[লেখাটি সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রথম বর্ষ ১০ম (১৪ অক্টোবর ২০২৪) সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।]

কাজী হাবিবুর রহমান

মাসিক সম্প্রীতি বাংলাদেশ পত্রিকার ১ম বর্ষ জুলাই ২০২৪ সংখ্যায় মালা মাহবুবের প্রবন্ধ ‘আমার স্বপ্ন আমার শৈশব-ইচ্ছামতী’ পাঠ করে আমার হৃদয় নেচে ওঠে, আবার তৎক্ষনাৎ মুষড়ে পড়ে। কারণ তিনি এখন তাঁর শৈশবের ভালোবাসার ইছামতী নদী আর খুঁজে পান না। তবে তার প্রবন্ধের শেষে তিনটি বাক্য আমার হৃদয়কে তোলপাড় করেছে। তাঁর হৃদয়ের হাহাকারের মূল কথাগুলি উদ্ধৃত করলাম, ‘আমরা কি ফিরে পাবো সেই স্বচ্ছতন্বী ইছামতীকে? আমার শৈশব, আমার সত্তা, আমার স্বপ্ন হারানোর বেদনায় আমি কুঁকড়ে আছি। নদীর মৃত্যুতে সভ্যতার মৃত্যু ঘটে।’

প্রারম্ভেই নদীর উৎপত্তি নিয়ে কিছু কথা বলি। হিমালয় পর্বত থেকে অসংখ্য শ্রোতধারা জন্ম নিয়ে ছোট ছোট নদীতে পরিণত হয় এবং যুগে যুগে মিলেমিশে এক সুবিশাল প্রাচীন নদী শিবালিক নদীর সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে সেই অতীতে প্রায় ১ কোটি ১০লক্ষ বছর পূর্বে এই জলধারা থেকে ৩টি নদীর জন্ম সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র!

মোকারম হোসেনের ‘বাংলাদেশের নদী’ নামক বই থেকে উদ্ধৃত করে এবার পৌরানিক, কাল্পনিক ও বাস্তবের মিশেল দিয়ে এক কাহিনী বর্ণনা করি।

বাংলা ব-দ্বীপাঞ্চল যেসময়ে সমুদ্র গর্ভে ছিল, সে সময় গঙ্গা নদী পুরাতন গৌড়ের নিকটবর্তী বা কিছুটা উপরে সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হতো। এটা বাস্তব কথা। পরবর্তী সময়ে গঙ্গার প্রধান অংশ ভাগিরথী সোজাসুজি কলকাতার দক্ষিণে গঙ্গাসাগরের নিকট সমুদ্রে পতিত হতো। হিন্দু পুরান মতে দিলীপের ছেলে ভগীরথ গঙ্গা আনবার বর পান। ইচ্ছাকু বংশের রাজা সুবাহুর স্ত্রী কালিন্দীর গর্ভে রাজা সাগরের জন্ম হয়। রাজা সাগরের ছিল ৬০ হাজার পুত্র। রাজা সাগরের যজ্ঞের ঘোড়া ইন্দ্র চুরি করে। ভূপৃষ্ঠে ঘোড়া খুঁজে না পেয়ে রাজা সাগর মাটি খোঁড়ার আদেশ দেন তার পুত্রদের। ৬০ হাজার পুত্র মাটি কাটতে কাটতে কলকাতার দক্ষিণে সাগর দ্বীপে এসে কপিলমুনির আস্তানায় ঘোড়া দেখতে পান। ইন্দ্র তাদের দেখে ঘোড়া রেখে চম্পট দেয়। ছেলেরা চোর মনে করে কপিলমুনির দিকে তেড়ে গেলে মুনির হুংকারে ৬০ হাজার পুত্র দগ্ধ হয়। রাজপুত্র ভগীরথ সাগর দ্বীপের দক্ষিণে গঙ্গাসাগরে এসে সাগর রাজার ছেলেদের এবং ঘোড়া উদ্ধার করে। কাহিনীটির বর্ণনা থেকে বর্তমানে অনুমান করা যায় ৬০ হাজার শ্রমিক গঙ্গা নদীর স্রোতধারাকে খালের মাধ্যমে কেটে কেটে গঙ্গাসাগরে নিয়ে ফেলেছিল সেই প্রাচীনকালেই।

এবার নদীর তীরের মানব-সভ্যতার কথা স্মরণ করি। সেই অতীতকাল থেকে মানুষ নদীর তীরে, বসতি গড়ে তুলেছে বড় বড় সভ্যতা। নদীর তীরে সভ্যতা গড়ে ওঠার কারণ- ঐতিহাসিকরা বলেন, নদীর পানি তৃষ্ণা মেটায় এবং শস্য ফলানো যায়। নদীর তীরের প্রধান প্রধান সভ্যতাগুলো হলোঃ-

