[২০ আগস্ট ২০২৬ ছিল চলনবিলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও সমাজসেবক অধ্যাপক মো. আবদুল হামিদ-এর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটিকে স্মরণ করে তাঁর ২৮ বছর আগের লেখাটি প্রকাশ করা হলো।]

অধ্যাপক মো. আবদুল হামিদ

১৯৫৬ সালের ৪ঠা জুলাই আমি পাবনার স্বনামধন্য এডওয়ার্ড কলেজের একজন শিক্ষক হবার সৌভাগ্য অর্জন করি। রসায়ন বিভাগের সর্বকনিষ্ঠ অধ্যাপকরূপে কলেজটিতে যোগদান করি। তখন রসায়ন বিভাগের প্রধান ছিলেন জাঁদরেল অধ্যাপক বসন্তকুমার ঘোষ (বি, কে, ঘোষ)। তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের হুগলীর বাসিন্দা। হুগলী শহরের সন্নিকটে তাঁর বাড়িতে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এই একই কলেজে তিনি আজীবন শিক্ষকতা করেন। তাঁর গভীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষানুরাগ এবং সর্বোপরি বিদ্যাপীঠটির প্রতি ভালবাসা তাঁকে কিংবদন্তীর মানুষে পরিণত করেছিল। তাঁর চেহারা ছিল গুরুগম্ভীর; খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু ক্লাশে তাঁর মুখে কথার খৈ ফুটতো।  লেখাপড়ার বিষয় ছাড়া অন্য কথা বলা তিনি পছন্দ করতেন না। অবশ্য মাঝে মাঝে রসিকতাও করতেন।

রসায়ন বিভাগের ছোট কক্ষটিতে প্রথম দিন তাঁর সামনে চেয়ারে বসতে আমি কুণ্ঠাবোধ করছিলাম। তিনি আমার সঙ্কোচ ভাব লক্ষ্য করে বলেন, ‘আপনি বসুন।’ আমি তাঁকে বিনয়ের সঙ্গে বলি, ‘স্যার, আপনি আমার পিতৃতুল্য। দয়া করে আমাকে আপনি না বলে তুমি বলবেন।’ তিনি হেসে বলেন, ‘সে হবে, হবে, আস্তে আস্তে হবে’।’ অবশ্য পরদিন থেকে তিনি আমাকে তুমিই বলতেন এবং যতদিন ছিলেন আমাকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন।

তৎকালে প্রশিক্ষণ শিক্ষক ব্যতীত অন্যান্য শিক্ষকদের অধ্যাপক বলা হোত। এখনকার মত প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ইত্যাকার শ্রেণীবিন্যাস ছিল না। তখন অধ্যাপকদের প্রারম্ভিক বেতন ছিল মাসিক ১৭৫/০০ টাকা। প্রতি দুই বৎসর পর পাঁচ টাকা বেতন বাড়তো। অবশ্য বাজারে সব কিছু সস্তা থাকায় এই সামান্য বেতনে ভালভাবে সংসার চলেও কিছু উদ্বৃত্ত থাকতো।

রসায়ন বিভাগে আর একজন অধ্যাপক ছিলেন আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ক্লাশের সহপাঠী মীর  মোহাম্মদ আলী। তাঁর বাড়ি ছিল সম্ভবত ফরিদপুর বা কুষ্টিয়া জেলায়। তিনি পাবনা শহরের জুবিলী ট্যাঙ্কের দক্ষিণে একটি বাড়ি কিনে পাবনার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিলেন। তখন রসায়ন বিভাগে একজন প্রদর্শন শিক্ষক ছিলেন মকবুল হোসেন বিশ্বাস। তাঁর বাড়ি ছিল পাবনার কুঠিপাড়ায়। কয়েক বৎসর পর মোজাম্মেল হোসেন নামে আর একজন প্রদর্শন শিক্ষক যোগদান করেন। তাঁরা উভয়েই একই কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

