[লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশ হয়েছিল।]

ফাতিমা তাসনীম দ্বীনা

‘আমি একটি পাহাড় কিনতে চাই।

একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ,

নীচে বিপুলা পৃথিবী

চরাচরে তীব্র নির্জনতা

আমার কণ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবেনা’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই লেখা পড়ে পাহাড় কেনার ইচ্ছা যে কারো হতেই পারে। আমারও হয়েছিল। সময়টা ২০২৩ এর মে মাসের প্রথম সপ্তাহ।

১ মে সোমবার রাতে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ইমিগ্রেশন সেরে মিতালী ট্রেনে করে ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে পরেরদিন মঙ্গলবার সকালে আমরা ইন্ডিয়ার বর্ডার ক্রস করলাম। আমরা মানে আমাদের পরিবারের চারজনসহ আব্বুজির কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ইন্টারমিডিয়েট পড়া কালের (১৯৭৮ ব্যাচের) ছয় সহপাঠী বন্ধু ও তাঁদের পরিবারের মোট ঊনিশজন।

জীবনে এই প্রথমবার নিজের জন্মভূমির সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশের সীমানায় প্রবেশের অনুভূতি উত্তেজনাকর ছিল আমার জন্য। সীমানার এপারের শেষ স্টেশন চিলাহাটী পেরিয়ে বর্ডারের এপারে কিছুক্ষণ থামলো আমাদের ট্রেন। তারপর সীমানার ওপারের হলদিবাড়ী ও জলপাইগুড়ি স্টেশন পার হয়ে পরবর্তী স্টেশন নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা উতরাতেই প্রায় দুপুর বারটা বেজে গেল। সকালের নাস্তা করা আর হলো না। এদিকে দুপুর হয়ে যাওয়ায় স্টেশনের বাইরের একটি হোটেলে একসঙ্গে দুবেলার খাবার খেয়ে দুপুরের পর আমাদের সড়ক পথের যাত্রা শুরু হলো। উদ্দেশ্য পাহাড় পর্বতে ঘেরা সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক।

সাতজন বসার উপযোগী তিনটি মাহেন্দ্র দেয়ার কথা ছিল আমাদের ভারতীয় টুর অপারেটরের। কিন্তু ইমিগ্রেশন আর মানি একচেঞ্জ করতে দেরি হয়ে যাওয়ায় তিনটি গাড়ি পাওয়া গেল না, জুটলো দুটো গাড়ি। একটায় পাঁচজন এবং আরেকটায় একজন ছোট্ট বাচ্চসহ চৌদ্দজন নিয়ে ছুটলো আমাদের দুই গাড়ির এই ছোট্ট বহর।

যাত্রা পথে দেখলাম শিলিগুড়ির অভয়ারণ্য, পাহাড়ি রাস্তার পাশ দিয়ে গভীর খাতে কুলকুল বয়ে চলা তিস্তা নদী। গুগুল ঘেঁটে দেখলাম- তিস্তা নদীর উৎস উত্তর সিকিমের হিমালয় পর্বতমালার ৫,৩৩০ মিটার (১৭,৪৮৭ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত সো লামো হ্রদে। হ্রদটি শেসচেনের ডোংগা গিরিখাতের উত্তরে অবস্থিত। তিস্তা নদী ছাঙ্গু, ইউমথাং ও ডোংকিয়া লা পর্বতশ্রেণী থেকে উৎপন্ন ছোট ছোট পাহাড়ি নদীর জলে পুষ্ট।

