জীবন সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না’

————————————————————————— ড. সন্‌জিদা খাতুন

[প্রিয় পাঠক : বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পথিকৃৎ ড. সন্‌জিদা খাতুন একাধারে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সঙ্গীতজ্ঞ এবং শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জীবিতকালে নেওয়া এই সাক্ষাতকারটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রস্তুতিমূলক সংখ্যায় (১৪ এপ্রিল ২০২৩) প্রকাশ হয়েছিল।]

প্রশ্ন : বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে ছায়ানট পালন করেছে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা। এই গুরু দায়িত্ব পালনে যারা আপনার সঙ্গে অবদান রেখেছেন তাদের কার কার কথা স্মরণ হয় আপনার?

ড. সন্‌জীদা খাতুন : ছায়ানট অসংখ্য নীরব কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তায় চলে আসছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো কার্যকরী সংসদের সদস্য, আবার কেউ তা-ও নন। একান্ত-অন্তর্তাগিদ থেকেই তারা ছায়ানটের কাজ করেছেন। এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে মরহুম মোখলেসুর রহমান সিধু ভাইয়ের কথা। আমার বন্ধু হুসনে আরা মাক্কী- কিছু দিন আগে মারা গেছেন। সিধু ভাইয়ের স্ত্রী আমাদের রোজ বু, ফরিদা হাসান এমপি, ছায়ানটের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। শামসুন নাহার রহমান, নূরুন্নাহার আবেদীন এমন অনেক নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মী- তাদের দানের মূল্য অপরিশোধ্য।

প্রশ্ন : একজন সংগীত শিল্পীর কি কি গুণ থাকা অপরিহার্য বলে আপনি মনে করেন?

ড. সন্‌জীদা খাতুন :  প্রথম কথা হচ্ছে, মানসিক ঔদার্য, রুচি এবং সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে- প্রেম। সংকীর্ণ অর্থে নয়- মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা, জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা, পরিবেশের জন্য ভালোবাসা- এগুলো না থাকলে হবে না। শিল্পী যদি কেবল নিজের উন্নতি ভাবে, গান পারুক না পারুক  টেলিভিশনে মুখ দেখাতে চায়, মঞ্চে উঠতে চায়- এটা কিন্তু সংস্কৃতি চর্চা নয়। এগুলো আচর্চা। উদার্থ, প্রেম, নিষ্ঠা এরকম অনেকগুলো জিনিস দরকার। আমিতো এমনও বলি, মোনায়েম খাঁ যে আমাকে রংপুরে বদলি করে দিয়েছিল, তা থেকেও আমি অনেক শিক্ষা পেয়েছি। এই যে ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত পথে যেতে-আসতে আমি সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা দেখার সুযোগ পেয়েছি- সেটা আমার জন্য একটা মস্ত বড় শিক্ষা। ঢাকা থাকতে আমি কুপমন্ডুক ছিলাম। ঢাকা থাকলে আমি এটা বুঝতেই পারতাম না।

প্রশ্ন : ছায়ানটের বিভিন্ন কার্যক্রমে আপনারা যে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় রেখেছেন সেটা সত্যিই ঈর্ষণীয়- যেমন ছায়ানটের শিল্পীরা বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান কবি শামসুর রাহমান এবং কবি শঙ্খ ঘোষের নির্বাচিত রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে শ্রোতার আসর বসিয়েছে- এটা একটা অভিনব এবং ঈর্ষণীয় উদ্ভাবন। এই অনুষ্ঠান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার কথা বলবেন কি?