ইরাকের ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদের সুমেরীয় সভ্যতা, পাকিস্তানের সিন্ধু নদের মোহেঞ্জদারো ও হরপ্পা সভ্যতা, চীনের হোয়াংহো ও ইয়াংসী নদীর সভ্যতা এবং মিশরীয় নীল নদের সভ্যতা। ৩০০০-৪০০০ বছর খৃষ্টপূর্বাব্দে নদীর তীরে এইসব নগর সভ্যতার শুরু।

এবার আসি আমার দেশের কথায়। ইছামতী বয়ে চলেছে পাবনায়। ইছামতী নদীর তীরের অবস্থা বা ইছামতীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলার পূর্বে ইউরোপের এক মহান নদীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলি। ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে কেবল দানিউব নদী পূর্ব-পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। জার্মানীতে উদ্ভুত দানিউব অস্ট্রিয়া, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরী, ক্রোশিয়া, সার্বিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মলডোভা, ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে ২৮৫০ কিমি/১৭৭০ মাইল অতিক্রম করে শেষের দিকে দক্ষিণ-পূর্ব দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে উক্ত স্বাধীন দেশগুলি অনেক উন্নত, ফলে দানিউবের পানি নিয়ে রাজনৈতিক কোন সমস্যা নেই। দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত অনেক শহরের মধ্যে চারটি জাতীয় রাজধানী হয়েছে যথা ভিয়েনা, ব্রাতিস্লাভা, বুদাপেস্ট এবং বেলগ্রেড। দানিউব নদী ইউরোপের মধ্যদেশগুলির মালামাল পরিবহনের অন্যতম পথও বটে।

উক্ত রাজধানীগুলির মধ্যে বুদাপেস্টের মাঝ বরাবর দানিউব প্রবাহিত হয়েছে, যেমন পাবনা শহরের মাঝ দিয়ে ইছামতী নদী প্রবাহিত। সেই অতীতকাল থেকে দানিউব নদীর দুই তীরে, দুইটি ছোট দুর্গ অবস্থিত ছিল- বুদা ও পেস্ট। পরবর্তীকালে এই দুইটি দুর্গকে একত্র করে একটি শহর গড়ে ওঠে এবং নাম হয় তার বুদাপেস্ট! আর একত্রিত বুদাপেস্ট শহর হাঙ্গেরী দেশের রাজধানী হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। ইতিহাস বলি। এক সময় হাঙ্গেরীকে জয় করে তুর্কির অটোমান মুসলিম সুলতানেরা ১৫০ বছর রাজত্ব করেছিল। শুধু তাই নয়, সেই আমলে বুদাপেস্ট ধীরে ধীরে পূর্ব ও পশ্চিম দুনিয়ার সভ্যতার মিলন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। রাজধানী বুদাপেস্ট এবং দানিউব নদীর সৌন্দর্য্য এখনও যেকোন পর্যটককে মুগ্ধ করে ।

এবার আসুন ইছামতী নদী নিয়ে আমরা কিছু আলোচনা করি। ইছামতী নদী এবং পাবনা শহর সম্পর্কে এমন সব কথা বলবো, যা আমরা অনেকেই জানিনা। পাবনা জেলা ঘিরে বয়ে চলেছে দুইটি বৃহৎ নদী, দক্ষিণে পদ্মা আর পূর্বে যমুনা নদী। এই দুইটি বিখ্যাত বৃহৎ নদীকে ইছামতী নদী সংযোগ করেছে। আর এই সংযোগ স্থাপন করতে গিয়ে ইছামতী  নদী পাবনা শহরের বুক চিড়ে প্রবাহিত হয়েছে, অর্থাৎ পাবনা শহরকে সম্পূর্ণরূপে দ্বিখন্ডিত করেছে ইছামতী নদী, যেমন দানিউব নদী দুই তীরে দুই দুর্গকে- বুদা ও পেস্টকে রেখে তাদের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে আপন আনন্দে। আমি যৌবনবতী ইচ্ছামতী নদীকে আমার যৌবন কালে পাবনা শহরকে দুই ভাগ করে আপন আনন্দে বয়ে যেতে দেখেছি। ইছামতীকে পুনরায় সেইরূপ বহমান করা যায় না?

