সৈয়দ মুসতাফী বৃত্তা
ঋতু বৈচিত্রের এই বাংলায় শুরু শরৎকাল। ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস শরৎকাল। আকাশে নীল মেঘের আগমন। অনেক যুগের ওপার থেকে বর্ষাকালের ভিজে পাতার ভিড়ে পায়ে পায়ে এসে গেল শরৎ। একেবারে আকাশ ছেয়ে। অনেকেরই জানা আছে, বর্ষাকালের মধ্য দিয়ে ছাতিমশরতের উত্তোরণ।
শরৎ এমনই এক ঋতু যা প্রকৃতির মধ্যে সঞ্চার করে দেয় যাদু। তাতেই পৃথিবী অপরূপ হয়ে ওঠে। হলুদ বোঁটার শিউলি, আদিগন্ত কাশফুল আর রোদ মেশানো হীরে কুচি বৃষ্টি নিয়ে শরৎ তুলনারোহিত। পদ্মার পাঁজরে জাাগ চরে কাশ ফুলের ঢল। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শুধুই ফুল। শরতের স্বর্ণ সপ্তাহ হলো শেষ আশ্বিনে। এসময় ছাতিম ফুটে থাকে। একালের পরিবেশে বর্ষার আমেজ যেমন থাকে তেমনি আশ্বিনের শেষ পক্ষে গিয়ে ভোর রাতে হালকা শীতের আমেজ অনুভব করা যায়। শরৎকাল প্রকৃতি দেখার কাল। আকাশ দেখার কাল। নৌকায় বসে পূর্ণিমার চাঁদ আর জোসনা দেখার কাল। শহর ছেড়ে চরাঞ্চল বা নদীর দিকে গেলে শরতের সঞ্চার টের পাওয়া যায় মেঘের খেলায়, ফিকে রোদের আলোয় এবং অন্ধকার আকাশে। মাটিতে স্যাঁতস্যাতে ভাব। এ কালেও কম বেশি রিমঝিম বর্ষার আনন্দ উপভোগ করা যায়। শেষ শ্রাবণের তাল পাকানো গরমে প্রত্যাশিত বৃষ্টি নামলে যেমন মজা লাগে ভাদ্রেও তেমন অনুভব করা যায়। মৃদু-বর্ষণে দিন রাতের ভেদাভেদ মুছে দিয়ে যায় ভাদ্র। রাস্তা-ঘাট, বাজার-হাটে অগণিত ছাতার মিছিলও দেখা যায়। নদী তীরে জেগে ওঠা কাশবনে তুলতুলে ফুল ফুটতে শুরু করে। বাতাস যখন কাশবনে ঢেউ তোলে তখন তা দেখতে চমৎকার লাগে। কিন্তু পদ্মার পরে ধূসর কাশবনে ঢোকা যায় না। সরু খসখসে পাতা। গাছের ঘন সারি। ঘ্রাণহীন কাশফুল অনেকটা ‘দিল্লি কা লাড্ডুর’ মতো। হার্ডিঞ্জ সেতুর পাকশী প্রান্তে ছাতা নিয়ে বসে পদ্মার আকাশে শরতের ছানা কাটা মেঘের ঘুড়ি দেখতে অন্যরকম লাগে। সেতুর ভাঁজে ভাঁজে রোদ মেশানো হীরে কুচি বৃষ্টি দেখা যায় হঠাৎ হঠাৎ। এ দৃশ্য চোখ দুটিকে সার্থক করে তোলে। ইস্পাত নির্মিত সেতুর ওপর বা ভেতর দিয়ে ঝন ঝন শব্দ তুলে ট্রেন গড়িয়ে যায়। এই শব্দ আর বৃষ্টির সমন্বয়ে অন্যরকম ধ্বনি ব্যঞ্জনের সৃষ্টি হয়। নদী তীরে আদিগন্ত কাশফুল আর নীলাকাশ নিয়ে শরৎ তুলনারোহিত। চলন্ত ট্রেনের খোলা জানালার ফ্রেমে যাত্রীদের মুখগুলো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে সেতুর খাঁজে খাঁজে। পদ্মা নদী তীরে কোন ছাউনি নেই। কয়েকটি দোকান আছে। ভাদ্রে নদীর তলদেশ প্রায় ভরাট থাকে পানিতে। মাছ ধরা নৌকা গুলো বেলা দুটো বাজতে না বাজতেই ঘাটে এসে থামে। জেলেরা শিকার করা দু একটি পদ্মা কন্যা ইলিশসহ অন্যান্য মাছ নিয়ে বাজারের দিকে যায়। এসময় তাদের হাতে তাজা ইলিশ দেখতে পেয়ে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলে মনে হয়। এ পথ দিয়েই ইলিশ হানিমুনে যায় উজানে।

