[লক্ষ্য করুন : মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আবদুল মতিন-এর এই লেখাটি সম্প্রীতি’র প্রস্তুতিমূলক (১৪ এপ্রিল ২০২৩) সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।]

২৫। ০৪। ১৯৯৮

আমি বর্তমানে সত্তরোর্দ্ধ। আমি জীবনে যা দেখেছি, যা ভেবেছি তা মোটামুটিভাবে গুছিয়ে বলতে তথা লিখতে বছর দুই মত সময় লাগার কথা। এই বছর দুই কাল সময় লেখার মত আমাকে সুস্থ থাকতে হবে। আমার শরীরের বর্তমান অবস্থায় এই দুইটা বছরের মোটামুটি সুস্থতা একটা রীতিমত কঠিন এবং অনিশ্চিত ব্যাপার। তাই আগামী দুই বছরের মধ্যে এই লেখাটা সম্পন্ন- করতে হলে তা এখনই শুরু করতে হবে। এই লেখাটা সম্পন্ন করা ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিগত দিক থেকে খুবই প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এই লেখার প্রধান বিষয় হওয়া উচিত আমাদের দেশের ভাষা আন্দোলন যা আমাদের দেশে তো বটেই, এমনকি পৃথিবীর ভাষা বিষয়ক আন্দোলনে অন্যতম প্রধান একটি আন্দোলন। আর ব্যক্তিগতভাবে আমি এই মহান ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে এই আন্দোলনের সূচনা থেকে সম্পর্কিত ছিলাম এবং এই আন্দোলনের অনেক মূল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ নেই।

২৬। ০৪। ১৯৯৮

ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও জ্ঞান এক বারে হয়নি। ক্রমান্বয়ে তা এমন পর্যায়ে- ১৯৪৩ সালে কলেজে পড়ার সময় বিকশিত হতে থাকে এবং ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদালয়ে পড়ার সময় থেকে বিশেষ করে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হওয়ার পর তা এমন পর্যায়ের হয়ে দাঁড়ায়, যার ভিত্তিতে আমি সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনের কর্মকান্ডের সঙ্গে লিপ্ত হয়ে পড়ি।

১৯২৬ সালে সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর চর এলাকায় কৃষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলাম। এই পরিবারের ম্যাট্রিকুলেট আমার বাবা উপার্জনের প্রয়োজনে চাকরির খোঁজে কোলকাতা, রেঙ্গুন ইত্যাদি জায়গায় বছর দুই ঘোরাঘুরির পর ১৯৩১ সালে ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল’ এই হিসাবে দার্জিলিং-এর তিন মাইল দূরবর্তী গোটা পঞ্চাশেক টাকার চাকরিটা নিয়েছিলেন।

জীবনে প্রথম অধ্যায় (জন্ম থেকে ১৯৩৩ সালে মা’র মৃত্যু পর্যন্ত)

