[দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় (১৪ জানুয়ারি ২০২৫) প্রকাশ হয়েছিল।]

—–অধ্যক্ষ এ আর শামসুল ইসলাম

বিষয়টা বিতর্কিত, তবু মনে হয় ধর্মশালা হলো পাঠাগারের প্রথম পুরুষ। তবে প্রধান পুরুষ নয়। প্রাচীনকালে ধর্মপ্রীতিবশত, যা মূলত প্রকৃতি পূজো থেকে উৎসারিত হয়েছিলো, মানুষ উপাসনালয়ে হাজির হতো। ধর্মশালার কর্তৃপক্ষ তাদের ধর্ম কথা শোনাতেন। স্বভাবত মৌখিক বাণীর চেয়ে লিখিত বক্তব্য অধিকতর কার্যকর এবং নিরাপদ প্রতিপন্ন হয়। তাই দরকার হলো বইয়ের যদিও সে বই আজকের বই নয়। আর বই সংরক্ষণের জন্য একটা বিধি ব্যবস্থা- যা পাঠাগার তুল্য, বস্তুত সর্বোচ্চ বিবেচনায় বর্তমান পাঠাগারের ছায়ামাত্র। ঐ বইগুলো ছিলো পাথরের উপরে খোদাই করা লেখা, মাটির ফলকে লেখা, প্যাপিরাস, পার্চমেন্ট, ভেলাম অথবা চামড়ার উপর  লেখা। অক্ষরগুলো নানা ছাঁদের কোনটা ছবিযুক্ত, কোনটা সূচালো, কোনটা প্যাচানো ইত্যাদি। এসব বইযের  বেশীরভাগই আজ অজানা। যেগুলো পাওয়া গেছে তারও অনেকগুলো পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বইয়ের বিষয়বস্তু হলো ধর্মবাণী, ধর্মের অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আইন, দেবদেবীর জীবনী। মন্দিরের যে স্থানে বই রাখা হতো  সেখানে সাধারণ উপাসকদের প্রবেশাধিকার সম্ভবত ছিলো না। বইগুলো কোথায় কিভাবে রাখা হতো তার সঠিক এবং বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া দুষ্কর। অনুমিত হয়, মন্দিরের দেয়ালের খোপে যতœসহকারে সংরক্ষিত থাকতো। বইয়ের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। এর একটা প্রধান কারণ, মন্দিরের প্রধানগণ উৎসাহভরে লক্ষ্য করেন, মুদ্রিত বাণীগুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ঐক্য সাধনে যাদুকরী প্রভাব সৃষ্টি করছিলো। মিশর, মেসোপটেমিয়া, গ্রীস,  রোমে এসব মন্দির সংগ্রহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গ্রন্থাগারের প্রথম পুরুষ এরাই। যথার্থ অর্থে, পাঠাগারের প্রধান পুরুষ হলো আর্কাইভস। প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, ব্যক্তিগত নথিপত্র রাখার জন্য এটা অতীতকালেই গড়ে উঠেছিলো। সরকারী আর্কাইভসে থাকতো রাজকীয় ফরমান, যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, রাজায় রাজায় চুক্তি ইত্যাদি। বণিকেরা ব্যবসা সংক্রান্ত কাগজপত্রাদি সংরক্ষণের জন্য ব্যক্তিগত সংরক্ষণাগার খুলেছিলো। বিত্তবানদের অনেকে বংশপঞ্জী এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহ সংরক্ষণের প্রতি ছিলো প্রবল আগ্রহী। মূলত জনবহুল, বাণিজ্য প্রধান নগরগুলোতে আর্কাইভসের উদ্ভব হয়। সরকারী আর্কাইভসের ক্ষেত্রে মিশর, মেসোপটেমিয়া, রোম ছিলো উল্লেখযোগ্য। মিশরের আর্কাইভস ছিলো প্যাপিরাসের, মেসোপটেমিয়ার মাটির ফলকের, রোমের প্যাপিরাস ও পার্চমেন্টের।

