বর্গাদার চাষীদের চাষের এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে কেনার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে যে তহশিল এতোকাল ভূমি প্রশাসনের মুখ্য ইউনিট হিসেবে পরিলক্ষিত হয়ে আসছিল। তাতে সাংগঠনিক এবং কার্যপত্র পরিবর্তন করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের কাজ শুরু করা হয়। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের নবীন কর্মকর্তাদের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে প্রশাসনে নিয়োগ করা হয়।
২০০৪ সালে চলতি বাজেটে কৃষিখাতে সহায়তা বাড়িয়ে সব মিলিয়ে ৬শ কোটি টাকা করা হয়। দরিদ্র কৃষকদের স্বার্থে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের পুঞ্জীভূত সমস্ত সুদ মওকুফ করা হয়। স্থগিত করা হয় তাদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা। পুরোনো ঋণের একটি কিস্তি দিলেই তাদেরকে নতুন ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
অনলাইনে খাজনা
২০১৮ সালে ভূমি রেকর্ড (খতিয়ান) কে ডিজিটাল করার উদ্দেশ্যে প্রায় ১শ কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যা- রেকর্ড রুম সার্ভিস শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০২৩ সালে খাজনা পরিশোধ ব্যবস্থা নেয়া হয় অনলাইনে।
এ বছর ১৫ এপ্রিলে ভূমি মন্ত্রণালয় জানায়, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনার ক্ষেত্রে হোল্ডিং প্রতি ১০ টাকার মওকুফ দাখিলা প্রতি বছর মাত্র একবারই আদায় করা হবে। একাধিক অংশীদার থাকলে আলাদা আলাদা ভাবে ১০ টাকায় মওকুফ দাখিলা সংগ্রহ করতে পারবেন।
কৃষি জমির অবিভক্ত খতিয়ান ২৫ বিঘার উর্দ্ধে হওয়া সত্ত্বেও অংশীদারদের প্রত্যেকের অংশ আলাদা করে বিবেচনা করা যাবে না। নিষ্কর ও ইকোনোমিক জোনের ভূমি উন্নয়ন কর সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ সংক্রান্ত নির্দেশনাসমূহ যাচাইয়ের মাধ্যমে নিষ্কর এলাকা নির্ধারণ করবেন। চলতি বছর (২০২৩) ১৪ এপ্রিল থেকে ম্যানুয়ালি জমির খাজনা আদায় বন্ধ করা হয়েছে। ১ বৈশাখ থেকে খাজনা আদায় ব্যবস্থা অনলাইনে চালু হওয়ার পর এক মাসে খাজনা আদায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকা। খাজনা প্রসঙ্গ বলেই গত অর্থ বছরের চিত্রটা দেখা যাক। ২০২১-২২ অর্থ বছরে খাজনা আদায় করা হয়েছিল প্রায় ৬শ ৪৯ কোটি টাকা। শুধুমাত্র ভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থা ও খাজনা দেয়া-নেয়া নিয়ে ১৮৭৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই দেড়শ বছরে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। এনালগ থেকে ডিজিটাল।
স্বাধীনতার ৫৪ বছওে সকল শ্রেণির জীবনে পালাবদল ঘটে গেছে। তার দৃশ্যমান চিত্র সবারই সামনে। ক্রমশ: বদলে যাওয়া দৃশ্য ধাপে ধাপে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।