[গল্পটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ দ্বিতীয় বর্ষ ৫ম সংখ্যায় (১৪ এপ্রিল ২০২৫) প্রকাশ হয়েছিল।]

আখতার জামান

প্রখর রোদ্দ্রে নিথর পড়ে আছে কফিনে মোড়ানো লাশটি। উঠোনের একেবারে শেষ সীমানায় খাটিয়াটি যখন রাখা হয়েছিলো তখন তার উপর সাজিনা গাছের ছায়া ছিলো, ছায়ার নিচে রাখা কফিনে মোড়ানো ইদ্রিস আলীর মুখমন্ডল বের করে অনেকেই দেখে ছিলো, অনতিদূর থেকে  মৃদু কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিলো। আর তখন, সকালের দিকে মুর্দার মুখ দেখার সামাজিক রীতির কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক, মানুষ ইদ্রিস আলীকে দেখেছে। মন ভার করা কণ্ঠস্বরে দুই-একটি বাক্য উগরে দিয়েছে। আহা! লোকটা চলে গেল!

ফজর ওয়াক্তে তার মৃত্য হয় এবং তারপর পরই তার মৃত্যুতে গভীর শোক নেমে আসে এই উঠোনে। দুই ছেলে, ছেলের স্ত্রীগণ এবং তাদের পুত্রকণ্যাগণ যথাসম্ভব গলা চড়িয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কান্নাকাটি করে। সময়ের সাথে সাথে শোক পাতলা হতে থাকে। এখন সেই শোকের অবশেষমাত্র নেই। যেমনটা শেষ রাতের ¯িœগ্ধতাকে হত্যা করে সূর্যের আলোর তেজ ক্রমশঃ সব জায়াগাই দখল করে নিয়েছে। ইতিমধ্যে ইদ্রিস আলীকে গোছল করানো হয়েছে। তাকে কবরস্থ করার আয়োজন চলছে। তার জন্য গোর খোঁড়া হয়েছে।

স্থানীয় মসজিদ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, বাদ আসর তার জানাজা নামাজ।

এখন লাশটি রোদে পুঁড়ছে। খাটিয়ার পাশে কেউ নেই। লোবান কাঠির শলাকাগুলো গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে ক্লান্ত। অনতিদূরে একটা বেওয়ারিশ কুকুর আয়েশী কায়দায় শুয়ে বিশ্রাম করছে। উঠোনের বিপরীত পাশের্^ ইদ্রিস আলীর দুইসন্তান এখন রীতিমতো ঝগড়া করে যাচ্ছে। মানুষও দুইভাগ হয়ে দুই ভায়ের দুই দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

‘এই লাশ দাফন হবেনা’ ‘এই লাশ দাফন হতে দেয়া হবে না। আগে এই বাড়ির ন্যায্য ভাগ চাই। জমিজমার সমান ভাগ চাই। বাপের জমানো টাকার হিসাব চাই।’

এক ভয়াবহ জটিলতায় উঠোনের মানুষজন চিৎকার চেঁচামেচিতে ব্যাস্ত। ছোট ভাই বড়ভায়ের মধ্যে হাতাহাতি হয়ে যায়, কিঞ্চিৎ রক্ত ক্ষরণ ঘটে। এখন এখানে এই সব শোক এবং যুদ্ধ বিগ্রহে দুই ভায়ের দলেই যোগ হয়েছে গ্রামের মাতববর শ্রেণির লোকজন। তারা দুই ভায়ের বিপরীত দিকে বিপরীত উঠোনে মুখোমুখি চেয়ার দখল করে পরামর্শ ও নেতৃত্ব দিচ্ছে। লাশটির দাফনের কোনো উদ্যোগ নেই। ক্রমশঃ উত্তেজনা বেড়েই চলছে।

মধ্য দুপুরের ঠা ঠা রোদ মাথায় নিয়ে ছুটে এলো রইচ। রইচ মানে চোরারইচ। গ্রামের মানুষ তাকে চোর বলে জানে। জেল খেটেছে কয়েকবার। এই চোরা রইসের দিকে মানুষ সরু চোখে তাকায়। সে কারোর আত্মীয় হতে পারে না। ইদ্রিস আলীও না। তবে কেন এই মরা বাড়িতে সে? তীব্র তাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, তার পাশে ইদ্রিস আলীর লাশ।

খাটিয়াটাকে একটু ছায়ার নিচে রাখা দরকার। একাএকা তো সেটিকে সড়ানো যাবে না। ইদ্রিস আলীর ছোট ছেলে বেলালকে হাত ইশারায় ডাকলো রইচ। বেলাল ছুটে এসে বিরক্ত মুখে বলল, ‘আপন্যা আবার কি মনে কর‌্যা আইছেন?’

রইচ নিচু স্বরে বলল, ‘তোমার বাপ আমার গ্যাদাকালের বন্ধু! তাকে একবার শেষদেখা দেকপ্যার আসতি পারব লা?’ খাটিয়া ধরে উঁচু করতে করতে বলে, ‘ব্যাটা একটু হাত লাগাও তো, দেখতিচ্যাওনা, রোদ লাগতিছে?’