যখন বছর ছয়ের মত বড় হয়েছি সেই ১৯৩২ সালে বাবা, আমরা দু’ভাই ও মা’কেসহ দেশের বাড়ি থেকে দার্জিলিং-এর ক্যান্টনমেন্টের এই সরকারি বাসায় এসে উঠলেন। জায়গাটা প্রথম থেকেই ভাল লেগেছিল। দু’এক দিনের মধ্যেই জানলাম ঐ বাসা থেকে বেশ অনেকটা দূরে শহরের কাছাকাছি ছেলে ও মেয়েদের একটা স্কুলে আমাকে ভর্তি করা হবে। তাই ঐ স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য আমাকে স্বরে অ, আ, আর ক, খ, গ জেনে নিতে হবে। রাত্রে বাবা বর্ণ পরিচয়ের প্রম ভাগ ও স্লেট-পেন্সিল আমার হাতে দিয়ে জানালেন, আমাকে ভর্তি হওয়ার জন্য অক্ষরগুলি পড়ে ও চিনে নিতে হবে। বাবা কোনটা কোন বর্ণ তা এবং অক্ষরগুলির কোনটার কি নাম সেটা আমাকে বলে দিলেন এবং আমাকে সেইভাবে অক্ষরগুলির নাম ধরে পড়তে বললেন। আমি অক্ষরগুলি চেনার চেষ্টা করতে লাগলাম। অক্ষরগুলি চিনতে গিয়ে দেখলাম স্বরে অ-র সঙ্গে একটা দাগ দিলে সেটা স্বরে আ, হ্রস ই, নিচে দাগ দিলে সে দীর্ঘ ঈ, এ-র উপরে একটা চিহ্ন দিলে ঐ এবং ও-র উপর চিহ্ন দিলে সেটা ঔ হয়ে যায়। এইটা বুঝে চিহ্নগুলির ভিত্তিতে আমি অক্ষরগুলিকে কয়েকবার করে পড়ে সে গুলিকে (স্বরবর্ণের অক্ষর গুলিকে) চিনতে সক্ষম হয়েছিলাম। তাই পড়া নিয়ে চুপচাপ থাকাতে বাবার পড়ার তাগিদের জবাবে বললাম, ‘আমার পড়া হয়ে গেছে।’ বাবা কিছুটা আশ্চর্য হয়ে পড়তে বললে আমি সবগুলি অক্ষর পড়তে পারায় তিনি কোনটা কি তা জানতে চাইলে আমি তা সঠিকভাবে বলায় বাবা আমাকে পরবর্তী অক্ষরগুলি (ক, খ, গ) কোনটার কি উচ্চারণ বলে দিয়ে পড়তে বললেন। এই অক্ষরগুলি পড়তে গিয়েও আমি মজার দিকগুলি লক্ষ্য করে অক্ষরগুলি চিনে চিনে পড়তে থাকলাম। মজার দিক দেখলাম, যে অক্ষরটাকে ব-বলা হয় ঠিক ঐ রকম অক্ষরের নিচে ফোঁটার মতো দেওয়াতে সেটা র, উপরের দিকে একটা দাগ দিয়ে সেটাকে ধ, ব-র পাশে একটা দাগ দিয়ে সেটাকে ঝ বলা, আবার ফোঁটা ছাড়া যেটাকে য-বলা হচ্ছে সেই রকম অক্ষরের নিচে ফোটা য য়. সেই রকম য’র মধ্যে দাগ দিয়ে সেটাকে ষ বলা হচ্ছে। আবার পৃথক দুটি অক্ষরকে শ বা স বলা হচ্ছে। এই জিনিসটা খেয়াল করাতে অক্ষরগুলিকে বা সেগুলি সেইভাবে উচ্চারণ করতে আমার সুবিধাই হচ্ছিল এবং বেশ কয়েকবার থেকে শেষ পর্যন্ত অক্ষরগুলি পড়ে আমি অক্ষর চিনে ফেললাম। আমাকে চুপচাপ থাকতে দেখে বাবা পড়ার তাগাদা দিলে আমি বললাম, ‘পড়া হয়েছে।’ এবার বাবা আরও আশ্চর্য হয়ে পড়তে বললে আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া ও অক্ষরগুলি চেনাতে তিনি বললেন, যাও আজকের মত পড়া শেষ।

এ রকম কঠিন কাজ থেকে রেহাই পেয়ে আমি রা ড়-বা ঘরে মা’র কাছে গেলাম। মা বললেন, আর একটু পড়ে আস, ভাত প্রায় হয়ে এল। আমি বললাম, আমার পড়া তো হয়ে গেছে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পড়া হওয়ার কথা বিশ্বাস না হওয়ায় মা জিজ্ঞেস করল, তোর বাবাকে কি পড়া দিয়েছিস? আমার কথায় বিশ্বাস না হওয়ায় মা বই আনতে বললেন। মা’র কাছেও অ, আ, ক, খ, গ, ঘ যা পড়েছি সব পড়ে শোনালাম। আর এই পড়া বাবাকে দিয়েছি শুনে মা’ও আশ্চর্য কম হলেন না।