তৎকালে লেখার উপকরণগুলোও ছিলো কৌতূহলোদ্দীপক। কলম, কাগজ, কালি সবই ছিলো স্থান ও সময়োপযোগী এবং সমকালীন মানব মেধার সর্বোচ্চ ফসল। কলম হিসেবে ব্যবহৃত হতো সূচালো কাঠ, ধাতু নির্মিত স্টাইলস, বাঁশের আগা, বাটাল, বুরুশ, পাখির পালক, সজারুর কাঁটা, হাড় ইত্যাদি। কাগজও কম  বৈচিত্র্যময় নয়। মেসোপটেমিয়া এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছিলো  ‘ক্লে ট্যাবলেট’ বা মাটির ফলক। কাদা যখন নরম থাকতো, সূচালো কাঠ, বাঁশ, হাড়, ধাতু নির্মিত দন্ড ইত্যাদি সহযোগে তার উপর চোখা চোখা কারুকার্যময় অক্ষর, পশুপক্ষী, দেবদেবীর মূর্তি ইত্যাদি উৎকীর্ণ করা হতো। পরে ঐ নরম মাটির প্লেটগুলোকে শুকানো হতো রোদে, সেঁক দিয়ে, চুলোর আঁচে। একে বলা হয় কিউনিফর্ম লিখন পদ্ধতি-প্রায় চার হাজার বছর আগের মানুষের লিখন বাসনা চরিতার্থের কামধেনু। প্রমাণ আকারের প্লেট ছিলো দৈর্ঘ্যে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি, প্রস্থে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি এবং পুরুত্বে ১ ইঞ্চি। বড় প্লেটগুলো দৈর্ঘ্যে ১২ ইঞ্চি, প্রস্থে ৮ ইঞ্চি, পুরুত্বে সমান। লেখার আরেক ধরনের পাতা ছিলো প্যাপিরাস। একই নামের গাছের বাকল থেকে তৈরী। নীলনদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এ গাছের চাষ হতো। বাকলগুলো চেঁছে, ঘষে সমতলীকরণ করে শুকানো হতো যাতে এর গায়ে কালি বসে। তারপর এগুলোকে সীট আকারে তৈরী করা হতো এবং সীটগুলো বড় করার দরকার হলে আঠা দিয়ে জোড়া দেয়া হতো। পার্চমেন্ট বা  ভেলামের উপরেও লেখার প্রচলন ছিলো। এগুলো ছোট ভেড়া বা ছাগলের চামড়া থেকে উপরের লোম ও চর্বি ছাড়িয়ে তৈরী করা হতো। তাছাড়াও আরো অন্যান্য প্রাণীর চামড়া কাগজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। প্যাপিরাসের চেয়ে পার্চমেন্ট ছিলো উন্নতমানের। সাধারণত প্যাপিরাসের উভয় পিঠে লেখা যেতো না, কিন্তু পার্চমেন্টে তা যেতো, আর এর স্থায়িত্বও ছিলো বেশী।

ব্যাপকভাবে ব্যবহার ছিলো কালো কালির। তেল জ্বালানো বাতির ধোঁয়াতে এক রকমের কালো দানা উৎপত্তি হতো, যার সাথে পানি ও আঠা মিশিয়ে কালো কালি তৈরী করা হতো। লাল এবং অন্যান্য রংয়ের কালিরও কিছু ব্যবহার ছিলো। লাল কালি বানানোর সময় পানির সাথে আয়রন অক্সাইড ও আঠা গোলানো হতো। সব কালিই শুকনো অবস্থায় রাখা হতো। ব্যবহারের সময় পানি মেশানো হতো। লেখার উপকরণ নির্বাচনকালে প্রধান বিবেচ্য ছিলো কোনটা সহজপ্রাপ্য, কম খরচের, বেশী টেকসই এবং লিখতে কম কষ্টকর।

বিশ্ব সভ্যতার উন্মেষে কতকগুলো দেশ সমসাময়িক। কেউ বলেন, সভ্যতার প্রথম সূর্য মিশরে উদিত হয়েছিলো। সভ্যতার সঙ্গে পাঠাগারের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক যুক্তিযুক্ত। প্রতœতত্ত্ববিদ্গণ ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রমাণ পেয়েছেন যে, প্রাচীনকালে মিশরে অনেক পাঠাগার ছিলো। রাজপরিবার, বিত্তশালী, জ্ঞানী-গুণিজন পাঠাগার নির্মাণ করতেন। মিশরের প্রাচীনকালের একটা বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘বুক অব দি ডেড’। বইটা ধর্মসংক্রান্ত এবং প্যাপিরাস রোলে লিখিত। এতে মৃতের আত্মাকে চূড়ান্ত বিচার কক্ষে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিবরণ আছে। বইটা বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। বর্তমান আকার ৭৮ ফুট লম্বা, চওড়া ১৫ ইঞ্চি। বইটার বিশেষ আকর্ষণ হলো প্রচুর রং চং ও ছবি। প্রাচীন মিশরীয়রা পাঠাগারের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মনোযোগী ছিলো। গ্রন্থাগারের দায়িত্বে থাকতো প্রশাসক ও গ্রন্থাগারিক। বই কপি করার জন্য লিপিকর (ংপৎরনব) নিয়োগ করা হতো। গ্রন্থাগারিক পদটি কোন  কোন ক্ষেত্রে বংশানুক্রমিক ছিলো। প্যাপিরাস রোলে লেখা বইগুলো গ্রন্থাগার কক্ষে সযতেœ মাটির পাত্রে অথবা ধাতুর চোঙে রাখা হতো। ক্যাটালগ পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে বস্তুসূচীর একটা তালিকা রাখা হতো। এডফুর মন্দিরে এমন একটা নিদর্শন পাওয়া গেছে। মিশরীয় সংগ্রহগুলো ধর্মবাণী এবং দলিল দস্তাবেজ জাতীয়। ব্যাবিলন ও এ্যাসিরিয়ার সংগ্রহগুলো সে তুলনায় অনেকটা গ্রন্থাগার পর্যায়ভুক্ত। গ্রন্থাগারের ইতিহাসে এ্যাসিরিয়ার অধিপতি আসুরবনিপালের (৬৬৮ – ৬২৬ খ্রীঃপুঃ) গ্রন্থাগারটি মূল্যবান। রাজধানী নিনেভে গ্রন্থাগারটি শুরু করেছিলেন পিতামহ সেনাকরিব। সরকারী দলিল দস্তাবেজ ছাড়াও ইতিহাস, বিজ্ঞান, কবিতা, ব্যাকরণ, অভিধান, সাহিত্য পুস্তক দ্বারা গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ ছিলো। বইগুলো কপি করার জন্য ২০ জনের অধিক সার্বক্ষণিক লিপিকর নিয়োজিত থাকতো। কিউনিফর্ম ভাষায় মাটির চাকতিতে বইগুলো লিখিত হয়েছিলো। চাকতিগুলো বিষয়ভিত্তিক সুবিন্যস্ত থাকতো। মজার ব্যাপার, কিছু কিছু চাকতি শক্ত মাটির ঢাকনা দিয়ে নিরাপদাবস্থায় আবদ্ধ রাখা হতো। প্রয়োজন হলে মাটির ঢাকনা ভেঙে ফেলে মাটির বইয়ের চাকতি বের করে পড়া হতো। গ্রন্থাগার বহু কক্ষবিশিষ্ট ছিলো। প্রতিকক্ষে কি কি বিষয়ের বই ছিলো তার তালিকা দরজা বা দেয়ালের উপর উল্লিখিত থাকতো। গ্রন্থাগারের দায়িত্বে যিনি নিয়োজিত ছিলেন আজো তিনি ‘লিখিত চাকতির মানুষ’ নামে খ্যাত হয়ে আছেন। আরো অনেক পাঠাগারের মতো ঐ পাঠাগারটি খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতকে যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। সৌভাগ্যের বিষয়, বইগুলো কিন্তু নিশ্চিহ্ন বা নিরুদ্ধার হয়নি। ঐসব চাকতির কতকগুলো খুবই শক্ত ছিলো। ফলে আড়াই হাজার বছর পরেও ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর অধিকাংশই ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। তাছাড়াও মাটির চাকতির অন্যান্য সংগ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে অন্যান্য শহর আশুর, উর, নিল্লুর ইত্যাদি থেকে।

