জমিদার বনওয়ারী লাল ও আজিম চৌধুরী

[লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ দ্বিতীয় বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যায় (১৪ মে ২০২৫) প্রকাশ হয়েছিল।]

অধ্যাপক মালা মাহবুব

সময়টা বর্ষা মৌসুম। সকাল সকাল যাত্রা শুরু করেছেন। গন্তব্য পাবনা সদর, জমির খাজনা দেয়া আর কিছু জমিদারি কাজ আছে সদরে। নৌকা চলেছে বড়াল নদীর মাঝ দিয়ে। চারিদিকে স্নিগ্ধ পরিবেশ। সবুজের সমারোহ  চোখের শান্তি এনে দেয়। তাড়াশের জমিদার বনওয়ারী লাল পারিষদ নিয়ে এই স্নিগ্ধ সবুজের ভিতর দিয়ে চলেছেন। পথে এক জায়গায় এসে ভালো লাগলো। মাঝি মাল্লাদের নৌকা ভিড়াতে আদেশ দিলেন। এখানেই জল খাবার খাবেন, একটু জিরোবেন, তারপর আবার যাত্রা। এখানে নেমেই প্রশান্তিতে মন ছুয়ে যায় জমিদার বাবুর। কি অপরূপ সুন্দর চারিদিক। সবুজ আর সবুজ, যেন প্রকৃতি সবুজ চাদরে মুড়ে রেখেছে নিজেকে। মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ঠিক এই সময় হঠাৎ করেই চোখ আটকে গেল অদ্ভুত এক দৃশ্যে। একটা ব্যাঙ সাপকে খাচ্ছে। সচরাচর ব্যাঙকে সাপ খেয়ে ফেলে, ব্যাঙের ত্রাহি চিৎকারে প্রকম্পিত হয়, কিন্তু এ তার উল্টো। জমিদার বাবু অবাক বিস্ময়ে  চেয়ে থাকেন। নিশ্চয়ই এই স্থানের আলাদা মাহাত্ম্য আছে।

বিশ্রাম শেষ করে যাত্রা শুরু করলেন পাবনার উদ্দেশ্যে। কাজ শেষ করে ফিরেও এলেন তাড়াশে। কিন্তু মাথার ভিতর ঘুরে ফিরে ঐ এক দৃশ্য আর ভালো লাগার আপ্লূতা। কেমন এক ঘোরের ভিতর কেটে যেতে থাকে দিন। মনে মনে স্থির করে ফেললেন এখানেই হবে তার বাড়ি। যেমন ভাবা তেমনই কাজ।

শুরু হলো বাড়ি তৈরির কাজ। সময়কাল আঠারো  শতকের শেষাংশ। জমিদার বনওয়ারীলাল ছায়া সুনিবিড়, নদী  বেষ্টিত এই গ্রামের সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে, এই গ্রামের নাম নিজের নাম অনুসারে বনওয়ারীনগর নাম করণ করলেন। যদিও হযরত শাহ শেখ ফরিদ (র.) নাম অনুসারে এই গ্রামের নাম ছিলো ফরিদপুর। এখানেই রয়েছে হযরত শাহ শেখ ফরিদ (র.) মাজার আর মাজার সংলগ্ন মসজিদ। সেই অনুযায়ী কালের বিবর্তনে রয়ে  গেল দুটি নামই। হলো বনওয়ারীনগর ফরিদপুর।

নিজের নামে তো গ্রাম প্রতিষ্ঠা করলেন- শুরু করলেন বাড়ির কাজ। তাড়াশের জমিদার বাড়ির মতো করে এখানেও বাড়ি তৈরি করলেন। চারিদিকে দিঘি বেষ্ঠিত, একটি মাত্র প্রবেশ দ্বার। ছায়া ঘেরা আম বাগানের মাঝে  তৈরি করলেন বাড়ি। তারপর শুরু হলো তাড়াশ থেকে দপ্তর স্থানান্তর করে বনওয়ারীনগরে স্থাপন করা। এখন  থেকে এখানেই হবে তার আবাসস্থল এবং দাপ্তরিক কাজের জায়গা। তাড়াশ থেকে দাপ্তরিক সমস্ত কাজ বনওয়ারীনগরে নিয়ে আসা হলো। এক কথায় নতুন গ্রামের পত্তন সঙ্গে নতুনভাবে পথ চলা।

জমিদার বনওয়ারী লাল রায় বাহাদুর বৃহত্তর পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা) তাড়াশ-এর দেব চড়িয়া গ্রামের বাসুদেব তালুকদার ওরফে নারায়ণদেব চৌধুরীর বংশধর। নারায়ণদেব চৌধুরী ঢাকার নবাব ইসলাম খাঁর অধীনে চাকরি করতেন। নারায়ণদেব ছিলেন খুব কর্মঠ ব্যক্তি। তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে নবাব তাকে চৌধুরীরাই তাড়াশ নামের সম্পত্তি তাকে দান করেন, সেইসঙ্গে চৌধুরী উপাধি প্রদান করেন। তখন পরগণা কাটার মহল্লা রাজশাহীর সাঁতৈলের রাজার জমিদারি ছিলো। এখান থেকে দুইশো মৌজা নিয়ে তাড়াশ জমিদারি সৃষ্টি হয়। এটা ষোড়শ শতকের শেষাংশের কথা।

