[দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রথম বর্ষ ৮ম সংখ্যায় (১৪ জুলাই ২০২৪) প্রকাশ হয়েছিল।]

– কাজী হাবিবুর রহমান
আদি যুগে পুরুষপুর, তারপর পেশোয়ার আর বর্তমানে পাকতুনখাওয়া। পুরুষপুরের নাম পাওয়া যায় প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে। বুদ্ধের পবিত্র দেহাবশেষ দেখবার উদ্দেশ্যে সুদুর চীন থেকে যেসব বিখ্যাত তীর্থ যাত্রী ভারত ভ্রমণের পর যে ইতিহাস লিখে রেখে গেছেন, সেখান থেকে জানা যায়, ফাহিয়ান এই শহরের নামোল্লেখ করেছেন ‘পলুশা বা পুরুষা’ নামে। হিউ-এন-সাং একে ‘পলুশাপলু’ বা ‘পুরুষাপুরা’ বলে অভিহিত করেছেন। আবুল ফজলের মতে, মুঘল যুগে এটা ‘পারশোয়ার’ নামে কথিত ছিল। পূর্বতন নামের অর্থ অনুধাবন করতে না পেরে আবুল ফজলই এর নতুন নাম রাখেন পেশোয়ার বা সীমান্তের শহর। ইংরেজরা নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সের রাজধানী করেন পেশোয়ারকে। বর্তমানে এর নাম হয়েছে পাকতুনখাওয়া। আর এটার অবস্থান এখন পাকিস্তানে। এর গা ঘেঁষে ওপারেই আফগানিস্তান।
পেশোয়ারের প্রাচীনত্ব অনস্বীকার্য। পাথর বা শিলালিপিতে লেখা, বহু রাজার রাজত্বের সন, তারিখ, রাজার নাম ও রাজবংশের তালিকা পাওয়া গেছে এখানে। প্রাচীন মুদ্রা, এতে দেব-দেবীর মুর্তি হতে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে জানা যায়। প্রাচীন যুগের স্থাপত্য ধ্বংসাবশেষ, ভাস্কর্যের টুকরা, স্তূপ, মাটি খুঁড়ে নানা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। প্রায় ৩০,০০০ বছরের পুরাতন দ্রব্যাদির নিদর্শন ঐতিহাসিকদের অবাক করে দিয়েছে। অতীতকালে পাক-ভারত উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে পুরুষপুর বা পেশোয়ারে অবস্থিত এই মহা ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার যা খাইবার গিরিপথ বা খাইবার পাস নামে সমধিক পরিচিত। এই প্রবেশদ্বার দিয়ে ভারতে কে না ঢুকেছে! সে কথা পরে বলছি।

আমি ১৯৫৫ এবং ১৯৫৭ সালে দু’বার পেশোয়ার এবং খাইবার পাস বা খাইবার গিরিপথ ভ্রমণ করেছি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত যে এলাকায় এসে মিশেছে তার নাম তোরখাম। শহর থেকে ৩৩ মাইল/৫৩ কিমি. দীর্ঘ রাস্তা পার হয়ে খাইবার গিরিপথের মুখে পৌঁছানো যায়। এই রাস্তার মাঝামাঝিতে পড়ে বৃহৎ জমরুদ দুর্গ। পাথরের তৈরি। গিরিপথের চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশেবিদেশে’ বইতে। আঁকাবাঁকা পথ। একটি বাস চলতে পারে, এতটুকু মাত্র রাস্তা চওড়া। এক পাশে খাড়া পাহাড়, আরেক পাশে গভীর খাদ। বাসের জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই ভয় করে। গা শিউরে ওঠে। নিচের দিকে দৃষ্টি দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখা যায়। কোন কালে বাস দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। বাসের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। বাস আর তোলা হয় নাই। যাত্রীদের কী অবস্থা হয়েছে তা আর জানতে পারি নাই। কিছু কিছু স্থানে দেখেছি পাহাড়ের গা কেটে বাড়ির দেওয়ালের মত মসৃণ করে তাতে গর্ত করে লেখা রয়েছে কোন্ কোন্ বৃটিশ রেজিমেন্ট এখানে পাঠানদের সাথে যুদ্ধ করেছিল।
ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বিলাতের প্রধান মন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁর My Early Life বইতে লিখেছেন, এখানে কোন্ কোন্ স্থানে তরুণ বয়সে বৃটিশ রাজ্যের পক্ষে পাঠানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এই এলাকা থেকে সৈনিক জীবনের ইতি টেনে তিনি সাংবাদিক হওয়ার চেষ্টা করেন এবং রাজনীতির খেলায় মেতে ওঠেন। তবে এখান থেকে যাওয়ার সময় এক পাঠানকে তাঁর ব্যাটম্যান হিসাবে বিলাতে নিয়ে যান। পরবর্তীতে বৃদ্ধ বয়সে সেই পাঠান দেশে ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু চার্চিল তাঁকে মাইনে দিয়েছিলেন। খাইবার পাস এলাকায়, রাস্তার এপার-ওপারে পাঠানদের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতো। সেই গোলাগুলির মাঝে খাইবার পাস ও রাস্তা ব্যবহার করা যেতো না। পাঠানরা যাতে যখন-তখন যুদ্ধ বাধিয়ে না ফেলে, তাই বৃটিশ সরকার পাঠানদের ট্যাক্স দিতো। খাইবার পাস রাস্তায় এবং বাস স্টপেজে পাঠানদের ঘাড়ে রাইফেল ঝুলতে দেখেছি। তোরখাম হলো বর্ডার পোস্ট। এখানে সীমান্তরেখার এপার-ওপার দুই দেশের, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আর্মি পাহারারত। বাস ট্রাক বেশ আসা যাওয়া করছে।