শরতের বৈকালী রোদের পাকা পেয়ারা রং ছড়িয়ে পড়ে রেলের শহর পাকশীতেও। সেতু ছুঁয়ে অপূর্ব সূযাস্ত। দিনের শেষ ও রাতের সূচনা লগ্নের মুর্হুর্তটি এখানে অন্যরকম লাগে। ইস্পাত সান্ধ্য মন প্রাণকে অপার্থিব জগত সম্বন্ধে এক অনির্বচনীয় অনুভূতি জাগায়। হার্ডিঞ্জ সেতু অপরূপ। পদ্মা এখন অনন্যা তাই দেখে কিছু কিছু প্রাণে দোলা লাগে। আবহাওয়া পরিস্কার হলে সেতুর নেপথ্যে নির্মল নীল আকাশ অপূর্ব দূতিমান হয়ে ঝলসে ওঠে। সেই আলোর ঝলকানি প্রতিফলিত হয় সেতুর ফুকরে ফুকরে। রাতে লালন শাহ সেতুর বৈদ্যুতিক আলো যেন পদ্মার গলার মালা হয়ে যায়।
পাতা ঝরার একটা মাধুর্য আছে নিসর্গে যেমন, বৃষ্টিপাতেরও তার চেয়ে বেশি মাধুর্য হার্ডিঞ্জ সেতুতে। আর তা বর্ষাকালের চেয়ে শরতেই সুন্দর। তা দেখে ভাবলেই হাই ওঠে। সারা শরীরে ছুটে যায় ভাল লাগার ভেলা। তাই বলা যায় পাকশী নিসর্গের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য না থাকলেও যা আছে তাই নিয়ে অতিথি আলিঙ্গনে সহাস্য। দেশে জোড়া সেতু আরও আছে। কিন্তু পাকশীর মতো আকর্ষণ নেই। ব্রিটিশ সভ্যতার ইতিহাসে হার্ডিঞ্জ সেতু অভূতপূর্ব। এখানকার ভৌগলিক পরিবেশ সামান্য অন্যরকম। চৈত্রে মরুভূমি সাদৃশ হয়। এখানে ছড়িয়ে আছে নানা জাতের ভেষজ উদ্ভিদ। পাকশীর প্রান্তর জুড়ে আছে বিভিন্ন জাতের পাখি। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ছাতারে বা সাত ভাই।
পদ্মা নদী তীরে অবস্থিত পাকশী একটু উচুঁস্থান। ভৌগলিক দিক দিয়ে এর একটা আকর্ষণ আছে। হার্ডিঞ্জ আর লালন শাহ সেতুর ওপরকার আকাশ আর ছানা কাটা মেঘের ঘুড়ি দেখে জিজ্ঞাসু মন তৈরি হয়। পাশাপাশি শরীর ও মনকে কিছুটা চাঙ্গা করে তোলে শরতি হাওয়া। পুষ্টি জোগায় মানসিক। দূর হয়ে যায় ক্লান্তি।
এই শরতেই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিক। এই শরতেই শারদীয় দুর্গোৎসব। এ কালের প্রসন্ন আকাশ ও নির্মল বাতাস ধৌত শস্যপূর্ণ প্রান্তরময়। এই বাংলায় দেবী দুর্গা সপরিবারে পূজিত হন। আশ্বিনে পাওয়া যায় ধোঁয়াশা ও কুয়াশা। অনেকটা দমকা হাওয়ায় গাছে গাছে দোল খায় আমড়া, শরিফা আর ঘন সবুজ বাতাবি লেবু। হেসে ওঠে বাগান। এই বাগানই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সম্পাদনের উপাদান। এ সময় ফুটে থাকে