দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি দুই বছর আগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশ হয়েছিল। পাবনার ১৯৮ বছরে এসে সেই লেখার ৫ পর্ব।

মোসতাফা সতেজ

পাবনা পরিচিত’ গ্রন্থে উল্লেখ, ১৯১৯ সালে ব্যবস্থাপক সভায় নতুন সংশোধিত আইন প্রবর্তিত হলে প্রবলভাবে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল বিদেশি পণ্য বর্জন করে দেশিয় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা। সে সময় পাবনার ঘরে ঘরে তুলার চাষ, চরকা ও তকলীর সাহায্যে সভা কাটা, খদ্দর কাপড় ব্যবহার করা এবং মাদক দ্রব্য বর্জনের হিড়িক পড়ে যায়। স্কুল-কলেজের অসংখ্য ছাত্র দেশ সেবায় আতœনিয়োগ করে। গ্রামে গ্রামে বক্তৃতা ও পিকেটিং করার অপরাধে কারাদন্ড ও অন্তরীণ হতে থাকে। এ রকম রাজনৈতিক রণাঙ্গণে ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় পুলিশের চরম অত্যাচার ও গুলিবর্ষণ ঘটে। সলঙ্গা হাটে মর্মান্তিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। এ আন্দোলনে অনেক ছাত্রের শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটে, অনেক চাকুরে বেকার হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যই ছিল বেশি। সৈয়দ বদরুল আলম তর্কবাগীশ তার পিতার স্মৃতি কথার উদ্ধৃতি দেন। লেখেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর সামনে ৭ জন নিহত হন। এই নির্মমতা জালিয়ানওয়ালাবাগের চেয়েও ভয়ংকর ও ন্যাক্কারজনক। পুলিশের গুলিতে হাটে এত গুরু মহিষ-ছাগল মারা যায় যে, তার সংখ্যা নির্ণয় করা যায় নি।  সময় প্রবাহে বৃহত্তর পাবনার একটি খ্রিস্টান সমাধিসহ বেশ কয়েকটি প্রাচীন অবকাঠামো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। স্থাপত্য ভাংচুর করা বা সংরক্ষণ করার আগে গভীরভাবে ভাবা হয় না। ঔপনিবেশিক যুগের স্মৃতি বহন করছে বলে তা মুছে ফেলার দরকার নেই।’ এ কথা বলার মতন মানুষ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

যমুনা নদী তীরে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ এ শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ধানবন্দী নদী। এ নদী ওপর ১২৯ ফুট দীর্ঘ একটি ব্রিজ আছে। ১৮৯৩ সালে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এ ব্রিজ নির্মাণ করান বাংলার লে. গভর্নর স্যার চালর্স ইলিয়ট। তিনি ভিত্তি পাথর স্থাপন করেছিলেন বলে তার নামেই ব্রিজের নামকরণ করা হয়। ১৮৯৭ সালের জুনে ভূমিকম্পে এ ব্রিজের আংশিক ক্ষতি হয়। ১৮৪৮ সালে যমুনা নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে এ শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা যমুনার নবগঠিত তীরে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করেন তিন মাইল দূরে। পুরাতন শহরটি আগের চিহ্ন মুছে দিয়ে শুকনো স্থানে পরিণত হয়।

এক সময়ের সেই ইমারসন ব্রিজ

বিলুপ্ত ইমারসন ব্রিজ : পাবনা শহরে ইছামতি নদীর ওপর ইমারসন ব্রিজ নির্মাণ করে জেলা বোর্ড। ১৯১১-১২ অর্থ বছরে এই ব্রিজের কাজ শুরু করা হয়। ইছামতি নদীর ওপর নির্মিত এটাই ছিল প্রথম ব্রিজ। পাবনার ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান টি. ইমারসন-এর উদ্যোগে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা ব্যয়ে এ ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। এতে বাজিতপুর স্টিমার ঘাটগামী যাত্রী ও মালবাহী পরিবহণে বিশেষ সুবিধা হয়। ব্রিজটির পূর্বে জজকোর্ট অপরদিকে লাইব্রেরি বাজার। বর্ষাকালে নদী পারাপারে মারাত্মক দুর্ভোগে পড়তে হতো। দুর্ভোগ লাঘবে এই লোহার ব্রিজ নির্মিত হয়। যার দৈর্ঘ প্রায় ২শ ফুট, প্রস্থে ১৬ ফুট। ব্রিজটি সলিড লোহার স্তম্ভের ওপর অবস্থিত ছিল। যার নামকরণ করা হয়েছিল ইমারসন ব্রিজ। ১৯৯৫ সালে ব্রিজটি ভেঙে ফেলা হয়। ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদ ছিল না।

