দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি দুই বছর আগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশ হয়েছিল। পাবনার ১৯৮ বছরে এসে লেখাগুলো পর্ব আকারে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে।

মোসতাফা সতেজ

[প্রাণোচ্ছল পাবনার অতীত সমৃদ্ধি যা ছিল তার খানিক হারিয়ে গেলেও পাবনা ফুরিয়ে যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই এ শহর নতুন করে গড়ে উঠছে শিক্ষানগরী হিসেবে। এ শহরের জীবন যন্ত্রণা যেমন আছে, তেমনি আছে জীবনের জয়গানও। শোনার কান চাই, দেখার চোখ চাই, ভালবাসারও মন চাই, পাবনাকে পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। এ শহর বিকশিত হয়েছে ১৮ শতকে। ইছামতি নদী তীরে গড়ে ওঠা বন্দরকে ঘিরেই এ শহর সমৃদ্ধ হতে থাকে। স্থানীয় নদী সমুহকে অবলম্বন করে জেলাবাসীর চিন্তা অনিবার্য ভাবে বিকশিত ও প্রবাহিত হতে থাকে। ক্রমাগত বাড়তে থাকে লোকসংখ্যা। উদাসীনতায় ঐতিহ্য গুলো চোখের আড়াল হয়ে গেলেও তার অনুরণন থেকে গেছে বহমান জীবন প্রবাহে। সংস্কৃতির পীঠভূমি এই পাবনা পলেস্তারা ভাঙা  শতাধিক বছরের দেয়ালও চিত্র শিল্পের ক্যানভাস হয়ে ওঠে। ধসে পড়া হতশ্রী বাড়ির জানালায় স্বপ্নের পর্দা দোল খায় বাসন্তী হওয়ায়। পদ্মা যমুনার দাক্ষিণ্যে ভৌগলিক পরিবেশ, ভূ-প্রকৃতি আর প্লাবন ভূমি নির্ভরতার অনুকূলে। এ জেলার হলুদ, মরিচ, মাখন, মাছ, পাট, দানা শস্য প্রভৃতি ঢাকা- কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় রফতানি হতো। তাঁত আর হোসিয়ারি পণ্য ১৯ শতকের শেষ দশক পর্যন্ত অর্থনীতি কে সচল রেখেছিল। এ জেলা শহর এখন জনচাপে দুর্ষিত হয়ে পড়ছে।]

জেলা পাবনার ১৯৮ বছর পূর্তির দিন ছিল গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে। লর্ড বেন্টিকের শাসনামলে ১৮২৮ সালের ১৬ অক্টোবর ৩১২৪ নম্বর সরকারি আদেশে পাবনা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। রাজশাহী  জেলার ৫টি ও যশোর জেলার ৩টি থানা নিয়ে সর্ব প্রথম পাবনা জেলা গঠন করা হয়। এ জেলার ইতিহাসে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, ‘রাজশাহী হতে পাবনা, ক্ষেতুপাড়া, মথুরা ও রায়গঞ্জ এবং যশোরের ধরমপুর, মধুপুর, কুষ্টিয়া ও পরে পাংশা এই ৮টি থানা নিয়ে সর্ব প্রথম পাবনা জেলা গঠিত হয়। একই বছরে ২১ নভেম্বরে খোকসা থানা সামিল হয় পাবনায়। এর আগে ১৭৬৫ সালের পর বাংলা বিহার যে আট ভাগে বিভক্ত হয় তার মধ্যে পাবনা হুগলি বিভাগের অন্তগর্ত রাজশাহী পরগনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রায় বাহাদুর ভবন

পাবনার পূর্বাঞ্চলের ও পশ্চিমাংশের চলনবিলের জলদস্যুতা ও গামছামোড়া বা ঠগিদলের উপদ্রব নিবারণে আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর স্বল্প সংখ্যক সদস্য ব্যর্থ হয়। জমিদারেরা নির্বিঘেœ যাতায়াত করতে পারেন না। তাদের নিরাপত্তা বাড়াতে পাবনা থানাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। ১৮৬৩ সালে কুষ্টিয়া থানা, ১৮৭১ সালে কুমারখালি থানা নদীয়া জেলা এবং পাংসা থানা ফরিদপুর জেলা ভুক্ত হয়।

ব্রিটিশ আমলে প্রকাশিত পাবনা জেলা গেজেটিয়ারে পাবনা সম্পর্কে লেখা হয়,  About 250 years ago, pabna was on the bank of the Ganges (padma) but gradually the off take of the Ichhamati silted up and a high sandy char was formed at its mouth which was gradually populated by agriculturists. On this char land ofactory was erected by an indigo planter, pabna was made the headquarters of the district in 1828 with a view to establishing law and ordes and suppressing the widespread prevalence of dacoites in this area. In 1828 a Joint magistrate was appointed and this arrangerent was made permanet in 1832.

১৯০৩ সালে দুলাই ও সাঁড়া থানা গঠিত হয়। ১৯২৯ এর ১০ মে সাঁড়া থানা টেংরি মৌজায় স্থাপন করে ঈশ্বরদী নামকরণ করা হয়। একই ভাবে দুলাই থানা সুজানগর, মথুরা থানা বেড়া এবং ক্ষেতুপাড়া থানা সাঁথিয়া থানায় রূপান্তরিত হয়। 

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর দেশের শাসন ব্যবস্থায় ইংরেজ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতায় গেলে সমাজ ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। আঠার শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশে ডাকাতির নিরস্কুশ প্রাদুর্ভাব ঘটে। 

১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে পাবনা অনেক মানুষ মারা যায়। অধিকাংশ জেলায় ছয় মাস বৃষ্টি হয়নি। দুর্ভিক্ষে মড়ক ও ভিক্ষাবৃত্তি বর্ণনাতীত। একথা লিখেছেন, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কর্মকর্তা ডবলিউ ডবলিউ হান্টার। অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল (১৮৬৮) গ্রন্থে আরও লেখেন, ‘কুষ্টিয়া মহকুমার দায়িত্বে থাকা কালীন আমার কাছে যে বিপুল সংখ্যক রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা আসে তার বেশির ভাগই জমির করের পরিমাণ একর প্রতি ছয় শিলিংয়ের নিচে। সেচযুক্ত দোফসলি জমির জন্য একর প্রতি বার শিলিং। দুর্ভিক্ষ পরবর্তী প্রথম জনের বছরে জনশূন্যতা বাড়তে থাকে। ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত বুড়োরা মারা যায়। তাদের শূন্যস্থান পূরণের জন্য কোনও প্রজন্ম ছিলনা।’ ১৭১০ সালে পাবনা ছিল রাজশাহী জমিদারির অধীন। ১৭৯৩ সালের দশ সালা বন্দোবস্ত পর্যন্ত এ ভুখন্ড একমাত্র নাটোর রাজ রাজা রামকৃষ্ণের অধিকার ভুক্ত ছিল। রাজস্ব বাকির কারণে জামিদারি নিলাম হতে আরম্ভ হলে পাবনার অনেক অংশ ভিন্ন জেলাবাসীর অধিকারের করতল গত হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।