পাঁচ পাপড়ির সাদা ফুল শিউলি, শশীলতা, কাশ, বক এবং কিছু বুনো ফুল। এছাড়া কেয়া, করবী, পদ্ম, শাপলা, নাগকেশর, ঘাস ফুল, স্পাইডার লিলি, কলাবতী, দোলন চাঁপা প্রভৃতি। অন্যান্য ঋতুতেও এসকল ফুল ফুটে থাকে। শেষ আশ্বিনেই ফুটে যায় কুল বরই ও ছাতিম ফুল। পাকশীতে অনেক ছাতিম গাছ আছে। শেষ বিকেল থেকে ঘ্রাণ ছড়াতে থাকে রাত অবধি। এ ঘ্রাণ তীব্র। অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে যায়। আশ্বিনের শেষ সপ্তাহে ছাতার মতো ফুল ফুটতে শুরু করে। গাছে থাকে এক সপ্তাহ কালেরও বেশি। ঘিয়ে রঙের এই ফুলের পাপড়ি বরই ফুলের মতো। ৩০/৩৫ ফুট লম্বা সপ্তাপর্ণ বৃক্ষের নাম ছাতিম। চিন্তা ও মননের একমাত্র সঙ্গী যাদের বই তারা এসময় এখানে এলে পুলকিত হবেন। আর মশগুল থাকা যায় ইতিহাস চিন্তায়। রেলওয়ের অফিসে ঘোরাঘুরি করে সংগ্রহ করা যায় অতীত ইতিবৃত্ত। মধ্য যুগের বাংলা গীতি কবিতাতেও শরৎ ছড়িয়ে আছে। কবি চন্ডীদাস শরতের পূর্ণিমা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ‘শারদ পূর্ণিমা নিরমল রাতি/ উজোর সকল বন। মল্লিকা মালতী বিশতি তিথি/মাতল ভ্রমরাগণ’। কবি বিদ্যাপতি লিখেছেন, ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর/ এ ভরা ভাদর মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর’। থেমে ছিলেন না জ্ঞানদাস। তিনি লেখেন, ‘এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা/ কেমনে আইল বাটে/ আঙ্গিনার মাঝে বঁধূয়া ভিজিছে/ দেখিয়া পরাণ ফাটে।’

শরতের নদী নিথর হয়ে থাকে। টান ধরে পানিতে। বিল, হাওর-বাওড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য ধরা পড়ে এই ভাদ্রে। অবশ্য এসব দেখার আলাদা চোখ থাকা চাই। শাপলা ফোটা বিলে ভেসে থাকা পানকৌড়ি, আর সারসেরা খোঁজে খাবার। খেত-খামারে ধান গাছের ডগা দোল খায় বাতাসে। তিনি আমাদের সুসংবাদ দেবার জন্যে বাতাস পাঠিয়ে দেন, তার অনুগ্রহ আস্বাদন করাবার জন্যে। যখন এই বাতাস ঘন মেঘ বহন করে তখন তিনি তা নির্জীব ভূখন্ডের দিকে চালনা করেন। পরে তা থেকে বর্ষিত হয় বৃষ্টি। তাতে সবুজ হয়ে ওঠে ফসলি খেত। দু চোখ মেলে দেখে চাষী। তাই দেখে তারা স্বপ্ন বুনতে থাকে। পূবের হাওয়ায় পট্রি দেয়া পাল তোলা নৌকা চলে এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে। প্রকৃতির ঋতুরঙ্গশালায় একটি জাতি তার জীবন নাটকের অংকগুলো কী ভাবে অতিবাহিত করে তা উপলদ্ধি করতে হলে গ্রামের দিকে মুখ ঘোরানো দরকার। যারা ফুল ফুটতে দেখে, ঝরতে দেখে, সোনালী রোদে প্রজাপতির বিচরণ দেখে দুচোখ মেলে, তাদের অনেকে একালে কেমন থাকে? যারা বন্যা আক্রান্ত হয় তাদের পরিবার এসময় আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ঘরে ফেরে। পশু সম্পদ হারিয়ে দুর্ভাবনায় পতিত হয়। তাদের আত্ম পরিচয় সামাজিক উপাদানগুলোর মধ্যে মিশে থাকে। কোনও কোনও নদী পাড় খাবলায়। তাই ভাঙনের টানাপড়নে নদী তীরের মানুষ জমি ছাড়া বাস্তহারা হয়ে ক্রমশ দূরে সরে যেতে বাধ্য হয় জন্ম মাটির কাছ থেকে। তাদের পায়ের তলা থেকে এই মাটি সরে যাওয়ার ইতিহাসই আমাদের ভাঙনের ইতিহাস। শরৎকালে আজো আবাদী জমির বুক (পলি মাটির প্রলেপ) গ্রহণ করে বর্ষাকালের আশীর্বাদ। আশ্বিন মাস আগমনের আগেই বাজার থেকে বিদায় নেয় আশ্বিনী আম। কিন্তু ভাদ্রে আগের মতো পাকা তালে সয়লাব হয় না হাট বাজার। কাঁচা থাকতেই গ্রীষ্মকালে তাল শাস বিক্রি হয়ে যায়। তারপরেও বেশি দামে পাকা তাল কিনে বড়া খাওয়ার মানুষ থাকে। মেঘলা দিনে ঘরে বসে তালবড়া খাওয়ার স্মৃতি প্রবীণদের মধ্যে অনেকেরই আজ জ্বলজ্বলে। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছোট হয়ে যাওয়ায় বড়া খাওয়ার মজাই হারিয়ে গেছে। বৈশাখে হালখাতা, আষাঢ়ে বর্ষা, আশ্বিনে পুজো, কার্তিকে গাস্মি, আর মাঘে বাঘ কাঁপানো শীত বলার মতো মানুষ কমে আসছে আর আরবি মাসতো অব্যবহৃত। নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, হট এপ্রিল, রেনি জুলাই, আর কোল্ড ডিসেম্বরের আবহাওয়ায়। অনেক শিশু বাংলা মাসের নামগুলো জানে না। জানে শুধু জিরো ওয়ান সেভেন ডাবল ওয়ান ………। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে কারো আক্ষেপ নেই। এ অবস্থায় এ ঋতুতে নৌকা বাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখার মানুষও কমে যাচ্ছে। এসময় ঠান্ডা-গরমে ভাদুরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে সকল বয়সের মানুষ। অবশ্য শিশুরাই বেশি। দাওয়াই হিসেবে ঘরে ঘরে পৌছে যায় আনারস। অন্যান্য ঋতুর মতো শরতও মন মেজাজে প্রভাব ফেলে।
প্রায় সবাই বসন্তকে উপভোগ করেন বা করতে চান। অন্যান্য ঋতুর আমেজ খেয়ালই করেন না। শরতকে উপভোগ করার মতন জায়গার নাম পাকশী। এখানকার পানি ও বাতাসে শরীর ও মন তরতাজা করে দেওয়ার সব উপকরণ না হলেও দুচারটি পাওয়া যায়। অরুচি, বদহজম আর গ্যাস ভাব দূর হয়ে যায় পাকশীর পানি পেটে পড়লেই। বৃটিশ বাংলোগুলো দেখার জন্যে খানিক হাঁটলেই চনচনে খিদে। আছে রির্সোট। এখানে যাতায়াতের দারুণ সুবিধা। পানি ও বায়ুপথ ছাড়া সব পথেই চলাচল করা যায়। পাকশী বাজারে নিম্নমানের হোটেলে মাঝে মধ্যে ইলিশ ঝোলে ভাত খাওয়া যায়। খেয়ে দেয়ে পুরনো শীলকড় বৃক্ষের সারি সারি ছায়ায় হাঁটা। রাস্তার দুধারে মোটা মোটা বৃক্ষ। পাখিদের ডাকাডাকি। হাঁটতে হাঁটতে কিছু সময় পর আবার খিদেটা জোরদার হয়ে ওঠে।