সিরাজগঞ্জ : বৃহত্তর পাবনার একটি মহকুমা ছিল সিরাজগঞ্জ। ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়। ২০২৪ সালে এ জেলার ৪০ বছর পূর্তি হয়। ১৮৫৫ সালে সিরাজগঞ্জ থানাকে ময়মনসিংহ থেকে আলাদা করে পাবনা জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। এবছরেই সিরাজগঞ্জ মহকুমায় উন্নীত হয়। মহকুমা প্রশাসক হন মি. ব্যারী। উপজেলা রয়েছে ৯টি। যমুনা নদী তীরে অবস্থিত এই জেলা শহরে রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ পাট ব্যবসা কেন্দ্র। ব্যবসায়ের গুরুত্বের দিক থেকে এ নদী বন্দর ২য় স্থান অধিকার করে আছে। সাক্ষী হয়ে আছে কওমী জুট মিল। হ্যামিলটনের ইস্ট ইন্ডিয়া গেজেটিয়ারে (১৮১৮) এ জেলাকে একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭৮৪ সালে রেনেলের জরিপের সময় থেকেই এ স্থান  বাংলার সর্ব বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল বলে মনে করা হয়। এ জেলা দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছে। দ্রুত উন্নয়নশীল শহর হয়ে ওঠে যমুনা ব্রিজের কল্যাণে। সিরাজগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠা পায় ১৮৬৯ সালে। যার আয়তন সাড়ে ১১ বর্গমাইল।

এই নীলকুটিকে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফৌজদারি কোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা হতো

বেলকুচি উপজেলার বনাম ধন্য জমিদার সিরাজ আলী চৌধুরী ১৮৪৯ সালে সিরাজগঞ্জ এলাকাকে বাণিজ্য বন্দর রূপে গড়ে তুলতে থাকেন। তাঁর নাম অনুসারে নদী বন্দরের নাম হয় সিরাজগঞ্জ। এ জেলায় ৫৩টি স্থানকে প্রতœসমৃদ্ধ স্থান হিসেবে চিহিৃত করে প্রতœতত্ব অধিদপ্তর। ইতিহাস সমৃদ্ধ স্থান হিসেবে নিমগাছি উপজেলার চেয়ে আর কোন স্থান এত সমৃদ্ধ নয়। এর পরেই রয়েছে শাহজাদপুর। তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলা প্রাচীন। হিন্দু প্রধান অঞ্চল হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কৃষক বিদ্রোহের এই জেলায় রাজনীতিকসহ অনেক মনীষী ভূমিষ্ট হন। এখানে প্রাচীনকীর্তিসমূহের মধ্যে রয়েছে, নিমগাছি বুরুজ ৬টি (ঢিবি) নওগাঁও শাহী মসজিদ, নওগাঁও ঢিবি, ভাগ্নে মসজিদ, নওগাঁ শিবমন্দির, নওগাঁ শিবলিঙ্গ, বেহুলার কূপ, বেহুলার ভিটা, বস্তুল শিবমন্দির, বারুহাস ইমামবাড়া, বারুহাস জুম্মা মসজিদ, সন্যাসী বাড়ি, বিবির বাংলা, গদাই সরকার, মসজিদ তাড়াশ শিবমন্দির (বড়) তাড়াশ শিবমন্দির  ছোট), জগন্নাথ মন্দির বা রসিক রায়ের মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, জগন্নাথ মন্দির (ছোট), গোপাল বাড়ি মন্দির, বৃন্দাবন বিহারী মন্দির, বাগবাটি জমিদার বাড়ি, মঙ্গল চন্ডির মন্দির, ফতুদাসের ঢিবি, জয়সাগর, বিরাট রাজার বাড়ি, খারিজা ঘু-ঘাট মসজিদ, ধানগড়া মসজিদ, রায়গঞ্জ ভাদুরী, জমিদার বাড়ি, রজনী কান্ত সেন বাড়ি, শাহ কামালের মাজার, উল্লাপাড়া শিবমন্দির, নরতœ মন্দির, দোচালা বাংলা, বড় শিব মন্দির, মক্কা আউলিয়া মসজিদ, চৈত্রহাটি কালী মন্দির, চৈত্র হাটি ঢিবি, মসজিদ তলা, পীর আগার মাজার, করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত শাহজাদপুর শাহ মুখদুম মাজার, শাহ বদরুদ্দিন মসজিদ, রবীন্দ্র কাচারিবাড়ি, পোতাজিয়া নররতœ মন্দির ও পোতাজিয়া ঢিবি। এসবের মধ্যে ১৭টি সংরক্ষণ যোগ্য। (সূত্র : দরবার-এ রেছালাতে মোজাদ্দেদীয়া, চরনরিনা শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ)।

চাটমোহরে চারশ বছরেরও বেশি সময় আগের পুরাতন মাসুম খাঁ কাবুলি মসজিদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।