সোহরাব আলী

মোসতাফা সতেজ

যিনি ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড ব্রাবোন কর্তৃক ১৯৪৫ সালে বাংলার শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে দৌঁড় প্রতিযোগিতায় ৪টি ইভেন্টে ব্যক্তিগতভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চমক সঞ্চার করেন, তিনি সোহরাব আলী শেখ। অ্যাথলেটিক অ্যাসেসিয়েশন (বেঙ্গল) আয়োজিত পশ্চিম বাংলার জলপাইগুড়ি জেলায় এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৬ সালের জুনে পাবনা পৌর এলাকার সাধুপাড়া মহল্লায় তিনি ভূমিষ্ঠ হন। জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

তাঁর কৃতিত্বকে সংবর্ধিত করার প্রবণতাও বেড়েছিল। ১৯৯২ সালের মে মাসে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পাবনায় নতুন প্রজন্মের ছেলেরা খেলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। রাজনীতিতে কিশোরদের অনুপ্রবেশ। অপরদিকে খেলাধুলার সরঞ্জামাদির অতিরিক্ত দাম বাড়ায় নতুন করে ক্লাবও গড়ে উঠছে না। দ্বিতীয়ত: যারা উৎসাহ দেবেন তারাই ডুবিয়ে দিচ্ছেন। মূলত এর জন্য দায়ী ডি এস। তখনকার আমলে পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল। স্বাধীনতার পরেও প্রতিটি পাড়া মহল্লায় নতুন নতুন ক্লাব হলো। সে সময় স্কুলের ছেলে-মেয়েরাও খেলাতে মনোনিবেশ করেছিল। কিন্ত এখন অনুশীলনের অভাবে পাবনা পিছিয়ে যাচ্ছে। ওয়াজি উদ্দিন খান এবং নাসির উদ্দিন ডিস্ট্রিক স্পোর্টসকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। নইলে এ জেলার খেলার জগৎ ধ্বংস হয়ে যেত’।

তাঁর  কথার রেশ ধরে বলা যায়, যোগ্য সংগঠক অভাবে ফুটবল খেলার মান বাড়ছে না। চলছে গতানুগতিক ধারা। এই প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদের এ্যাথলেটিক জীবন কঠোর  দীর্ঘ পরিশ্রমের। শরীরটাকে শেষ ক্ষমতা পর্যন্ত নিংড়ে দেওয়ার ফসল যৎসামান্য ঘরে তুলতে পেরেছেন। শৈশব থেকেই লেখাপড়ার চেয়ে খেলাধুলার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। গোপালচন্দ্র ইন্সটিটিউশন (জিসিআই) থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করেও কলেজে ভর্তি হননি। একজন প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় হবার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে স্পোর্টস চর্চায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি বরাবরই স্বত:স্ফূর্ত প্রেরণায় চর্চা চালিয়ে গেছেন। ফুটবল, হকি-ভলিবল এবং সাঁতারেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। গত শতাব্দীর চল্লিশ দশকে (১৯৩৯-১৯৪৮) জেলা শহরে বেশ কয়েকটি ফুটবল টিম গড়ে উঠেছিল। যেমন পাবনা স্পোটিং, মোহামেডান স্পোটিং, কলেজ টিম, কলেকটরেট টিম, পুলিশ টিম, আরপিবিসি প্রভৃতি। মোহামেডান স্পোর্টিং এ খেলতেন সোহরাব আলী। ১৯৪৩ সালে আবহমান বাংলার পরিবেশ হয়ে ওঠে বিপদ জনক। কলকাতায় জাপানিরা বোমা ফেলে। আতঙ্কে অনেক পরিবার ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালাতে থাকে। পাবনা শহরেও কয়েকটি পরিবার এসে ওঠে। দেখা দেয়া দুর্ভিক্ষ। খাদ্য ঘাটতি। খোলা হয় লঙরখানা। অনাহারে মরতে থাকে মানুষ। এ অবস্থায় ক্রীড়াঙ্গন ঝিমিয়ে পড়ে। তার জীবন অসংখ্য ঘটনা নিয়ে আবর্তিত হতে থাকে। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি ছিলেন বাংলার এ্যাথলেট সা¤্রাজের স¤্রাট। জলপাইগুড়িতে ১শ, ২শ, ৪শ এবং ৮শ মিটার দৌড়ে ব্যক্তিগতভাবে। তিনি চ্যাম্পিয়ন হন ১৯৪৫ সালে বাংলার শ্রেষ্ঠ দৌড়বিদ হিসেবে ব্রিটিশ গর্ভনর লর্ড ব্রাবোন কর্তৃক অ্যাথলেটিক পুরস্কার লাভ করেন। এর পরে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কৃত হন। পাবনার ডিএম তাকে মূল্যবান হাতঘড়ি উপহার দেন। কুষ্টিয়া জেলার ডিএসপি তাকে পুরস্কার হিসেবে নগদে ৫শ টাকা দেন।  ১৯৪৫ সালে কলকাতার মোহমেডান স্পোটিং এর হয়ে খেলতে যান। মহানগরী কলকাতা থেকে ভৌগলিক বিচারে সুদূর পাবনার সোহরাব আলী ফুটবল জগতে সেখানেও সৌরভ ছড়াতে থাকেন। তখন চলছিল লীগ খেলা। তিনি লেফট হাফে খেলতেন। তার বাম পায়ের কিক ছিল অসাধারণ গতিসম্পন্ন। রোগা-পাতলা শরীর। কালচে রঙ। এই ফুটবলার বাতাসের সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বল নিয়ে ছুটতেন। ট্যাকলিং, কিক, হেডিং, কভারিং কোন কিছুতেই তাঁর দুর্বলতা ছিল না। সর্বত্রই তাঁর শক্ত ঘাটি। তিনি রাফ না টাফ এ রকম তর্কে হয়তো সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায়। ডিফেন্ডারেরা তাকে সমীহ করতেন। হাফ লাইনের অ্যাটাকিং দক্ষতার চেয়ে ডিফেন্সিভ দক্ষতা তার অত্যন্ত মজবুত। এ সকল তথ্য তাঁর কাছ থেকেই জানা গেছে। একজন দৌড়বিদ হয়ে ফুটবলেও সুনাম অর্জন করেন।

