অরুণ কুমার বসাক

[লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রথম বর্ষ ৫ম সংখ্যায় (১৪ এপ্রিল ২০২৪) প্রকাশ হয়েছিল]

পিন্টু রঞ্জন অর্ক 

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে তাঁর। তারপর প্রার্থনা সেরে উঠে যান বাসার ছাদে। সেখানে হরেক রকম ফুল-ফল ও ঔষধি গাছের বাগান। সেগুলোর পরিচর্যা করেন। এরপর নাশতা সেরে তৈরি হয়ে কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়মুখো হন। ঘড়ির কাঁটা তখন বড়জোর সাড়ে ৮টার ঘরে।

কর্মনিষ্ঠ এই মানুষটির নাম অরুণ কুমার বসাক। জীবনযাপনের বিবরণ শুনে বোঝাই যাবে না আগামী অক্টোবরে ৮৪ বছরে পা দেবেন। দেশের বিশিষ্ট একজন পদার্থবিজ্ঞানী তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস প্রফেসর। পদার্থবিজ্ঞানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রফেসর ইমেরিটাস বাসা থেকে ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। কিছুদিন আগেও এই পথটা হেঁটেই  যেতেন। এখন লম্বা সময় ধরে হাঁটা নিষেধ বলে রিকশায় চড়তে হয়। কাজে রওনা হওয়ার সময় সঙ্গে থাকে দাপ্তরিক কাগজপত্র ছাড়াও কুকুর-বিড়ালের খাবার। সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের (প্রথম বিজ্ঞান ভবন) ১০৬ নম্বর কক্ষই তাঁর গন্তব্য। ভবনটির সামনে নিত্যদিন তাঁর অপেক্ষায় থাকে চার-পাঁচটি কুকুর। সেগুলোকে কাটা মাছের উচ্ছিষ্ট, বিস্কুট, পাউরুটি খাইয়ে তার পর প্রবেশ করেন নিজের কক্ষে। সেখানে জানালায় এসে বসা শালিক, পায়রা, দোয়েল, ঘুঘু, চড়ুইকেও খাবার দেন। দিনের বাকিটা সময় ল্যাবে কাটে। বাসায় ফিরতে ফিরতে  বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়।

সদা হাস্যোজ্জ্বল অরুণ কুমার বসাক। কয়েক বছর আগেই আশির ঘরে যাত্রা শুরু হলেও মনে-প্রাাণে আজও যেন ১৮ বছরের তরুণ এই অরুণ কুমার বসাক। এখনো নিজের কাজ নিজেই সামলান। সহকর্মী অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ শামস বিন তারিক বললেন, ‘এখনো সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত স্যারের ল্যাব খোলা থাকে। নিভৃতে গবেষণা করে যাচ্ছেন। এ যুগে এমন শিক্ষক বিরল।

ড. অরুণ বসাক এ বিষয়ে বললেন, ‘শিক্ষকতায় এসেছি জ্ঞান তৈরির জন্য, দলাদলির জন্য নয়। ছাত্রছাত্রীদের হাতে আলোর মশাল জ্বালিয়ে দেওয়াই আমার কাজ।’

‘যাও, ক্লাস নাও!’

অরুণ কুমার বসাকের জন্ম পাবনায় ১৯৪১ সালে। বাবা হরিপদ বসাক, মা ঊষা রানী বসাক। পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে মেট্রিক (বর্তমানের এসএসসি) পাস করে ১৯৫৭ সালে ভর্তি হন এডওয়ার্ড কলেজে। ১৯৫৯ সালের উচ্চ মাধ্যমিকে বোর্ডের সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় হয়েছিলেন। রাজশাহী কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। মাস্টার্স করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ভালো ছাত্র হিসেবে ক্যাম্পাসে বেশ সুনাম ছিল। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ভালো করবেন বলে বিশ্বাস ছিল বিভাগের শিক্ষকদের। যে কারণে এমএসসি ফাইনালের ফল প্রকাশের ঠিক পরদিনই অরুণকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ক্লাস নিতে। স্মৃতি হাতড়ে ড. অরুণ বললেন, ‘এমএসসি ফাইনালের আগে আহমদ হোসেন স্যার একটা ফরম দিয়ে ফিলআপ করতে বললেন। বললাম, স্যার, আমি তো এমএসসি পরীক্ষা দিইনি। স্যার বললেন, এই অংশটা খালি রাখো, অন্যগুলো ফিলআপ করে আমাকে দাও।’