প্রাচীনকালে গ্রীসের বড় বড় মন্দিরের সাথে পাঠাগার ছিলো। সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে রাজকীয় লাইব্রেরীর উদ্ভব হয়। খ্রীষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে এথেন্সের সরকারী লাইব্রেরীর উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এটা জনগ্রন্থাগারে পরিণত হয়। এতে এসকাইলাস ( ৫২৫-৪৫৬ খ্রীঃ পূঃ), সফোক্লিস (৪৯৫-৪০৫ খ্রীঃ পূঃ) এবং ইউরিপিডাস (৪৮০-৪০৫ খ্রীঃ পূঃ) এঁদের বিখ্যাত গ্রীক নাটকগুলো সংরক্ষিত ছিলো। ঐসব নাটক ও অন্যান্য পুস্তক কপি করার কাজে অনেক লিপিকর রাখা হতো। যাদের নাটকগুলো কেনার আর্থিক সামর্থ্য ছিলো না, তারা গণগ্রন্থাগারে গিয়ে ওগুলো পড়তে পারতো।

মনীষী প্ল্যাটো (৪২৮?-৩৪০? খ্রীঃপূঃ), এ্যারিস্টটল (৩৮৪- ৩২২ খ্রীঃ পূঃ) এঁদের বইয়ের বিপুল সংগ্রহ ছিলো। তৎকালীন আরেকজন পন্ডিত পিটিাসেরও ব্যক্তিগত বড় পাঠাগার ছিলো। এ্যারিস্টটল তাঁর সংগ্রহ প্রিয় শিষ্য থিওফ্রেস্টাস (৩৭১-২৮৭ খ্রীঃ পূঃ) কে দিয়ে যান। শেষোক্তজন মৃত্যুর পূর্বে ঐ সংগ্রহশালা নেলিয়াস নামক এক অনুজ কমরেডকে উইল বলে প্রদান করেন। এরপরে বইগুলোর ভাগ্য সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। মনে হয়, ঐ রতœরাজি রোম অথবা আলেকজান্দ্রিয়াতে স্থানান্তরিত হয়েছে। আলেকজান্ডারের বংশধরদের নিজ নিজ সাম্রাজ্যে পাঠাগার স্থাপনের ঐতিহাসিক স্বাক্ষর পাওয়া যায়।

আলেকজান্দ্রিয়া, পারগেমাম, ম্যাসিডন, এন্টিওক ক্ল্যাসিকান শিক্ষার জন্যে ইতিহাসখ্যাত। এসব স্থানে অবশ্যই মূল্যবান পাঠাগার স্থাপিত হয়েছিলো। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম পাঠাগারটি ছিলো আলেকজান্দ্রিয়াতে। গ্রীক-মিশরীয় শাসক ১ম টলেমী এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। শেষ হয় ২য় টলেমীর শাসন আমলে। ১ম টলেমী ৭০ জন পন্ডিতের সাহায্যে ২৬০ খ্রীষ্টপূর্বে প্রাচীন হিব্রু ভাষায় পুরাতন টেস্টামেন্ট সম্পাদন করেছিলেন। আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগারের সঙ্গে জাদুঘর ও গবেষণা ইনস্টিটিউট যুক্ত ছিলো। জাদুঘর এবং লাইব্রেরীর অনুষদগুলো পৃথকভাবে বিন্যস্ত ছিলো। তত্ত্বাবধানের দায়িত্বভার প্রেসিডেন্ট-প্রিস্টের উপর ন্যস্ত থাকতো। তার অধীনে অনেক বেতনভুক শিক্ষক-কর্মচারী কাজ করতেন। বিভাগীয় প্রধানগণের নাম উদ্ধার করা হয়েছে। যেমন জেনোডটাস, এরাটোসথিনিস, এরিসটোফেনস প্রমুখ। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন কলিমাচুস। তিনি ক্যাটালগিং প্রবর্তন করেন (এ বিষয়ে মতান্তর আছে। এ থেকেই সম্ভবত ক্লাসিফায়েড বোঝা যায়, বই ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তাঁরা কতো চিন্তিত ও উদ্ভাবনী ছিলেন। দুটো প্রধান সমস্যা তাঁদের সামনে ছিলো- (ক) গ্রীক সাহিত্যের গ্রন্থপঞ্জী রচনা ও (খ) পুরনো জীর্ণ বইগুলোর নতুন প্রকাশনা। এ তাগিদ থেকেই মুদ্রণের পদ্ধতি আসে। এথেন্স বই ক্রয় বিক্রয়ের একটা বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। পুটার্কের মতে সীজার আলেকজান্দ্রিয়াতে অবরুদ্ধ হলে এই পাঠাগার ভষ্মীভূত হয়। জানা যায়, এ পাঠাগারে ১ থেকে ৭ লক্ষ বই ছিলো।

