[লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রথম বর্ষ ১১ তম (১৪ নভেম্বর ২০২৪) সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।]

- শ্যামল দত্ত
যে সময়টার কথা বলছি, তখন আমরা পাবনার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র। আমরা কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত তখন। বিভিন্ন দৈনিকের শিশু-কিশোরদের পাতাকে কেন্দ্র করে সারাদেশের শাখা সংগঠনগুলোর মতো আমরাও শাখা গড়ে তুলেছিলাম কেউ কেউ। পাবনায় সৃষ্টি হয়েছিলো ‘কচি কাঁচার মেলা’, ‘চাঁদের হাট’, ‘কিশোর কুঁড়ির মেলা’। আমরা কয়েকজন মিলে ‘চেতনা’ নামের একটি সংগঠন গড়েছিলাম। মুদ্রিত সংকলনও বের করেছিলাম ‘চেতনা’ নামে। অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীতে নিয়মিত হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকাও প্রকাশ করেছি দীর্ঘদিন। এরপর অমর একুশে, পয়লা বোশেখ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে স্মরণিকা প্রকাশ করেছি।
সেটা ছিল ১৩৮৫ বঙ্গাব্দ, ইংরেজির ১৯৭৮ সাল। সময়টা ছিল শরৎকাল। ‘শারদীয়া’ নামে একটি ক্ষুদে পত্রিকা বের করেছিলাম সে সময়। এ সংখ্যায় ছিল কবিতা, ছোটগল্প, নিবন্ধ। আর লেখকসূচিতে ছিলেন : আবু মহম্মদ রইস, ইসমাইল হোসেন শুচি, বিনয় দেবনাথ, রতন দাস, আবদুল মালেক (খোকন), রুমী খোন্দকার, জাহানারা বেগম জলি, মো. আবদুস সবুর খান (হামীম), জাহাঙ্গীর-উল-হক, শ্যামল দত্ত, এস দাহার মাতলু, মো. মোখলেসুর রহমান, এস এম আবদুস সালাম, শ্রীঅতুলচন্দ্র সরকার, আতাহার আলী, আবদুর রাজ্জাক, মো. বুরহানুল ইসলাম, সৈয়দ মোস্তফা হোসেন, মিতা চৌধুরী (ডায়না), যদুপতি মল্লিক এবং মঞ্জুল চক্রবর্তী। এমনকি কবি বন্দে আলী মিয়ার একটি কবিতাও ছাপা হয়েছিল সেই সংকলনে। এরপর শহরের নতুন ব্রিজের নিচে মওলানা কসিমউদ্দিন স্মৃতি তথ্য কেন্দ্রে ‘শারদীয়া’ প্রকাশনার এক ছোট্ট আয়োজন করা হলো। স্বল্প পরিসরের আয়োজন হলেও সেটি ছিল খুবই প্রাণবন্ত। যাদের লেখা ছাপা হয়েছিল, তাদের প্রায় সবাই এসেছিলেন। লেখা না ছাপা দলেরও অনেকে এসেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। এদের মধ্যে অন্যতম শ ই শিবলী। তিনি ছিলেন আমাদের অগ্রজ। বলতে গেলে তাঁর প্রেরণাতেই আমরা লেখালেখির চর্চা শুরু করেছিলাম।
প্রকাশনা অনুষ্ঠান তো হলো। তারপর হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে গেলাম রূপকথা রোডের প্যারাডাইসে। সেখানে চা-সিঙারার আয়োজনটা বোধহয় আমরা সবাই মিলেই করেছিলাম। সেই আড্ডাতেই সিদ্ধান্ত হয়, তথ্য কেন্দ্রে প্রতি শুক্রবার আমরা কবিতা পাঠের আসর করবো। আমরা নিজেরা কবিতা লিখবো, পাঠ করবো আবার অন্যের কবিতা নিয়ে আলোচনা করবো। কবিতার যে কী অসীম শক্তি, আমরা তখন থেকেই যেন বুঝতে শিখেছিলাম। বুঝেছিলাম, নিয়মিত কবিতার চর্চায় একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ব্যূহ রচনা করা যায়। কবিতা নিয়ে আমাদের এই আড্ডার মূল নেতৃত্বে ছিলেন শিবলী ভাই।
আমাদের সবাইকে নিয়ে সৃষ্টি হলো নিয়মিত কবিতা পাঠের আসর ‘কবিকণ্ঠ’। এতে যুক্ত হলেন আবু মহম্মদ রইস, মো. আতাহার আলী, রুমী খোন্দকার, জাহাঙ্গীর-উল-হক, মহম্মদ রাশেদ, মুকুল আহমেদ, দীপকরঞ্জন চৌধুরী, শ ই রিপন, নূরুল হক সোজন, স ম সুবহানী বাবু, মোসতফা আরব সতেজ, মাসুদ আলী শেখ, সমজিৎ কুমার পাল, ইসমাইল হোসেন শুচি, সেলিনা খান শেলী, হা-মীম আবদুস সবুর, কামাল আহম্মেদ, সঙ্গীত চৌধুরী, শামসুল আলম বকুল, শাহনেওয়াজ খান স্বপন, তুষার গায়েন, সুশান্ত, আবদুল কুদ্দুস, আবদুল মতিন। আরও অনেকে ছিলেন। সবার নাম হয়তো মনেও নেই আজ। সে সময় বয়সে তারা প্রায় সবাই তরুণ। প্রাণচাঞ্চল্যে উচ্ছল সেই টগবগে তরুণরাই পাবনার সংস্কৃতি অঙ্গনকে তখন মাতিয়ে রেখেছিলো।