পাকশী জেগে ওঠে খুব ভোরে। দারুশ্বরীয়াত খানকা শরীফ থেকে মাইকে ছড়িয়ে পড়ে ফযরের আজান। দুপুরের পর নিস্তব্ধ হয়ে যায় পাকশী বাজার। কোজাগরী (শারদীয় পূর্ণিমা) রাতে পদ্মার বুকে জাগা জোড়া সেতুকে জ্যোস্নার আলোয় অন্যরকম লাগে। চাঁদ রজনিতে পাকশী কাঁদে না হাসে তা অনুভব করা যায় না। পদ্মা যেন সেতার। সেতু দুটি তার। বর্ষা ও শরতে অবিরাম বেজে চলে ভারী বর্ষণ লগ্নে। যাকে বলে বৃষ্টির নুপুর বা পদ্মার জলতরঙ্গ। তিনি আকাশে, গ্রহ, নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সুশোভিত করেছেন দর্শকদের জন্য। তাই আকাশ দেখতে ভাল লাগে। দিনে এবং রাতেও। অপর দিকে পাকশীতে অসংখ্য ব্রিটিশ নিদর্শন রয়েছে পর্যবেক্ষণ শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য। বিলুপ্ত হয়ে গেছে চাঁদমারিসহ কয়েকটি নিদর্শন।
সূর্যাস্তের আগে রাখাল বালিকারা চারণ ভূমি থেকে গরু ছাগল গুলো ঘরে নিয়ে যায় এবং সকালে যখন চরাতে নিয়ে যায় তখন তার সৌন্দর্য উপভোগ্য। সবমিলিয়ে এখানে ভ্রমণবোধে থাকা যায় সারাটা দিন। রোমাঞ্চিত হওয়া যায় মুহুর্মুহু।
সৃষ্টিকর্তা আকাশকে সুশোভিত করেছেন প্রদীপ মালা দিয়ে। এই শরতেও থাকে বিজলী ভয়। বজ্রধ্বনি তাঁর সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনিই সঞ্চালিত করেন মেঘমালাকে। আকাশের বর্ষণমূখর ঘনমেঘে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ চমক। তিনিই সৃষ্টি করেন ভারী মেঘ। যখন তা পঞ্জীভূত হয় তখন সবাই দেখতে পায় বৃষ্টি ধারা। শেষ শরতে রাতের আকাশে একটি সুন্দর নক্ষত্র মন্ডল দেখা যায়। যা শীত ও বসন্তেও নজরে পড়ে। এই নক্ষত্র মন্ডলকে বলে কাল পুরুষ। আশ্বিন-কার্তিক মাসে পূব আকাশে দেখা গেলেও ধীরে ধীরে তা পশ্চিমাকাশে সরে যায় চৈত্র বৈশাখে। এই নক্ষত্র মন্ডলে দেখা যায় কয়েকটি উজ্জল এবং অনুজ্বল তারা। কল্পনায় একজন যোদ্ধার সঙ্গে তুলনা করা যায়। যার বাঁ হাতে ঢাল বা ধনুক অপর হাতে তীর বা তলোয়ার। কোমরে কোমার বন্ধ ও লম্বিত তরবারির খাপ। বিজ্ঞানীরা বলেন, কাল পুরুষের দুটি উল্লেখ যোগ্য নীহারিকা আছে যা সাদা এবং কালো। কয়েক বছর আগে অ্যান্টার্কটিকার আকাশে বিরল মেঘ দেখা গেছে। স্ফটিকের মতো রং, তার মধ্যে রংধনুর ছটা। প্রচন্ড ঠান্ডায় একমাত্র মেরুর আকাশে এরকম মেঘ দেখা যায়। এই মেঘের তাপমাত্রা মাইনাস ৮৭ ডিগ্রি। মাটি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার ওপরে এ মেঘ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। আকাশের শিলাস্তুপ হতে বর্ষিত হয় খন্ড খন্ড শিলা। এ ঋতুতেও মেঘের বিদ্যুৎ ঝলক দৃষ্টি শক্তি প্রায় কেড়ে নেয়।