অনার্সের মতো মাস্টার্সেও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলেন অরুণ। ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে ফল প্রকাশের ঠিক পরদিনই হাতে নিয়োগপত্র দিয়ে সেই আহমদ হোসেন বললেন, ‘যাও, ক্লাস নাও!’

সহপাঠীরাও ছাত্র

প্রথম দিকে অরুণকে এমএসসি ফাইনালের দুটি কোর্স দেওয়া হয়েছিল। সপ্তাহে থিওরির ক্লাস ছয়টি। প্রথম দিন দুরু দুরু বুকে ক্লাসে ঢুকলেন। দেখলেন, উপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী। তারা অরুণের মাত্র এক বছরের জুনিয়র। বাকিরা হয় তাঁর সহপাঠী, নয়তো সিনিয়র!

কিছুটা ভড়কে গেলেও পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিকই পড়ানো শুরু করলেন। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলেন। তাদের অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পেরেছিলেন। কোনোটার উত্তর দিতে না পারলে বলতেন, ‘আজকে জবাব দিতে পারব না, পরবর্তী ক্লাসে চেষ্টা করব।’ পরের ক্লাসে ঠিকই সেই প্রশ্নের উত্তর দিতেন।

ড. অরুণ বললেন, ‘তখন নিজেকে শিক্ষক নয়, কর্মশালার পরিচালক হিসেবে ভাবতাম। তখন

ক্লাস ছিল খুব ইন্টারেক্টিভ। আদান-প্রদান চলত। শিক্ষার্থীরা অনেক প্রশ্ন করত। এখন সেটা একেবারেই কমে  গেছে।’

বাধা পেরিয়ে বিদেশযাত্রা

মাস্টার্সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদে সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। তার সুবাদে লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেলেন ১৯৬৫ সালে। কিন্তু যাওয়া হয়নি। রাজনৈতিক কারণ  দেখিয়ে বিমানে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তান সরকার তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করল। এর পর থেকে প্রতিবছরই বৃত্তি  পেলেও পাসপোর্ট জব্দ থাকায় আর বিদেশে যেতে পারেননি। এতে খুব মন খারাপ হলেও কর্তব্যে অবহেলা করেননি। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক তখন মোটে পাঁচ-ছয়জন। অন্যদের সঙ্গে মিলে বিভাগটিকে গড়ে তুলতে মন দিলেন। পুরো সায়েন্স ফ্যাকাল্টির প্রথম পিএইচডি হয়েছিল তাঁদের ওখানেই। স্বাধীনতার পর কমনওয়েলথ  পোস্ট গ্রাজুয়েট স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে ১৯৭২ সালে ইংল্যান্ড গেলেন। গন্তব্য বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি।  ছোটখাটো গড়নের বাদামি চামড়ার মানুষ। তা-ও আবার গেছেন সদ্য স্বাধীন একটা দেশ থেকে। তাই প্রথমে  সেখানে খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হতো না অরুণকে! তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কাজের মাধ্যমে এই অবহেলার জবাব দেবেন। প্রথম বছর বাসা আর বিভাগের অফিস ছাড়া কোথাও যেতেন না। পড়াশোনাতেই ডুবে থাকতেন। ফলও পেয়েছিলেন হাতেহাতে। প্রাক-পিএইচডি পরীক্ষায় এলো সর্বোচ্চ নম্বর। গবেষণার বিষয় ছিল,  ‘পোলারাইজড ডিউটেরন’। ‘নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ ও ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’র মতো নামকরা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর গবেষণা নিবন্ধ। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান এসে পিঠে হাত রেখে খুব প্রশংসা করলেন। পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক ড. জেএআর গ্রিফিথ একদিন খবর দিলেন, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন অরুণ।

