শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র

সাগর লোহানী
বাংলাদেশের প্রখ্যাত ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী ইলা মজুমদার ১৯৪১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পাবনার রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন পাবনা জজকোর্টের এডভোকেট ও এডওয়ার্ড কলেজের ইংরেজীর খন্ডকালীন অধ্যাপক অলিন বিহারী মজুমদার। তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমার নরিনার জমিদার সুরেশচন্দ্র মজুমদারের প্রথম সন্তান নির্মলা বালা মজুমদার ছিলেন ইলা মজুমদারের মাতা। বাংলাদেশের শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের খ্যাতনামা প-িত বারীন মজুমদার ছিলেন তার স্বামী।
ইলা মজুমদার শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের এক বড় অংশ কাটান তার জন্মস্থান পাবনা শহরেই। এখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন পাবনা গার্লস স্কুলে পড়া শেষে। তিনি এরপরে ভর্তি হন এডওয়ার্ড কলেজে। সেখান থেকে আর্টস বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। স্নাতকসম্মান ডিগ্রী লাভ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
ইলা মজুমদার পারিবারিক পরিবেশেই প্রাথমিক সঙ্গীত শিক্ষাগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পাবনায় ১৯৫৪ সালে ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের কাছে তিনি শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে তালিম নেন।

পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা চলে আসেন। ১৯৬০ সালের ২৬ জুন তিনি পন্ডিত বারীণ মজুমদারকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এম এ পাস করেন।
পন্ডিত বারীন মজুমদার ১৯৬৩ সালের ১০ নভেম্বর কাকরাইলের ভাড়া বাসায় ১৬ জন শিক্ষক এবং ১১ জন ছাত্রছাত্রীর সহায়তায় মাত্র ৮৭ টাকা নিয়ে সম্পূর্ণ প্রতিকুল পরিবেশে দেশের প্রথম ‘কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা করেন। এসময়ে ইলা মজুমদার স্বামীকে সর্বোতভাবে সহায়তা দেন, এমনকি নিজের শেষসম্বল সঞ্চয়ও তিনি তুলে দেন এই কলেজ প্রতিষ্ঠায়।
১৯৮১ সাল থেকে প্রায় ২২ বছর তিনি রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৫ বছর ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংগীত মহাবিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংগীতচর্চা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি ইলা মজুমদার লেখালেখির জগতেও বিচরণ করেন। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘স্মৃতিতে শ্রুতিতে বারীণ মজুমদার’ ‘দিনগুলি মোর’ ও ‘সঙ্গীতের তত্ত্বকথা’।
শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য ইলা মজুমদার ১৯৫৮ সালে স্বর্ণপদক পান। শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দুইবার গুণীজন সম্মাননায় ভূষিত হন। রতœগর্ভা মায়ের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন ইলা মজুমদার। শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে গুণীজন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।

ইলা মজুমদারের তিন সন্তান। প্রথম সন্তান মধুমিতা মজুমদারের জন্ম হয়েছিল ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখে। ৯ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধকালে ’৭১-এর ২ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে বাঁচতে শরণার্থী হয়ে দেশ ত্যাগের সময় গানবোটের মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণের মধ্যে বিক্রমপুর এলাকায় হারিয়ে যান মধুমিতা। এই দম্পতি তাদের কন্যাকে আর কখনই ফিরে পাননি। তাদের দ্বিতীয় সন্তান পার্থসারথী মজুমদার একজন সঙ্গীত পরিচালক এবং কনিষ্ঠ সন্তান শুভাশিস মজুমদার (বাপ্পা মজুমদার) একজন সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক।
ইলা মজুমদার ২০১১ সালের ৩ মে ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
সূত্র : বাঙালীয়ানা থেকে সংকলিত