ভালো খেলার স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কারের মূল্য অস্বীকার করা যায় না। এতে খেলোয়াড়ের আতœবিশ্বাস বেড়ে যায়। চেতনায় আরও ভালো খেলার প্রেরণা সঞ্চারিত হয়। নি¤œবিত্ত পরিবারের এই ক্রীড়াবিদ আর্থিক স্বাচ্ছ্যেন্দের জন্যে রোজগারের পথ সন্ধান করতে থাকেন। যা পেশা ভিত্তিক খেলোয়াড়দের কাম্য হতে পারে না। তিনি কলকাতার ফুড ডিপার্টমেন্টে চাকরি নেন। দেশ ভাগের পর যোগদেন পাবনা কালেক্টরেটে। এ সময়ে তার বিয়ের পাগড়ি মাথায় ওঠে। দাম্পত্য জীবন শুরু। মাঠের ক্রীড়া ধারার অনুভব শক্তি এবং কৌশল থাকলেও জীবন প্রবাহে তিনি যথাযথ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। তাই তাঁর অদম্য আকাক্ষা বা জীবনের পর্দানশীন ইচ্ছাগুলি নির্জীব হতে থাকে। ছেড়ে দেন কালেক্টরেটের চাকরি। কিছুদিন পর যোগদেন ডিস্ট্রিক স্পোর্টসে। কালের নবতরঙ্গ বুঝে নিতে পারেন নি। মূল্যায়ন সেটুকু পেয়েছেন সেটুকু তিনি ভুলে যান নি।  এখানেও তিনি স্থিতিশীল হতে পারেননি। বিভিন্ন কারণে ডি এস থেকে চাকরি ছাড়েন। মাত্রাতিরিক্ত আবেগের শিকার হয়ে হোঁচট খেতে থাকেন। ১৯৫২ সালে পাবনা জিন্নাহ পার্কে (পাবনা স্টেডিয়াম) বল খেলতে গিয়ে আকস্মিক ভাব তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর গ্রন্থি ছুটে যায়। এর পরের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। খেলোয়াড় জীবনের বাতি নিভে গেল একজন প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ আড়ালে চলে যেতে থাকেন। ক্রীড়াঙ্গন থেকে আকস্মিক ভাবে ছিটকে পড়া সোহরাব আলী ঘাত-প্রতিঘাতে, সুখ-দু:খের টানাপোড়েনে হারিয়ে ফেলতে থাকেন স্পোর্টিং আনন্দ। 

সোহরাব আলী শেখ পিতার একমাত্র সন্তান। কোন দিন কোন কাজে নিরুৎসাহী হননি। খেলোয়াড় হবার স্বপ্নকে জিইয়ে রেখে সংসার পরিচালনা করতে থাকেন। অসুখ জীবনের আর্থিক সংকটময় পর্বে যাবতীয় আশা-আকাঙ্খা সংকল্প সব ভেসে যায় হতাশায়। 

কজন ক্রীড়ামোদি জানেন, যারা ক্রীড়া জগৎকে সজীব রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান তাঁরা অনেকেই বেঁচে থাকেন আধা মরা ভাবে। তাদের সাংসারিক জীবনের খবর কেউ রাখেন না। স্পোর্টস মেডিসিনে চিকিৎসিত সোহরাব আলী শুরু করেন আরেক জীবন। যোগ দেন রেফারিতে। এর পর থেকেই রেফারি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। স্থানীয় খেলা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকটি খেলা পরিচালনাতেও অংশ নিয়ে ফুটবল রেফারি সার্টিফিকেট লাভ করেন। এ রকম অর্থাভাব চলাকালে অর্থ্যাৎ ১৯৫৮ সালে তিনি তৎকালীন ইপি আর টিসি (বর্তমানে বি আর টিসি) যাত্রী ভাড়া আদায়কারী হিসেবে যোগ দেন।

