বাংলা ভাষার ধ্রুপদী গদ্যশিল্পী

শুচি সৈয়দ

১.

সবেমাত্র কৈশোরে পা রেখেছি। শৈশবের গন্ধ তখনও কি গা থেকে গিয়েছে? বোধকরি নয়, বই পড়ি মফস্বল শহর পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী, শহীদ মওলানা কসিমউদ্দিন আহমদ স্মৃতি কেন্দ্র লাইব্রেরি, জেলা তথ্য কেন্দ্র লাইব্রেরি থেকে এনে। টুকটাক্ শহরের ছোট ক’টি বইয়ের দোকান আব্বার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, পাবনার ভাষা আন্দোলনের নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা কাকার ‘বইঘর’, জাহাঙ্গীর আলম মুকুল ভাইয়ের  ‘চতুরঙ্গ’, আরজু ভাইয়ের ‘বিকিকিনি মার্ট’ থেকে সীমিত সাধ্যে কিনে (সাধ্যের সেই সীমা আজও ঘোচেনি, শুধুমাত্র বইয়ের দোকানে ঢুকলেই আমার কষ্ট হয়Ñদারিদ্র্যকে মর্মপীড়াদায়ক বলে মনে হয়।) তখন কারও কাছে বই থাকলেই বন্ধুত্ব হয়ে যেত তার সঙ্গে। বই মানে স্বর্ণখনি, বইই সেতুবন্ধ সম্পর্কের, বন্ধুত্বের।

আমাদের পাড়ার বড়রা একটি পাঠাগার গড়ে তুলেছিলেন ‘রাধানগর ইছামতি শহীদ স্মৃতি পাঠাগার’ নামে। বই পড়ার আগ্রহ দেখে আব্বা সেটার সদস্য করে দিয়েছিলেন আমাকে। প্রধানত গল্পের বইই পড়ি আর প্রবন্ধের বই? সেটা সরিয়ে রাখি কেননা সেগুলো কাঠখোট্টা নিরস, টানে না মোটেই। না টানাই স্বাভাবিক কেবল তো কৈশোরে পা রেখেছি। প্রবন্ধের বইয়ের ওপর থেকে সেই বিরাগ কাটতে অনেক সময় লেগেছে। সেই বিরাগ কি আমার অত সহজেই যেত যদি রাশিদুর রহমান রঞ্জু ভাই আমাকে ‘অনতিক্রান্ত বৃত্ত’ বইটি পড়তে দিতেন? চুম্বকের মতো আটকে রাখল আমাকে দুই/তিন দিন- পাঠ শেষে আমি খুঁজতে শুরু করলাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আরও প্রবন্ধের বই। ‘তাকিয়ে দেখি’, ‘নিরাশ্রয় গৃহী’, ‘আমার পিতার মুখ’ এগুলো হল প্রবন্ধের বইয়ের নাম! অসম্ভব উদ্দীপ্ত হলাম। এরকম সময়ই তিনি সেই স্বাধীনতা উত্তর সময়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় ধারাবাহিক লিখতে থাকলেন ‘উপরিকাঠামোর ভেতরে’ নামে নিয়মিত কলাম। এমন কাব্যময় আলোজ্বালা গদ্যের পাঠকের অভাব ঘটেনি-একদিন লক্ষ্য করলাম শুধু রনজু ভাই নন, আমি, মনজু ভাই, শিবলী ভাইসহ কমবেশি অনেকেই এমনকি যারা তাঁর বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির ঘোর বিরোধী (যেমন শিবলী ভাই, মুকুল ভাই) হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কলামটিতে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন ঠিকই। সে এক মজার অভিজ্ঞতা।

