মারুফ হোসেন
ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল শহর। ৫৬৫ বর্গমাইল ঢাকায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করে। রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ। রাস্তায় মানুষ, গাড়ির হর্ন, ভিড়- অতিষ্ঠ এই যান্ত্রিক শহর থেকে মুক্ত হতে এবার ঘুরে এলাম বান্দরবানের বগালেক, কেউক্রাডাং ও সুনসাং পাড়া।
আমাদের ভ্রমনের সহযাত্রী আমরা ৭ জন। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বৃহস্পতিবার রাত ১১ টার বাসে আমরা ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দেই। শুক্রবার সকাল ৮ টায় বান্দরবান বাসস্ট্যন্ড নেমে একটা রেস্টুরেন্টে ফ্রেশ হয়ে বগালেক, কেউক্রাড়াং, সুনসাং পাড়া যাওয়ার জন্য চাঁদের গাড়ি ভাড়া নেওয়ার খোঁজ করতে থাকি। কেউক্রাডাং যাওয়ার জন্য এখানে একটা কাউন্টার আছে, যেখান থেকে চাঁদের গাড়িগুলো ভাড়া পাওয়া যায়। মোটামুটি দামাদামি করে ১৭ হাজার টাকায় একটা চাঁদের গাড়ি ভাড়া নেই দুদিনের জন্য। চাঁদের গাড়ি বলতে মুলত ৪ চাকায় শক্তি আছে এমন গাড়ি, যা পাহাড়ে চলাচল করে। আমাদেরটা মূলত ল্যান্ড ক্রুজার মডেলের।
সবার ব্যাগপত্র ল্যান্ডক্রজার গাড়ির পেছনে রেখে আমাদের প্রথম গন্তব্য রুমা বাজার পর্যন্ত। শুরু হলো আমাদের পাহাড়ি পথ চলা। বান্দরবান শহর পার হতেই চোখে পড়লো পাহাড় আর পাহাড়। আমাদের গাড়ি এঁকে বেঁকে চলছে। ঘণ্টা দুয়েক পরে আমরা পৌঁছে যাই রুমা। প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে ঢুকে সকলের আইডি কার্ড দিয়ে নাম ঠিকানা এন্ট্রি করতে হয়। নাম ঠিকানা এন্ট্রি করার পরে ওই ওয়েবসাইট থেকে একটা টোকেন প্রিন্ট করে জমা দিতে হয় এবং ওই টোকেনের একটা কপি নিজের কাছে রাখতে হয়। সকলের নামে আলাদা আলাদা টোকেন থাকে। এরপরে আমরা ওই টোকেন নিয়ে পৌঁছে যাই রুমা বাজারে। সেখানে একটি বুথ আছে, যেখান থেকে গাইড ভাড়া করতে হয়। আমরা দেখেশুনে ১৬০০ টাকা দিয়ে দুদিনের জন্য লিটন দাস নামের একজন গাইড ভাড়া করি। রুমা বাজারে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেই। বাজার থেকে কলা পেঁপের পরে চা পান করে আমরা একটু বিশ্রাম নেই। গাইডকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের শুরু হয় বগা লেকের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

রুমা থেকে বগা লেকের দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার। এই যাত্রা অনন্য সুন্দর ভয়ংকর এক যাত্রা। এক ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছাই মুনলাই পাড়ায়। পরিস্কার পরিছ্চন্ন অসাধারণ এক পাহাড়ি গ্রাম। এখানে কিছু খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করি পথ চলা। একপাহাড় থেকে আরেক পাহাড় আমাদের ল্যান্ডক্রুজার এগিয়ে চলছে। কখনো পাহাড়ের উপরে উঠছি আবার কখনো পাহাড়ের নিচে নামছি। ঘণ্টা দুয়েক পরে আমরা পৌঁছে যাই বগালেকে।
চারপাশে পাহাড় মাঝখানে বৃহৎ লেক। পাহাড়ের উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে যখন হঠাৎ চোখের সামনে নীলচে পানির বিশাল একটি লেক দেখতে পেলাম, তখন দীর্ঘ পথের ক্লান্তি যেনো মুহূর্তেই দূর হয়ে গেলো। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন বগালেক কটেজে আমরা একটা রুম ভাড়া করে রেখেছিলাম ৩ হাজার টাকায়। এক রুমে আমরা সাতজন। ঢালাও বিছানা। সারাদিনের ক্লান্তি গাড়ির ঝাকুনি, সবার শরীর ভীষণ রকমের ক্লান্ত। পাশের একটা রেস্টুরেন্টে গাইড রাতের খাবার অর্ডার করলো। রাত ৮ টায় খাবার দেবে, জন প্রতি ৪০০ টাকা : মুরগির মাংস, ভাত, ভর্তা ও সবজি। গাইড ড্রাইভারসহ আমরা ৯ জন। এখানে সব খাবার হোটেলেই অর্ডার করার পরে রান্না শুরু করে। আমাদের রুমটা ঠিক লেকের সামনে। রুমে ব্যাগপত্র রেখে নেমে পড়ি স্বচ্ছ পানির লেকে।
