বাংলাদেশের পথিকৃৎ

[লেখাটি ২০২৩ সালের ১৪  আগস্ট সম্প্রীতির প্রস্তুতিমূলক সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।]

শ্যামল দত্ত

উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ হীরালাল সেন (১৮৬৬ – ১৯১৭) এ দেশেরই সন্তান। রাজধানী ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে তাঁর জন্ম। প্রথম বাঙালি নারী চলচ্চিত্রকার হিসেবে সম্ভবত অরুন্ধতী দেবী (১৯২৪ – ১৯৯০) পরিচিত। তিনি একজন বাঙালি ভারতীয় অভিনেত্রী, নারী চলচ্চিত্রকার, লেখিকা এবং গায়িকা হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর জন্ম ১৯২৩ সালে বাংলাদেশের বরিশালের বিখ্যাত গুহঠাকুর পরিবারে। তবে   বাংলাদেশের প্রথম নারী চলচ্চিত্রকার রেবেকা। তাঁর পুরো নাম মনজন আরা বেগম, ডাকনাম বকুল। তিনি কেবল বাংলাদেশের নন, তিনি এ দেশের উত্তর জনপদের জেলা শহর পাবনার সন্তান। ১৯৪১ সালের ১১ মার্চ পাবনার হায়দারপুরের পৈলানপুরে বাবার বাড়িতে তাঁর জন্ম। বাবা শেখ বাহাদুর আলী, মা মেহেরুন্নেসা। পাঁচ বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে রেবেকা ছিলেন চতুর্থ। বাবা জেলা জজকোর্টে কাজ করার পাশাপাশি রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিলেন। সেইসাথে তিনি সংস্কৃতিচর্চাতেও মনোযোগী ছিলেন। থিয়েটার করতে ভালোবাসতেন। ছোটবেলা থেকেই রেবেকা ছিলেন একরোখা এবং দুরন্ত স্বভাবের। রেবেকার দাদিও ছিলেন খুব ডানপিটে। দাদির সেই স্বভাবটাই পেয়েছিলেন রেবেকা। দুরন্তপনা সত্ত্বেও বাবা তাঁকে খুব আদর করতেন। জন্মস্থান পাবনার পৈলানপুরেই কেটেছে শৈশবের সোনালি দিনগুলো। পরে অবশ্য রেবেকার পরিবার পাবনা শহরে অন্য একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। পাবনার গান্ধী বালিকা বিদ্যলয়ে শুরু হয় রেবেকার স্কুলজীবন। স্বদেশী আন্দোলনের আর্দশে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে সে সময় ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়তো। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের ছোট বোন ছিলেন রেবেকার সহপাঠী। স্কুলের ছেলেমেয়েদেরকে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোরা চালানো, লাঠিখেলা, বন্দুক ছোড়াসহ নানা ধরনের শরীরচর্চার শিক্ষা দেওয়া হতো। পাশাপাশি স্বদেশী মনোভাবে গড়ে ওঠার জন্য শিল্পকর্মেও উৎসাহ দেওয়া হতো। স্কুলেই রেবেকা ছবি আঁকা, ভাস্কর্য তৈরি করা এবং চিত্রকলার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে শিক্ষা পান।

কিন্তু পাবনার মতো একটি মফস্বল শহরে সে সময় একটি মেয়ের পক্ষে ছেলেদের মতো করে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে কিশোরী রেবেকা জানতে পারে যে, তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সন্দেহ নেই সেটি ছিল বাল্য বিয়ে। ফলে স্কুলে থাকতেই রেবেকার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের কথা শুনে কিশোরী রেবেকা কেঁদেকেটে অস্থির। শেষ পর্যন্ত বিয়েতে কনের পরিবর্তে কনের বাবাকেই ‘কবুল’ বলতে হয়। যেন একটি চঞ্চল মুক্ত বিহঙ্গকে খাঁচায় বন্দী করা হলো এবং বিয়ের পর কিশোরী রেবেকাকে স্বামীর সাথে ঢাকায় শ্বশুর বাড়ি আসতে হয়। সম্পূর্ণ অপরিণত বয়সেই তিন সন্তানের জন্ম দেন রেবেকা। বড় ছেলে রাগীব এহসান, মেজ ছেলে শিবলী এহসান এবং মেয়ে মোনালিসা তুলি। সংসার জীবনের মধ্যেই রেবেকা কবিতা লেখেন, ছবি আঁকেন, ভাস্কর্য গড়েন এসব তাঁর স্বামীর পছন্দ হয় না। কিন্তু রেবেকা এরই মধ্যে কিশোরী থেকে পরিণত হয়েছেন। তাই এখন আর জোর করে তার ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। স্বামী পছন্দ করুক বা না করুক, রেবেকা তার পছন্দ থেকে সরে দাঁড়াবেন না। বাধ্য হয়ে নিজেই ১৯৬০ সালে স্বামীর সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদ করেন। আবারও তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। কিন্তু এই বিয়েটাও ১৯৮০ সালের দিকে ভেঙে যায়। এবার রেবেকা পুরোপুরি স্বাধীন। ছোটবেলা থেকে বাবার কাছে রেবেকার অভিনয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল। সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ছোটবেলায় অভিনয় করেছেনন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নামে একটি নাটক পরিচালনা করেছিলেন রেবেকা। এরপর ‘রানা প্রতাপ’ নাটকে মানসিংহের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি নাচ-গানও করেছেন।