শিলিগুড়ির সেই অভয়ারণ্য দেখে যেমন মন্ত্রমুগ্ধ হলাম, ঠিক তেমনই কষ্টও লাগল- এটা ভেবে যে, আমার দেশে এমন অভ্যারণ্যের দেখা মেলেনা। সুন্দরবন, কুয়াকাটার ম্যানগ্রোভ বনে গিয়েছি, চট্টগ্রাম আর রাঙ্গামাটির পাহাড়ি বনেও কিছুটা ঘুরেছি, কিন্তু এত ঘণসন্নিবিষ্ট বন দেখেছি বলে মনে হয় না। আরেকদিকে তিস্তার ঘোলা পানির অপ্রতুলতা চোখে পড়ে সহজেই। সেই অল্প পানিতেই বিভিন্ন জায়গায় বাধ দিয়ে পানির রিজার্ভার তৈরি করা হয়েছে। রিজার্ভারের পানি স্বচ্ছ স্ফটিকের মত মনে হলো দূর থেকে- আমরা তো থেমে নেই, পথেও নামা হয়নি, শুধু এক জায়গায় ছাড়া। চলন্ত গাড়িতে বসেই যা কিছু দেখা। তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। চলার পথে এই পাহাড়ি তিস্তা দেখে মনে হল বর্ষাকাল ছাড়া ভারতের অংশের তিস্তার ভরা রূপ দেখা সম্ভব নয়। অবশ্য পাহাড়ি নদীর প্রকৃতি সম্পর্কে আমার বাস্তব ধারণাও নেই মোটে- আমরা সমতল ভাটি এলাকার মানুষ। সেখানে নদী প্রশস্ত- শীতে বিস্তীর্ণ চর আর বর্ষায় দুকূল ছাপিয়ে উপচে পড়া অথৈ পানি দেখেই তো আমরা অভ্যস্ত। সে যাই  হোক কখনো কখনো রাস্তার ঠিক পাশেই অনেক নিচ দিয়ে তিস্তার সেই কুলকুল ছলছল বয়ে চলা পানিতে বড় বড় পাথরের চাঁইয়ের ফাঁক ফোকর দিয়ে ¯্রােতের টানে ছুটে চলা দু’একটা কায়াক আর আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে বিপরীত দিকে ছুটে যাওয়া অনেক গাড়ির ছাদে বাঁধা কায়াক দেখতে পেলাম। তাতে মনে হল পাহাড়ি এই নদীতে কায়াকে চড়া এখানকার একটা অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হয়তো। এই কায়াক স্বল্প পানির তিস্তার সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে প্রায় ৬ ঘণ্টার যাত্রায় পেরিয়ে আসা ১৩৫ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে ধীরে ধীরে ঊর্ধমুখী চলতে চলতে অবশেষে প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে কনকনে ঠা-া বাতাসের মধ্যে কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক পৌছলাম আমরা। পথে সিকিমে ঢোকার পথে র‌্যাংপো চেকপোস্টে থামতে হয়েছে সিকিম যাত্রী আর সবার মত আমাদেরকেও। পাসপোর্ট ও ভিসার ফটোকপি জমা দিয়ে সিকিম ঢোকার লিখিত অনুমতি নিতে হয়েছে। সেখানে বিপত্তি বাধলো আব্বুজিদের বন্ধু আমাদের সফরসঙ্গী কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সরওয়ার জাহান বাদশা আংকেলের লাল রং-এর ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট নিয়ে। সিকিমে ডিপ্লোম্যাটিক ও সরকারি পাসপোর্টধারী বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অনেক বলেও বাদশা আংকেল ও আন্টির অনুমতি মিলল না। উনারা মন খারাপ করে কালিম্পং গেলেন- আমাদের সিকিম অবস্থানকালীন সময়ে উনারা দুজন অনির্ধারিতভাবে ওখানে থেকে দার্জিলিং-এ আমাদের সঙ্গে আবার মিলিত হবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আব্বুজি- অবসরপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, পান্নু আংকেল-অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, ডাবলু আংকেল- অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সরকারি কলেজ। উনাদের তিনজনেরই সরকারি চাকরিকালীন কালো রং-এর সরকারি পাসপোর্ট ছিল।  সেটাও বর্তমান পাসপোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত আছে, তাই চেকপোস্টে এটা নিয়েও কথা উঠেছিল। কিন্তু সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় এবং বর্তমানে সাধারণ সবুজ পাসপোর্টধারী হওয়ায় তাঁরা সিকিমে ঢোকার পারমিশন পেলেন। আমাদের ভ্রমণদলের লোকসংখ্যা কমে সতেরতে নেমে এলো।

