[পাবনা শহরের ছেলে নাজমুল হক মণ্টু। বর্তমান বসবাস ঢাকায়। ছোট বেলা থেকেই পুরাকীর্তি বা অতীতের নিদর্শন সংগ্রাহক তিনি। দেশে, এমনকি বিদেশেও তিনি নিদর্শন সংগ্রাহক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। কারণ মণ্টুর কাছে যে সংগ্রহ রয়েছে- তার অনেক কিছু দেশের কোন জাদুঘরেও নেই। সেদিক থেকে তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাহক। এ কারণে তিনি স্বীকৃতি ও সম্মান দুই-ই পেয়ে আসছেন।
মণ্টুর সংগ্রহ তালিকার মধ্যে রয়েছে বহু বিষয়। তবে এই প্রতিবেদনে শুধুমাত্র কালির দোয়াতকেই তুলে ধরা হলো। মণ্টুর সংগ্রহে আড়াই’শ বছর আগে থেকে পরবর্তী সময়ের পিতল, দস্তা, জার্মান সিলভার, রৌপ্য, মিক্স ধাতুর সহস্রাধিক কালির দোয়াত ও কলম রয়েছে। এরমধ্যে আছে পাঁচ শতাধিক অ্যান্টিক (দুই’শ বছর আগের) এবং দুই শতাধিক ভিন্টেজ (একশ’বছর আগের) দোয়াত। নিচে তাঁর একটি সাক্ষাতকারও তুলে ধরা হলো।]

নাজমুল হক মণ্টু : আমি এনটিক সংগ্রাহক হলেও বিশেষত আমার সংগ্রহ কালীর দোয়াত। এরমধ্যে রয়েছে ১৮ থেকে ১৯ শতকের দোয়াত। ২০ শতক পর্যন্ত এইসব দোয়াতগুলো ছিল বিভিন্ন ধরণের বিভিন্ন মেটালের এবং বিভিন্ন মোটিভের। আমার সংগ্রহের মূল এগুলোই। বাংলাদেশে এই ধরণের সংগ্রাহকের সংখ্যা খুবই কম। যদিও এখন দু-একজন করছেন। তবে আমি এটা আগে থেকে করে আসছি। আমার সংগ্রহে আমি দোয়াতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছি।
দোয়াত বলতে সাধারণত কাঁচের দোয়াত বোঝায়। সংগ্রহ করতে গিয়ে জানতে পারি শুধু কাঁচের দোয়াত নয়, মেটালিক দোয়াতের প্রচলন ছিল। এরমধ্যে দস্তার দোয়াত উল্লেখযোগ্য। এগুলো ছিল বিদেশি। আমাদের দেশে আগে এ ধরণের দোয়াতের মধ্যে ছিল পেতলের, তামার, দস্তার- এমনকি সোনার দোয়াতও। জমিদার বা এলিট শ্রেণী যারা ছিল- তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রূপার দোয়াত ব্যবহার করতো। এছাড়া ব্যবহার করতো জার্মান সিলভার ব্রঞ্জ এবং পেতলের দোয়াত। এখন থেকে তিন’শ সাড়ে তিন’শ বছর আগে ভারত উপমহাদেশে পেতল এবং কাঁসার দোয়াত ব্যবহার হতো। এরকম কিছু দোয়াত আমাদের দেশের ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ছাত্র ব্যবহার করতো- যদিও সংখ্যায় তা খুবই কম। হয়তো কোন গ্রামের ২০/২৫ জন ছাত্রের মধ্যে একজন একটা দোয়াত ব্যবহার করতো কিনা সন্দেহ। অনুসন্ধান করতে গিয়ে এমনও জেনেছি, ১০/১৫টা গ্রামের মধ্যে একটা ছাত্র হয়তো ম্যাটিক পাশ করেছে- তাকে একটা দোয়াত দেওয়া হতো। দোয়াতের মর্যাদার দিকটা ছিল এইরকম।
একটা সময় মানুষ প্রাকৃতিকভাবে দোয়াত বানাতো। যেমন বেলের খোল, নারকেলের মালই, বা মাটির সরা ইত্যাদি দিয়ে দোয়াত বানাতো। প্রাকৃতিক কালি বানিয়ে এর ভেতর রেখে ব্যবহার করা হতো। এসময় কলমও প্রাকৃতিকভাবে বানানো হতো- যেমর হাঁসের পালক, ময়ূর পালক, নলখাগড়ার কাটা, সজারুর কাটা ইত্যাদিকে কলম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এসব মিলিয়েই আমাদের অঞ্চলে দোয়াতের ব্যবহার হয়েছে।
দোয়াতের ইতিহাস বহু প্রাচীন। প্রাচীন যে বৌদ্ধ বিহারগুলো রয়েছে, সেগুলো কিন্তু মূলত ছিল শিক্ষাকেন্দ্র। এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে দোয়াত, কালি, কলমের ব্যবহার ছিল। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে আমাদের দেশের বিভিন্ন জাদুঘরে মাটির দোয়াত রাখা হয়েছে। এগুলো কয়েকটি জাদুঘরসহ তিন/চারটি বৌদ্ধ বিহারে রাখা আছে। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহেও এগুলো আছে। এই মাটির দোয়াতগুলোকে বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যেতো না। কারণ এগুলো ব্যবহারের পর মানুষ ভেঙে ফেলতো। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে চলে আসে কাঁচের দোয়াত। আমাদের দেশে পঞ্চশের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত, এমনকি নব্বই দশক পর্যন্তও এই কাঁচের দোয়াত ব্যবহার হতো। এগুলোও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি। কারণ কেউ হয়তো ভেঙে ভেলেছে, কেউ এদিয়ে কুপিবাতি বানিয়েছে। এরপর কুপিবাতির ব্যবহারও শেষ হয়েছে। এখন এ বাতি নেই বললেই চলে।