তাঁর প্রতিভা শুধু ক্রীড়া জগতেই সীমাবন্ধ ছিল না বিচরণ করেছে সাহিত্য জগতেও। ১৯৪৫ সালে রচনা করেন নাটক। পরিণাম। মঞ্চস্থ করা হয় এবছরই বনমালী ইন্সটিটিউটে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সাহাযার্থে। এই নাটকে কলকাতার চিনু গোস্বামী ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সোহরাব আলী সিনেমা এবং নাট্যমঞ্চেও অনেকবার অভিনয় করেছেন। এপার-ওপার ২ বাংলার মঞ্চেও নাটক করেছেন। তাঁর অভিনয় দেখে সিনেমায় ডেকে নেন মহিউদ্দিন আহমেদ। গোধুলির প্রেম এবং রাহী ছবিতে অভিনয় করেন। ক্যারিয়ার তৈরির ব্যাপারে তিনি খুব একটা সচেতন ছিলেন না বলে মনে হয়। ১৯৮৫ সালে ৬০ বছর বয়সে পাবনা স্টেডিয়ামে ক্যারাবান ফুটবল খেলা উদ্বোধন করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন।

প্রাক্তন এই খেলোয়াড়ের মুখে ফুটে ওঠে স্মৃতির পাপড়ি। যৌবনকালের দিনগুলি একজন দৌড়বিদ ফুটবলার অভিনেতা-সাতারু-রেফারি জীবন অতীতপ্রীতিতে মাখামাখি। জীবনের বহুমাত্রিক বেদনা তাকে পীড়িত করেছে। পরিবার-পরিজনদের অবহেলায় সেদ্ধ হতে হতে বিনা চিকিৎসায় তিনি নিঃশেষ হতে থাকেন। যৌবন স্মৃতির নদীতে ডুবে দিয়ে তিনি একটি সাহসী ঘটনা তুলে আনেন। চল্লিশের দশকে সকল কিছুতেই পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কিছু দৃশ্যমান, কিছু অদৃশ্যমান। তাঁর স্মৃতিময় অধ্যায়ে অম্লান হয়ে আছে গামাকসিনের গন্ধ মাখা পর্ব। যেন তারুণ্যের তরোয়াল। বলতে থাকেন ফেলে আসা দিনের সেই ঘটনার কথা।

‘১৯৪৭ সাল দেশ ভাগের সপ্তাহ দেড়েক কি দুয়েক পরের ঘটনা। সাধুপাড়া বাঁধের কাছে ৪০টি নারিকেল আর নগদ দুশ টাকা ঘুষসহ পাবনা সদর থানার ওসি কাজী আতাহার হোসেনকে হাতে নাতে ধরে গরু বাধা বেঁধে তাকে পাঠিয়ে দেই থানায়। পুলিশ প্রশাসন তখন আমার ওপর ক্ষেপে বারুদ। চারদিকে থেকে নাজেহাল করতে থাকে। বাড়িতে ঘুমানো প্রায় বন্ধ। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি পৌছে যায় ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের কানে। তিনি তখন সরেজমিন তদন্তে পাঠান কর্নেল শের আলমকে। ঘটনা তদন্তের যে রির্পোট তিনি দিয়েছিলেন তাতে পুলিশ সুপারের ডিমোশন হয়। বদলী হন রাজশাহীতে। এরপর থেকে পুলিশি হয়রানি বন্ধ হয়ে যায়।’

যিনি জীবনের সীমাহীন পরিশ্রমের প্রতিটি ঘাম বিন্দুকে চিত্রিত করতে চেয়েছেন ক্রীড়াঙ্গণে তিনি অসহায় অবস্থায় রোগক্রান্ত হয়ে পড়ে ছিলেন শয্যায়। প্রতিযোগিতার দৌড়ে প্রথম হলেও জীবন সংগ্রামের দৌড়ে তিনি একেবারে পেছনে পড়ে যান। সঞ্চয় শুন্য তাই সেধিয়ে ছিলেন ঘরের কোণে। সেখানে থেকে অস্তাচলের ধারে বসে পূর্বাচলের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। প্রতিকূল পরিবেশে ক্রীড়া গরিমার দিনগুলির কথা ভেবেছেন ভাঙা চৌকিতে বসে। মশারি টানাবার যথার্থ লাঠিও ছিল না । কাঁচা মেঝে। দ্রুত পৌঢ়ত্ব পেরিয়ে পৌঁছে যান অকাল বার্ধ্যকে। ক্রীড়া সংস্থার দেয়া মাসিক ৫শ টাকা ভাতা পেয়েছেন। অনাদরে-অবহেলায় দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভুগতে ভুগতে ১৯৯৭ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।