যাহোক রাজধানী শহর গ্যাংটকের উপকণ্ঠে ৫,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ৫ তলা বিশিষ্ট অপেক্ষাকৃত ছোট্ট  হোটেল ‘দি রাইস ভ্যালি রেসিডেন্সি’ তে আমাদের ট্যুর অপারেটর  শিবাজী মুখোপাধ্যায়- কোলকাতার মানুষ, যাঁর পূর্বপুরুষ মানে ঠাকুর্দা আমাদের বাংলাদেশেরই মানুষ ছিলেন, ফরিদপুরের সম্ভবত ও হোটেলের ম্যানেজার, এই সিকিমেরই বাসিন্দা সদা হাস্যজ্জ্বল শিল্পাদি’ আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। রুমে যাওয়ার আগে আমাদের প্রত্যেকের দুই কপি করে পাসপোর্ট সাইজ ছবি, পাসেপোর্ট ও ভিসার ফটোকপি হোটেলের রিসেপশনে জমা দিতে হলো হোটেলে চেক ইন করা এবং সেইসঙ্গে উত্তর সিকিমের লাচুং, ইয়াম থাং ভ্যালি, সাংগু লেক ভ্রমণের পারমিশন নেয়ার ব্যবস্থা করার জন্য। শিল্পাদি অতি দ্রুত এবং আন্তরিকতার সঙ্গে সেসব কপির ছবি তুলে কর্তৃপক্ষের কাছে অনলাইনে পাঠিয়ে পারমিশন করিয়ে নিলেন। আমরা নিশ্চিন্ত মনে যে  যার জন্য বরাদ্দ করা রুমে চলে গেলাম। ভিনদেশি এ দুজনের আতিথেয়তা ও দায়িত্ব পরায়নতায় আমরা মুগ্ধ।

আমি আর শাম্মা আপু পেলাম হোটেলের দোতলার দক্ষিণ-পূর্ব দিকের রুম। রুমটি অপেক্ষাকৃত অন্য রুমগুলোর  থেকে ছোট হলেও বিশেষ সুবিধা হিসেবে ছিল পূব দিক একটা উন্মুক্ত ব্যালকনি আর দক্ষিণে গ্রিলছাড়া বড়সড় একটা জানালা। সেই স্বচ্ছ কাচের বিরাট জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দূরে কালচে পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য  জোনাকির মতো আলো পাহাড়ি জনপদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল, আমি যার পর নাই অভিভূত হলাম। ঠিক তার মাথার ওপরে মেঘমুক্ত স্বচ্ছ আকাশে অসংখ্য মিটিমিটি তারার মেলা। রাতের আকাশ প্রেমিক শাম্মা আপু অতি আনন্দে হর্ষধ্বনি করে উঠে আমাকে চেনাতে থাকলো কোনটা কোন নক্ষত্র আর কোনটা কোন নক্ষত্রম-ল। আলোর দুষণমুক্ত এমন রাতের স্বচ্ছ আকাশ এর আগে কখনোই বাংলাদেশে দেখা হয়নি শাম্মা আপুর- না নিজেদের রাজশাহী শহরে, না আপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহর ঢাকায়, আর না দাদুর বাড়ি পাবনা শহর বা নানুদের গ্রাম চাটমোহরের মহেলায়। সব জায়গায় বিদ্যুতের আলোর দূষণ প্রকট, তাই গ্যাংটকের প্রথম রাত শাম্মা আপুর জন্য স্বপ্নের রাত, আমিও শাম্মা আপুর মহা আনন্দে ভাগিদার হলাম। স্মরণীয় একটি রাত শুরু হল আমাদের। মুহূর্তে আকাশে তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করে ফেলল আপু, নামাজ পড়তে হবে- আমরা মাগরিব নামাজ পড়ে নিলাম।

অন্যদিকে এতদিন হিন্দী মুভি দেখে রপ্ত করা হিন্দী বেশ ভালই বলতে পারি ভাবতাম। মনে হয় একটু বেশী আত্মবিশ্বাসও ছিল আমার। কিন্তু এখানে চোখের সামনে সব মানুষকে হিন্দীতে কথা বলতে দেখে মনে হচ্ছিল আমি যা হিন্দী জানতাম সব ভুলে গেছি। সে এক অদ্ভুত অনুভুতি।