আমি গার্লস হাইস্কুলে ইনফ্যান্টে অ তে ভর্তি হলাম। প্রথম দিনই কয়েকজনের সঙ্গে আমার কিছুটা হাতাহাতি হয়েছিল। ক্লাশের দিদিমনি মিটমাট করে দিল। দু’দিন পরের পরীক্ষায় আমি প্রথম হওয়ায় দিদিমনিদের কাছে আমার সমাদার বেড়ে গিয়েছিল।

এইভাবে ১৯৩২ সালে আমার আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। তবে এইসব আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাশাপাশি কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে যা সব দেখেছি এবং তার মধ্য দিয়ে চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছে সেইগুলির বাস্তবায়নই আমার জীবন ও সেই জীবনের কর্মকান্ড।

মা-র মৃত্যু থেকে ১৯৪৩ ম্যাট্রিক

আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়

২৯। ০৪। ১৯৯৮ ও ৩০। ০৪। ১৯৯৮

ধূলাবালি পলি মাটিতে লালিত একটি ছয় বছরের শিশুটিকে তুলে এনে বন জঙ্গল ও পাথুরে মাটিতে লাগালেও সে দুটি বিশেষ সঞ্চিত রসে তাতেই শিকড় বিস্তার করে দিনে দিনে নিজের আনন্দে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছিল। লেখাপড়া যেন জীবনেরই প্রকাশ। অক্ষর জ্ঞানের ভিত্তিতে সেখানে ভাষার কুড়ি ফুটে উঠতে থাকে। ছোট ছোট গল্পের বইগুলি যে কিভাবে হাত পড়েছিল তা বলতে না পারলেও সেগুলি পড়ে মনটা নানা বিষয়ে ভরে উঠছিল। তার মধ্যে একটা বই-র নাম কেবল মনে আছে- ‘আরো গল্প’। টু-ও থ্রি’র পাঠ্য বই ছিল, ছোটদের রামায়ণ ও ছেলেদের মহাভারত। এ বইগুলি কথা এখন মনে গেঁথে আছে। আরও গল্প বই’র আগে শ্যানডোর বই পড়ে রাস্তায় মটর গাড়ি ঠেকাতে গিয়েছিলাম। গাড়ির মালিক এক সাহেব কষ্টে ব্রেক কষাতে সে যাত্রায় আর কিছু হয়নি। সাহেব আমার নাম ও স্কুলের ঠিকানা জেনে স্কুলে অভিযোগ করাতে দিনিমনিদের অনেক কড়া কড়া কথা শুনতে হয়েছিল এবং স্কুল থেকে গার্জিয়ানের কাছে এসব জানিয়ে চিঠি দেওয়াতে বাবার কাছে ভালমত মার খেতে হয়েছিল। এরপর থেকে মা আমার জন্য আরও অস্থির হয়ে প্রতিক্ষা করতেন। বাড়ির কাছাকাছি ক্যান্টনমেন্টে মোড় ঘুরলেই আমাদের বাড়ির গেটটা দেখা যেত। প্রায়ই দেখতাম মা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁকে দেখতে পেলেই দৌড়ে জড়িয়ে ধরতাম। মা আমাকে জড়িয়ে ধরত। তবু কত আনন্দে যে এই দিনগুলি কেটেছিল। সেই সময়কার অনেক কথা আজ আমি সবচেয়ে কম মনে করতে পারি।