তোরখাম পৌঁছানোর পূর্বে ২/১ মাইল অভ্যন্তরে একটি বাজার পেলাম। নাম তার লান্ডিকোটাল। কিছু পাকা ঘরে কাপড়ের দোকান বসেছে। বিক্রেতার পিছনে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাইফেল রাখা আছে। বেশিরভাগ দোকান একচালা বেড়া একটি বাঁশ ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে। এর মাঝেই কয়েকটি পত্রবিহীন গাছ দাঁড়িয়ে আছে। নজরে এলো একটি কাবাবের দোকান। আমার পেশোয়ারী সাথী জানালেন যে এই কাবাব না খেয়ে ফেরা যাবে না। মাটিতে গর্ত করে বেশ বড় একটি চুলা তৈরি হয়েছে। বেশ মোটা মোটা গাছের কা-ে আগুন দেওয়া হয়েছে। চুলার উপর অনেক বড় একটি লোহার তাওয়া। তাওয়ার একপাশে রয়েছে ভেড়ার এক তাল চর্বি। চর্বি গলে গলে তাওয়ার মাঝখানে এসে একটু জমলেই দোকানদার আলাদা এক পাত্র থেকে মশলা মাখানো কাবাবের গোস্ত, ভেড়ার গোস্ত, থপ করে সেই গরম চর্বিতে ফেলছেন। একটি বড় লম্বা মোটা মতন চ্যাপ্টা কাঠি দিয়ে কাবাব নাড়ছেন এবং পরে উল্টে দিচ্ছেন। পাক হলে কিছু কাটা পেঁয়াজসহ একরকম বড় গাছের পাতার উপর কাবাব পরিবেশন করলেন। স্বাদ সুন্দর। এই কাবাবের নাম চাল্লিকাবাব।