সংগ্রহ করতে গিয়ে জেনেছি, বিভিন্ন সময় দোয়াতের বিভিন্ন ধরণ, ডিজাইন বা কোয়ালিটি ছিল। এ অবস্থায় আমি প্রথমে ধাতব দোয়াত সংগ্রহ শুরু করি। এটা করতে গিয়ে আমি পিতল, দস্তা, জার্মান সিলভার, রৌপ্য, মিক্স ধাতুর দোয়াত সংগ্রহ করি। আবার কাঁচের দোয়াতের মধ্যেও অনেক রকম ডিজাইনের ভ্যারাইটি আছে- যেমন কোনটা গোল, কোনটা চ্যাপটা, কোনটা লম্বা, চিকন ইত্যাদি। বিদেশ থেকে আঠারো-উনিশ শতকে যেসব দোয়াত আসতো সেগুলো ছিল বেশিরভাগই ক্রিস্টালের। এসব দোয়াত ফ্রান্স, ইংল্যান্ড বা ইউরোপ থেকে আসতো। আর আমাদের দেশের তৈরি দোয়াতগুলো ছিল কাঁচের এবং সবুজাভ। এগুলো ছিল অনেকটাই দুর্বল। কিন্তু ক্রিস্টালের দোয়াত ছিল ভারী, মজবুত এবং দেখতে সুন্দর। আমাদের দেশে বেলে পাথরের দোয়াতেরও অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর নমুনা রয়েছে বগুড়ার মহাস্থান জাদুঘরে। এছাড়া স্বেত পাথর, মার্বেল পাথরের দোয়াতও পাওয়া গেছে। কাঁচের দোয়াতের মধ্যে পাওয়া গেছে রঙিন কাঁচ যেমন- নীল, পানি রং ইত্যাদি। আকৃতিও বিভিন্ন রকমের। যেমন কোনটি মাছ আকৃতির, কোনটি হাতির আকৃতিক, কোনটি দেবতার মূর্তি আকৃতির, আবার মূর্তির ভেতরেও লুকিয়ে রাখা দোয়াতও পাওয়া গেছে। এরকম নানা ধরণের দোয়াত ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।


কলমের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এরকম বৈচিত্র রয়েছে। প্রথম দিকে যে স্টাইলস কলম ছিল সেগুলো দিয়ে মাটির উপরে বা মোমের উপর লেখা হতো। এজন্য ব্যবহার হতো সুচালো মেটাল কলম। তারপর প্রাকৃতিক কালি এলো। এগুলো তৈরি হতো পুঁইশাকের বীজ, ফুলের বীজ, গাছ-গাছালির রস-কষ দিয়ে। এরসঙ্গে বয়রা-হরতকি ইত্যাদি মিশিয়ে কালি বানানো হতো। এর অনেক পরে, অর্থ ১৮৫০ সালের পরে কালি এবং কলম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। এসময় ফাউন্টেন পেন-এর জন্ম হয় এবং তৈরি হয় ক্যাপিটাল কালি। প্রথম দিকে এগুলো আমাদের উপমহাদেশে তৈরি হতো না, তখন এগুলো ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, চীন থেকে আসতো। আমাদের দেশে এরকর কালির প্রচলন হয় ৫০ দশকের পর ৬০ দশকের দিকে। তখন ঢাকাসহ দেশের অনেকগুলো জেলায় কালি তৈরি হতো। এই কালি ছাত্র-শিক্ষক এবং ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করতেন। মজার ব্যাপার হলো- কালির দোয়াতের ব্যবহার আশির দশকের পর থেকে কমা শুরু করে এবং নব্বই দশকে প্রায় বিলীন হয়ে যায়। এই বিলীনের বিষযটিকে কেন্দ্র করেই আমার সংগ্রহের বিষয়টি চাঙা হয়। আমি ইতিহাসের এই বিষয়টি ধরে রাখার জন্য এর সংগ্রহকে গুরুত্ব দিয়েছি এবং সংগ্রহ কাজে নেমে পড়ি। আমাদের নতুন প্রজন্ম যাতে আগের ইতিহাস জানতে পারে- সেজন্যই আমার এই সংগ্রহকে এভাবে তুলে ধরা।