চলচ্চিত্রকার অরুন্ধতী দেবীর সাথে রেবেকার বেশ কিছু মিলও রয়েছে। অরুন্ধতী বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী ছিলেন, তিনি রবীন্দ্রসংগীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের মহাপ্রস্থানের পথে (১৯৫২) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে পা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আরও কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং পরে নিজেই নির্মাণ করেন ছুটি (১৯৬৭)। ছবিটি ১৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়। এরপরও তিনি বেশ কয়েকটি ছবি পরিচালনা করেন।

ঢাকায় চলচ্চিত্রকার জিল্লুর রহমান ছিলেন রেবেকার প্রতিবেশী। তার স্ত্রীর সাথে রেবেকার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। তার মাধ্যমেই ১৯৬৪ সালে রেবেকা প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেটি ছিল জিল্লুর রহমান পরিচালিত এই তো জীবন (১৯৬৪) চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য রেবেকা তাঁর নিজের নাম পাল্টে রাখেন ‘রাত্রি রায়’। এই তো জীবন চলচ্চিত্রে রেবেকা ভাবির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আরও সুযোগ আসে। প্রায় ১৫টি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। কখনও মা, কখনও ভাবি হিসেবে রেবেকা চলচ্চিত্রের পর্দায় আসতেন রাত্রি রায় নামে। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র : জহির রায়হানের বাহানা (১৯৬৫), মুস্তাফিজের মালা (১৯৬৫), এতেহশামের ডাকবাবু (১৯৬৬) ও ছোটো সাহেব (১৯৬৭), আজহার হোসেনের উলঝন (১৯৬৭), বশীর হোসেনের ১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন (১৯৬৬), নুরুল হক বাচ্চুর আগুন নিয়ে খেলা (১৯৬৭) ও মানুষ অমানুষ (১৯৭০)।

১৯৬৯ সালে দেশ জুড়ে তখন রাজনৈতিক উত্তাল অবস্থা চলছিল। মাঝেমাঝেই সামরিক শাসনের কারফিউ চলছে। ঘরের বাইরে বের হবার উপায় নেই। সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রেবেকা এক রকম জেদ করেই চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তার মধ্যে কেবল একটাই প্রশ্ন, পুরুষরা পারলে নারী কেন পারবে না? সংস্কার আর সামরিক শাসনের কঠিন দেয়াল ভেঙে তিনি বেরিয়ে আসেন। একজন নারীও যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারে সেটা দেখানোর জন্যই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব সহজ বিষয় নয়। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং এর পেছনে থাকে অনেক মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। মাত্র আশি হাজার টাকায় রেবেকা নির্মাণ করেছিলেন তার একমাত্র চলচ্চিত্র বিন্দু থেকে বৃত্ত (১৯৭০)। ছবিটিতে অভিনয়ও করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে বিশেষ করে জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) আর মুস্তাফিজের (১৯২৮-১৯৯২) কাছ থেকে রেবেকা অনুপ্রাণিত হয়েছিরেন। তবে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) এবং সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২)। বিশেষ করে ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) ছবির ব্যাপক প্রভাব দেখা যায় ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ ছবিতে।

‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন মদন সাহু আর সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন আনোয়ার পারভেজ। ছবিটি সাদা কালো ও ৩৫ মি.মি. ফিল্মে নির্মিত। এই ছবিতে অভিনয় করেছেন আতিয়া চৌধুরী, মফিজ, এফ আলম, রেবেকা, গোলাম আকবর, অমিতা বসু, আনোয়ার আশরাফ, ফয়জুল্লাহ, শহীদ, অনুপ, কালিপদ, ওবায়েদ, কাসেম, দুলালী, সুষমা, মুস্তাক, শাহজাহান প্রমুখ। ছবিটির প্রযোজক ফকরুল আলম ও রেবেকা। এফ এ ফিল্মস-এর ব্যানারে নির্মিত এই ছবিটি পরিবেশনার দায়িত্ব নেয় সালাহউদ্দিন প্রোডাকশন্স।   চলচ্চিত্র সমালোচেকরা সে সময় ছবিটির দারুণ প্রশংসা করেছিলেন। অবশ্য এরপর রেবেকা আর কোনো চলচ্চিত্র পরিচালনা বা প্রযোজনা করেননি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ছবিটির নেগেটিভ বা প্রিন্ট এখন আর কোথাও সংরক্ষিত নেই। ছবিটির অস্তিত্ব সম্পর্কেও কারও কাছে কোনো তথ্য আছে বলে জানা যায়নি। 

পরিচালনা বা অভিনয়ের পাশাপাশি রেবেকা ভাস্কর ও কবি হিসেবেও পরিচিত। রেবেকা কখনও একটি কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না। কখনও ছবি এঁকেছেন, গান শিখেছেন, অভিনয় করেছেন, বিজ্ঞাপন চিত্রে কাজ করেছেন, গীতিনাট্য রচনা করেছেন, কবিতা-গল্প লিখেছেন, টেলিভিশনের জন্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ছয়টি। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ‘ব্যাকুল ঠোঁটের বৃষ্টি’, ‘নদী বুঝি ডাকে’, ‘সময় ভেঙেছে সংশয়’, ‘নদী বুঝি ডাকে’। তাঁর প্রথম কাব্য প্রয়াস ‘ব্যাকুল বৃষ্টির ঠোঁটে’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে কবি আসাদ চৌধুরী মন্তব্য করেছিলেন, ‘১৯৭০ সনে আমাদের শৈশবে, চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি তার প্রেমের, শ্রমের এবং মেধার ফসল বিন্দু থেকে বৃত্ত। সেই মেধাবী আঙুলেরই সৃষ্টি’। রেবেকা ভাস্কর ছিলেন। ঢাকায় তাঁর বাড়ির নাম ‘শেষের কবিতা’। বাড়িটি তিনি তাঁর বিভিন্ন ভাস্কর্য আর নিজের আঁকা নানা চিত্রকর্ম দিয়ে সাজিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে রেবেকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে শিখেছিলেন এবং ডেথ স্কোয়াডে নামও লিখিয়েছিলেন। তবে নিজের কাজের জন্য রেবেকা খুব বেশি স্বীকৃতি পাননি। এজন্য তাঁর কোনো আক্ষেপও ছিল না। ১৯৬৬ সালে ‘মালা’ ছবির জন্য পেয়েছেন লিও ফিল্মস সম্মাননা স্মারক, চলচ্চিত্রের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি তাঁকে একটি সম্মাননা দেন। এছাড়া সমাজ সেবায় অবদানের জন্য পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বর্ণপদক পান। এছাড়া জীবনের শেষ দিকে তিনি ঢাকায় ‘পাবনা সমিতি’-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে রেবেকা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকা-কে বেছে নিয়েছিলেন। এরপর ২০০৭ সালে রেবেকা না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

যে সময় মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া রীতিমতো বিধিনিষেধের পর্যায়ে, সেই সময় রেবেকা একজন মুসলিম নারী হয়ে শুধু যে ঘরের বাইরে বেরিয়েছেন তাই নয়, অভিনয় করেছেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁকে বাংলাদেশের নারীদের চলচ্চিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁর পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে জাহানারা ভূঁইয়া, রোজী আফসারী, সুজাতা, সুচন্দা, কবরী, মৌসুমী, সামিয়া জামান, রোজিনা,  শামীম আকতার, শাহনেওয়াজ কাকলী, নারগিস আক্তার, রওশন আরা নিপা, রুবাইয়াত হোসেন, চয়নিকা চৌধুরীর মতো নারী চলচ্চিত্রকাররা এগিয়ে এসেছেন। এ দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেবেকার নাম চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

শ্যামল দত্ত : লেখক, গবেষক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।