অনুজা সাহার কৃতিত্ব
কামাল সিদ্দিকী
কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস ও নিজের কিছু করার অদম্য ইচ্ছা একজন মানুষকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ পাবনার নারী উদ্যোক্তা অনুজা সাহা এ্যানি। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাংখিত চাকরি পাননি। সংসারে এসেছে নানা সংকট। প্রতিকূলতার কাছে থেমে না গিয়ে তিনি নিজেই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন। নিজের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন বহু নারী-পুরুষের জন্য।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ বর্তমান সময়ে নারীরা আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। পাবনার নারীরাও সেই অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাদেরই একজন অনুজা সাহা এ্যানি।

শৈশব থেকেই সৃজনশীলতার চর্চা : পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার অমূল্য কুমার সাহা ও অঞ্জনা সাহার একমাত্র সন্তান অনুজা সাহা। তার বাবা অমূল্য সাহা শহরের ঐতিহ্যবাহী সেলিম নাজির উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষকতার জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে গড়ে তুলেছেন তিনি।
বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল একমাত্র মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করবেন। সেই লক্ষ্য পূরণে অনুজা সাহা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া অনুজার সাংস্কৃতিক চর্চার হাতেখড়ি ছোটবেলা থেকেই। মাত্র তিন বছর বয়সে নৃত্যচর্চা শুরু করেন। পরে সংগীতের সঙ্গেও যুক্ত হন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অর্জন করেন পুরস্কার ও সনদ।
চাকরির চেষ্টা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত : উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেন অনুজা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আশায় আবেদন ও যোগাযোগ করেও সফল হননি। এরই মধ্যে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান অর্ণব। পরবর্তীতে স্বামীর ব্যবসায়িক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারে দেখা দেয় আর্থিক সংকট। সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি।
চাকরির জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও যখন কোনো সুযোগ মিলছিল না, তখন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নারী উদ্যোক্তাদের সফলতার গল্প তাকে অনুপ্রাণিত করে। চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রথমদিকে ব্যবসা করার বিষয়ে তার মা অঞ্জনা সাহা খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু মেয়ের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
মায়ের রান্না থেকে ব্যবসার শুরু : অনুজার মা অঞ্জনা সাহা খুব ভালো রান্না করতে পারতেন। সব ধরনের খাবার রান্নায় তার ছিলো দক্ষতা। মায়ের রান্নার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প পুঁজি নিয়ে ঘরে তৈরি খাবারের হোম ডেলিভারি’র ব্যবসা শুরু করেন অনুজা সাহা। প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয় ‘অর্ণব এন্ড কোং’। শুরুতে পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি পণ্য, ভাত, বিরিয়ানি ও বিভিন্ন ধরনের ঘরোয়া খাবার সরবরাহ করা হতো। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে অর্ডার। পাবনা শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকেও বড় বড় অর্ডার আসতে শুরু করে।
ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুজা নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেন। বিসিক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মায়ের কাছ থেকে সেলাই ও কাটিংয়ের কাজও শেখেন। পরে সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শুরু করেন বুটিক হাউসের ব্যবসা।

সংস্কৃতি চর্চায়ও অবদান : ব্যবসার পাশাপাশি নিজের সাংস্কৃতিক চর্চাকেও ধরে রেখেছেন অনুজা। গড়ে তুলেছেন ‘মন ময়ূরী’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এখানে শিশুদের আর্ট, নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি ও সুন্দর হাতের লেখা শেখানো হয়। ব্যবসার পাশাপাশি শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে কাজ করার মধ্যেও তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পান।