আমি কলেজটিতে যোগদানকালে অধ্যক্ষ ছিলেন মি. নলিনীরঞ্জন রায় (এন আর রায়)। তিনি ছিলেন পাবনা  জেলার বেড়া থানার পোতাজিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে গণিত বিষয়ে প্রথম শ্রেণী লাভ করে এমএসসি পাশ করেন। তিনি শুধু অধ্যক্ষই ছিলেন না, একইসঙ্গে গণিত বিভাগের প্রধান ছিলেন। রুটিন মাফিক তিনি অংকের ক্লাশ নিতেন। নিরস গণিত বিষয়কে সহজ সরলভাবে বুঝিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট হৃদয়গ্রাহী করে তুলতেন। ছাত্রদের মতে তিনি ছিলেন ‘অংকের যাদুকর’। এ-সব মন্তব্য ছাত্রদের মুখেই শোনা।

পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন মি. মাখনলাল চক্রবর্তী। তিনি কলিকাতার বাসিন্দা ছিলেন। তিনিও এমএসসিতে প্রথম শ্রেণীপ্রাপ্ত সুদক্ষ ও অতুলনীয় অভিজ্ঞ অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর এক পা খোঁড়া ছিল। তিনি মন প্রাণ ঢেলে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষাদান করতেন। ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর এক-একটি ক্লাশ হীরা মুক্তার চেয়েও দামী মনে করতো। তিনি তাদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

তাঁর সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ে; আই এসসি (উচ্চ মাধ্যামিক) পরীক্ষার ফরম পূরণ কালে তিনজন ছাত্রের পদার্থবিদ্যায় মাত্র একটি করে ‘পারসেন্টটেজ’ কম পড়ায় তারা ‘ননকলেজিয়েট’ হয়। তখন নিয়ম ছিল প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে প্রতি বিষয়ে অন্তত শতকরা পঁচাত্তরটি ক্লাশে উপস্থিত থাকতে হোত, তবেই সে ‘কলেজিয়েট’ হিসেবে পরীক্ষা দিতে পারতো। যাদের উপস্থিতি শতকরা ৬০-৭৫ থাকতো তারা ‘ননকলেজিয়েট’ হিসেবে দশ টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষা দিতে পারতো। জরিমানার টাকা শিক্ষা বোর্ড পেতো। যাদের শতকরা ষাট-এর কম ‘পারসেন্টটেজ’ থাকতো, তারা ‘ডিস্‌কলেজিয়েট’ হোত এবং পরীক্ষার ফরম পূরণ করার সুযোগ পেত না।

উল্লেখিত তিনজন ছাত্রের একমাত্র পদার্থবিদ্যা ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ের উপস্থিতি শতকরা পঁচাত্তর ছিল, বা করে নিতে পেরেছিল। শুধুমাত্র পদার্থবিদ্যায় একটি করে ‘পারসেন্টটেজ’ কম ছিল। একটি ‘ডট’কে পি (চ) করে নিতে পারলেই আর কোন সমস্যা থাকে না। তিনজন পরামর্শ করে বুঝে সাহস করে পারসেন্টটেজ-এর আবদার জানায়। তিনি সবকিছু শুনে ছাত্রদের বসতে বলে ভিতরে যান এবং তিনখানা দশ টাকার নোট এনে তাদের হাতে দিয়ে বলেন, ‘যাও, ফরম পূরণ করগে। তোমাদের জন্য আমি চোর হতে পারিনা। একটি ডটকে ‘পি’ করার অর্থই চুরি করা বা মিথ্যা বলা- যা জীবনে করিনি তা আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তোমাদের জন্য আমি আমার পরকাল নষ্ট করতে পারিনা।’ তিনি কিরূপ সৎ ছিলেন- এই সামান্য ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।

জীববিজ্ঞান বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ডা. মনীন্দ্রনাথ রায়, এমবিবিএস। বিদ্যায় ডাক্তার হলেও তিনি পেশায় ছিলেন অধ্যাপক। অত্যন্ত কেতাদুরস্ত সুদর্শন ভদ্রলোক ছিলেন। ‘বো-টাই’ পরতেন। তিনি এমএন রায়ের মানবতাবাদী দলের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর কাছে অনেক চাণক্য শ্লোক ও তুলসী দাসের দোঁহা শিখেছিলাম। তাঁর একটি কথা মনে পড়ে। তিনি বলতেন, হিন্দু ধর্মবিশ্বাসীদের জীবনযাত্রা কত সহজ। এতে বাধ্যতামূলক কিছুই নেই। পূজা করলেও হিন্দু, না করলেও হিন্দু। আমি হিন্দু- এ কথা স্বীকার করণেই যথেষ্ট। তিনি রসিকতা করে বলতেন- ইসলাম ধর্মে দৈনিক পাঁচ বার নামাজ, এক মাস রোজা, হজ্ব, জাকাত, কোরবানী কত কি করতে হয়। বড্ড কঠিন ব্যাপার। এ কথার উত্তরে বলতাম, যত গুড়, তত মিঠা। কষ্ট না করেই কেষ্ট পেতে চান?

শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিভাগেই নয়, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগেও ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল হক, আরবী বিভাগে খন্দকার তোজাম্মেল হোসাইন ও মওলানা আবদুল হামিদ, ঊর্দু বিভাগে অধ্যাপক মোহাম্মদ দারা, দর্শনে অধ্যাপক এস কিউ হোসেন, ইতিহাসের অধ্যাপক হালিমুজ্জামান খান ও জালাল উদ্দিন, বাংলার অধ্যাপক গোলাম সাকলায়েন (পরে পিএইচডি), আনোয়ার পাশা (শহীদ বুদ্ধিজীবী) ও আনসার আলী, ইংরেজী বিভাগে অধ্যাপক খলিলুর রহমান, মুজিবুর রহমান, আবদুুল কাদের ও রশিদুল হাসান (শহীদ বুদ্ধিজীবী), বাণিজ্য বিভাগে অধ্যাপক আবদুুল কুদ্দুস প্রমুখ। সবাই ছিলেন নামকরা অধ্যাপক।

তৎকালে রাজশাহী কলেজের পরেই ছিল পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের স্থান। রাজশাহী কলেজ ছিল রাজশাহী ও খুলনা বিভাগদ্বয়ের একমাত্র সরকারী কলেজ। অনেক সময় এডওয়ার্ড কলেজের কাছে হার মানতো। এডওয়ার্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের সুনাম ছিল দেশ জোড়া। এ কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ব বাংলার) অনেক দূরবর্তী জেলা হতে বহু ছাত্র এডওয়ার্ড কলেজে বিজ্ঞান পড়তে আসতো। এই কলেজের বহু ছাত্র আইএসসি ও বিএসসি পরীক্ষায় শীর্ষ স্থান ও প্রথম দশ জনের মধ্যে স্থান লাভ করে কলেজটির গৌরব বৃদ্ধি করে। শুধু বিজ্ঞান বিভাগেই নয়, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগেও এডওয়ার্ড কলেজের ফলাফল অনুরূপ গৌরবোজ্জ্বল ছিল।

আমি এডওয়ার্ড কলেজে এসে আইএসসি প্রথম বর্ষে ও ২য় বর্ষে (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে) দু’টি করে সেকশনে (শাখায়) চারটি ক্লাশ, আর বিএসসি তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে দু’টি ক্লাশ পাই। রসায়ন বিভাগের তিনজন শিক্ষককে  দৈনিক ছয়টি তত্ত্বীয় ক্লাশ নিতে হোত। এ ছাড়া ছিল ব্যবহারিক ক্লাশ। আইএসসি ক্লাশের ব্যবহারিক ক্লাশে প্রদর্শন শিক্ষক সব সময় উপস্থিত থাকলেও অধ্যাপকদের রুটিন অনুযায়ী দেখতে হোত। অধ্যাপক বি কে ঘোষ সপ্তাহে ২ দিন করে বিএসসি ক্লাশের ৪ টি করে ভৌত রসায়নের তত্ত্বীয় ক্লাশ ও ব্যবহারিক ক্লাশ নিতেন। সকল ক্লাশে মীর  মোহাম্মদ আলী পড়াতেন জৈব রসায়ন, আর আমি পড়াতাম অজৈব রসায়ন। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাশের ভৌত রসায়ন আমরা অংশ ভাগ করে পড়াতাম। তৎকালে শিক্ষার মাধ্যমে ছিল ইংরেজী। বাংলা ছাড়া সকল বিষয়ের বই ছিল ইংরেজীতে। শিক্ষাদান ও পরীক্ষা ইংরেজী ভাষাতেই হোত। ১৯৬৫ সালের পর হতে ক্রমান্বয়ে ইংরেজীর স্থান দখল করে বাংলা ভাষা।

অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী আমি যোগদানের অল্পদিন পরই শিল্প বিভাগে সরকারী চাকুরী পেয়ে ঢাকায় চলে যান। ফলে, তাঁর ক্লাশগুলো আমাকেই নিতে হোত। প্রতিদিন চার-পাঁচটি তত্ত্বীয় ক্লাশ, তার উপর ব্যবহারিক ক্লাশ নিতে অবস্থা কাহিল হয়ে উঠতো। প্রায় দিনই অবিরাম পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় গলদঘর্ম হয়ে বাসায় ফিরতাম।

একদিন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ঘোষ মহাশয়কে রসায়ন বিভাগে একজন শিক্ষক নিয়োগের কথা বলি। তিনি অধ্যক্ষ মহোদয়ের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি সম্মত হন। যথারীতি বিজ্ঞপ্তি প্রচারের পর পাবনার জেলা প্রশাসনের অফিসে প্রার্থীদের সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা হয়। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি। প্রার্থীদের মধ্যে দু’জন ছিলেন আমাদের প্রাক্তন ছাত্র : আবদুুল হালিম শিকদার ও শ্রীপদ দাস। শ্রীপদ দাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিষয়ে এমএসসিতে প্রথম শ্রেণী ও স্বর্ণপদক লাভ করেন। আবদুুল হালিম শিকদারও একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। আমি ও অধ্যাপক বি কে ঘোষ উভয়েই সাক্ষাতকার বোর্ডে ছিলাম। আরো ছিলেন জেলা প্রশাসক ও অধ্যক্ষ মহাশয়। আমাদের সামনে বিরাট সমস্যা দেখা দিল ঃ কাকে বাদ দিয়ে কাকে নিয়োগ করা যায়? অবশেষে আমার অনুরোধে উভয়কেই নিয়োগের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তারা কলেজে যোগদান করেন। কিছুকাল পর অধ্যাপক শ্রীপদ দাস এডওয়ার্ড কলেজের চাকুরী ছেড়ে ভারতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর কলেজে যোগদান করেন। তার শূন্যপদে বয়েনউদ্দিন আহম্মেদকে অধ্যাপক নিয়োগ করা হয়। অধ্যাপক আবদুুল হালিম শিকদার পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষরূপে অবসরগ্রহণ করেন। অধ্যাপক বয়েনউদ্দিন আহম্মেদ রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুকাল দায়িত্ব পালনের পর একদিনের জন্য এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করে সরকারী চাকুরী হতে অবসর গ্রহণ করেন।

ষাটের দশকে অধ্যক্ষ এন আর রায়, অধ্যাপক বি কে ঘোষ ও অধ্যাপক মাখনলাল চক্রবর্তী এডওয়ার্ড কলেজ হতে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁদের বিদায় সংবর্ধনা সভায় বক্তা, দর্শক, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকবর্গ যাঁরা উপস্থিত ছিলেন অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। সেদিনের দুঃখ ভারাক্রান্ত স্মৃতি জীবনে ভুলতে পারবনা। জীবনে বহু বিদায় সভায়  যোগদান করেছি, কিন্তু অন্য কোথাও অনুরূপ উদ্বেলিত হৃদয়ের কান্না চোখে পড়েনি। তাঁরা তিনজনই এই কলেজ  ছেড়ে যাবার পর বেশী দিন বাঁচেননি। সবাই একে একে পরকালের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাঁদের জীবদ্দশায়  শেষবারের মত হুগলীতে গিয়ে অধ্যাপক বি কে ঘোষ এবং কলিকাতার রাশা রোডের বাড়ীতে অধ্যাপক এম এল চক্রবর্তীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। অনেকদিন পর তাঁরা আমাকে কাছে পেয়ে যে কিরূপ খুশী হয়েছিলেন তা ভাষায়

ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। বসন্ত বাবুর ছোট ছোট নাতী নাতনীরা এসে যখন আমাকে প্রণাম করে, আমি বিচলিত হয়ে পড়ি। কি করবো ভেবে পাইনা। তাদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করি। প্রবীণ শিক্ষকদ্বয় আমাকে নিজ হাতে বহুকিছু পরিবেশন করে খাওয়ান। সেদিনের স্মৃতিও মনের মণিকোঠায় চির অম্লান হয়ে থাকবে। অধ্যাপক বি কে ঘোষের অন্তেষ্টিক্রিয়ার পর তাঁর পুত্র আমাকে চিঠি লিখে তাঁর পিতার মৃত্যু সংবাদ জানান। আমরা কলেজে শোকসভা করেছিলাম।