বগালেক বাংলাদেশের বান্দরবান পার্বত্য জেলার একটি অন্যতম প্রাকৃতিক পর্যটন স্থান। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ বগালেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই লেকটি তার নীলাভ পানি, চারপাশের সবুজ পাহাড় এবং মেঘময় পরিবেশের জন্য বেশ পরিচিত। বগালেক কেউক্রাডাং-এর বেজ ক্যাম্প স্বরূপ। কেউক্রাডাংয়ে অল্প কিছু থাকার কটেজ আছে, সেটা আবার পাওয়া মুশকিল। সেজন্য অধিকাংশ পর্যটক বগালেকে রাত্রিযাপন করে। বগালেকের চারপাশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে মেঘের খেলা এবং শান্ত লেকের পানির দৃশ্য আমাদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করলো। চারদিকে সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা, আর নীরব প্রকৃতি- সব মিলিয়ে বগালেকের পরিবেশ অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি করে। বিকেলে পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য বেশ আকর্ষণীয়।
শিতল স্বচ্ছ জলে গা ভিজিয়ে চলে আসি রুমে, ততোক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। খাবার খেয়ে আমরা হাঁটতে বের হই। ছোট্ট জায়গা, চারপাশে পাহাড়, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। রাস্তার দুপাশে থাকার জন্য কাঠের তৈরি কটেজ ও কিছু দোকানপাট। প্রচুর পাহাড়ি ফল পাওয়া যায় এখানে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই। সোলার বিদ্যুৎ আছে সব কটেজে, রাত ১২ টা পর্যন্ত চলে। বগালেকের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো পাহাড়ি জীবনযাত্রা। আশপাশে বসবাসকারী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন, ঘরবাড়ি, পোশাক, খাবার ও সংস্কৃতি পর্যটকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
রাতের বগালেক অসাধারণ, গভীর রাত পর্যন্ত হাঁটাহাঁটি করে ঘুমিয়ে পড়ি, ভোড়ে উঠতে হবে সুনসাং যাওয়ার জন্য। খুব ভোড়ে উঠে দরজা খুলতেই বগালেকের শান্ত জল, ভোরের কুয়াশা আর মেঘ পাহাড়ের সম্মিলন দেখে বিমোহিত হই। শুরু হলো সুনসাং পাড়ার উদ্দশ্যে যাত্রা, সকাল ৬ টায় আমাদের গাড়ি স্টার্ট দিলো। কেউক্রাডাং ও সুনসান পাড়ার রাস্তা বান্দরবানের পাহাড়ি ভ্রমণের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ। বগালেক পেরিয়ে সামনে এগোতে থাকলে শুরু হয় আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। কখনো খাড়া উঁচু পথ, কখনো সরু রাস্তা, আবার কখনো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া পথ। প্রতিটি বাঁকেই যেনো নতুন কোনো দৃশ্য অপেক্ষা করে থাকে। পথের দুই পাশে ঘন সবুজ পাহাড়, বাঁশঝাড় ও বিভিন্ন পাহাড়ি গাছপালা। কোথাও পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ঝিরি, কোথাও দূরে দেখা যায় একের পর এক পাহাড়ের সারি। কখনও গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন অনুভব করি নিরবতা। চারপাশের নিরবতা এতটাই গভীর যে নিজের হাঁটার শব্দ কিংবা বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনিও স্পষ্ট শোনা যায়। এই নির্জনতার কারণেই সুনসান পাড়ার পথ ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। আমাদের গাড়ি যখন পাহাড়ের উঁচু অংশে উঠে যায়, তখন পেছনে তাকালে দেখা যায় বিশাল পাহাড়ি ভূ-দৃশ্য। কখনও পাহাড়ের চূড়া মেঘের সঙ্গে মিশে যায়, আবার কখনো দূরের পাহাড়গুলো স্তরে স্তরে সাজানো ছবির মতো মনে হয়।

৩০ মিনিট পর আমরা দার্জেলিং পাড়ায় পৌঁছাই। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম, ভীষণ পরিচ্ছন্ন। প্রতিটি বাড়ির সামনে ফুলের গাছ লাগানো। গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মসৃন রাস্তা। চারপাশে পাহাড় বেষ্ঠিত। এখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা কেউক্রাডাংয়ের উদ্দ্যেশে রওনা দেই। কেউক্রাডাং যাওয়ার পথটি শুধু গন্তব্যে যাওয়ার রাস্তা নয়, এটি নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবন, ছোট ছোট ঘরবাড়ি, সবুজ প্রকৃতি এবং দীর্ঘ নির্জন পথ মিলিয়ে এখানে আমরা শহুরে জীবনের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশ অনুভব করি। কেউক্রাডংয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পথ যত দুর্গম হয়, ভ্রমণের রোমাঞ্চও তত বাড়তে থাকে। কেউক্রাডাং পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে চারপাশের বিশাল পাহাড়ি দৃশ্য দেখা- এই অনুভূতিই পুরো যাত্রাকে স্মরণীয় করে তোলে। বগালেক থেকে কেউক্রাডাং- এই পাহাড়ি পথ যেনো প্রকৃতির সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হওয়ার এক অসাধারণ যাত্রা।