‘মায়ের পরশ’ রেস্টুরেন্ট : অনুজা সাহার উদ্যোক্তা জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘মায়ের পরশ’ রেস্টুরেন্ট। পাবনা শহরের জেলা পাড়ায়, ডিসি অফিস সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন তিনি। এখানে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় ও আধুনিক খাবারও তৈরি করা হয়। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাবারের ব্যবস্থা যেমন রয়েছে, তেমনি মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল মানুষের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন।
সকালের নাশতায় রুটি, পরোটা, সবজি ও ডাল থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের বিভিন্ন প্যাকেজে ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, ভর্তা, শাক-সবজি, খিচুড়ি, পোলাওসহ নানা ধরনের খাবার রয়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় লুচি, আলুরদম, ফুচকা, কচুরি, ঘুগনি, চিকেন কবিরাজি, চিকেন চাপ, পাউভাজি, কালাই রুটি, ভেলপুরি, পাপড়ি চাট, বার্গার, মমোসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবার পাওয়া যায়।
অতি সম্প্রতি চালু করেছে দেড়শ টাকায় ফুল প্লেট চিকেন কাচ্চি বিরানী এবং ১২০ টাকায় মোরগ পোলাও প্যাকেজ। এই প্যাকেজ ব্যাপক সারা ফেলেছে। সম্ভবত; উত্তরবঙ্গে এটাই প্রথম সাশ্রয়ী উন্নত খাবার। খাবারের বৈচিত্রের পাশাপাশি সাধ্যের মধ্যে ভালো খাবার পরিবেশনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেন তিনি।
বহু মানুষের কর্মসংস্থান : অনুজা সাহার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে বহু নারী ও পুরুষ কাজ করছেন। কিছু নারী পুরুষের কর্মসংস্থানের পথও তিনি করেছেন। তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পুরাতন কর্মচারী ফয়সাল বলেন, আমার এখানে কাজ করতে খুব ভালো লাগে। অনুজা দিদি নিষ্ঠাবান পরিশ্রমী মানুষ। তার কাজ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে- কিভাবে ছোট থেকে বড় বড় হওয়া যায়। ফয়সাল বলেন, আমি এখানে কাজ করে যে টাকা পাই, তাতে আমার সংসার ভালোভাবে চলে যায়। দিদির কারণে আমার কর্মসংস্থান হয়েছে।
আলআমীন, আলম, জেসমিন, রাসেলসহ অনেকেই জানান, এক সময় সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অনুজা সাহার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে এখন তারা পরিবারকে আর্থিকভাবে ভাল করতে পারছেন। নিজেদের আয় দিয়ে সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সংসারের খরচেও অবদান রাখতে পারছেন।
বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা : উদ্যোক্তা জীবনের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না অনুজার। পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যবসার নানা প্রতিকূলতা তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। কখনো ব্যর্থতা ও হতাশা তাকে ঘিরে ধরেছে। কখনো মনে হয়েছে সামনে এগিয়ে যাওয়া হয়তো কঠিন। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। নিজের মেধা, শ্রম, নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
আজ তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য আয় করছেন না; তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের পরিবারের আয়- রোজগারের সঙ্গেও তার উদ্যোগের সম্পর্ক রয়েছে।
নারীদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন : অনুজা সাহা মনে করেন, পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে এখনো অনেক নারী নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পান না। সুযোগ পেলে নারীরা নিজের পরিবারকে যেমন সহযোগিতা করতে পারেন, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি চলমান উদ্যোক্তারাও তাদের ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। তার নিজের স্বপ্নও অনেক নারীকে কর্মের সঙ্গে যুক্ত করা।
অনুজা সাহা বলেন, ‘আমি শুধু নিজের জন্য এগিয়ে যেতে চাই না। আমার সঙ্গে যত বেশি মানুষকে কাজে যুক্ত করতে পারব, বিশেষ করে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারব- ততই আমি আনন্দিত হব।’
————-
সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে নিজের কর্মজীবনের পথ তৈরি করা অনুজা সাহা এ্যানির গল্প তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন শিক্ষিত নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা, পরিবারের পাশে থাকার দায়িত্ব এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির একটি বাস্তব উদাহরণ।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা শুধু একটি পরিবারের পরিবর্তন ঘটায় না; এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। অনুজা সাহা এ্যানির পথচলাও সেই পরিবর্তনেরই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ।