রুমী খোন্দকার

তের মাস শুধু দুটি শব্দ‘তের মাস ’। অথচ এই দুটি শব্দের ভেতর কত দীর্ঘ অপেক্ষা, কত অশ্রু, কত না-বলা কথা, কত অসহ্য শূন্যতা জমে আছে- তা কেবল একজন সন্তানহারা বাবা-মাই জানেন। তের মাস আগে  একমাত্র সন্তান জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। সময় তার নিয়মে এগিয়ে চলেছে। দিন পেরিয়ে মাস হয়েছে, মাস পেরিয়ে বছরেরও বেশি। পৃথিবীর কোনো কিছুই থেমে থাকেনি। শুধু আমাদের ভেতরের একটি জায়গা সেই দিনটিতেই থেমে আছে। আমরা থেমে গেছি একটি শূন্যতার কাছে।

মৌমিতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনা করেছে। সে চারুকলা বিভাগের ৪২তম ব্যাচের (২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী ছিল। সেই একই বিভাগে ২০১৯ এর ৯ ডিসেম্বর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে শেষ পর্যন্ত সহকারী অধ্যাপক হয়েছিল। যে বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষাজীবনের অংশ ছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেÑএটি ছিল আমাদের জন্য গভীর আনন্দ ও গর্বের বিষয়।

মৌমিতা খুব চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে ছিল। অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত কথা বলত না। নিজের কথা নিজের মধ্যেই রাখত। কিন্তু তার নীরবতার মধ্যেও ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা। ছিল ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কোনো অহংকার ছিল না। বিনয় ছিল তার স্বভাবেরই একটি অংশ। তাকে দেখলেই বোঝা যেত, সে নিজের একটি স্বতন্ত্র জগৎ নিয়ে চলতে জানত।

গত বছর ১১ সেপ্টেম্বর ছিল জাকসু নির্বাচন। রাত ১২টা পর্যন্ত ভোট গণনা শেষে কোয়ার্টারে ফিরে আমায় ফোন দিল। ফোনটা প্রথমবার বাজতেই আমি ধরি নাই। সারাদিন ভোটের সঙ্গে যুক্ত থেকে ক্লান্তির বিষয় মাথায় রেখে ভেবেছিলাম এখন আর ধরব না! ২ মিনিট পর আবারও রিং হলো। সেটাও ধরলাম না। তৃতীয়বার ফোনের স্ক্রিনে ‘মৌ’ নামটা উঠতেই একটু উতলা হয়ে ধরলাম।

-আব্বু, কোনো বিপদ হয়নি তো?

ওপাশ থেকে মৌ তার চিরচেনা শান্ত, নিবিড় গলায় বলল-

– কিছু না আব্বু… তুমি রিডিং রুমে? পড়ছ এখনও?

আমি নিঃশ্বাস ফেলে বললাম-

– না আব্বু, চশমাটা টেবিলে রেখে একটু জিরোচ্ছিলাম। এত রাতে খামখেয়ালি করে ফোন দিলে কেন বল তো?

মৌ ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নিথর নীরবতা রেখে ধীরস্বরে বলল-

-আচ্ছা আব্বু, তুমি জিরোও। ঘুমিয়ে পড়ো।

পরদিন লাল ইটের ক্যাম্পাসটায় যখন সকালের আলো ফুটল, আমি ওকে  কল করলাম। একটু  হেসেই জিজ্ঞেস করলামÑ

-কাল রাতে অসময়ে বারবার ফোনে কড়া নাড়ছিল কেন, আব্বু?

মৌ বিষণ্ণ অথচ মিষ্ট একটা হাসি দিয়ে বলল-

-এমনিই… হঠাৎ মনে হলো তোমার গলাটা একটু শুনি।

আমি আর উত্তর দিতে পারিনি। কথাগুলো বুকের ভেতর এক অলৌকিক হাহাকার তৈরি করেছিল। পরে শুনলাম, ১২ সেপ্টেম্বর সিনেট ভবনে ভোট গণনাকালীন উপস্থিত সময়ে মেয়েটি হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেছে- আজও ঝরা পাতার শব্দ হলে কিংবা ওই ক্যাম্পাসের ছায়াবীথিতে দাঁড়ালে মনে হয়, ও ঠিক ওপাশ থেকেই আমায় ডাকছে। ছায়াময় সেই গলাটা আজও আমার বুকের কোণে একইভাবে প্রতিধ্বনি তুলে যায়।