দুলাই জমিদার বাড়ির অবশেষ

বাসুদেব রায়ের দুই পুত্র, জয়কৃষ্ণ রায় চৌধুরী এবং ছোট রমানাথ রায় চৌধুরী। পরবর্তীতে তারা দুই ভাই ঢাকার নবাব সরকারের অধীনে চাকরি করতেন, এবং যথেষ্ট ধন সম্পদ অর্জন করেন। বড় পুত্র জয়কৃষ্ণ রায় চৌধুরীর সাত পুত্র ছিলো, কিন্তু পরিতাপের বিষয় শুধু তিনপুত্র রামদেব, বলরাম এবং রামরাম ছাড়া বাকী চারপুত্র রাজারাম, গঙ্গারাম, ঘনশ্যাম ও হরিরাম এর কোন সন্তান ছিলো না। বাসুদেব রায় চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র রামনাথ রায় ঢাকার নবাব বাহাদুরের চাকরি করে যথেষ্ট অর্থ বিত্ত লাভ করেন। জয়কৃষ্ণ রায় চৌধুরী এবং বলরাম রায় চৌধুরী বাংলার সুবেদার আজিমুশ্মানের দেওয়ানে কাজ করতেন। তিনি অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে রাজকার্য ছেড়ে দিয়ে পৈতৃক বিষয়াদি দেখাশোনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও ধার্মিক ছিলেন। তার তিন পুত্র ছিলো  রঘুরাম, হরিরাম ও জগন্নাথ রায়। রঘুরাম রায়ের দুই পুত্র। রামচন্দ্র রায় ও রামকেশর রায়। রামচন্দ্র রায়ের তিন পুত্র, রামরুদ্র রায়, রামলোচন রায় ও রামসুন্দর রায়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তিন পুত্রের প্রথম দুই পুত্র ছিলেন নিঃসন্তান। রামসুন্দর রায়ের পুত্র কৃষ্ণ সুন্দর এবং কৃষ্ণ সুন্দর রায়ের পুত্র গৌরসুন্দর রায় অপুত্রক থাকার কারণে বনওয়ারীলাল কে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন।

বনওয়ারী লাল রায় দুইজন পত্নী গ্রহণ করেন তথাপি কোন স্ত্রীর কোন সন্তানাদি না থাকায় রঘুনাথ রায়ের ভাই হরিনাথ রায়ের বংশের বনমালী রায়কে প্রথম স্ত্রী পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন।

প্রজাবান্ধব হিসেবে বনওয়ারী লাল রায় পরিচিত ছিলেন। জ্ঞানী এই ব্যক্তি কোন এক বর্ষার সকালে তাড়াশ থেকে পাবনা যাচ্ছিলেন জমিদারি কাজে। বড়াল, চিকনাই নদী পার হয়ে পাবনা পৌছাবেন। ফরিদপুরে এসে বিশ্রামের জন্য থামলেন। সবুজ বনজঙ্গলে ঘেরা ফরিদপুরে তিনি আগেও এসেছেন শিকার করতে। কিন্তু এদিন চারিদিকের সবুজ বনভূমি তাকে অন্যরকমভাবে আকৃষ্ট করলো। তার মনে হলো অতি পবিত্র স্থান এই সবুজঘেরা দৃষ্টি নন্দন প্রকৃতি। অপার সৌন্দর্য আর শান্তি! মনের মাঝে প্রফুল্লতা এনে দেয়। তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে বাড়ি তৈরি করবেন। তারপর থেকে এই চিন্তা তাঁকে আর স্বস্তি দেয়নি। অবশেষে তাড়াশে জমিদার বাড়ির মতো করে নির্মাণ শুরু করলেন। তাড়াশের জমিদার বাড়ির মতো করে চারিদিকে দিঘি বা পরিখা খনন করলেন। মাঝখানে জমিদার বাড়ি। দিঘি বা পরিখা খনন করার উদ্দেশ্য দুটি। এক পানীয় জল আর দুই শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া।