ঐ পাঠাগারের প্রায় সমকক্ষ আরেকটি পাঠাগারের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। ২য় ইউমিনিস প্রতিষ্ঠিত পারগেমামের পাঠাগার। কথিত, এন্টনি যখন এই পাঠাগারটি ক্লিওপেট্রাকে উপহার দেন তখন এর পুস্তক সংখ্যা ছিলো ২ লক্ষ। এছাড়াও হেলেনীয় সাম্রাজ্যের প্রধান নগরগুলোতে বলার মতো পাঠাগারের সন্ধান পাওয়া যায়।

পান্ডুলিপিকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার একটা প্রচেষ্টা প্রাচীন এথেন্সে ছিলো বলে জানা যায়। সফোক্লিস ও ইউরিপিডাসের আমলে প্রত্যেক রচনার মূল কপি কেন্দ্রীয় সংগ্রহাগারে জমা দিতে হতো এবং যে কেউ এসে রচনা যাচাই করতে পারতো।

রোমে খ্রীষ্টপূর্ব ১ম শতকের পূর্ব পর্যন্ত সরকারী দলিলপত্র সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত আর্কাইভস ব্যতীত পাঠাগারের প্রমাণ নেই৷ খ্রীষ্টপূর্ব ৮৬ অব্দে সুলার গ্রীস থেকে এ্যারিস্টটলের রচনা রোমে আনেন। লুকুলাস খ্রীষ্টপূর্ব ৬৩ অব্দে প্রাচ্য থেকে বই আমদানী করেছিলেন। জানা যায় লুকুলাসের একটা বড় পাঠাগার ছিলো। সেখানে জনসাধারণ ঢুকতে পারতো। এ্যাটিকাস এবং সিসারোর ব্যক্তিগত বড় বইয়ের সংগ্রহ ছিলো। সীজার নিজের জন্যে একটা পাঠাগার স্থাপনের প্রচেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা চরিতার্থ হয়নি। সম্ভবত এ্যাসিনিয়াস পোলিও রোমে প্রথম ব্যক্তিগত পাঠাগার স্থাপন করেন। এর পরেই অগাস্টাস দুটো বড় পাঠাগার নির্মাণ করেছিলেন। এ দুই পাঠাগারের সঙ্গে সংযোজিত ছিলো উপাসনালয়, পৃথক পৃথক গ্রীক ও ল্যাটিন সহ-পাঠাগার ও পাঠকক্ষ যেখানে প্রয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তী লাইব্রেরীগুলোর জন্যে এটাই মডেল হিসেবে গৃহীত হয়। টাইবেরিয়াস  ভেসপাসিয়ন, উজান পাঠাগার নির্মাণ করেছিলেন। ক্রমেই লাইব্রেরীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। শুধু রোম নগরীতেই ২৬টা পাঠাগার স্থাপিত হয়েছিল। প্রাদেশিক শহরগুলোতেও পাঠাগার নির্মাণের প্রবণতা বিস্তৃত হয়। প্রায় প্রতিটি পাঠাগারে ছিলো ২টি কক্ষ, প্রতিটি লম্বায় ৬০ ফুট ও প্রস্থে ৪৫ ফুট। কালক্রমে লাইব্রেরীর জন্য ব্যক্তিগতভাবে টাকা দান দাতা হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মাপকাঠিরূপে স্বীকৃত হয়। রোমানরা বিজয়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে প্রচুর বই আমদানী করে তাদের পাঠাগার সমৃদ্ধ করেছিলো।

রোমে ব্যক্তিগত লাইব্রেরী স্থাপন একটা ফ্যাসান হয়ে দাঁড়ায়। ওটা যেনো অভিজাত মহলে প্রবেশের সিংহদ্বার। এ বিষয়ে সেনেকার একটা মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘বাসভবনের জন্য স্নানাগার যেমন প্রয়োজনীয় পাঠাগারও তেমনি। অনেকের বাড়ীতেই লোক দেখানো, শোভাবর্ধক পাঠাগার গজাতে থাকে। স্যুদাস একটা পাঠাগারের কথা বলেছেন, যার সংগ্রহ ছিলো ৩০ হাজার বই। ১৭৫২ সালে হারকিউলানিয়াম এর ধ্বংসাবশেষ  থেকে একটা ব্যক্তিগত পাঠাগারের নমুনা উদ্ধার করা হয়েছে। পাঠাগার কক্ষটা ছিলো দৈর্ঘ্য প্রস্থে উভয় দিকে ১২ ফুট। দেয়ালের চতুর্দিকে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কারুকার্যমন্ডিত কাঠের বুককেস বসানো। কক্ষের মাঝখানে পাঠকদের জন্য একটা বড় টেবিল সাজানো ছিলো। সিসারোর বর্ণনানুযায়ী ব্যক্তিগত লাইব্রেরী স্থাপনের জন্যে দারুণ প্রতিযোগিতা চলতো। ফলে বিশালাকায় ব্যক্তিগত লাইব্রেরী গড়ে ওঠে। ৬২ হাজার বই সমৃদ্ধ এমন একটি ব্যক্তিগত পাঠাগারের সন্ধান পাওয়া গেছে। অগাস্টাসের সময় প্রতি মন্দিরে লাইব্রেরী নির্মাণের রেওয়াজ দেখা যায়। ২য় শতাব্দী থেকে স্কুল বৃদ্ধির সাথে সাথে লাইব্রেরীর প্রসার ঘটে।