রবীন্দ্রনাথ ‘আশ্বিন’ কবিতায় লেখেন ‘আকাশ আজিকে নির্মলতম নীল/ উজ্জল আজি চাঁপার বরণ আলো/ সবুজে সোনায় ভুলোকে দুলোকে মিল/দূরে চাওয়া মোর নয়নে লেগেছে ভালো। আমাদের সমাজে ভাদ্র মাসে শাশুড়ি তার নতুন বউমার পা দেখেন না। তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই কুসংস্কার স্থান ভেদে কম বেশি আজো প্রচলিত। কোনো সমাজে কম, কোনো সমাজে বেশি। তবে আগের মতো নেই। শরতের সবুজ সৌরভে গৌরবে আর রৌদ্র মেঘের লুকোচুরিতে ঋতু রঙ্গের হাওয়া অনুভব করা যায়। উৎসবে রূপ-লাবণ্যে তার জুড়ি নেই। একালে পাড়ায় পাড়ায় আগে তাল বড়া খাওয়ার ধুম পড়ত। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় জীবন থেকে হারিয়ে গেছে তালবড়া। মৃদু বৃষ্টিতে ঘরে বসে তাল আর কলা বড়া খাওয়ার মজাই আলাদা। বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে ছোট ছোট পা ফেলে পাশের বাড়ি গরম গরম তাল পিঠা পৌছে দেয়ার যে কি সুখ তা এখনকার শিশুরা অনুভব করতে পারে না। এখন একলা চলোরে। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ায় মানুষ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। এ ভাঙন শুরু হয়েছিল শরৎ চন্দ্রের যুগে। তিনি তা নিয়ে গল্প লিখেছেন। বেড়ার গিরিবালা দেবী তাঁর রায়বাড়ি উপন্যাসে লেখেন, ‘শরতের স্বল্পায়ু বেলা দেখিতে দেখিতে নিবিয়া গেল। যাহাকে ধরিয়া রাখিতে চাওয়া যায়, সেই তাড়াতাড়ি পলাইয়া যায়।…….. হুরাসাগর উচ্ছলিত, উচ্ছসিত। জলের ধারা তটভূমি ছাড়িয়া নিম্নে প্রবাহিত। তটের কোল ঘেঁষিয়া কাশের শ্রেণী রেখাকারে সন্নিবেশিত। কাশের স্তবকে স্তবকে শুভ্র পুষ্প বাতাসে দুলিতেছে। নাচিতেছে। পর পারে হৈমন্তিক পাকা ধান সোনার বরণে সাজিয়া ঝকমক করিতেছে। মেঘমুক্ত নীলকাশ হইতে শরতের সোনা গলানো রৌদ্র অনুরঞ্জিত করিতেছে সোনার ধানের গায়, ভরা নদীর ঘোলা জল। জলচর পাখিদের কলরবে নদীর কুল কুল তানে চারি দিক মখুরিত। স্বাধীনতার আগে লেখা এই উপন্যাসের সাথে বেড়া উপজেলার বর্তমান নদীর মিল নেই। তিনি আরও লেখেন, শিউলি ফুলের বোঁটা রোদে শুকিয়ে বড় বড় মোটা বোতল ভরে তুলে রাখা হয় বাসন্তী পঞ্চমীর জন্য।
এ শরতের শেষ দিকে মৌসুমী বায়ু প্রত্যাহৃত হতে শুরু করে। এই বায়ু প্রত্যাহারের ঘটনা স্বাভাবিক ভাবে ঘটবে কিনা তা আবহাওয়াবিদরাই জানিয়ে দেন প্রচার মাধ্যমে।