দেশের টানে বিদেশি চাকরি ত্যাগ

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি হওয়ার পর একসময় রিসার্চ ফেলো (লেকচারার) হিসেবে চাকরি হলো তাঁর। কিন্তু বছর না ঘুরতেই অরুণের মনে হলো, ‘বিদেশে কেন থাকব? দেশের জন্য আমার কিছু করার আছে।’  দেশে চলে আসবেন শুনে সেখানকার সবাই বলল, ‘তোমাদের উপমহাদেশের সবাই তো এখানেই থাকতে চায়।  দেখছি তুমিই কেবল আলাদা। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইংল্যান্ড ছেড়ে দেশে ফিরেছেন দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদেরও অনেকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো পাগল। এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে?’

তাঁর হাত ধরেই কম্পিউটার সেন্টার

অরুণ কুমার বসাক ১৯৮৪ সালে হন অধ্যাপক। পরের বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন কম্পিউটার  সেন্টার। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগের বার্ষিক প্রতিবেদন আগে হাতে লেখা হতো। কিন্তু দেশে প্রথমবারের মতো কম্পিউটারে ই-অ্যাকাউন্টস করে সেবার ইউজিসিতে হিসাবের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এর নেপথ্য কারিগর ছিলেন ড. অরুণ।

১৯৯০ সালে ডাক পড়ল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ভিসি অধ্যাপক ড. সদরুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী ছিলেন অরুণের সরাসরি শিক্ষক। তাঁর অনুরোধে ১৯৯০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছরের ছুটি নিয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে গিয়েছিলেন সেখানে। সেখানকার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। প্রথম কম্পিউটার সেন্টারও তৈরি হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই।

বিদেশেও পড়িয়েছেন

তাঁর তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত পিএইচডি বিশ্বমানের। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. নুরে-আলম আবদুল্লাহর পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অরুণ। তাঁর থিসিস দেখে এক্সটার্নাল (বহিরাগত) পরীক্ষক প্রফেসর ড. জিসি মরিসনের মন্তব্য ছিল, ‘এটা পিএইচডি-কাম-লউডের (খধফব) সমতুল্য।’ উল্লেখ্য, কোনো গবেষক যদি অসাধারণ ভালো করেন তখন তাঁকে ‘পিএইচডি কাম লউডে’ ডিগ্রি প্রদান করা হয় ।

অনেকবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছেন অরুণ। চাইলেই উন্নত বিশ্বে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে দিতে পারতেন জীবন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তবে ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে।

ভুল করেছেন তা মনে করেন না

নিজেকে এখনো ছাত্র ভাবতেই পছন্দ করেন অরুণ কুমার বসাক। বললেন, ‘আমি নিজেকে একজন বৃদ্ধ ছাত্র বলে মনে করি। কারণ, শেখার কোনো শেষ নেই।’ ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার, ফিজিক্যাল রিভিউ এ ও সি, জার্নাল অব ফিজিক্স জি, নিউক্লিয়ার ফিজিক্সসহ এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত জার্নালে তাঁর শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এখন গবেষণা করছেন নিউক্লিয়ার অ্যাস্ট্রো-ফিজিক্স নিয়ে।

‘ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স, লন্ডন’ ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স’ ও ‘বাংলাদেশ ফিজিক্যাল সোসাইটি’র আজীবন সদস্য এবং আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি’র সদস্য ড. অরুণ। পেয়েছেন ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স’ স্বর্ণপদক। তাঁর নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক ‘বসাক পুরস্কার ও বসাক বৃত্তি’ রয়েছে।

এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদকের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবে এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে?- এমন প্রশ্নের জবাবে মৃদু হেসে ড. অরুণ বললেন, ‘পুরস্কারটা আসলে আমার জন্য না। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটা পেলে বিলাত থেকে দেশে ফেরার পর আমাকে যারা পাগল বলেছিল তাদের অন্তত বলতে পারব, দেশে ফিরে আমি ভুল করিনি।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।