আমরা দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। পাবনায় আমাদের বাড়ি। মৌমিতা পাবনা থেকেই এইচএসসি শেষ করেছিল। সেই বাড়ি, সেই শহর, সেই পরিচিত পথ-সবকিছুর সঙ্গেই তার শৈশব ও কৈশোরের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজ সেই বাড়িতে আমরা দুজনÑবাবা ও মা। আর কেউ নেই।

বাড়িটি আছে। ঘরগুলো আছে। আসবাবপত্র আছে। কিন্তু মৌমিতা নেই। তার শৈশবে ব্যবহার করা কত জিনিস আমরা আজও যতœ করে সাজিয়ে রেখেছি। সেগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, এই তো সেদিনও সে ছিল। তার ছোটবেলার স্মৃতিগুলো যেন জিনিসগুলোর মধ্যেই জমে আছে।

ডাইনিং টেবিলে তার চেয়ারটি এখনো আছে। তার থালাটিও যেন আগের মতোই রাখা। কতবার মনে হয়, একটু পরেই হয়তো সে এসে সেই চেয়ারে বসবে আমার গা ঘেষে। খাবার টেবিলে বসে হয়তো দু-একটি কথা বলবে। কিন্তু সে আর আসে না। একটি চেয়ার কতটা শূন্যতা বহন করতে পারে, একজন সন্তানহারা বাবা-মা তা জানেন।

মৌমিতার রুমে গেলে কখনো কখনো মনে হয়, সে যেন এইমাত্র বেরিয়ে গেছে। তার পরিচিত জিনিসগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। অথচ মানুষটি নেই। এই না-থাকার অনুভূতিই সবচেয়ে কঠিন। বাড়ির প্রতিটি কোণে তার শৈশব আজও বেঁচে আছে।

একজন বাবা-মা সন্তানের মৃত্যুর পর শুধু একজন প্রিয় মানুষকে হারান না; হারান নিজেদের ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মৌমিতা ছিল আমাদের একমাত্র সন্তান। তার কোনো ভাই-বোন নেই। আমাদের বয়সের এই সময়ে এসে তার চলে যাওয়া যেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটি বিশাল দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো।

এক বছরের একটু বেশি  হয়ে গেল। তবু শোকের কোনো বার্ষিকী হয় না। ক্যালেন্ডারে একটি তারিখ আসে, চলে যায়; কিন্তু বাবা-মায়ের হৃদয়ে সেই দিনটি প্রতিদিন ফিরে আসে। মৌমিতাকে আমরা আর ছুঁতে পারব না, তার কণ্ঠ আর শুনতে পাব না, তার সঙ্গে বসে কথা বলতে পারব না। কিন্তু তার স্মৃতিকে তো কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।

মৌমিতা, তুমি ছিলে আমাদের একমাত্র সন্তান। তাই তোমার চলে যাওয়ার পর আমাদের পৃথিবীটা যেন সত্যিই অর্ধেক নয়, অনেকটাই শূন্য হয়ে গেছে। তোমাকে নিয়ে আমাদের যে স্বপ্ন ছিল, তার অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেল। কিন্তু তোমার জীবন বৃথা যায়নি। তুমি পড়েছ, জেনেছ, শিক্ষকতা করেছ, শিক্ষার্থীদের তথা পুরো ডিপার্টমেন্টের  ভালোবাসা পেয়েছ এবং নিজের মতো করে একটি জীবন গড়ে তুলেছিলে। তোমার বাবা-মা হিসেবে এটাই আমাদের সান্তনা- তুমি আমাদের সন্তান হয়ে এসেছিলে, কিন্তু তোমার নিজের আলোয় তুমি একজন স্বতন্ত্র মানুষ হয়ে উঠেছিলে। তোমার ডিপার্টমেন্ট ’তুমি রবে নীরবে’ শিরোনামে স্মরণানুষ্ঠান করেছে।

আজ তোমার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তোমাকে শুধু একটি কথাই বলতে চাই-মৌমিতা, তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ, কিন্তু আমাদের জীবন থেকে চলে যাওনি। পাবনার সেই বাড়িতে তোমার চেয়ার, তোমার থালা, তোমার শৈশবের জিনিসপত্র যেমন তোমাকে ধরে রেখেছে, তেমনি আমরা তোমাকে ধরে রেখেছি আমাদের স্মৃতির প্রতিটি পাতায়। তুমি ছিলে, তুমি আছÑআমাদের স্মৃতিতে, আমাদের নিঃশ্বাসে, আমাদের নীরবতায়। আল্লাহ আমাদের প্রিয় মৌমিতাকে মা করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, তাঁকে শান্তি দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।

রুমী খোন্দকার : প্রয়াত জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতার বাবা। পেশায় তিনি শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং কবি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।