কী আশ্চর্য, আমাদের সেই কবিতা পাঠের আড্ডাকে সেদিন অনেকেই সমর্থন করেছিলেন। পাবনার প্রবীণ রাজনীতিক ও সাংবাদিক অ্যাডভোকেট শ্রী রণেশ মৈত্র, কমরেড প্রসাদ রায়, রাজনীতিক আমিনুল ইসলাম বাদশা, দৈনিক ইত্তেফাক-এর জেলা প্রতিনিধি আনোয়ারুল হক, অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জাহেদী, অধ্যাপক শিবজিত নাগ, সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি, সাংবাদিক ও সংগঠক আবদুল মতীন খান, অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম, জি এস এস চিশতী এবং আরও অনেকের কথা মনে পড়ছে। রূপকথা সিনেমা হলের মোড়ে যে প্যারাডাইস রেস্টুরেন্ট ছিলো কবিকণ্ঠ-র অন্যতম আড্ডার কেন্দ্র, সেই রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার টিপু ভাইও তখন বিকেলভর আমাদের আড্ডার যন্ত্রণা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শুধু কবিতা পাঠ করেই কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। পাবনার প্রায় সক ক’টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা এক যোগসূত্র গড়ে তুলেছিলাম। কবিতাকে শোনা এবং দেখার বিষয় করে তোলাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। এজন্য কবিতার সঙ্গে আমরা যন্ত্রানুষঙ্গ, গান এমনকি অভিনয়ও যুক্ত করেছিলাম। একইসাথে মঞ্চে চিত্র প্রক্ষেপণের চেষ্টাও ছিল। আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা প্রযুক্তির সুবিধা না থাকলেও কবিতাকে দর্শনীয় করে তোলার চেষ্টা ছিল আমাদের সবসময়।
রবীন্দ্র জন্ম-জয়ন্তীতে কবিকণ্ঠ শাহজাদপুর কুঠিবাড়িতে অনুষ্ঠান করেছিল। সে সময় পাবনার জেলা প্রশাসক এম এ জব্বার এবং ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমানের সহায়তার কথা না বললেই নয়। কণ্ঠশিল্পী সুদীপ্তা রায় পুতুল, শিবানী নাগ এবং পাবনা থিয়েটার ’৭৭-এর আবদুর রাজ্জাক, মো. কোবাদ আলী, আমিনুর রহমান, সোলেমান আলীর সহযোগিতাও ছিল অপরিহার্য। শাহজাদপুর কুঠিবাড়ির বকুলতলায় আমাদের সেই অনুষ্ঠান দেখে অতিথিরা মুগ্ধ হয়েছিলেন। রাতে একটি স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। পরদিন সকালে শাহজাদপুরে কবিকণ্ঠ-র সদস্যদের জন্য প্রাত:রাশের আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় কলেজের অধ্যক্ষ এবং তাঁর সহকর্মীরা। এভাবে কবিকণ্ঠ তার ভ্রাম্যমাণ কবিতা পাঠের আসর নিয়ে পৌঁছে গেছে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়িতে, সিরাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠনগুলো ছিল কবিকণ্ঠ-র প্রধান সহযোগী। পাবনার ললিত কলা কেন্দ্র ‘ইফা’, প্রেস ক্লাব, বনমালী ইনস্টিটিউট, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি, শহীদ বুলবুল কলেজসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান সেদিন কবিকণ্ঠ-র জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। ১৯৭৯-র ডিসেম্বরে অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হলো কবিকণ্ঠ-র প্রথম বর্ষপূর্তি। অনুষ্ঠানে গুণিজন সংবর্ধনায় অভিষিক্ত হন বিশিষ্ট কবি ওমর আলী। এছাড়াও পাবনার গুণী নাট্যশিল্পী তপন লাহিড়ি, কণ্ঠশিল্পী রেণু অধিকারী, দেলোয়ার হোসেনকে বিভিন্ন সময় কবিকণ্ঠ সম্মাননা জানিয়েছে। সে সময় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও কবিকণ্ঠ’র অনুষ্ঠানের খবর ছাপা হয়েছে।