এডওয়ার্ড কলেজে চাকরি করবো- এটা ছিল আমার অনেক দিনের আশা। কেননা কলেজটি ছিল উন্নতমানের ও নামকরা। দ্বিতীয়ত, আমার নিজ থানা গুরুদাসপুরের কাছে অবস্থিত। পাবনায় থাকার সুযোগ পেলে পশ্চাৎপদ চলনবিল অঞ্চলের জন্য কিছু করার সুযোগ পাব। এটাই ছিল চিন্তার বিষয়। ১৯৫২ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে রসায়ন বিষয়ে এমএসসি পরীক্ষা দেই। আবাসিক ছাত্র ছিলাম সলিমুল্লাহ মুসিলম হলের। শেখ মুজিব (বঙ্গবন্ধু) তখন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। তিনি বাইরে বাস করলেও এস এম হলের অ্যাটাচী ছিলেন। সেই সুবাদে ও বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায়ই সাক্ষাৎ হোত। আমাদের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্টতা ছিল। তিনি যুক্ত ফ্রন্টের আমলে দুর্নীতি দমন দপ্তরের মন্ত্রী থাকাকালে কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছিলাম। তাঁর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয় ১৯৭৪ সালে রাজশাহী শহরে।

এমএসসি পরীক্ষা শেষ করে আমি ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানার কলাতিয়া স্কুলে কয়েক মাস শিক্ষকতা করি। পরীক্ষার ফল বের হলে তৎকালীন খুলনা জেলার সাতক্ষীরা কলেজে রসায়ন বিষয়ের শিক্ষকরূপে যোগদান করি ১৯৫৩ সালের আগস্ট মাসে। কয়েক মাস পর সাতক্ষীরা কলেজ ছেড়ে রংপুর জেলার গাইবান্ধা কলেজে যাই। গাইবান্ধা কলেজে থাকাকালে ১৯৫৫ সালে আমি একদিন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বেড়াতে আসি এবং অধ্যক্ষ এন আর রায় মহাশয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমার সঙ্গে আলাপ করে আমার বি এস সি এবং এম এস সি-র  রেজাল্ট জেনে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি এডওয়ার্ড কলেজে আসতে চান?’ আমি সম্মতি জানালে তিনি বলেন, ‘আগামী মাসে প্রথম সপ্তাহেই নিয়োগপত্র পাঠাব। পেলেই চলে আসবেন।’ আমি তাঁকে কথা দিয়ে বিদায় গ্রহণ করি। গাইবান্ধা কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাই। কিন্তু পরবর্তী মাসের ১৫/২০ তারিখের মধ্যেও নিয়োগপত্র পাইনা। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমার নাম প্যানেলে দুই নম্বরে আছে। এক নম্বরে আছেন- মুরারী মোহন চক্রবর্তী এম এসসি (ফার্স্ট ক্লাশ)। তাঁকে নিয়োগ করা হয় এবং তিনি যথাসময়ে কাজে যোগদান করেন। খবরটি জেনে স্বভাবতই মন খারাপ হয়। আমি গাইবান্ধা কলেজ থেকে বিদায় নিয়ে নভেম্বর মাসে রংপুর কারমাইকেল কলেজে যোগদান করি। কয়েক মাস পর এডওয়ার্ড কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক বন্ধুবর আবদুুল কাদের-১ আমাকে চিঠি লিখে জানান, রসায়নের নতুন শিক্ষক মুরারী বাবু চলে গেছেন। অধ্যক্ষ মহাশয় আপনাকে নিতে ইচ্ছুক, শীঘ্র চলে আসুন। আমি তাঁকে জানাই- নিয়োগপত্র না পেলে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। এক সপ্তাহ পর নিয়োগপত্র পেয়ে এডওয়ার্ড কলেজে এসে যোগদান করি।

