মোতালেব মোল্লার পাওয়ার হাউজ

[ লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ, দ্বিতীয় বর্ষ, ১০ম সংখ্যায় (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) প্রকাশ হয়েছিল।]

[গারসি উৎসব, যা গাস্বী ব্রত বা গারু সংক্রান্তির ব্রত নামেও পরিচিত। এটি মূলত আশ্বিন মাসের শেষ দিনে (ডাক সংক্রান্তি বা নল সংক্রান্তি) গ্রামীণ বাঙালি হিন্দু সমাজে পালিত একটি উৎসব ও ব্রত। এই উৎসবে বাড়ির উঠোনের তুলসীতলা নিকোন করা, কাকভোরে গারুর ডাল রান্না করা এবং সেই ডাল বাড়ির মেয়ে ও বউদের খাওয়ার আচার পালন করা হয়। এই ডাল তৈরির জন্য খেসারির ডালের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি যেমন ঝিঙে, আলু, পটল, লাউ, কুমড়ো ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

মোসতাফা সতেজ

গারসি উৎসব। এ উৎসব এখনও গ্রামীণ সমাজে এলাকা ভেদে কম বেশি ভর করে আছে। ১৯৭০ সালেও পাবনার কিশোর যুবকেরা ভূত-প্রেত তাড়াতে মধ্য রাতে টায়ার আর মশাল জ্বালিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়াত। কি শহর, কি গ্রাম। কিন্তু এখন শহর থেকে এ ধারনা দূর হলেও গ্রামীণ জীবনে কিছু প্রবীণদের মধ্যে আজও এ উৎসবের আমেজ কিছুটা আছে।

বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরেরা এ উৎসবের কথা জানে না। আগে এ দিনে পাড়ায় পাড়ায় মালাম বা মল্লযুদ্ধ এবং লাঠি খেলা হতো। এখন আর হয় না। পাকিস্তান আমলে হিন্দু এবং মুসলিম পরিবারে এ উৎসব জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করা  হতো। এটা ছিল এ অঞ্চলের অনেকটা সার্বজনীন উৎসব। বর্তমানে কমে আসছে। তবে এবারও আশ্বিনের শেষ রাতে পাবনাবাসীর একাংশ পালন করবে এই গারসি উৎসব।

আগে অগ্রজেরা এ রাতে তার শিষ্য বা অনুজদের তন্ত্রমন্ত্র বা তুক তাক শিক্ষা দিতেন। আবহমানকাল থেকে পালিত হয়ে আসা রকমারি উৎসবের মধ্যে গারসি উৎসবও উল্লেখযোগ্য ছিল। এ সময় অসুখ বিসুখ লেগেই থাকতো বলে শরীরকে সুরক্ষার জন্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ রাতটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতেন। যেমন, তারা একটি কাঁসার ঘটিতে পানি আর আম গাছের মিনি ডালপাতা ও কিছু খাদ্যসহ তুলে রাখতেন চালে। কেউবা রাখতেন আঙিনায়। পরদিন সকালে পরিবারের সবাই এ পানি গায়ে ছিটিয়ে নিতেন। এতে নাকি রোগ বালাই থেকে মুক্ত থাকা যেতো। অনেকে আশ্বিনের শেষ সন্ধ্যায় রান্না-বান্না করে রেখে পরদিন সকালে তা মৌয করে  খেতেন। এ ছাড়া তালবড়াসহ পিঠে পায়েস তৈরিরও চল ছিল তখন।

কয়েক দশক আগেও বড় বাজারের হাজী মো. মহসিন রোডে এ উৎসব উপলক্ষে ক্রেতা বিক্রেতাদের ঢল নামত। আমদানি হতো নানা রকম খাদ্য দ্রব্য। যেমন বেতের ডগা, অঙ্কুরোদগম তালের বীজ, আখের ডুমা, মদনা কলা, পাকা তাল, বাতাবি লেবু, পাকা পেঁপে, কাগজি লেবু নারিকেল, পেয়ারা, ঢ্যাপ, কয়েত বেল, বক ফুল প্রভৃতি। থাকত ধানের খড় গুচ্ছ। এসব কিনে বাড়ি নেয়ার পর ঘরনিরা অংশ বিশেষ কুলোয় বা চালনিতে সাজিয়ে সন্ধ্যায় চালে তুলে রাখতেন। রাতবাসি করা এ সব খাবার খাওয়া হতো দিনভর। খড়গুলো ফলজ গাছে বেঁধে রাখা হতো, যাতে রোগ বালাই আক্রমণ না করে। অনেকেই বলেন এসব কুসংস্কার। অনেকে তা মানেনও।

