গণিত চর্চার ইতিহাসে উজ্জ্বল প্রদীপ
[লেখাটি Loukik Bangla-এর সৌজন্যে ইতিহাস ও শিক্ষা সচেতনতায় তুলে ধরা হলো]
উপমহাদেশের গণিত চর্চার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল প্রদীপ যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী। একসময় বাংলা তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে অংক বা পাটীগণিত মানেই ছিল যাদব বাবুর বই। গণিতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গণিত সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী ১৮৫৫ সালে তৎকালীন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) কামারখন্দ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জ শহরের ধানবান্ধি মহল্লাতেও তাঁর পরিবার বসবাস করত।
তাঁর বাবার নাম ছিল কৃষ্ণ চন্দ্র চক্রবর্তী এবং মায়ের নাম দুর্গা সুন্দরী। পেশায় পুরোহিত বাবার আর্থিক অবস্থা খুবই সাধারণ ছিল। শৈশবকালেই যাদব চন্দ্র পিতৃহারা হন এবং চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে তাঁকে বড় হতে হয়। কিন্তু দারিদ্র্যকে তোয়াক্কা না করে নিজ মেধার জোরে তিনি একের পর এক কৃতিত্ব অর্জন করেন। মেধার সুবাদে তিনি মধ্যবৃত্তি পরীক্ষায় সমগ্র রাজশাহী বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে বৃত্তিলাভ করেন। ১৮৭৬ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করেন। পরে কলকাতার জেনারেল এসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফ.এ এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে এম.এ (গ.অ.) ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি কলকাতা সিটি কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (এমএও কলেজ) তাঁর গণিত প্রতিভা ও পড়ানোর দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান তাঁকে নিজ প্রতিষ্ঠানে (তৎকালীন মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ) গণিতের অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। তিনি সেখানে টানা ২৮ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যাপনা করেন।
যাদব চন্দ্র চক্রবর্তীর সবচেয়ে বড় অবদান হলো জটিল পাটীগণিতকে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা।
Arithmetic (১৮৯০): আলিগড়ে অধ্যাপনাকালে তিনি ইংরেজিতে তাঁর বিখ্যাত পাটীগণিত বইটি রচনা করেন। বইটি প্রকাশের পর উপমহাদেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁর এই পাটীগণিত বইটি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, অসমীয়া, মারাঠি, নেপালি ভাষায় অনূদিত হয় এবং কয়েক দশক ধরে স্কুল-কলেজে প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বীজগণিত (১৯১২): পাটীগণিতের সাফল্যের পর তিনি বীজগণিতের ওপরও একটি মানসম্মত গ্রন্থ রচনা করেন, যা সমানভাবে জনপ্রিয় হয়।
১৯১৬ সালে আলিগড় থেকে শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি সিরাজগঞ্জে ফিরে আসেন এবং নিজের তৈরি বাসভবন যাদব নিবাস-এ বসবাস শুরু করেন। তিনি সিরাজগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্থানীয় শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবদান রাখেন। নিজ গ্রাম তেঁতুলিয়া ও সিরাজগঞ্জ শহরে জনকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
জীবনাবসান ও স্মৃতি : ১৯২০ সালের ২৬ নভেম্বর কলকাতার নিজ বাসভবনে ৬৫ বছর বয়সে এই মহান গণিতবিদ মৃত্যুবরণ করেন। গণিতকে ভীতিহীন ও আনন্দময় করে তোলার ক্ষেত্রে যাদব চন্দ্র চক্রবর্তীর অবদান বাংলা তথা পুরো উপমহাদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।