প্রথম দিন আমাকে কোন ক্লাশ নিতে দেয়া হয়না। পরদিন থেকে ক্লাশ নিতে শুরু করি। পূর্বে আমি যে কয়টি কলেজে ছিলাম, সেখানে একাদশ শ্রেণীর প্রথম দিন রসায়নের ক্লাশে কতিপয় বিজ্ঞান ভিত্তিক খেলা বা ম্যাজিক  দেখিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের রসায়ন বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রয়াস পেতাম। এডওয়ার্ড কলেজে তার ব্যতিক্রম হয়নি। রসায়ন বিজ্ঞানে মজার মজার খেলা নিয়ে পরবর্তীকালে আমার ‘রসায়নের তেলেসমাতী’ বই প্রকাশ করি ।

আমার পূর্ববর্তী কলেজসমূহে বিজ্ঞান প্রদর্শনী করেছিলাম। এর উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রছাত্রী ও জনগণের মধ্যে বিজ্ঞান মনন সৃষ্টি করা। এডওয়ার্ড কলেজে এসে মাননীয় অধ্যক্ষ ও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে পর পর কয়েক বছর তিনদিনব্যাপী বিজ্ঞান প্রদর্শনী করা হয়। প্রদর্শনী দেখার জন্য এত দর্শকের ভীড় জমতো, যা নিয়ন্ত্রণ করা ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। বিজ্ঞান বিভাগের সকল শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, বেয়ারা সবাই বিজ্ঞান প্রদর্শনীর সাফল্যের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। এমনকি বয়োবৃদ্ধ অধ্যাপক মাখনবাবু, বসন্তবাবু ও মণিবাবু পর্যন্ত অসাধারণ পরিশ্রমের ফলে গলদঘর্ম হয়ে উঠতেন। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকার প্রতি বৎসর বিজ্ঞান মেলার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু সে-সব অত্যন্ত গতানুগতিক ও নিষ্প্রভ।

আর একটি ব্যাপারে ছাত্রদের বিশেষ উৎসাহ পেয়েছি। তা হল, প্রতি বৎসর বি এস সি ক্লাশের ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা সফর ও বিভিন্ন শিল্প কারখানা দেখানো। এজন্য তাদের সামান্য বিশ-ত্রিশ টাকা বাসভাড়া বাবদ দিতে হলেও তারা যা শিক্ষা লাভ করতো- তা পরিমাপ করা যায় না। বিভিন্ন স্থানের শিল্পপতি ও কারখানার কর্মকর্তাগণ সফরকারী ছাত্রছাত্রীও শিক্ষকদের জন্য রাজকীয় আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন।

এডওয়ার্ড কলেজে এসে এক ব্যাপারে খুবই অসুবিধায় পড়ি। সামান্য খাম, পোস্ট কার্ড কিনতে বা চিঠি পোস্ট করতে অনেক দূরে হেড পোস্ট অফিসে যেতে হয়। পোস্ট অফিসের সঙ্গে আমার নিত্যদিনের সম্পর্ক ছাত্র জীবন  থেকে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী খুলনার আবদুস সবুর খানকে চিঠি লিখে এডওয়ার্ড কলেজে একটি  পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করি। অতঃপর তিনি পাবনায় সফরে এলে তাঁর সঙ্গে সার্কিট হাউসে সাক্ষাৎ করে পাবনায় একটি নৈশ পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠার দাবি জানাই। তিনি সেইদিনই পাবনা প্রধান ডাকঘরে নৈশ পোস্ট অফিস খুলে দেন।