পরেরদিনের গন্তব্য লাচুং। তারিখ ৩ মে, বুধবার সকাল ৮:৩০ টার দিকে একের পর এক সুয়েটার, জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু আরও উত্তরের উদ্দেশ্যে। এবারেও ৬ ঘণ্টার পথ। সুউচ্চ পাথরের পাহাড়ের গা  ঘেষে সাপের মতো কিন্তু প্রচ- ও বিপদজনক আঁকাবাকা কালো পীচঢালা রাস্তা, রাস্তার পাশেই গভীর খাদ, কখনো রাস্তার উপর দিয়ে বয়ে চলা ঝিরিঝিরি পাহাড়ি ঝর্ণা। এতো আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতেও পাহাড়ি রাস্তায়  কোনো গাড়ির হর্ন শুনলাম না। ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও খুব সুন্দর লাগল, গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর এই যে বাতাস  ভেদ করে ধেয়ে চলার শাঁ শাঁ শব্দ ছাড়া আর কোনশব্দ নেই। অথচ আমাদের বাংলাদেশে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি রাঙ্গমাটি যেতে গাড়ির হর্নে কান ঝালা পালা! আর শহরের পথে কারণে অকারণে গাড়ির হর্ন দেয়াতেই যেন চালকদের বাহাদুরী। সর্বত্র শব্দদুষণ, হায়রে বাংলাদেশ! আর এখানে অদ্ভুতভাবে প্রায় শব্দদুষণ মুক্ত প্রকৃতি। প্রকৃতিকে এরা সত্যি ধারণ করতে জানে। পথে প্রান্তরে সিকিমের কোথাও ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখিনি। প্লাস্টিকের ব্যবহার এখানে এতটাই সীমিত যে তা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মত এবং অনুকরণীয়।

সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২,৭০০ মিটিার (৯০০০ ফুট) উপরে অবস্থিত লাচুং। পথে যেতে যেতে চুংথাং টাউনে  দেখলাম সবুজ স্বচ্ছ পানির নদী, যেখানে সেখানে যখন তখন মেঘের আগমন। এদিকে ‘সেভেন সিস্টার্স ফলস’-এ যাত্রা বিরতি দিলাম আমরা। উঁচু পাহাড় থেকে প্রবল বেগে নিচে পড়ছে পানি উপর থেকে হঠাৎ পড়ায় ফেনার সৃষ্টি হচ্ছে, তারপর সেই পানি রাস্তার নিচ দিয়ে সাতটি ধারায় আবার হঠাৎ নিচে পড়ছে গড়িয়ে গড়িয়ে নয়- জলপ্রপাত; সেটা দেখতে দেখতে বৃষ্টির পানি আর জলপ্রপাতের ছিটকে আসা ঠা-া পানির সঙ্গে এক কাপ ধোয়া ওঠা গরম দুধ চা-এর অনুভূতি ঐশ্বরিক। এরপর চোখে পড়লো মিয়ানছু জলপ্রপাত, নাগা ফলস, চুং থাং জলবিদ্যুৎ  কেন্দ্র, চুং থাং ব্রীজ, চুং থাং টাউন, চুং থাং চেক পোস্ট প্রভৃতি। কিন্তু সময়াভাবে সেসবগুলোয় নামা হয়নি, চলতি পথে এক নজর দেখামাত্র। লাচুং যাওয়ার পথে চোখে পড়ল স্কুল কলেজের ড্রেস পড়া ছেলেমেয়ে। দূরের পাহাড়ের চুড়ায় বরফের দেখা মিলল। আহা কী সুন্দর!