রোমের বইগুলো সংরক্ষণের পদ্ধতিও ছিলো বৈশিষ্ট্যময়। বই এর রোল কাঠির লাঠির মধ্যে পোঁচিয়ে চামড়ার আবরণে অথবা মাটির পাত্রে রাখা হতো। তদুপরি মূল্যবান বইগুলো কখনো ব্রঞ্জের চোঙের ভিতরে নিরাপদ  হেফাজতে অবরুদ্ধ করা হতো। ৩য় শতকে রোমান গ্রন্থাগারে ছিলো ভাঁজ করা অথবা পুস্তকাকৃতি পুথি। সাধারণত এ জাতীয় মূল্যবান গ্রন্থগুলো পাঠাগারের বাইরে নিতে দেওয়া হতো না।

গ্রন্থাগার প্রশাসনে দক্ষতার পরিচয় মেলে। বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী নিযুক্ত থাকতো। সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজকীয় গ্রন্থাগার প্রশাসক, তাঁর নীচে প্রতি পাঠাগারের জন্যে নিজস্ব প্রশাসক। বই ঝাড়া মোছা গোছগাছ করা ইত্যাদি কাজের জন্যে ছিলো বিবলিয়থেকার পদধারী কর্মচারী। আরো ছিলো লিপিকর। এ কাজে মহিলারা পর্যন্ত নিযুক্ত হতো। সর্বানিম্ন পদে আসীন ছিলো ক্রীতদাস।

একালে প্রকাশনা শিল্পও এগিয়ে গিয়েছিলো। বইয়ের পাইকারী প্রকাশকের উল্লেখ পাওয়া গেছে। তারা লেখক নিয়োগ করতো, সুন্দর হস্তাক্ষর বিশিষ্ট ক্রীতদাস মাইনে দিয়ে রাখতো। একজন উচ্চস্বরে পাঠ করতো, দশ-বার জন শুনে নকল করতো। কাজ নিখুঁত করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রুফ রিডার পর্যন্ত নিয়োগ করা হতো৷ বইয়ের ব্যবসা বোধ হয় জমে উঠেছিলো। বই বিক্রেতারা দোকানে খুঁটির মাথায় বইয়ের তালিকা লটকিয়ে রাখতো। কোন  কোন দোকানে আবৃত্তিকার এবং পাঠকক্ষ রাখা হতো। আবৃত্তি শুনে ক্রেতার ভালো লাগলে বই কেনা হতো।

কিছু কিছু পাঠাগারের নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্র ছিলো। এসব মুদ্রণালয়ে বইয়ের রোল তাকে, দেয়ালের খোপে অথবা বাক্সে সংরক্ষিত থাকতো। অনেক সময় লেখকের ছবি মুদ্রণালয়ের কাঠের কেসের উপর খোদাই করা থাকতো অথবা বাক্সের উপর লেখকের অর্ধবক্ষ মূর্তি বসানো থাকতো। ইয়ংগর প্লিনি শয়ন ঘরের দেয়ালে বুককেস স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে মঠে এ পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছিলো। রোমান সভ্যতার পতনের পরে বাইজেনটাইন সভ্যতার উদ্ভব হয়। কনস্টানটিনোপলের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট ১ম কনস্টানটাইন ৪র্থ শতকে কনস্টানটিনোপলে ৬ হাজার পুস্তকের একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এখানে লক্ষাধিক পুস্তকের সমারোহ হয় এবং স্থানটি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উন্নীত হয়।