কলেজটিতে আর একটি অভাব অনুভব করি। কলেজ গেটের দক্ষিণ পাশে ছিল ছোট একখানা টিনের নামাজের ঘর, যেখানে বিশ জনেরও একসঙ্গে জামাতে নামাজ আদায়ের স্থান সঙ্কুলান হোতনা। মুসলমান ছাত্রদের নামাজ পড়ায় কিছুটা উৎসাহিত করায় ধীরে ধীরে নামাজীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। মাথায় চিন্তা জাগে, কি করে কলেজে একটি মসজিদ করা যায়? মুসলিম ছাত্র ও শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনা সভা করে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অধ্যাপক কে এম টি হোসাইন সাহেবকে সভাপতি এবং অধ্যাপক হালিমুজ্জামান খানকে সম্পাদক করে একটি ‘মসজিদ প্রতিষ্ঠা কমিটি’ গঠিত হয়। প্রত্যেক মুসলিম ছাত্র বেতনের সঙ্গে এক টাকা মসজিদের জন্য আর আট আনা (৫০ পয়সা) ইসলামী পাঠাগারের জন্য দিতে সম্মত হয়। অধ্যক্ষ এন আর রায় মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে কলেজ অফিসে বেতনের সঙ্গে মসজিদের টাকা আদায় হতে থাকে। পাবনার হাজী আবদুর সোবহান ও আরো কতিপয় ব্যক্তি কলেজে মসজিদ হবে জেনে স্বেচ্ছায় এসে অর্থ দান করে যান। তখন কলেজে মুসলিম ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। প্রতি মাসে মসজিদের জন্য টাকা জমা হতে থাকে। এই সময়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান পাবনা সফরে আসেন। মসজিদের সাহায্যের জন্য তাঁর কাছে একখানা দরখাস্ত পেশ করা হয়। তিনি দশ হাজার টাকা মঞ্জুর করেন। অতঃপর ইট কিনে ফুরফুরা শরীফের পীর হজরত আবদুুল হাই সিদ্দিকী সাহেবের হাতে মসজিদের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে বর্তমান দ্বিতল কলেজ মসজিদ ও ইসলামী পাঠাগার।

১৯৬৬ সালে আমার উপর এডওয়ার্ড কলেজের টাউন হোস্টেলের সুপারের দায়িত্ব অর্পিত হয়। হোস্টেলটি ছিল  জেলা পাড়ায় শিল্প সঞ্জিবনী হোসিয়ারীর দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে (এডভোকেট আবদুর রাজ্জাক সাহেবের বর্তমান বাড়ি)। মাত্র ত্রিশ চল্লিশ জন ছাত্র হোস্টলে থাকতো। তাদের অধিকাংশই চাপাইনবাবগঞ্জের। এ কারণে  হোস্টেলটি ‘চাপাই নবাবগঞ্জ মেস’ নামে পরিচিত ছিল। প্রকৃতই এটা ছিল এক পরিত্যক্ত ভাঙ্গা দালানে এক প্রাইভেট মেস। ছাত্রদের নিরাপত্তা ও দেখাশোনার জন্য অধ্যক্ষ কর্তৃক প্রতি তিন বছর মেয়াদের জন্য একজন অধ্যাপককে সুপার নিয়োগ করা হোত। মেসটিকে কলেজ হোস্টেলে রূপদানের ইচ্ছায় ভবনটির কিছু সংস্কার, নামাজের ঘরের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের ব্যবস্থা, মাঝে মাঝে ছুটির দিনে ছাত্রদের নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযান করতাম। তাদের নিয়ে প্রতি শুক্রবারে বাদ জুমা সাহিত্যসভা, স্বরচিত কবিতাপাঠ, ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক আলোচনা, বিতর্ক সভা ইত্যাদির ব্যবস্থা করতাম। ছাত্রদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করার ফলে টাউন  হোস্টেলের ছাত্রদের পরীক্ষার ফল  ‘মেইন’ হোস্টেলের চেয়ে ভাল হোত। প্রায় সকল পরীক্ষার্থীই ভালভাবে পাশ করতো। সর্বাধিক গৌরবজনক বিষয় ছিল- টাউন হোস্টেলের প্রতিটি ছাত্র নিয়মিত নামাজ পড়তো। কলেজের বিভিন অনুষ্ঠানে তাদের অনেককেই নেতৃত্ব দিতে দেখা যেতো।

পরবর্তীকালে রসায়ন বিভাগে শিক্ষক ছিলেন আবদুুল হালিম শিকদার, বয়েনউদ্দিন আহম্মেদ, মোহাম্মদ আলী, আবদুর রশিদ, রহমতুল্লাহ, দলিল উদ্দিন মন্ডল ও আকমল হোসেন। প্রদর্শন শিক্ষক ছিলেন মকবুল হোসেন বিশ্বাস

ও মোজাম্মেল হোসেন। বেয়ারার সুরেন, নরেশ, আ. ওয়াহেদ, নুরুল ইসলাম, আবদুুল আজিজ, নাসির উদ্দিন ও আবদুল কাদের। সবার মুখ মনের মুকুরে ভেসে উঠছে।