লান্ডিকোটাল বাজারে চীন-জাপানের কাপড় প্রচুর পরিমাণে মেলে, দামও বেশ সস্তা। আমি চীনে প্রস্তুত দু’টো ফুলপ্যান্টের কাপড় কিনেছিলাম। ফেরার পথে জমরুদ দুর্গের কাছে এক কাস্টমস চেক পোস্টে কাপড় দু’টি দেখলো, আর কোনো কাপড় নেই জেনে ছেড়ে দিল। পরে জেনেছি, বেশি পরিমাণে কাপড় পেশোয়ার শহরে আনতে দেয় না। আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম যে খাইবার পাশের মত আরো ২/৩টি সেই পুরাতন আমলের গিরিপথ আছে, সেখান দিয়ে চীনা-জাপানি-ইরানি কাপড় পাকিস্তানে ঢুকতে দেয়। সেইসব গিরিপথে কাস্টমসের ঝামেলা নেই। অতীতে এই খাইবার গিরিপথ দিয়ে ব্যবসায়ী, তীর্থ যাত্রী এবং বহু আক্রমণকারী ভারতে প্রবেশ করেছিল। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে, পারসিকরা বা ইরানিরা এই পথে ভারতে প্রবেশ করেছিল প্রায় ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে। সিন্ধু নদীর পাড়ের অধিবাসীকে তারা উল্লেখ করেছিল হিন্দু বলে। এই হিন্দু শব্দটি পরবর্তীকালে এবং এখন পর্যন্ত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরই বোঝায়। তারপর আসে গ্রিকরা। তারা পারসিকদের বিতারিত করে খাইবার গিরিপথ দিয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে ২৫০ বছর রাজত্ব করে। পরে মৌর্য-গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। এই বংশের রাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তিনি বিবাহ নীতিকে সাম্রাজ্য ও ক্ষমতা সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহার করেন। সেনাপতি সেলুকাস নিকাটোর তখন গ্রিক কলোনির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য তার কন্যাকে চন্দ্রগুপ্তের সাথে বিবাহ দিয়ে এক সন্ধি করেন। ফলে সর্বপ্রথম এই পেশোয়ার ভারতের অধীনে আসে। এরপর কুশাল, আফগান, তুর্কি এবং মুঘলরা এই খাইবার গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে রাজ্য স্থাপন করে। অতীতে আর্যরা ধীরে ধীরে, এই গিরিপথেই উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল প্রায় ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে এবং নতুন এক ধর্ম প্রচার করে যা বৈদিক ধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। তারা ধীরে ধীরে জনগণের সাথে মিশে যায়। ফলে সনাতন ধর্ম ও বৈদিক ধর্মের মাঝে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হয় নাই।
পেশোয়ারে কিস্সাখানি নামে একটি বাজার আছে। সেই অতীতকাল থেকে আজ পর্যন্ত মধ্য এশিয়া, আরবদেশীয় এবং অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীরা উট ও গাধার পিঠে মালামালসহ এই বাজারে ওঠেন, গল্পগুজব করেন, মালামাল বেচা-কেনা করে চলে যান। এটা আমাদের ঢাকার অতীতের কারওয়ান বাজার ব্য ক্যারাভান বাজারের মতো। আমার পেশোয়ারী সাথীর মাধ্যমে আমি কয়েকজন ভিনদেশি ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করেছিলাম। আমি মাশরেকী পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানি জানা মাত্র তাঁরা মহা আনন্দে আমার সাথে আলাপ করলেন। মঙ্গোলীয়রা ব্যবসায়ীদের অনুরোধ রক্ষা করে তাঁদের ক্যাম্পে চা পান করলাম। তাঁরা চায়ে ঘন দুধ, মাখন এবং ঘরে প্রস্তুত নেশা জাতীয় কিছু মেশালেন। চা দেখতে আমাদের দেশের দুধ-চায়ের মতো। সুস্বাদু! তবে দেহের উপর ফলাফল হলো একটু অন্যরকম!

আমি খাইবার পাসের লান্ডিকোটাল বাজারে চাল্লি কাবাব খেয়েছি, চীনা কাপড় কিনেছি, পাক-আফগান সীমান্তে তোরখামে অনেকক্ষণ বসেছিলাম, খাইবারপাস পর্যবেক্ষণ করলাম, চিন্তা করেছি এই গিরিপথে পারসিক/ইরানিরা এসেছে, আলেকজান্ডার প্রবেশ করেছে, আর্যরা ঢুকেছে, আরো অনেক জাতির নাম বলতে পারি যারা এই খাইবারপাস দিয়ে প্রবেশ করে শত-শত বছর ভারতে রাজত্ব করেছিল। সে এক ইতিহাস! খাইবার গিরিপথ পরিদর্শনের জন্য পৃথিবীখ্যাত ব্যক্তিরা আসেন। যেমন মুষ্টিযোদ্ধা মহম্মদ আলী, প্রিন্সেস ডায়না, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং পাক-ভারতের ক্রিকেটাররা। পাবনা থেকে আমার মতো আর কেউ খাইবার পাস পরিদর্শনে গেছেন কিনা তা আমার জানা নেই।
কাজী হাবিবুর রহমান : সদস্য ও উপদেষ্টা, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্ট ঢাকা