এবার আরেকটি অবাক করা কথা বলি। ইছামতী নদী কিন্তু কোন প্রাকৃতিক নদী নয়। এটা একটি মানুষ কর্তৃক খনন করা খাল যা দুইটি বিখ্যাত নদী পদ্মা এবং যমুনার  মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছে। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবাহ বাংলার সুবেদার ইসলাম খান মুঘল নৌবাহিনীর জলতরীগুলোকে নদী দিয়ে চলাচলের জন্য খাল খনন করে পদ্মা এবং যমুনার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন। প্রচলিত ইতিহাস মতে, ইসলাম খানের নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে খননকৃত খালের নাম রাখা হয় ইছামতী। তাই ইছামতীকে একটি ঐতিহাসিক নদীও বলা যায়। তবে আমরা ইছামতীকে তন্বী বা যৌবনবতী নদী হিসাবেই চিনি,  কোন খাল নয়।

কবি ঈশ^রচন্দ্রগুপ্ত নৌকায় ইছামতীর উপর দিয়ে ভ্রমণ করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বজরায় ইছামতী নদীর উপর দিয়ে পরিভ্রমণ করেছেন বেশ কয়েকবার। তাঁরা দুজনেই তাঁদের গদ্য এক পদ্যে সেই সব ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা সুললিত ভাষায় লিখেছেন, যা পাঠ করে আমরা হই মুগ্ধ ও গর্বিত।

আমি এই লেখার এক স্থানে বলেছি, আমি ইছামতীকে যৌবনবতী দেখেছি। আমার পিতা চাকুরি থেকে অবসর পাওয়ার পর আমরা পাবনায় এলাম। আমরা নতুন বাড়ী স্থাপন করলাম ইছামতী নদী থেকে খুব বেশী দূর হলে বলা যায় মাত্র ৬০/৭০ গজ দূরে। আমি এডওয়ার্ড কলেজে আইএ এবং বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম এমএ পড়তে ১৯৫৭ সালে। তখন অবলোকন করেছিলাম শীতকালে ইছামতী একটু শীর্ণ দেখাতো, তবুও খুব ধীরে ধীরে স্রোত বইত। বর্ষায় তখন হতো সে পূর্ণ যৌবনবতী। তীরে উপচে জলরাশি উঠতো। বড় বড় গয়নার নৌকা ৫০০/৬০০ মন মাটির তৈজষপত্র বিক্রির জন্য ঘাটে এসে ভিড়ত। নগরবাড়ী এবং অন্যান্য ঘাট থেকে ৩০/৪০ সীটের ভটভটি লঞ্চ আসতো যাত্রী নিয়ে। আমাদের বাড়ীর সামনে, বর্তমানে যেখানে ইসলামী লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে, সেই ঘাটে যাত্রী ওঠাানামা করতে দেখছি। আরও ব্যক্তিগত কথা বলি, আমার এক ভগ্নিপতি যার বাড়ী ছিল নগরবাড়ী, তিনি তখন স্কুল পড়ুয়া ছাত্র, তাঁর দাদার সঙ্গে সেই ভটভটী লঞ্চে নগরবাড়ী থেকে পাবনা আসতেন কোর্ট-কাচারী করার জন্য। দাদার সঙ্গে তিনি ওই ঘাটে নামতেন।

সেই ইছামতী নদী আর নেই। জমি দখলদাররা তাকে হত্যা করেছে। ইছামতী নদীর বর্তমান অবস্থা দেখলে আমার হৃদয়টা হাহাকার করে ওঠে। সভ্যলোকে নদীকে হত্যা করে কেন, এর উত্তর কেউই দিতে সক্ষম নন।

একবার ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ইছামতী নদীর উপর থেকে দখলদার উচ্ছেদ করার জন্য হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ এলো। সে সময় ইছামতীর উপর ২০১৪ সালে ফেসবুকে আমার এক ইংরেজীতে লেখা প্রবন্ধের কপি ডিসি জনাব কবির মাহমুদকে প্রেরণ করেছিলাম ১৪ জানু ২০২০ তারিখে। ডিসি সাহেবকে আমার কভারিং পত্রে লিখেছিলাম, ‘ইছামতী নদীর মধ্য থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুনঃখনন করে নদীকে নাব্য করার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।’ তখন কিছুদিন খুব জোরেসোরে দখলদারদের উচ্ছেদ করা শুরু হলো। কিন্তু আস্তে আস্তে উচ্ছেদ কর্ম স্তিমিত হয়ে এলো, এক সময় কাজ থেমেই গেল। তারপর প্রতি বছর একই ঘটনা ঘটছে। আমার সেই ২০১৪ সালের ফেসবুকে ইংরেজীতে লেখাটির শেষ অংশ ছিলনিম্নরূপ।

“Lastly, I appeal to the inhabitants of Pabna to get the water of the river Ichhamoti flowing once again by driving away the Land grabbers. If it is done, Pabna Town will be a beautiful city, more beautiful than Budapest and you will save an historical site for the posterity.”

সত্যই কি ইছামতী নদীর যৌবনকাল ফিরিয়ে আনা সম্ভব? ইউরোপ এবং অনেক সভ্য দেশের মানুষরা মৃত নদীকে বহমান অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। আমরা পারিনা কেন? আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কি উত্তর দেবো? হায়রে ইছামতী নদী!

          কাজী হাবিবুর রহমান : সদস্য ও উপদেষ্টা ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্ট, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।