লাচুং যখন পৌছালাম আশেপাশে পাহাড়ে তখন ঘন কুয়াশা আর মেঘের সঙ্গে সন্ধ্যা নামছে। আশেপাশের পরিবেশ দেখতে বের হলাম আব্বুজির সঙ্গে, হোটেল থেকে সরবরাহ করা বড় সাইজের ছাতা মাথায় দিয়ে ঢালু রাস্তা দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে। কিন্তু গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর ঘন কুয়াশার আচ্ছাদনে চারিদিকে তখন আর কিছুই  দেখা যাচ্ছিল না। লাচুং-এ যে হোটেলে আমরা ছিলাম তার নাম ‘ইথো মিথো’’, চাইনিজ নির্মাণশৈলীর নিদর্শন  যেন। হোটেলের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা, মেঝেও কাঠের, হোটেলের সবচেয়ে ওপরের রুমটা আমরা বরাদ্দ  পেলাম এক রাতের জন্য। মাথার ওপরে চৈনিক পদ্ধতির চাল, চালের নিচে কাঠের ডেকোরেশন- অদ্ভুত নতুনত্ব- মনোরম- অতি আকর্ষণীয়। এক কথায় আমি মুগ্ধ। ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তাঁদের ভাষায় ‘ইথো মিথো’ অর্থ হলো ‘সিটি অফ ফ্লাওয়ার’। লাচুং-এর আরেক নামও নাকি‘সিটি অফ ফ্লাওয়ার’। সিকিমে রাস্তার পাশে বিভিন্ন জায়গায় রডোডেন্ড্রন নামে এক ধরনের ফুলের আধিক্য চোখে পড়ে। মুলত সেখান থেকেই  হোটেলের এমন নাম। এই ফুলের প্রায় ২১ রকম প্রজাতি শুধু লাচুং-এ-ই পাওয়া যায়, তবে লাল রংটা কমন। বরফ ঠা-া পরিবেশ ছাড়া এ ফুল জন্মায় না। এর সুবাদে রডোডেন্ড্রনের ফুলের জুসও ভাগ্যে জুটল- সিকিম সরকার নিজের উদ্যোগে সিকিমের একান্ত নিজস্ব প্রোডাক্ট হিসেবে রডোডেন্ড্রন ফুলের জুস তৈরি ও বোতলজাত করে বাজারজাত করে থাকে, বেশ সুস্বাদু ।

হোটেলের রুমের ভেতরে রুম হিটার চলতে থাকার পরেও তাপমাত্রা  দেখলাম ৫ক্ক ডিগ্রি। আশেপাশে শুধু বরফ,  মেঘ আর হুটহাট বৃষ্টির সঙ্গে এই প্রচ- ঠা-ার অনুভূতি ছিল সম্পুর্ন নতুন। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, টিপটিপ থেকে বৃষ্টির গতি বেড়েছে, তাই কালকের মত আর তারার মেলার দেখা নেই লাচুং-এর আকাশে। শুনলাম আরও উত্তরের জিরো পয়েন্টে তুষারপাত চলছে। একদল অভিযাত্রী আটকাও পড়েছে নাকি। কর্তৃপক্ষ পথ বন্ধ করে দিয়েছে তাৎক্ষণিক। মনটা খারাপ হয়ে গেল। হায়! এতদূর এসেও তুষার পাত দেখার ভাগ্য হল না- আমরা গ্রীষ্ম ম-লীয়  দেশের মানুষ। অবশ্য আব্বুজির বন্ধুরা সবাই ষাটোর্ধ বিধায় ১৫,৫০০ হাজার ফুট উচ্চতার উত্তর সিকিমের জিরো পয়েন্ট ভ্রমণ তালিকায় নেই আমাদের- অত উচ্চতায় ভ্রমণ পিয়াসীদের অনেকেরই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, ওখানে  যেতে তাই অগ্রিম ব্যবস্থা হিসেবে আবশ্যিকভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্গে নিতে হয়। আব্বুজিরা কোন ঝুঁকি নিতে চাননি।