তারপর শ্লেষভরা কণ্ঠে বলে, ‘ব্যাটা বিলাল, আমি চুরি চামারি কর‌্যা খাই! এ জন্নি তুমি ঘিন্ন্যা করব্যার লাগতিচাঁও!  আমি চোর হব্যার পারি, অমানুষ কিন্তুক না!’

বেলাল মুখ দিয়ে তাচ্ছিল্যের মৃদু শব্দ প্রক্ষেপণ করে এবং অতি বিরুক্তির ভঙ্গিতে রইচের দিকে তাকায়। মাইকের তীব্র শব্দ চারপাশের সকল কোলাহল ও নিরবতার মধ্যে ঢুকে কাঁপতে থাকে। ‘একটা শোক সংবাদ। আজ রাত চারটা ত্রিশ মিনিটে ইদ্রিস আলী চাচা মারা গেছেন। তার জানাজা নামাজ…..।’

রইচ বলে, ‘ব্যাটা, একখান কতা কই, মনে কিছু করইরো না! বাপের লাশ সামনে নিয়া দুইবাই ঝগড়াবিবাদ করব্যার লাগতিছো, কামডা ঠিক হতিছেনা!’ 

বেলাল চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘দ্যাহেন, জ্ঞান দিব্যার আসেন না! মাথা কিন্তুক হট আছে। বড়ডা কি করচে দ্যাহেন না? বাড়ির জমির আগরটা নিজের নামে করিচে। দ্যাহেন না? আমার বাপ নাকি ওক ওভাবে লিখেটিকে দিছে?’

রইচ কাছে যায়। নরম স্বরে বলে, ‘বাপের জানাজাডা আগে সারো। তারপর না হয়….’

তীব্র আক্রোসে বলে উঠে বেলাল,‘এ লাশ দাফন হবি লা!হবি লা…..’ ‘আগে পজিশন দখল তারপর! আমার দিকে মাতবর চাচা আছে। ঐ যে চাচা, চাচা কয়ে দিছে….’

রইচ হাসে। শব্দ করে হাসে। বলে, ‘ঐ তোমার চাচা, কত মানুষের জমি তার উদরে গেছে! বাদ দাও! একখান কতা শোনো, বাপু, কাউরে কোনোদিন কই নাই। শুনবা?’

‘কন দেহি!’

‘তোমার বাপের অবস্থা কিন্তুক এক কালে বালো ছিলো না! মাঠে কামকাজ কর‌্যা চলতো। তুমি যহন জন্মি ছিল্যা তহন একখান বিরাট অসুখ বাধাইছিল্যা। তোমাক বাঁচানোর জন্য ঢাকায় নিয়া যায় তোমার বাপ। অনেক খরচপাতি! ঐ সময় তোমার ঐ চাচা তোমার মায়ের গয়নাগাটি যা ছিলো হজম কর‌্যা ফেলাইচে! তারপরও টাকায় কুলাতি ছিলো না! অনেক টাহার দরকার ! তহন ….’

‘তহন কী ? তহন কী অইছিলো কন …’

‘কতাডা তোমার শুনতি বালো ঠেকবিন ন্যা, তাও কই। তোমার বাপ আমার সাথকর‌্যা চুরি করব্যার গেছিলো। চুরি কর‌্যা সে কি কান্না! একজন চোর কোনোদিন চুরি কর‌্যা কাঁদে? কাঁদ ছিলো! কাঁদছিলো ক্যান জানো? সে তো অরিজিনাল চোর না। সাওয়ালের জন্য চুরি করতে অইছে! অই ছাওয়াল তুমি …..’।

আকাশে গাঢ় মেঘ জমে গেল হঠাৎ। বৃষ্টি হবে হয়ত। বড় ছেলের ঘর থেকে মালামাল বের করা হচ্ছে। বাপের ঘর থেকে পুরানো ট্রাংক বের করা হচ্ছে। ট্রাঙ্কের তালা ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। ঐ ট্রাঙ্কের ভেতর কী আছে তারও একটা ভাগ হওয়া চাই। দুই পক্ষের মাতব্বররা সেগুলো ঠিকঠাক মতো কাগজে লিখে নিচ্ছে।

বিশাল আয়োজন। মানুষের গভীর আগ্রহ তারা বাড়ি ভাগ হতে দেখছে। লাশ দাফন হচ্ছে না, এটাও বিরাট সংবাদ। একটা বাড়ি টুকরো হতে যাচ্ছে! বিলাল ওই দিকে ছুটে যায়।

এই উঠোন থেকে বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে, মানুষের হিংসা, ক্রোধ, কোলাহল, তর্ক-বিতর্ক, হাসি তামাশা লোবানের তীব্র গন্ধ! রোগাক্রান্ত কুকুরট তাকিয়ে আছে লাশের দিকে, মানুষজন এরকমই ভীষণএকা; কারোর প্রতি নেই কোনো মোহ, টান, ভালোবাসা! গহীনের সূতোগুলো ফটফট করে ছিঁড়ে যাচ্ছে।

অপেক্ষায় যেন রয়েছে শুধুই ইদ্রিস আলীর লাশ, দাফনের অপেক্ষা। নাকি সকল জীবন্ত মানুষের দাফন! কে জানে!

       লেখক : সহযোগী অধ্যাপক  (রসায়ন), পাবনা সরকারি মহিলা কলেজ, পাবনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।