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা পৌঁছে যাই ৩২০০ ফুট উচ্চতায় কেউক্রাডাংয়ের চুড়ায়। পাহাড়টা সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত থাকায় টুরিস্ট টোকেন দেখে ভেতরে ঢুকতে দেয়। ছোট্ট একটু চূড়া একটা মাত্র কটেজ, যার নাম লালা কটেজ। গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই চুড়ায় উঠি। চুড়া থেকে ভারতের মিজোরাম দেখা যায়। অপর পাশে মায়ানমার। যতোদুর চোখ যায় স্তরে স্তরে পাহাড় সাজানো। কেউক্রাডাং একসময় দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ছিলো। পরে জরিপ করে প্রমাণিত হয় তাজিংডং দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। যদিও বেসরকারিভাবে সাফা হাফং-এর কথা প্রচলিত আছে।

কিছুক্ষণ থাকার পরে রওনা দেই শেষ গন্তব্য সুনসাং পাড়ারের উদ্দ্যেশে। এ যাত্রা ভীষণ ভয়ংকর। সুনসাং পাড়া বর্তমান সময়ের ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে এক অপার বিস্ময়। কেউক্রাডং পাহাড়ের গা ঘেঁষে থাকা বম সম্প্রদায়ের এই গ্রামটি একইসঙ্গে শান্ত, দুর্গম আর বৈচিত্রময়। পাসিং পাড়া থেকে রোমাঞ্চকর ও খাড়া ডাউনহিল রাস্তা ধরে নামলেই চোখে পড়ে আদিবাসীদের সুন্দর ঘরবাড়ি, সবুজ জুম খেত আর চারপাশের মেঘের খেলা। নির্জন প্রকৃতি উচু নিচু রাস্তা, বাইকারদের কাছে ভীষণ প্রিয়। কিছু জায়গায় রাস্তা এতটাই খাড়া যেন রোলার কোস্টারের মতো। আমাদের ড্রাইভারও বেশ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই সুনসাং পাড়ায়।
অসাধারণ এক গ্রাম, তখন সকাল ১০ টা। প্রচুর পর্যটক, বিশেষ করে বাইকার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাইক রাইড করে এসেছে। ফলমুল, আদিবাসিদের বানানো হরেক রকমের পিঠা, নানান রকমের খাবার, হাতে বানানো চাদরসহ নানান জিনিসপত্রের পশরা। আমরা হেঁটে হেঁটে উপভোগ করছি আদিবাসিদের জীবন যাত্রা। যে দিকে তাকাই স্তরে স্তরে পাহাড় সাজানো। দুরে মিজোরাম দেখা যায়। এখানে মোবাইল কোনো নেটওয়ার্ক নেই। রাত্রিযাপনের জন্য অল্প কিছু কটেজ আছে, নেটওয়ার্ক না থাকায় আগে লোক পাঠিয়ে বুক করতে হয়। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত সুনসাং পাড়ার পরে আর পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি নেই।
পাহাড়ি ঢাল, মেঘের মিতালি এবং আঁকাবাঁকা রাস্তার পাশাপাশি সুনসাং পাড়ার চমৎকার ডাউনহিল ও খাড়া পাহাড়ি পথ ভীষণ রোমাঞ্চকর। চারপাশের সবুজ পাহাড়, বন-জঙ্গল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই এলাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য। পাড়াটিতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসবাস এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রা উপভোগ করছে। এখানকার মানুষ সাধারণত কৃষিকাজ ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়ের ঢাল, ঝিরি-ঝরনা এবং নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ সুনসাং পাড়াকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শান্ত ও নিরিবিলি, পরিচ্ছন্নতার কারণে পাড়াটির প্রকৃতিগতভাবে বিশেষভাবে মনোমুগ্ধকর।
এবার ঘরে ফেরার পালা। ১২ টার দিকে রওনা দিলাম। যেখানে যেখানে যাওয়ার সময় আর্মি ক্যাম্পে এন্ট্রি করেছিলাম ঠিক একই জায়গায় আবার এক্সিট এন্ট্রি করে রুমা বাজারে গাইডকে নামিয়ে ৬ টায় বান্দরবান শহরে। এরপরে রাত ৮ টার বাসে ঢাকায়। পরদিনই আবার ফের রবিবার শুরু হলো যান্ত্রিক জীবন। জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত হতে ও নিজেকে ভালো রাখতে আসলে ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই। ভ্রমণ যেমন মানসিকভাবে নিজেকে ভালো রাখে, তেমনি অনেক অভিজ্ঞতায় পূর্ণ করে তোলে আমাদের।
লেখক : পর্যটক ও বেসরকারি চাকরিজীবী