প্রাইভেট কলেজ হেতু এডওয়ার্ড কলেজে চাকরীর পাশাপাশি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস-এর চীফ কেমিস্ট (১৯৫৬-৬৮) এবং পাবনা মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন বিষয়ের শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতাম। ১৯৫৮ সাল থেকে প্রায় এক যুগ ধরে পাবনা থেকে প্রকাশ করতাম মাসিক ‘আমাদের দেশ’ পত্রিকা। পত্রিকাটির ইংরেজী সংস্কর ‘আওয়ার হোম’ লন্ডন থেকে এবং উর্দু সংস্করণ ‘হামারা ওয়াতান’ প্রকাশিত হোত। তিনটিরই প্রধান সম্পদাক ছিলেন রায়গঞ্জ থানার চান্দাইকোনার ব্যারিস্টার এ এম আব্বাস। তিনি লন্ডনে থাকতেন। সকল ছাত্র ‘আমাদের দেশ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক ও কর্মী ছিল। পরবর্তীকালে তারা নামকরা সাহিত্যিক ও সাংবাদিকের মর্যাদা লাভ করে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।

‘আমাদের দেশ’ ও চলনবিল অঞ্চলের কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনা ছাড়াও আমাকে ঢাকার ‘দৈনিক পয়গাম’ পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা, কোয়েটার ত্রিভাষী পত্রিকা  ‘বোলানের ডাক’-এর নিজস্ব প্রতিনিধি, ‘আওয়ার হোম’ পত্রিকার পাকিস্তানের প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করতে হোত। এছাড়া বই লেখার প্রতিও কিছুটা  ঝোঁক ছিল। এডওয়ার্ড কলেজে থাকাকালীন সময়ের মধ্যে আমার লেখা ‘চলনবিলের ইতিকথা’ ‘জ্ঞানের মশাল’ ‘কর্মবীর সেরাজুল হক’ ‘পল্লী কবি কারামত আলী’ ‘পশ্চিম পাকিস্তানের ডাইরী’ ও কয়েকখানা কলেজ পাঠ্য বই পাবনা থেকে প্রকাশ করি। আমার উদ্যোগ ও সহায়তায় পাবনা শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়- পাবনা শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ সমিতি, মোজাহিদ ক্লাব, অভিযান ক্লাব, পৈলানপুর যুবক সমিতি, জেলাপাড়া মাতৃমঙ্গল সমিতি, রাধানগর নারীকল্যাণ সমিতি, পাবনা বিজ্ঞান সমিতি, পাবনা জেলা সাহিত্য পরিষদ, পাবনা সাহিত্য মজলিশ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। এতদ্ব্যতীত পাবনা ইসলামিয়া কলেজ পরবর্তীকালে শহীদ বুলবুল কলেজ, পাবনা মহিলা কলেজ ও আইন কলেজ প্রতিষ্ঠায় আমার বিশেষ ভূমিকা ছিল।

১৯৬৮ সালের ১লা মার্চ এডওয়ার্ড কলেজ সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়। রসায়ন বিভাগের একমাত্র আমি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাই। রসায়ন বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকগণ প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। আমার সহকর্মী ও প্রাক্তন ছাত্র আবদুল হালিম শিকদার আমার পরেই ছিলেন রসায়ন বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক। তাকে সহকারী অধ্যাপক না করায় তিনি অত্যন্ত মনক্ষুণœ হন। তার জন্য আমি ঢাকায় গিয়ে প্রায় সপ্তাহ ধরে তদবীর করার ফলে তিনি সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে যশোহর এম. এম. কলেজে বদলী হন। অতঃপর ১৯৬৯ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর আবদুল হালিম শিকদার যশোহর এম.এম. কলেজ হতে বদলী হয়ে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আসেন। আমি তাঁকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে তার ছেড়ে আসা যশোহর এম. এম. কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদেই যোগদান করতে যাই। এখানেই অবসান ঘটে আমার এডওয়ার্ড কলেজে সাড়ে  তের বছর চাকুরী জীবনের।

[বি:দ্র : লেখাটি এডওয়ার্ড কলেজ শতবর্ষ উৎসব স্মারক থেকে সংকলিত।]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।