৪ ও ৫। ০৫।১৯৯৮

দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠেই আমি বই পড়ে তার মর্ম মোটামুটি বুঝতে পারতাম। এই সময় প্রথম যে বইটা পড়ে আনন্দের সীমা ছিল না সেটার নাম ছিল ‘আরো গল্প’। থ্রিতে উঠতেই যে নতুন বইগুলি আমাকে কিনে দেওয়া হয়েছিল তার একটার নাম ছিল ছোটদের মহাভারত। বইটা আমি নিয়েই কয়েকদিনের মধ্যে পড়ে ফেলেছিলাম। তার অপূর্ব গল্পগুলি আমি মা ও ছোট ভাইটিকে শোনাতাম। আমি তখন যেন বাতাসে উড়ে বেড়াতাম। কোনো দিন স্কুলে যাওয়া বাদ পড়ত না। স্কুলে না গেলে সেই ক্লাশগুলিতে সেখানে পড়া দেওয়া-নেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা, টিফিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে এটা ওটা কিনে খাওয়া। নাশপাতি বা অন্যান্য জংলা ফল পেড়ে খাওয়ার ইত্যাদি আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকা। আমাদের বাসা থেকে জঙ্গলের মধ্যকার পথ দিয়ে একা একা স্কুলে যাওয়া কোনদিন খারাপ লাগতো না। ছুটির দিনে মা’র আশপাশে ঘুর ঘুর করতাম, কত অফুরন্ত কথাবার্তা বলতাম। এইসব কথা শুনে মা’র কখনও হাসি, উৎসাহ। তার উৎসাহের ও ঔৎসুক্যের ঘাটতি দেখতাম না।

এইভাবে সেই বাল্যকালে আসা দেশটি আপনার চেয়ে আপন সুখের স্থান হয়ে উঠেছিল। তারপর মা হঠাৎ বিছানায় পড়লেন। নিজেই খেয়ে কাপড়-জামা পরে মা’কে বলে স্কুলে যেতাম। সেদিন কিছুই ভাল লাগছিল না। তবু স্কুলে যেয়ে ভাল লেগেছিল। মার অসুখ বাড়তে থাকল। কয়েক দিন থেকে আমার স্কুলে যাওয়া নিষেধ করা হল। মা’র কাছে যাওয়াও আমার নিষেধ হল। তবু মাঝেমধ্যে দাই কাজের মেয়েটা আমাকে মার কাছে নিয়ে যেত। মা বেদেনা, কমলা ইত্যাদি আমাকে খেতে দিত এবং আমি যেন ভাল ভাবে থাকি, লেখাপড়া করি ও ছোট ভাই-বোন দুটিকে দেখতে বলতেন। আমি মা’র এসব কথাবার্তার কিছু বুঝতাম না কিন্তু মন খুব খারাপ হয়ে যেত। আমাকে বেশি মা’র কাছে থাকতে দিত না। কাজের জন্য রাখা মেয়েটা আমাকে বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিত। এসবে মনটা ভেঙে যেত। বাবার আদর আমার ভাল লাগত না। দুই তিন দিন পর একদিন সকালে আমাকে বিছানা থেকে তুলে হাত মুখ ধুইয়ে শার্ট পরিয়ে কাজের মেয়েটা আমাকে হাত ধরে মা’র ঘরে নিয়ে গেল। দেখলাম মা ঘুমিয়ে, তার মুখ ঢাকা। মেয়েটা মুখের কাপড়টা তুলে মার মুখটা দেখালো। মেয়েটা বলল, আমার মা মরে গেছেন। বাঁচা ও মরা কী জিনিস, কি তাদের পার্থক্য তা সেই মুহূর্তেও যেমন বুঝিনি, দুপুরে মাকে গোছল করানোর পর মুখটা দেখালো, তখনও মরার তাৎপর্য বুঝিনি। তারপর মা’কে কবর দিল। মাকে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে কবরের মধ্যে নামাবার পর প্রম একমুঠ মাটি আমাকে দিতে বললেও, এমনকি তারপর মাকে মাটি দিয়ে ঢেকেও কী হচ্ছে তা ভাল করে বুঝতে পারলাম না। কেবল বুঝতে পারলাম আমার সবচেয়ে আপন ও প্রিয়তম মানুষটাকে কোথায় যেন সকলে মিলে রেখে আসল। তারপর আমি তাঁকে আর কোনদিন দেখিনি, পাইনি। এরপর থেকে যে আমার জীবনে নতুন ও ভিন্ন অধ্যায় শুরু হবে তা আগে বুঝতে পারিনি। যা আমার জীবনে উপলব্ধির ও অবস্থানের তৃতীয় অধ্যায়। …

সংগ্রহ : মতিনুল হাসান মতিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।