মধ্যযুগে মুসলমানরা অনেকগুলো উৎকৃষ্ট লাইব্রেরী উপহার দিয়েছে। শাসক, খলিফাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অতুলনীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বিত্তবানদের কৃষ্টি প্রীতি, পাঠাগারের প্রতি সার্বজনীন আন্তরিক সম্মান প্রদর্শন এবং বিদ্বান, মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে উচ্চ পারিতোষিকের বিনিময়ে পাঠাগার পরিচালনায় দায়িত্বে নিয়োগের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিলো। উমাইয়া আমলে দামেশকে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন আলকেমী ইত্যাদি বিষয়ের উপর অজস্র বই সমাহারে এক পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। খলিফা মামুনের বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরী ছিলো তখনকার দিনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মিশরের খলিফা আল-আজীজ ১০ম শতাব্দীতে কায়রো নগরকে এক বিশাল লাইব্রেরী দিয়ে স্মরণীয় এবং শোভিত রেখেছিলেন। এর সংগ্রহ অনেকটা অবাক হবার মতো, কারো মতে ১২ লাখ। গজনীর সুলতান মাহমুদ রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘরসহ এক অনন্য পাঠাগার গড়ে তুলেছিলেন। ১১শ শতকে খলিফা আল-হাকীম ১ লক্ষ বইয়ের এক পাঠাগার নির্মাণ করেন। তাঁর ছিলো একটা পুরো কমপ্লেক্স-একাডেমী, অডিটরিয়াম, ‘হাউস অব উইসডম’ নামাঙ্কিত পাঠাগার। দুর্ভাগ্যবশত ১০৬৮ সালে তুর্কী আক্রমণকারীদের দ্বারা এটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বইয়ের ছেঁড়া পাতাগুলো এমনি এক বিশাল স্তুপ সৃষ্টি করেছিলো যার নাম ‘হিল অব বুক্স’ এর নীচে নামানো যায়নি। তবে ঐ ধ্বংস বইয়ের গায়ের, অন্তরের নয় কখনোই। তাই অচিরেই ফাতেমীয় বংশের এক যুবরাজ অক্লান্ত প্রচেষ্টায় অনেক বই সংগ্রহ করে ফেললো। একশত বছর পরে সালাউদ্দিন যখন কায়োরোতে প্রবেশ করেন তাঁকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপনার্থে সোয়া লক্ষ বইয়ের এক পাঠাগার অপেক্ষা করছিলো। দিগ্বিজয়ী মুসলমানরা স্পেন বিজয়ের পরে কর্ডোভাতে চার লক্ষ বইয়ের একটা লাইব্রেরী স্থাপন করেছিলেন। এখানে নাকি ৫০০ কর্মচারী নিযুক্ত ছিলো। ১২৫৮ সালে বাগদাদে ৩৬টা লাইব্রেরীর সন্ধান পাওয়া যায়। স্মর্তব্য, মধ্যযুগে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুসলমানরা বাড়ীতে লাইব্রেরী রাখতেন। অনেকটা রোমান অভিজাতদের কৌলিন্য ক্রয়ের মতো।

এবারে মধ্যযুগের পশ্চিম ইউরোপের পাঠাগারের দিকে তাকানো যাক। এই ইতিহাস চড়াই উৎরাইয়ে যেমন  রোমাঞ্চকর, ফলাফল গুরুত্বে ততোধিক সুদূরপ্রসারী এবং তাৎপর্যমন্ডিত। মধ্যযুগের প্রথম দিকে পাঠাগার ছিলো মূলত গীর্জা সর্বস্ব। ক্যাথিড্রাল এবং ধর্মগৃহেই এর মূল অবস্থান। তখন অবশ্য যাজকেরাই প্রধানত শিক্ষিত ছিলো, যদিও এদের মধ্যেও শিক্ষার হার ছিলো কম। বস্তুত সংগঠিত শিক্ষা ও পাঠাগার শুরু হয সেন্ট বেনিডিক্ট ও ক্যাসিওডেরাসের প্রেরণা ও পরিচালনার দাক্ষিণ্যে। এ আন্দোলনে আয়ারল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। ষষ্ঠ শতাব্দীতে স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে এর বিস্তার হয়। ৭ম শতাব্দীর শেষের দিকে বেভীর প্রচেষ্টায় য্যারো এবং ওয়ারমাউথে পাঠাগার স্থাপিত হয়। সেন্ট বনিফেস ৮ম শতাব্দীতে জার্মানীতে পাঠাগারের জন্ম দেন। অচিরেই ইয়র্কে স্কুল এবং পাঠাগারের আবির্ভাব হয়। মনে হয় এটাই ইতালীর বাইরের সর্বোৎকৃষ্ট পাঠাগার।

ফ্রান্স এবং জার্মানীতে পাঠাগার সম্প্রসারিত হয় ৯ম থেকে ১১শ শতাব্দীতে। অবশ্য বড় লাইব্রেরীর উদ্ভব ১৩ শতাব্দীর পূর্বে হয়নি। ১৫শ শতাব্দীতে পাঠাগারের জন্য বিশেষ কক্ষের ব্যবস্থা চোখে পড়ে। বলা বাহুল্য মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার পুস্তক এবং পাঠাগারের বিস্তারে বৈপ্লবিক গতি দান করেছিলো।

১৩ শ এবং ১৪ শ শতাব্দীদ্বয় অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, প্যারিস, প্রাগ, ভিয়েনা ইত্যাদি স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সাথে বড় লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয়। আরবীয় এবং বাইজেনটাইন লাইব্রেরীর দাক্ষিণ্যে এ্যারিসটটলকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং গীর্জা সর্বস্ব পাঠের গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। ১৫৩৬ থেকে ১৫৪০ সালের মধ্যে গীর্জা পাঠাগারের বিনাশ এবং ১৫৫০ সালে শুদ্ধিকরণের নামে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারগুলোর ধ্বংস সাধন হলে বই এবং পাঠাগারের অপুরণীয় ক্ষতি হয়।

