দৃষ্টি আকর্ষণ : লেখাটি দুই বছর আগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশ হয়েছিল। পাবনার ১৯৮ বছরে এসে সেই লেখার তৃতীয় পর্ব।

মোসতাফা সতেজ
পাবনা প্রাচীনযুগে পুর্ব ভারতের বঙ্গ ও পুন্ড্রর্বধন প্রদেশদ্বয়ের অংশ ছিল বলে ইতিহাসে জানা যায়। তবে এ জেলায় বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতির ইতিহাস সম্বন্ধেও খুব বেশি জানা যায় না। ১৯০৫ এ স্বদেশী আন্দোলনের সময় পাবনা শহরে গড়ে ওঠে হোসিয়ারী শিল্প। ব্যবসা প্রসার লাভ করে। এখানকার তৈরি গেঞ্জি ও মোজার সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ছিল দোগাছির শাড়ি ও ধুতি। পাবনা পরিচিতি পেতে থাকে শিল্পের শহর হিসেবে। শিল্প মানচিত্রেও স্থান করে নেয়। ১৯১৯ সালে অসহযোগ আন্দোলনে বিদেশি পণ্য বর্জনে দেশিয় শিল্প পুনরুজীবিত হতে থাকে। সে সময় জেলার ঘরে ঘরে চরকা ও তকলীর মাধ্যমে সূতা কাটা ও খদ্দর পরার ঢেউ ওঠে। ফ্যাশনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। রজনীকান্ত সেন দেশের গান লিখতে থাকেন। যা শ্রোতা প্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২২ এর ২৭ জানুয়ারি উল্লাপাড়া থানার সলঙ্গাহাটে পুলিশ আন্দোলনরতদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। কয়েক জন যুবক প্রাণ হারান। তখনও ঘোড়ায় টানা পালকি গাড়ি থেকে টমটম ব্যবস্থা যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। ৫০ দশকে টমটমের বদলে চালু হয় রিকশা।
১৯১৫ সালের দিকে শহরে প্রথম মটর গাড়ি অর্থ্যাৎ যাত্রী পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন বিশ্বাস এন্ড কোম্পানী। পরে সাবিত্রী, অলকা, নুরজাহান, ঘোষ, পথের সাথি প্রভূতি নামের বাস চালু হয় বলে জানা যায়। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূব পাকিস্তান সরকার বেসরকারি পাওয়ার হাউজ ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন অধিহগ্রহণ করে। ১৯৪৮ এ টেলিফোন চালু। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পরও জেলাবাসী জাতীয় ও স্থানীয় গণ আন্দোলনে অংশ নেন। দেশ ভাগের পর ২০ হাজারের বেশি মাহাজির শহরে ও রেলওয়ের বসতি এলাকায় আশ্রয় নেয়। আসাম ও পশ্চিম বাংলা থেকে তারা আসতে থাকে। শহরে ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় পাঠাগার। যার নাম অন্নদা গোবিন্দ। ১৯৬২ সালে বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হয় ঈশ্বরদী থানায়। ১৯৬৪ তে নগরবাড়ী ফেরিঘাট। ১৯৬৭ সালে পাবনা-ঈশ্বরদী-নগরবাড়ী ঘাট পর্যন্ত সরকারি বাস সার্ভিস উদ্বোধন। ১৯৬৮ সালে ১৮ একর জমির ওপরে ১শ শয্যার পাবনা সদর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৫৭ সালে মানসিক হাসপাতাল চালু করা হয়। ১৯৬৭ সালে ভুট্টা আন্দোলন। সমগ্র জেলায় সরকার গম ও ভুট্টা ভাঙানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সান্ধ্য আইন জারি। চলে নির্বিচারে গ্রেফতার। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট দেশ ভাগের ২৪ বছর পর এসে গেল স্বাধীনতার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শুরু হয় নতুন অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে পাক ইতিহাসের অবসান ঘটে, শুরু হয় বাংলাদেশের পথ চলা।

উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী সম্পদ : হিংস্র প্রাণী নিধনে ব্রিটিশ সরকার যে জেলায় পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, ভারতের রাজ প্রতিনিধি লর্ড মেয়ো যে জেলায় শিকার করতে এসেছিলেন, যে জেলায় এখনো অজগর সাপ আর মোছো বাঘ মারা হয় সেই জেলার জীববৈচিত্র ছিল ভরপুর। বন্য প্রাণীর আক্রমনে দেড়শ বছর আগে পাবনায় বছরে অসংখ্য ব্যক্তি হতাহত হতেন। ডাবলিউ ডাবলিউ হান্টারের গ্রন্থে লেখা রয়েছে, ১৮৬৯ সালে ৫৩ জন মারা যায়। ১৮৭২ এ বেড়ে দাঁড়ায় ১৬২ জনে। ১৮৭৪ এ আরও বেড়ে ২১৪ জন হয়। এ বছর বন্য প্রাণীর দংশনে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সাহায্যের জন্য বৃটিশ সরকার ১৪৩ টাকা ব্যয় করে। কেবল মাত্র সর্প দংশনে মৃত্যুর হার ছিল ৫৯ জন। তাই সরকার থেকে প্রতিটি বাঘ ১০ টাকা, চিতাবাঘ নিধনের জন্য ৫ টাকা হারে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
১৮৭৫ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিটি গোখরা সাপের জন্য সরকার থেকে ৪ আনা হারে পুরস্কার দেয়া হয়। পরের বছর এখাতে ব্যয় হয় সর্বমোট ২২ টাকা। কয়টা সাপ, কয়টা বাঘ নিধন করা হয় তা তিনি উল্লেখ করেন নি। ২০০৭ এ চরতারাপুর ও সাদুল্লাহপুরে কয়েকজন সর্প দংশনে নিহত হয়। এ তথ্য সরকারি ভাবে রেকর্ড করা হয়নি। তৎকালিন সময়ে জেলার জমিদারেরা পশু শিকারের জন্য হাতি পালন করতেন। বাঘ, ভাল্লুক, ও বন্য শুকুরের সংখ্যা ছিল বেশি। তাই ইউরোপিয়ানেরাও এ সকল প্রাণী শিকার করে আনন্দ উপভোগ করতেন। বন্য প্রাণীর হামলা আতংকে সন্ত^স্ত্র মানুষ কিভাবে সর্তকতা অবলম্বন করত তা ইতিহাসে সঞ্চিত আছে। নদী ও বিলে অতিথি পাখি আসত হাজারে হাজার। ঐতিহাসিক এল এস এস ও ম্যালির লেখা বেঙ্গল ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ার পাবনা গ্রন্থে উল্লেখ আছে, শহরের উপকন্ঠে একটি শুকর ও চিতা বাঘ আতংকের কারণ ঘটিয়েছিল। বুনো শুকর ও চিতা বাঘ এ জেলায় অসংখ্য পরিমাণে দেখা যায়। জেলার উত্তর ও পশ্চিমের ঝোপ ঝাড়ে মাঝে মাঝে নেকড়ে নজরে পড়ে।

এছাড়া সর্বত্র শিয়াল, ধূসর বেজি, খেকশিয়াল, খরগোস, কাঠবিড়ালী এবং দু ধরনের উদবিড়াল (ভোঁদড়) দেখা যায়। পদ্মা নদী ও খালে বিলে রকমারি বক, চখা, বেঙ্গী হাঁস, বেলে হাঁস, দিগর হাঁস, চিনা হাঁস, ধূসর পায়ী রাজহাঁস, ডোরা মাথার রাজহাঁস, নারকেলি হাঁস, অলস হাঁস, পোচার্ড হাঁস, লালপেয়ে হাঁস বড় ধরনের বুনো হাঁস, ছাপযুক্ত ঠোঁটঅলা হাঁস, ডুবো হাঁস ও বালিহাঁস ভেসে বেড়াত। এছাড়া লম্বা পা অলা বক, জলচর, পানকৌড়ী, লম্বা গলার সামুদ্রিক পাখি, নানা রকম মাছ রাঙা, তিতির, সবুজ পায়রা, ধূসর কোয়েল, কয়া প্রভৃতি।
পদ্মা ও যমুনা নদীতে দেখা যেত কুমীর, শুশুক, হরিয়াল, বাশিয়াল, বড় বড় কচ্ছপ, কাঁকড়া প্রভৃতি। অপর দিকে সাপ ছিল সর্বত্র। নানা জাতীয় গোখরা, দাঁড়াস, বোরো, ঘর মোহিনী, সখিনী কেউটা, লাউজান, চন্দ্রবোড়া, ধোড়া প্রভৃতি। আরও ছিল অজগর যা ছোট ছোট ছাগল ও বাছুর পর্যন্ত গিলে খেয়েছে। আর ছিল গুঁই সাপ। বন্যপ্রাণী সম্পদে পাবনা ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। জেলায় সর্বত্রবাঁশ ঝাড় ছিল। বেত ঝোপ ছিল। ছিল ছন। যা ক্রমশ উজাড় হওয়ায় অরণ্যক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে গেছে। অথচ জেলার অন্যতম এবং গর্বিত সম্পদ ছিল বুনোমহিশ ও হরিণ। বন্য শুকুর শিকার একটি উত্তেজনাকর ক্রীড়া হিসেবে বিবেচিত হতো। বিশেষত পর্যটক ও ইউরোপিয়ানদের কাছে এটি একটি চমৎকার ক্রীড়া ও বিনোদন ছিল। জেলায় এত বেশি বাঘ ও চিতা ছিল যে মানুষ দিনের বেলা সাধারণ কাজ কর্ম করতে পারত না। প্রায় প্রতিদিনই বাঘ ও সাপের ছোবলে প্রাণ হারাত মানুষ। ১৮৭১ সালে শীতকালে ভারতের রাজ প্রতিনিধি লর্ড মেয়ো সুজানগরে এসেছিলেন শিকার উপলক্ষে। তখন শীতকাল। তাকে অমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সুজানগরের তাঁতিবন্দের জমিদার বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী। তাড়াশ থেকে জমিদার বনওয়ারি লাল ফরিদপুরে শিকারে আসেন। মুগ্ধ হন প্রাকৃতিক পরিবেশ আর জীববৈচিত্র্য দেখে।