ভোরে ফজর নামাজ পড়ে সূর্য ওঠার আগেই আমরা দু’বোন আব্বুজির সঙ্গে হোটেল থেকে বেরুলাম পথে। রাতের বৃষ্টি তখন আর নেই- ঝকঝকে আকাশ। হোটেলের ঠিক পেছন দিয়ে উঠে যাওয়া সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় জমাট বরফ- নিচের দিকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে যেন। কিন্তু না, একটু খেয়াল করে দেখলাম পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঐ নেমে আসা বরফের ধারাগুলো স্থির জমে আছে পাহাড়ের গায়ে। হোটেলের পাশ ঘেসে হালকা গোলাপি সাকুরা ফুলের নাতিদীর্ঘ গাছ- পাতা শূন্য ফুলে ভর্তি, শুধুই ফুল, দূরে চারপাশ ঘিরে সিকিমের সুউচ্চ পর্বতমালা। আগে  থেকেই চাইনিজ ড্রামায় চীনা পরিবেশ দেখে আমার আগ্রহের সীমা ছিলনা। এবারে লাচুং-এর মানুষ, কাঠের তৈরি বাসাবাড়ির প্যাটার্ন থেকে শুরু করে বাড়ির সামনে উঠোনে সাকুরা গাছ, কাঠের এবড়োথেবড়ো বেড়া, বাড়ির  পেছনে পাহাড়ের চূড়ায় শুভ্র বরফ- সবই আমার দেখা চাইনিজ ড্রামার মতো। চড়াইয়ের পথে হাটতে থাকলাম আমরা তিনজন। আজই লাচুং-এর শেষ দিন। তাই যতটুকু দেখে নেয়া যায়। আমাদের হোটেল থেকে আরও উপরের দিকে উঠতে থাকলাম। বেশ হাঁপিয়ে উঠলাম এক সময়। যে পর্যন্ত উঠলাম সেখানে পাহাড়ের গা বেয়ে  নেমে আসা হিম ঠা-া পানির ধারা বেয়ে চলেছে নিচের দিকে অবিরাম। ঐ পানির ধারার ওপরে নির্মিত একটা কালভার্টের ওপর দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। ওটার নিচ দিয়ে সাদা ফেনা তুলে পানির ছুটে চলা দেখলাম প্রাণ ভরে।

আজ ৪ মে বৃহষ্পতিবার লাচুং থেকে আরও উত্তরে সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১২০০০ ফিট উপরে ইয়ামথাং ভ্যালি যাবার পালা। এই ভ্যালি লাচুং থেকে আরও ৩,০০০ হাজার ফুট উপরে। পথে যেতে চোখে পড়লো রাস্তার পাশ  থেকে উঠে যাওয়া পাহাড়ের গায়ে, উপত্যকায়, সমতলে নাম না জানা নানান রংয়ের ফুলের মেলা। বাগান নয়, না  তো মানুষের হাতে লাগানো, তবু যেদিকে যতটা চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল। প্রকৃতির স্বর্গ যেন। যত উপরে উঠছি তত বরফ রাস্তার কাছে পর্যন্ত চলে এসেছে যেন আমাদের স্বাগত জানাতে। গাড়ির ভেতর থেকে মনে হচ্ছে রাস্তায় নামলেই যেন বরফের নাগাল পেয়ে যাব। শুধু সাদা আর সাদা, বরফ আর বরফ, আর দূর থেকে দেখা যেন নয়, এই তো কাছেই। হাতের নাগালে যেন। কিন্তু আসলে তা তো নয়। অবশেষে ইয়ামথাং ভ্যালির রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ঢালু জমিনে নেমে পড়লাম আমরা সবাই- দলের মোট সতের জন। আরও অনেক দর্শণার্থী জড়ো হয়েছে এই ভ্যালিতে। অদূরে পানির সোতধারার দিকে আমাদের সবার গতি। হালকা ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামা খুবই সহজ। নামতে নামতে নদীর ধারে চলে এলাম। অগভীর পাথুরে নদীর তীব্র স্রোত-এর ঠিক কিছুটা উপরে ভেসে থাকা মেঘ, নদীর অপরপাশে পাহাড়, সরু নদীর মাঝে মাঝে বিরাট পাথরে ইয়ামথাং ভ্যালিকে দেখতে চিত্রশিল্পীর নিখুঁত আচড়ে আঁকানো ছবির মতো লাগে। বিরাট উপত্যকার একপাশে সিকিমের পর্বতমালা, আরেকপাশে স্বচ্ছ পানির নদী- যার নিচে বিভিন্ন রং ও সাইজের পাথরের বিছানা যেন, সঙ্গে নদীর পাশে আবারো সেই পাহাড়। এই ইয়ামথাং ভ্যালির সৌন্দর্য্য প্রতিটা প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের মনে দোলা দেয়। সবুজ গাছপালা, ক্ষেত-খামার আর জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদ-নদীকে ঘিরে বাস করা বাংলাদেশের মানুষের কাছে সিকিমের অনিন্দ্য  সৌন্দর্য্য দেখাই সর্বোচ্চ আনন্দের হওয়ার কথা। কিন্তু ফিরতি পথে ঢালের বিপরীতে ঊর্ধমূখী চলা সহজ ছিল না। আমাদের অনেকেই হাঁপিয়ে উঠলেন। বড়বড় শ্বাস নিতে হলো গাড়িতে ওঠার আগে। এখানেই প্রথম একটা ইয়াক  দেখলাম। লম্বা লম্বা লোমওয়ালা খাটো পায়ের নাদুসনুদুস বরফ এলাকার গরু যেন, পিঠে সুদৃশ্য জিন সাটানো, অনেকে ভাড়ার বিনিময়ে ইয়াকে চড়ে বেড়াচ্ছে, ছবি তুলছে। আমরা আর দাঁড়ালাম না, ইথোমিথো হোটেলে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে তারপরেই গ্যাংটক ফেরার পালা।