সেই অপরিসীম ভালোলাগার গদ্যের কবিকে প্রথম সামনা-সামনি দেখার সৌভাগ্য হল একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সূত্রে। ১৯৭৮ সালে প্রকাশনা সংস্থা ‘মুক্তধারা’ দেশব্যাপী একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে এক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। ‘জাতীয় জীবনে একুশের প্রভাব’ এই শিরোনামে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় পুরস্কার জুটে গেল। পুরস্কার নেবার জন্য তাঁরা ঢাকায় ডাকলেন। সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তাই ছিলেন বোধহয় তিনি। আমি আর শ্যামল দত্ত এসেছিলাম পুরস্কার নিতে। স্কুল পর্যায়ে আমি ২য় আর কলেজ পর্যায়ে ২য় হয়েছিলেন শ্যামল দত্তÑ আমরা দু’জনই পাবনা থেকে।

আমাদের সাহিত্যে নিরস গদ্যকে যিনি কাব্যের মাত্রা দিয়েছেন তাঁর গদ্য আমাকে এত বেশি আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে তা বর্ণনা করাও কঠিন। তাঁর অনুকরণে প্রাণপণে লিখতে চেষ্টা করতাম অন্ধের মতো। কৈশোরের সেই হাস্যকর প্রয়াসের অসম্পূর্ণতার কারণ এখন বুঝি আর লজ্জা পাই। এখন আর তাঁকে অনুকরণ করি না অনুসরণ করি এবং সেটাও পাঠে। এখনও তাঁর লেখা সমান আলোজ্বালাÑতাঁর গদ্যের অর্থই মনের অন্ধকার হয়ে থাকা কোণকে আলোয় আলোয় ভরে তোলা। এখনও তার বইয়ের নাম কি সাংঘাতিক ভাবেই না কাব্যিক ‘এর প্রাচীর, ওর পথ’, ‘মাঝখানের মানুষেরা’ (তাঁর এই বইটির উৎসর্গ পাতায় তিনি আমার নামটিকে স্থান দিয়েছেন), ‘কুমুর বন্ধন’ ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’।

সেদিন টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উপন্যাস প্রসঙ্গে। বলছিলেন, সেই উপন্যাসটির মধ্যে আছে কবিতার উপস্থিতিÑআমি তাঁর এই কথায় চমকে উঠলাম, একই সঙ্গে তাঁকেও একজন কবি হিসেবে আমি আবিষ্কার করলাম। নিশ্চয়ই একজন কবির পক্ষেই সম্ভব উপন্যাসের কাব্য উপাদানকে এমন অব্যর্থভাবে শনাক্ত করা।

আমার সৌভাগ্য হয়েছে কর্মসূত্রে এই গদ্যের কবির সান্নিধ্য পাওয়া। সাপ্তাহিক ‘সময়’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি ছিলেন তিনি। দুই বছর সেই পত্রিকায় তাঁর সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ‘অলাভজনক’ সেই ‘কুটির শিল্প’ (ড. হুমায়ুন আজাদের ভাষায়)।

পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহেদা আহমদ। সেই দুই বছর তাঁর (ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর) অনেক লেখারই প্রথম পাঠক হবার অভিজ্ঞতাকে আমি সারাজীবন আমার গৌরব মনে করব। যে বইটির আলোচনার সূত্রে উপরের এত সাতকাহন সে বইটির অধিকাংশ লেখাই সাপ্তাহিক ‘সময়’-এ ছাপা হয়েছে। মনে আছে যেদিন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম পরলোকগমন করলেন সেই সপ্তাহে তিনি একটি স্মৃতিকথামূলক রচনা লিখলেন, লেখাটি আমাদের সহকর্মী আজহার এসে পৌঁছবার আগেই আমি পড়ে ফেললাম। প্রবন্ধ পড়ে কাঁদবার অভিজ্ঞতা সেটাই আমার প্রথম। তিনি কোনও শিরোনাম দেননি। লেখাটি লিখে শেষ করার যন্ত্রণা তাঁর ভেতরও যে সমান কাজ করছে তা আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমি লেখার ভেতরে উল্লিখিত শহীদ জননীর চিরকুটের অভয়বাণীকে শিরোনামে তুলে আনতে বললাম-‘ভয় পেয়ো না, বেঁচে আছি’-তিনি সম্মতি দিলেন।