রেনেসাঁ কালে ইতালীতে মানবতাবাদের উদয়ের সাথে সাথে পুস্তক সংরক্ষণের চেতনার উন্মেষ হয়। পেট্রার্ক এবং  বোকাকিও জ্ঞানীদের পাঠাগারের প্যাটার্ন সূচনা করেন। বিত্তবানরা পাঠাগারের প্রতি অনুরাগী হয়। ফ্লোরেন্স বইয়ের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ভেসপাসিনো মোটামোটা বই প্রকাশনা করেন। ১৩শ শতাব্দীতে ফ্রান্সের সরবোনে বড় বড় পাঠাগার দেখা যায়। ১৪শ শতাব্দীতে ৫ম চার্লস ল্যুভারে বিশাল পাঠাগার গড়েন। পোপ অষ্টাদশ জনের প্যাপাল পাঠাগার, ভ্যাটিকান পাঠাগার, প্রাগের ও ভিয়েনার পাঠাগার, মিউনিসিপ্যাল ও আধা-মিউনিসিপ্যাল পাঠাগার উল্লেখযোগ্য।

রিফরমেশনকালে পুরনো পাঠাগারগুলোর বিনাশ ঘটলেও জার্মানীর শহরে শহরে লাইব্রেরীর সম্প্রসারণ বিপুলভাবে উৎসাহিত হয়। ১৫২৪ সালে লুথারের নির্দেশে বড় বড় শহরে লাইব্রেরী স্থাপনের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য হয়ে পড়ে।

রেনেসাঁকালে ইংল্যান্ড ক্লাসিক্যাল পাঠের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলো। ইতালি থেকে অনেক বই এখানে আমদানী হয়। এলিজাবেথীয়ন যুগে প্রত্মতত্ত্ববিদ্গণ ধ্বংসপ্রাপ্ত গীর্জা পুস্তকের পুনরুদ্ধার কাজে সফল হয়েছিলো। বই এবং পাঠাগার সংরক্ষণের প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গণিত, জরিপবিদ্যা, মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি পাঠকের নতুন আগ্রহ জন্মে। একালে জ্ঞান সাধনা এবং পাঠাগারের প্রসারে সর্বাধিক অবদান যুগিয়েছে- (ক) পার্চমেন্টের পরিবর্তে সস্তা কাগজের প্রচলন এবং (খ) টাইপের আবিষ্কার। এসবের সমন্বিত ফল-এলিজাবেথীয়ন সাহিত্যের বিকাশ।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠা, যা ঘটেছিলো ১৭শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ১৭৫৩ সালের মধ্যে, লাইব্রেরীর বিবর্তনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মূলত জাতীয় পাঠাগার স্থাপনের তাগিদ এবং ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় কারণ  থেকে এই মিউজিয়ামের জন্ম। এ সময় সমগ্র ইউরোপে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পাঠাগার স্থাপনের একটা প্লাবন বইছিলো। এর রেশ হিসেবে ব্যক্তিগত বিশাল পাঠাগারও সৃষ্টি হয়েছিলো। আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগারের পরে এই প্রথম বই সুবিন্যস্তকরণের তাগিদ আসে। তখনকার দিনে বই ডেসকের উপর শেকল দিয়ে অনুভূমিক সমান্তরাল লাঠির সঙ্গে বেঁধে রাখা হতো। বই যতো বাড়তো, ডেসকও ততো। উন্নতির মধ্যে ডেসকের কাছে জানালা রাখা হতো যাতে প্রয়োজনে বাইরের আলো আমদানী করা যায়। এসকোরিয়াল পাঠাগার ১৮৫৪ সালে শেকল দিয়ে বই বাঁধা পদ্ধতি পরিত্যাগ করে দেয়ালে বসানো কেসের মধ্যে বই রাখার প্রবর্তন করে। কার্ডিন্যাল ম্যাজারিন ১৬৪২ সালে স্বীয় নামাঙ্কিত লাইব্রেরী পরিচালনার দায়িত্বভার নায়ূদের উপর অর্পণ করেন। শেষোক্তজন পূর্বেই পাঠাগার ইকনোমি’ এর উপর বই লিখে নাম করেছিলেন। জন এভিলিন ঐ বইটা ইংরেজীতে অনুবাদ করেন। রেস্টোরেশন যুগে এই বই বিত্তবান সংরক্ষক এবং জ্ঞানীদের উপর প্রবল প্রভাব ফেলেছিলো। ফলশ্রুতিতে ইংল্যান্ডে আধুনিক পাঠাগারের উত্তরণ ঘটলো। পাঠাগার সুসংগঠিত ও পরিচ্ছন্ন হলো। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়াধীন ম্যাগডালোন কলেজ পাঠাগার এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ভারত উপমহাদেশ প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি। অতীতকাল থেকেই এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সাথে সাথেই পাঠাগারের বিকাশ এবং সমৃদ্ধি হয়েছে। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পার ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রচুর সীলমোহর পাওয়া গেছে। প্রাচীন ভারতে মন্দির, মঠে পাঠাগার ছিলো। রাজন্যবর্গ, পন্ডিতজন-রাজকীয় এবং ব্যক্তিগত পাঠাগার সংরক্ষণ করতেন। নালন্দা, তক্ষশীলায় তৎকালের শ্রেষ্ঠ পাঠাগার অবস্থিত ছিলো। পাঠাগারগুলো মূলত বৌদ্ধ ধর্ম পুস্তক সমৃদ্ধ হলেও এসবে অন্যান্য বিষয়ের উপরে মূল্যবান পুস্তক মজুত থাকতো। কার্জনের শাসনামলে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী স্থাপিত হয়। উইলিয়ম জোনাসের প্রচেষ্টায় ‘রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ‘ম্যানুসক্রিপট লাইব্রেরী’ স্থাপন ভারতের পাঠাগারের ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য দিক। এ প্রসঙ্গে তাঞ্জোরের সরস্বতী মহল লাইব্রেরী (১৮০০০ বই), হায়দ্রাবাদের সফদর জং লাইব্রেরী, পাটনার খোদা বকস লাইব্রেরী, কোলকাতার বোহার লাইব্রেরী ইত্যাদি স্মরণীয়। এসব লাইব্রেরীতে প্রচুর পরিমাণে সংস্কৃত, আরবী, ফারসী পান্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিলো। এগুলো জনগণের জন্য খোলা থাকতো। ব্যক্তিগত সংগ্রহের দিক  থেকে ত্রিবাঙ্কুর, উদয়পুর, মহীশূরের মহারাজাদের নাম উল্লিখিত আছে। তবে এসব লাইব্রেরীতে জনসাধারণ প্রবেশ করতে পারতো না। ভারতের জৈন ধর্মশালাগুলোতেও পাঠাগারের সংযোজন ছিলো। তবে সম্ভবত সেগুলো ক্যাটালগসম্পন্ন ছিলো না। ১৯৪৮ সালে কোলকাতার গভর্নর জেনারেলের বাসভবনে অবস্থিত ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী জাতীয় লাইব্রেরীর নামধারণ করে। ১৯৫৪ সালে এটাই ভারতের ডিপোজিট লাইব্রেরীতে পরিণত হয়।বর্তমান সময়ে বিশ্বে পাঠাগারের কলেবর বিস্ময়করভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