বিকেলে গ্যাংটকের হোটেলে পৌছালাম এবং সন্ধ্যার আগে মানি একচেঞ্জ করার জন্য গ্যাংটক শহরের এম.জি.মার্গ (মহাত্মা গান্ধী মার্গ) মার্কেটে গেলাম। গ্যাংটক শহর আমাদের অবস্থানস্থল থেকে আরও উঁচুতে। আম্মু আমাদের সঙ্গে গেল না। অন্য আংকেলদের সঙ্গে আমরা তিনজন গেলাম।

এখানে মার্কেটের ভেতরে কোন গাড়ি ঢোকে না। মার্কেটের বাইরে একটি ব্রীজের ওপর গাড়ি থামল। সেখানে  নেমে পায়ে হেঁটে মার্কেটে ঢুকতে হবে। চমৎকার ব্যবস্থা। একটি টু-ওয়ে রাস্তার দুধারে মার্কেটের দোকান পাট। রাস্তার মাঝ বরাবর মার্কেটের শুরু থেকে শেষ মাথা পর্যন্ত লম্বালম্বি ফুলের বাগান। বাগানের দুপাশে সারি সারি বসার বেঞ্চ, ছবির মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কোন  হৈ-হুল্লোড় নেই। নিরিবিলি পরিবেশ- পার্কের মত। একজন মুসলমান মানি একচেঞ্জারের দোকান থেকে আব্বুজিসহ আংকেলরা কেউ ডলার, কেউ বাংলাদেশি টাকা ভাঙ্গিয়ে নিলেন। আমরা দু’বোন এখানে নিরব দর্শকমাত্র। দোকানদার ভদ্রলোকের কাছে শুনতে পেলাম, সিকিমের তৃতীয় বৃহত্তম ধর্মগোষ্ঠী হচ্ছে মুসলমান। উনার নাম আনছারি। বাড়ি বিহার প্রদেশ, এখন এখানে এই সিকিমেই পুরো পরিবারসহ থিতু হয়েছেন।

যাহোক টাকা বদলানোর পর এবার মার্কেট দেখার পালা, এক জোড়া কেডস কিনতে হবে আমার- পায়েরটা নষ্ট হয়ে গেছে। রাত বাড়ছে মার্কেটের দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। আমরা সবাই যে যার মত ছড়িয়ে পড়লাম মার্কেটের ভেতরে।। ফিরতেও হবে যে যার মত। আগে কেডস কিনে তারপর মার্কেট দেখলাম, ততক্ষণে অনেক  দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তিনজন একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম যে পথে এসেছি সে পথে না, ভিন্ন পথে চলল গাড়ি। মনের মধ্যে একটু ভীতি ভাব, অচেনা দেশ, অচেনা শহর, অচেনা রাস্তা, সরু গলি এই খাড়া নেমে যাচ্ছে আবার উঠছে ঊর্ধমুখী। আঁকাবাকা পথ- তার একসময় সব দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে হোটেলের সামনে এসে পৌঁছে গেলাম আমরা।