আরেক দিন চোখে পানি এল তাঁর ‘বর্ষা আমার মায়ের মত’ লেখাটি পড়ে। অসম্ভব আবেগঋদ্ধ এক কবি যেন লুকিয়ে আছে তাঁর বুকের গভীরে, যে কবি স্পষ্ট আর ঋজু উচ্চারণে বর্ষাকে নিয়ে রচনা করতে পারে গদ্য-আলেখ্যÑ বর্ষাকে আবিষ্কার করতে পারে জননীরূপেÑবাংলাদেশের কোনও ঋতুকে নিয়ে এত সুন্দর উপলব্ধিযোগ্য লেখা আমি কি আর পড়েছি? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কিংবা হুমায়ুন আজাদের ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ এরকম উপন্যাস ও আত্মজীবনীমূলক লেখার বাইরে- ছোট্ট অথচ অন্যরকম যেন ছোট নয় কোনও মতেই। মনে আছে ধ্রুব (শিল্পী ধ্রুব এষ-এ সময়ের তুলনাহীন তরুণ শিল্পী, সে তখন সাপ্তাহিক সময়ের শিল্প নির্দেশক) কাগজ ছিঁড়ে, কাগজ কেটে, ‘মেঘ’ আর ‘বৃষ্টির ফোঁটা’ এঁকেছিল-আর সেটা ছিল সময়-এর একটি ব্যতিক্রম সংখ্যা; যে সংখ্যার প্রচ্ছদ রচনা হয়েছিল ‘বর্ষা আমার মায়ের মত’ লেখাটি। প্রাণস্পর্শী এক গদ্যের অধিকারী তিনি। পাঠ এবং প্রজ্ঞা যাঁকে পান্ডিত্যে বৃদ্ধ কিংবা ন্যুব্জ করেনি, করেছে চির তরুণ। যাঁর গদ্য কখনওই অপাত্রের বন্দনায় অন্ধ হয়নি (যেরকম অন্যেরা হয়েছেন), মেকী পান্ডিত্যও যাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি, নিজস্ব নির্মোহতায়, নিজের কাজে নিমগ্ন থেকেছেনÑকি যে অপরিসীম মমতায় পত্রিকার লেখা সম্পাদনা করেছেন, কত যে তরুণকে অনুপ্রেরণা দিয়ে লেখক করে তুলেছিলেন সেটা তাঁর স্নেহ-প্রশ্রয় যারা পেয়েছে তারা বলতে পারবে। তরুণের প্রতি প্রবীণের এই প্রশ্রয় এদেশে এই সময়ে তার দুটি দৃষ্টান্ত মিলবে না।

২.

এ বছর বইমেলায় বেরিয়েছে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বই ‘শেক্সপীয়রের মেয়েরা’। বইটির অধিকাংশ লেখাই অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘সময়’ পত্রিকায় বেরিয়েছে।

শেকসপীয়রের ১৮টি নাটকের নায়িকাদের চরিত্রের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করে লেখা ১৮টি রচনায় সমৃদ্ধ এই বই আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ বলে বিবেচিত হবে। ইংরেজি সাহিত্যের কালজয়ী নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপীয়রকে নিয়ে গত তিনশ’ বছর হাজার হাজার গ্রন্থ রচিত হয়েছে- পৃথিবীতে এমন ভাষার সংখ্যা বিরল যে ভাষায় এই মহৎ প্রতিভার সৃষ্টি অনূদিত হয়নি, পঠিত ও জনপ্রিয় হয়নি।