উত্তরাধিকারসূত্রে, বাংলাদেশ কিছুসংখ্যক পাঠাগার লাভ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারসহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি মোটামুটি আকারের পাঠাগার অবস্থিত। পাঠাগারের প্রাচীনত্বের দিকে থেকে বাংলাদেশ উপক্ষিত নয়-এক শ’ বছর পাড়ি দেয়া পাঠাগারগুলোর মধ্যে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার (১৮৮৪), পাবনা অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী (১৮৯০), রাজশাহী শাহ মখদুম ইন্সস্টিটিউ ও সাধারণ গ্রন্থাগার (১৮৯১) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দেশের গ্রন্থাগারের সংখ্যা, এর ভবন, আনুষঙ্গিক ভৌতিক সুবিধাদি, পাঠাগারের প্রশাসন ব্যবস্থা, পাঠাগারের প্রতি পাঠকের আগ্রহ, সরকারী এবং বেসরকারী আর্থিক আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি, দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়েই বলতে হয়, মোটেই সন্তোষজনক নয়। অধিকাংশ লাইব্রেরীই মান্ধাতার আমলের বিধিব্যবস্থায় ক্লিষ্ট, দেশের কোন পাঠাগারকে প্রকৃত অর্থে আধুনিক পাঠাগার হিসেবে গণ্য করা যাবে কিনা, সংশিষ্ট বিশারদরা বলতে পারেন। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৭-৮৮ সালে বাংলাদেশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ব্রিটিশ লাইব্রেরী উপদেষ্টা স্টিফেন পার্কারের নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশের লাইব্রেরী জরিপ প্রতিবেদন প্রণিধানযোগ্য। কিছুটা আশার কথা, দেশের পুস্তক ও প্রকাশনার শিল্পের মানোন্নয়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে পুস্তকের প্রসার, পুস্তকের মূল্য মানুষের ক্রয় সীমার মধ্যে রাখা, জনগণকে পাঠাগারমুখী করে তোলার মহান ব্রত নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বিদ্যমান আছে। এর অধিকতর সক্রিয়তা আবশ্যক। তবে ‘৯০ এর ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে স্বৈরতন্ত্রের পতনের পরে দেশে যে গণতান্ত্রিক আবহ প্রক্রিয়াধীন আছে তার বিকাশের জন্য ন্যূনতমকাল অতিক্রান্ত হবার পূর্বে বাংলাদেশের পাঠাগারের প্রকৃত প্রকৃতি-পরিচয়ের মূল্যায়ন সঙ্গত নয়।

আদিকালে গ্রন্থাগার বলতে বোঝা যেতো শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা। তারপরে এরসঙ্গে যুক্ত হলো গবেষণাকক্ষ, জাদুঘর, অডিটোরিয়াম ইত্যাদি। আর আজ বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে পাঠাগার হলো এক দিগন্ত প্রসারী, সর্বগ্রাসী কমপিউটরাইজড কমপ্লেক্স- যেখানে বই পত্র-পত্রিকা সংরক্ষণের সাথে সাথে রেডিও, টেলিভিশন, ভি-সি-আর, টেপ, ফিল্ম, মাইক্রোফিল্ম কমপিউটার, ফ্যাক্স প্রভৃতি সহস্র ধারার তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণকারী অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সেবাদাসরূপে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকবে। তবে আজকের দিনের লাইব্রেরীর পরিধি বেড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে জটিলতাও। যন্ত্রপাতির ব্যয়, দক্ষ লোকের প্রয়োজন, আন্ত পাঠাগার সহযোগিতার প্রয়োজন সবই যেন সীমাহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য এক প্রাণান্তকর অবস্থা। প্রকৃতপক্ষে, উন্নত দেশসমূহের পাঠাগার এখন শুধু অত্যাধুনিকই নয়, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাকরুদ্ধকরও বটে।

          পাবনা অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীর শতবর্ষ পূর্তি গ্রন্থ থেকে সংকলিত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।