ড. সন্‌জীদা খাতুন : কবি শঙ্খ ঘোষের একটি প্রবন্ধের বই আছে- ‘এ আমির আবরণ’। এই বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটিই ছিলো শ্রোতার আসরের সেদিনকার মুখবন্ধ। শঙ্খ ঘোষ যে রবীন্দ্রসংগীতগুলো নির্বাচন করেছিলেন, সে গানগুলোর ওপর তাঁর বক্তব্য ওই শ্রোতার আসরে তুলে ধরেন। ওই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, ধরো অনেকে আছে ধর্মে বিশ্বাস করেন না, অথচ যখন রবীন্দ্রনাথের পূজার গান হয় তখন তারা স্তব্ধ হয়ে শোনেন- এরকম এক অদ্ভুত ধরনের ব্যাপার আছে, মানুষের ভেতরে একটা ভক্তিমান সত্তা আছে। এই জিনিসটা উনি দেখিয়েছেন খুব সুন্দর করে। সবাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করবে, নামাজ পড়বে বা পূজা করবে- তা নয়। প্রত্যেকের ভেতরে যে মূল্যবোধে বিশ্বাসটা থাকে সেটা। ধর্ম কি একটা ছোট জিনিস? ধর্ম কি একটা এমনি এমনি কতগুলো সংস্কার বা আচার? তা  তো নয়, ধর্ম অনেক বড় জিনিস। ধর্ম আমাদের ধারণ করে থাকে- এই জিনিসটা শঙ্খ ঘোষ ওই প্রবন্ধে খুব সুন্দর করে ব্যক্ত করেছিলেন।শামসুর রাহমানের যেটা প্রধান বক্তব্য ছিলো, তিনি খুব অল্প বয়েসে রবীন্দ্রনাথের এই গানটি শুনেছিলেন, ‘আমি কান পেতে রই…..’ তার অবাক লেগেছিল। এই কথাগুলো, ‘ভ্রমর যেখায় হয় বিবাগী / নিভৃত নীল পদ্ম লাগি’- এই ‘নিভৃত নীল পদ্ম লাগি’ খুব অল্প বয়েসে তাকে নিয়েছিল। কবির প্রাণটাকে যেন স্পন্দিত করে নিয়েছিল। এই জিনিসটা তো একটা মস্তবড় ব্যাপার।

প্রশ্ন : ছায়ানট কোনও রাজনীতিতে জড়ায়নি, কিন্তু রাজনীতির শিকার হয়েছে ঠিকই। সংস্কৃতির সংগ্রামে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকেও বারবার নষ্ট রাজনীতি দ্বারা আপনারা আক্রান্ত হয়েছেন- এ থেকে আপনার উপলব্ধি কি?

ড. সন্‌জীদা খাতুন : রাজনীতি বলতে আমি যা বুঝি তা হচ্ছে রা-জ-নী-তি! শ্রেষ্ঠ-নীতি! রাজ বলতে বড় নীতি, অনেক বড় নীতি। আমরা যারা সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে জড়িত, আমাদের নীতিটাকে আমি মনে করি মূল্যবোধের রাজনীতি এবং সংস্কৃতি মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে, উন্নত করে- জীবন সংস্কৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না। কিন্তু  কেউ কেউ এটাকে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে। ধর্ম খুব ভালো জিনিস, কিন্তু ধর্ম সম্প্রদায় ভালো না। ভাগের মধ্যে ঢুকলে, সংকীর্ণতার ভেতর আবদ্ধ হয়ে গেলেই মুশকিল।

প্রশ্ন : যে সময়ে সংস্কৃতি চর্চা শুরু করেছিলেন তখন আপনারা ব্যক্তির কাছ থেকে, পরিবারের ভেতর থেকে সর্বোপরি সমাজের কাছ থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন- আজ পরিস্থিতি ঠিক তার বিপরীত। কিন্তু এ প্রজন্মে যারা সংস্কৃতির চর্চা করে তারা স্টার হতে চায় শিল্পী হওয়ার সাধনা তাদের ভেতর অনুপস্থিত- এ রকম প্রেক্ষাপটে আপনার কি মনে হয় না- আপনাদের দায়িত্ব আরও বেশি বেড়ে গেছে?

ড. সন্জীদা খাতুন : হ্যাঁ, তা বেড়ে তো গেছেই। আমরা ভেবেছিলাম যে, ছায়ানটের সংস্কৃতি ভবনটা তৈরি করতে পারলে সেখানে আমরা নানা জায়গা থেকে গুণী শিল্পী নিয়ে এসে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতাম। এখানে শিখবে যারা তারাও আসবে, শেখাবে যারা তারাও আসবে। কিন্তু সংস্কৃতি ভবন শেষ করতে পারছি না তো। এটা শেষ করতে পারলে আমরা ওই দায়িত্বটা পালন করতে পারতাম।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সাইফ শাহজাহান অর্ক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।