সারা পৃথিবীতে তাঁকে নিয়ে অনেক লেখা হলেও বাঙলা ভাষায় শেকসপীয়রকে নিয়ে লেখা মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা হাতে গুনে বের করা যাবে। উৎপল দত্তের লেখা ‘শেকসপীয়রের সমাজ চেতনা’ বইটি ছাড়া এ মুহূর্তে আর কোনও বইয়ের কথা স্মরণে আসছে না। প্রয়াত কবি পূর্ণেন্দু পত্রীর একটি বই আছে ‘রবীন্দ্রনাথের শেকসপীয়র’ নামে সম্ভবত। শেকসপীয়র সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বই বলা যায় উৎপল দত্তের বইটিকেই- উৎপল দত্ত তাঁর অগাধ পাঠ, পান্ডিত্য ও অনুরাগ দিয়ে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে শেকসপীয়রের সমাজ চেতনাকে সুন্দর এবং সাবলীলভাবে উন্মোচন করেছেন।

‘শেকসপীয়রের মেয়েরা’ বইটিতে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শেকসপীয়রের নায়িকা চরিত্রগুলোর ওপর আলোকপাতের পাশাপাশি তাদের সীমাবদ্ধতা, বিশিষ্টতা সম্পর্কে

যেমন বলেছেন তেমনই চিরকালের নারী প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন তাঁর অতুলনীয় কুশলী গদ্যে। বইটি সম্পর্কে চমৎকার পরিচিতি বক্তব্য রয়েছে ফ্ল্যাপে ‘শেকসপীয়রের নাটকে ছেলেরাই প্রধান, মেয়েদের তুলনায়। সেটাই স্বাভাবিক, বাস্তবতা ছিল ওই রকমেরই আদর্শিক আধিপত্যও ছিল পুরুষেরই, যে আধিপত্য মেয়েরাও মেনে নিয়েছে। এবং শিল্পী হিসেবে শেকসপীয়র যতই নৈর্ব্যক্তিক হোন না কেন, তিনিও পুরুষ মানুষই। ওই জগতে তাই মেয়েরা প্রধান হয়নি, হবার উপায় ছিল না। তবু ক্ষেত্র বিশেষে মেয়েরা ছাড়িয়ে গেছে প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষকেও এবং কখনও কোনও অবস্থাতেই তারা উপেক্ষণীয় থাকেনি। যেখানে তাপ নয়, সেখানেও তারা আলো বটে।’ এই বক্তব্য থেকেই কি শনাক্ত করা যায় না ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চরিত্রগুলোর ওপর শুধু আলোই ফেলেননি অনুভব আর উপলব্ধির শক্তিতে আলোকেও বিধৃত করেছেন। তাঁর সে অনুভবের সঙ্গে, উপলব্ধির সঙ্গে অন্ধআবেগ নেই আছে একটি সুতীক্ষ্ণ সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি, যে দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে স্থূল কিংবা বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করে না।

এই গ্রন্থের ভূমিকার সমাপ্তি টানতে গিয়ে তিনি যেভাবে বলেছেন, ‘একটা সাংস্কৃতিক বক্তব্য আছে এই নাট্যকারের। সেটা এই যে, মানুষ উন্নত হতে পারে পরিবেশ ও প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেই। অন্যভাবে নয়। আর সে-কাজটা কেউ একা করতে পারে না, প্রয়োজন হয় পারস্পরিক সহযোগিতার, সৌহার্দ্যের এবং ভালোবাসার।’

এ বছর একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলার একটি মহার্ঘ প্রকাশনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় নির্দ্বিধায় এই বইটিকে। মনে পড়ে ‘অনতিক্রান্ত বৃত্ত’ পড়ে যে অসংখ্য প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা-কৌতূহলে তাড়িত হয়েছিলাম সুদীর্ঘদিন পর তেমনই প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা-কৌতূহলের তাড়না বোধ করছি। প্রথম সে তাড়না ছিল সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি সম্পর্কে আজ সে তাড়না ধ্রুপদী সাহিত্য সম্পর্কে।

সূত্র : সম্প্রীতি বাংলাদেশ অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।