পরের দিন ৫ মে শুক্রবার সকালের গন্তব্য হলো সমগো বা সাংগু লেক- তখন উত্তেজনা শীর্ষে। পথে বরফের পরিমাণ বাড়তে থাকলো। যে দোকান থেকে বুট ভাড়া নিলাম সে দোকানের বেড়ার পাশের দুদিন আগের তুষার পাতের বরফ জমে আছে দেখলাম। আর দূর থেকে দেখা নয়, একেবারে কাছ থেকে দেখা শুরু হল। হাত দিয়ে  ছোঁয়া যায়, নাড়া যায়। আর কল্পনা নয়, বাস্তবে বরফের রাজ্যে তখন আমরা। ডান দিকের শুভ্র সাদা বরফে  মোড়ানো অনেকগুলো পাহাড়ের গা ঘেষে বামে কাঠের রেলিং দেয়া ট্র্যাক আর তার বাম পাশে কালচে পানির  লেকের উপর আংশিক বরফের আচ্ছাদন। পানি আর বরফের সহঅবস্থান। ভাড়ায় নেয়া হাটু পর্যন্ত ঢাকা মোটা রাবারের বুট, দু’হাতে মোটা গ্লাভস- বরফের দেশের জন্য তৈরি। গায়ে মোটা সুয়েটার আর তার ওপরে জ্যাকেট চড়িয়ে বরফের বল বানিয়ে আব্বুজি আম্মু আপুর সঙ্গে সেই বরফের বল ছোড়াছুড়ি করে খেলতে খেলতে দেখা মিলল ইয়াক-এ চড়ে সাদা বরফের মধ্যে গমনকারী অভিযাত্রীদের। এই অনুভূতি ব্যাখার জন্য শব্দের অভাব অনুভব করছি। কিন্তু এই ইয়াকের বর্জ্য আর বরফ গলা পানিতে একাকার চলাচলের পথটি এমন নোংরা ও দুর্গন্ধময় হয়ে ছিল, যা এই স্বর্গীয় পরিবেশের সঙ্গে যেন মানাচ্ছিল না। এটুকু না থাকলেই মনে হয় ভাল হত। কিন্তু ইয়াকের মালিকেরাও তাঁদের জীবিকার তাগিদে এইসব ইয়াক নিয়ে নেমেছে হিম শীতল বরফের প্রান্তরে। কর্তৃপক্ষও তাঁদেরকে অনুমতি দিয়েছে। তাঁদেরই তো দেশ। তাই ভাল-মন্দ নিয়ে আমাদের কোন মন্তব্য করা আসলেই সাজে না।

জানতে পারলাম আরও উপরে পাহাড়ের চূড়ায় নামিয়ে বরফের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ওখানে রোপওয়ে আছে- ভাড়াও নাগালের মধ্যে মাত্র ৩২০/- রুপি জনপ্রতি। রোপওয়ে স্টেশন পর্যন্ত উঠলামও আমরা চারজন, কিন্তু  সেদিনই গ্যাংটক ফিরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য দার্জিলিং যাওয়ার প্ল্যান থাকায় সময়ের অভাবে রোপওয়েতে চড়ার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হলাম। ইয়াকে চড়েও পাহাড়ের চুড়ায় ওঠা যায়, ওদের প্যাকেজ তিন ধরনের।  সেক্ষেত্রে খরচের পরিমাণ বেশী, তবে নিশ্চিতভাবে ইউনিক হয় সেই অভিযাত্রা। 

এতো এতো পাহাড়, বইয়ে পড়া সিকিমের পর্বতমালা, হাজার হাজার ঝর্ণা, জলপ্রপাত, মেঘের রাজ্যে ডুব দেয়া আর চীনা পরিবেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের সিকিম ভ্রমণের সমাপ্তি হলো। এই অঞ্চলের প্রতিটা জায়গার আলাদা সৌন্দর্য্য, কোনটা কারো সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই সিকিম স্বর্গীয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।