বর্তমানে গারসি উৎসব ফিকে হয়ে আসছে। কিন্তু ৪০ বছর আগেও রাধানগরে অবস্থিত মোতালেব মোল্লার পাওয়ার হাউজ থেকে সংগ্রহ করা পোড়া মোবিল আর বাতিল জুট লাঠিতে বেঁধে কিশোরেরা মশাল জ্বালাত মধ্য রাতে। কেউ কেউ সাইকেল রিকশার পুরনো টায়ার জ্বেলে ভূত ও মশা তাড়াতে নিজ নিজ এলাকা প্রদক্ষিণ করত। শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে দুর্বল ছিল, সে বিষয়ের বই চালনায় চালে তুলে রাখত।

পাবনা বাজারে এ দিন বিক্রি হত গার্সির উপকরণ। কাঁচা তেঁতুল, আদা, হলুদ, শুটকি পাতা, নতুন কুলা, বই এসব নিয়ে চালনায় বা কুলায় রথ আকারে সাজানো হতো। পাটখড়ি দিয়ে তৈরি করা রথ জাগানো হতো রাতে। নতুন কুলা নিয়ে বাড়ির চারপাশে পরিভ্রমণ করার সময় মশা তাড়াতে কুলা পেটানো হতো। এরপর পাটখড়ির আগুনের আলোয় বই পড়া হতো হিন্দু পরিবারে।

শোনা যায় এ উৎসব উপলক্ষে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল নিয়ে খিচুড়ি রান্না করে বিতরণ করত তরুণেরা। রাখালেরা এদিনে লাভ করত বাড়তি কিছু পোশাক।  ৩০ আশ্বিনের বিকেলে নানা রকম ক্রীড়াদি প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিল। পাবনা জেলার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ আছে, জেলার মল্লযুদ্ধ মালাম নামে খ্যাত। যাহারা ইহাতে বিশেষ অভ্যস্ত তাহারা ‘মাল’ নামে অভিহিত। ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মল্লগণ এ দিনে নানা রূপ ক্ষমতা প্রদর্শন করিয়া পুরস্কার লাভ করিয়া থাকে। এদিনে সর্বত্রই লাঠিখেলার প্রচলন আছে। লক্ষীকোল গ্রামে অনেকের মাল উপাধি আছে। ধনী ও স¤্র¢ান্ত ভদ্র পরিবারের মাল বা মল্লগণ এদিন নানা রুপ ক্ষমতা প্রদর্শন করে পুরস্কার লাভ করে থাকে।

গিরিবালা দেবী তার রায়বাড়ি (১৯৯১) উপন্যাসে উল্লেখ করেন, ‘আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির শেষ রাতে বেড়া উপজেলার রায়বাড়িতে গারসিপূজা হয়। এটা বারোমেসে লক্ষ্মীব্রতের পর্যায় পড়ে। গারসি পূজো আচ্ছা নয়। মেয়েলি ব্যাপার। চালুনি ডালায় গারসি পূজার উপকরণ সাজিয়ে রাখা হয়। তেল, তেলের প্রদীপ, সিঁদুর, কাঁচা হলুদ, কাঁচা তেতুল, পান, সুপারি, আদা, মাসকলাই ভিজানো, কলা, বাতাসা, পাটকাঠি প্রভৃতি। রাতে পাড়ায় পাড়ায় কুলা বাজানো হয়। পাঠকাঠির বোঝা ও হারিকেন নিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে বচন ঝাড়া হয়। ‘ভূত প্রেত দূরে যাক লক্ষ্মী আসুক ঘরে।’ ‘পথের মাঝে গারসি পূজার দ্রব্যসম্ভার নামিয়ে রেখে পাঠকাঠিতে আগুন দেয়া হয়। বরণের ডালা হতে প্রত্যেকটি জিনিস আগুন স্পর্শ করাতে থাকে। পাটকাঠির ছোট ছোট জলন্ত অংশ নিয়ে ধূমপান করা হয়। এই ধোঁয়া গলায় লাগালে সর্দি কাশি হয় না। গলার অসুখ হয় না। এমনি জাগ্রত এবং মহা মূল্যবান সেই ধোঁয়া। বাড়ির বড়রা দুএকটা টান দিয়ে ভূতের মন্ত্র আওড়াতে থাকেন-

‘ভূতের বাপের বিয়ে জলার কাঁধায় বাদ্যি বাজে/তা থই থই থিয়া। প্যাঁচায় চড়ে লক্ষ্মী আসেন ঘরে, ভূত পলায় ডরে/লক্ষ্মীর হাতে ধানের বালা, মাথায় সোনার ছাতি/ভূত পালালো জ্বালা তোরা হাজার সোলার বাতি’। বিজ্ঞজনেরা বলেন, এসব কুসংস্কার। বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর সচেতনতা বাড়ার কারণে এ সংস্কার ফিকে হয়ে আসছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।