জমিদার বনওয়ারী লাল ছিলেন স্থাপত্য শিল্পের প্রখর জ্ঞানের আধিকারী, এবং সৌন্দর্য বোধ সম্পন্ন। তার নির্মিত রাজবাড়ী দেখেই বুঝতে পারা যায় তিনি কতটা বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিলেন। বাড়ির চারিদিকে দিঘি কিন্তু প্রবেশ দ্বার একটা। যেন থৈথৈ জলে ভেসে থাকা লাল পদ্ম। বিশাল গেট বা প্রবেশ দ্বার, হাতি, তীরন্দাজ, ময়ূর ইত্যাদি আঁকা রয়েছে- প্রবেশদ্বারে যা মনকে সহজেই স্পর্শ করে। গেট দিয়ে ঢুকলেই ডান দিকে একটি একতলা বিল্ডিং, এটি একসময় জমিদার বাবুর রাজস্ব অফিস ছিলো। এখানেই প্রজাদের খাজনা আদায় আর তাদের অভাব অভিযোগ শুনতেন। এই দালানটি অপূর্ব কারুকাজ আর কেমন যেন ধ্যান গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা সহজেই অতীতে নিয়ে যায়। ভাবতে বাধ্য করে দূর অতীতকে। এর ঠিক একশত গজ দক্ষিণে রয়েছে একটি দোতলা দালান। একসময় এটি ছিলো কয়েদখানা আর টাকশাল। মোটা মোটা লোহার গরাদ, দরজা  আর অন্ধকার কুঠুরি মনে করিয়ে দেয় জমিদারের নিষ্ঠুরতার কথা। বন্দী শালার ডানপাশে লোহার সিন্দুক, যার ভিতর খাজনা আদায় করে রাখা হতো।

রাজপ্রাসাদের দক্ষিণে যে ভবন সেটাই জমিদারের মূল বাস ভবন। বাসভবনের কাছেই ছিলো তিনটি ধাপে ছাদবিহীন হাম্মাম খানা বা গোছলখানা, যা নেমে গেছে দিঘির জলে। এই ঘাট রাণীর ঘাট হিসেবে পরিচিত ছিলো। জমিদার পরিবারের আভিজাত্যের কারণে এই রকম ঘাট নির্মাণ করেছিলেন যাতে বাইরে থেকে অন্দরমহলের নারীদের স্নান দৃশ্য কেউ দেখতে না পায়। মূল বাসভবনের কাছেই রয়েছে দিঘির পারে দক্ষিণ মুখী হাওয়া খানা। লাল একতলা বাড়ি, টানা বারান্দা। বড় বড় খিলান পিলারের গায়ে কারুকাজ। সবকিছু মিলে শুধুই ভালো লাগা ছুয়ে যায়। হাওয়াখানার পুব দিকে রয়েছে একটি একতলা ভবন, এটি ছিলো বিনোদবিগ্রহ মন্দির। তিন দরজা বিশিষ্ট ভবনটির মূল প্রবেশপথে অংকিত রয়েছে বাঘের চিত্র। ভিতরে পুরোহিত থাকার ঘর, বিগ্রহের  বেদী। একসময় এখানে পূজা অর্চনা করা হতো। কিন্তু এই ভবন এখন আগাছায় ছেয়ে আছে।

ফরিদপুর রাজবাড়ি

এর কাছাকাছি একটা দোতলা ভবন, একসময়ের নাট মন্দির। এককথায় শীশমহল। এই ভবনে রয়েছে নানা ধরনের অলংকরণ। সাপ, হাতি, বাঘ, ঘোড়া, তীরন্দাজসহ নানা আকৃতির নকশা। বিনোদ বিগ্রহ মন্দিরে হতো পূজা অর্চনা আর নাট্য মন্দিরে নাচ গান। ঝাড়বাতির আলো ঠিকরে পড়তো অলংকারের উপরে। বাঈজীদের সুললিত সুরে, নুপুরের নিক্কণে রাতের আকাশ বাতাস মদির হয়ে যেত।

রাজবাড়ী থেকে বেশ কিছুদূরে দিঘি ছিলো যার নাম দুধ সাগর। এই দিঘির পারেই ছিলো গ্রন্থাগার নাম সরোদ গণপাঠাগার। জমিদার বনওয়ারী লাল রায় ছিলেন শিক্ষা অনুরাগী। প্রজাবান্ধব বনওয়ারী লাল চৌধুরীর সঙ্গে দুলাই এর জমিদার আজিম চৌধুরীর সখ্যতা ছিলো। কথিত আছে যদি নদী পথে কোন শত্রু আক্রমণ করে তাহলে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন। সাহায্যের প্রয়োজন পড়লে নিজের বাড়ির ছাদ থেকে আকাশ মুখে গুলি করবেন, তাহলেই সাহায্যে এগিয়ে আসবেন।

পাবনা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে বনওয়ারীনগর। সিএনজি চালিত অটো রিকশা বা বাসে চড়ে দিনে দিনেই বেড়িয়ে যাওয়া যায়। জমিদার বনওয়ারী লালা চৌধুরীর বাড়ি এখন সরকারের উপজেলা অফিস। কেউ রাত্রিযাপন করতে চাইলে অনুমতি নিয়ে উপজেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে থাকতে পারেন। এছাড়াও নদী পথে এখানে আসা যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।