শুরু থেকেই কবিকণ্ঠ’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বাণী মুদ্রণ প্রেস-এর স্বত্ত্বাধিকারী ইয়াসিন আলী মৃধা রতন। রতন ভাই একসময় একটি নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রকাশের প্রস্তাব দিলে আমরা সেটা লুফে নিলাম। কবিকণ্ঠ পরিচালক শ ই শিবলীর সম্পাদনায় ১৯৮১-র ৩০ এপ্রিল শুরু হলো সাপ্তাহিক বিবৃতি’র নিয়মিত প্রকাশনা। আট পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েড আকারের সাপ্তাহিক বিবৃতি’র মূল্য ছিল মাত্র এক টাকা। বিবৃতি নিয়ে আমরা নিজেরাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। বিক্রি আর বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ছাড়াও পত্রিকার জন্য খবর তৈরি, প্রতিবেদন লেখা এমন কী রাত জেগে মুদ্রণের কাজও করতে হয়েছে কবিকণ্ঠ সদস্যদের।
নিয়মিত কোনো সংবাদপত্র প্রকাশনার ধারণা ছাড়াই আমরা সেদিন বিবৃতি’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। কিছু সংকলন বা সাময়িকী প্রকাশের সামান্য অভিজ্ঞতা হয়তো ছিলো। সেই অভিজ্ঞতা পুঁজি করেই কবিকণ্ঠ-র একদল উদ্যোমী তরুণের হাত ধরে বিবৃতি’র পথচলা। সম্পূর্ণ ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে বিবৃতি-র যাত্রা শুরু। কারণ সংবাদপত্র মুদ্রণের উপযোগী কোনো প্রিন্টিং প্রেস তখন পাবনা শহরে ছিল না। ‘রায়ের বাজার’ কিংবা ‘নাগ মার্কেট’-এর মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো তখনও শহরটাকে গ্রাস করেনি। কমরেড প্রসাদ রায়ের প্রাসাদোপম পুরোনো বাড়ির সামনেই খোলা সবুজ চত্বরে বসে বিবৃতি’র সংবাদ লেখা, প্রুফ দেখা, বিশেষ সংখ্যার জন্য আলোচনা, পরিকল্পনা কতো কী যে হয়েছে বলে শেষ করা যাবে না। কবিকণ্ঠ’র পাশাপাশি বিবৃতি নিয়েও ছিল সারাবছর বিভিন্ন আয়োজন। পাবনার বিভিন্ন এলাকা থেকে নবীন সংবাদকর্মীদের জন্য সপ্তাহব্যাপী কর্মশালা ছিল এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। স্থানীয় প্রবীণ সাংবাদিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং পেশাজীবীরা বিবৃতি কর্মীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। ব্যবসায়ীদের অনেকে স্বেচ্ছায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিবৃতি কর্মীদের উৎসাহিত করেছেন।
একটি নতুন সাপ্তাহিক ঘিরে এই যে এতো আয়োজন, এর মূলে শিবলী ভাই। তাঁর আশ্চর্য সাংগঠনিক দক্ষতায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলো সেদিন পাবনা শহরের তরুণ প্রজন্ম। তিনি তাদের সামনে শিল্প-সাহিত্য, সঙ্গীত, অভিনয়, মুদ্রণ-প্রকাশনা, সাংবাদিকতার বিচিত্র জানালা খুলে দিয়েছিলেন। সংস্কৃতিচর্চার সেই বিশাল স্রোতে নবীনদের পাশাপাশি প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিতজনেরাও এগিয়ে এসেছিলেন এক বিস্ময়কর স্বতস্ফূর্ততায়। কণ্ঠশিল্পী আবুল কাশেম, শিবানী নাগ, ভক্তিদাস চাকী, সাংবাদিক আবদুস সাত্তার বাসু সবাই সামিল হয়েছিলেন।
সময়ের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় পেরিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক। বিবৃতি তার সাপ্তাহিক গ-ি অতিক্রম করে দৈনিক হিসেবে প্রকাশ হচ্ছে এখনও। অবশ্য বিবৃতি-র প্রিন্টার্স লাইনের নামগুলো বদলে গেছে। সম্পাদক শিবলী ভাইয়ের পর শিবজিত নাগ, আবুল হোসেন খোকনসহ অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন।
কবিকণ্ঠ’র সেই অদম্য উৎসাহী তরুণদের অনেকেই আজ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত। যেমন শিক্ষকতায় আবু মহম্মদ রইস, মো. আতাহার আলী, রুমী খোন্দকার, আবদুদ দাইয়ান দুলাল। সরকারি পেশায় আবু হেনা মোস্তফা কামাল লী, ফয়জুল ইসলাম সুমন। কৃষি গবেষণায় ড. সমজিৎ পাল। আইনপেশায় স ম সুবহানী বাবু। বেসরকারি সাহায্য সংস্থায় সেলিনা খান শেলী, শামসুল আলম বকুল। সাংবাদিকতায় শুচি সৈয়দ, মোসতফা আরব সতেজ, খায়রুজ্জামান কামাল, আবুল হোসেন খোকন। আরও অনেকে ছড়িয়ে আছেন দেশ বিদেশে। আমাদের জীবন থেকে কবিকণ্ঠ’র সেই সোনালি দিনগুলো যেন হারিয়ে গেছে। কবিকণ্ঠ আমাদের কাছে তাই আজ কেবল স্মৃতি। পাবনার নবীন প্রজন্ম কি কবিকণ্ঠ’র কথা জানে? জানলে খুশি হবো।