আহমেদ হুমায়ুন কবীর তপু
চলনবিলের দেশি প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছের স্বাদ এখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত হয়ে উঠেছে। অথচ উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এখানকার মাছ ভারতের কোলকাতার বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ অঞ্চলে ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। তখন ছিল ‘মাছের ট্রেন’ নামে একটি বিশেষ ট্রেন। চলনবিলের ইতিহাস থেকে জানা গেছে ট্রেনটি রাতভর চলনবিলের পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মাছ নিয়ে পৌঁছে যেত কোলকাতায়।

চলনবিলের মাছ কোলকাতার বাণিজ্যিক বাজারে নিয়ে যেতেই ১৯১৫ সালে চলনবিলের বুক চিড়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বিশাল রেলপথ, যা এখন উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও অনেকদিন সেই ট্রেনের চলাচল ছিল। সে সময় মৎস সম্পদের প্রাচুর্যকে কাজে লাগিয়ে চলনবিলের অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। তবে কালের বিবর্তনে চলনবিলের মৎস সম্পদের সেই সোনালি অতীত এখন রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছে।
কারণ দিনে দিনে ছোট হতে হতে চলনবিল এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তারপরেও উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ মাছের আবাসস্থল চলনবিল। অবশ্য এখানকার মাছ রাজধানিসহ বড় শহরের বাজারগুলোতে পাওয়া গেলেও, আসলে এসব মাছের বেশিরভাগই চাষ করা মাছ।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেশের অন্যতম বৃহত্তম বিল চলনবিলের পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা ও ফরিদপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ ‘কারেন্ট’ জাল আর ‘চায়না দুয়ারি’ জালের অবাধ ব্যবহারে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে মাছ আর চলনবিলের জলজ জীববৈচিত্র্য। এসব অতি সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত জালে ধরা পড়ছে অতি ক্ষুদ্র পোনা থেকে শুরু করে সব ধরণের জলজ প্রাণী। ফলে কমে যাচ্ছে দেশিয় প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছের বংশবৃদ্ধি। আর এতে করেই দিনে দিনে কমছে চলনবিলের দেশি প্রজাতির মাছ। বর্ষার পানি নেমে যেতেই বিস্তীর্ণ চলনবিলের শুকিয়ে যাওয়া জলরাশিতে মাছের বংশ নির্বংশ করতে নির্বিচারে চলছে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার।

কথা হয় বেশ কয়েকজন ভূক্তভোগীর সঙ্গে। তাঁদের একজন চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল গ্রামের জেলে হামিদুল ইসলাম। বর্ষার শেষ দিকে বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও খেওয়া জাল দিয়ে কয়েক ঘণ্টায় তিনি ২ থেকে ৩ কেজি মাছ ধরতে পারতেন। কিন্তু এখন দলবেধে সারাদিন নৌকা নিয়ে যৌথভাবে ৫ থেকে ৮ কেজির বেশি পান না, যা ভাগ করে নিলে একজনের ভাগে এক কেজিও পড়ে না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে চাটমোহর, ভাঙ্গুরা ও ফরিদপুর উপজেলায় অবৈধ ‘বাদাই’ ও ‘কারেন্ট’ জালের ব্যবহার এখন অতি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর চেয়েও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। বাক্স আকৃতির এই জালে একবার যেকোনো মাছ বা জলজ প্রাণী ঢুকলে আর বের হতে পারে না। ফলে পোনা মাছ, মা মাছের পাশাপাশি কচ্ছপ ও সাপের মতো বিভিন্ন জলজ প্রাণীও এতে আটকে মারা যাচ্ছে।
ঋতুভিত্তিক জেলে আবদুল আলিম বলেন, ‘বর্ষায় পানি কম থাকায় সাধারণ জালে মাছ পাওয়া যায় না। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে রাতে চায়না দুয়ারি জাল পেতে রাখেন। প্রথমে এ জালে ৫/৭ কেজি মাছ পাওয়া গেলেও এখন সারাদিনে ১/২ কেজির বেশি ছোট মাছ মেলে না।’ হান্ডিয়াল গ্রামের বয়োবৃদ্ধ সৃষ্টি হালদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘তিন-চার দশক আগেও খেওয়া বা বেড় জাল দিয়ে দিনে ৮/১০ কেজি বড় মাছ ধরা যেত। গত দুই দশকে মাছ কমে যাওয়ায় জেলেরা কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জালের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই জালের ক্ষতিকর প্রভাব দেখে আমি বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে এখন সেলুনে কাজ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে আমরা যখন জালে মাছ ধরেছি তখন ছোট পোনা মাছ ধরা পড়েনি। ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ভরা মৌসুমে স্বাভাবিকভাবে যে মাছ পাওয়া গেছে, তা ডিঙ্গি নৌকায় বয়ে নিয়ে আসতেও বেগ পেতে হয়েছে। অনেক সময় জাল কেটে অতিরিক্ত মাছ বিলেই ফেলে দিতে হয়েছে। সে সব এখন অতীত! এখন যেভাবে বিধ্বংসী জাল দিয়ে ডিমওয়ালা মাছ থেকে শুরু করে পোনা মাছ পর্যন্ত ধরে নেয়া হচ্ছে, তাতেকরে মাছের বংশ বৃদ্ধি মারাতকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামি কয়েক বছরের মধ্যে চলনবিলের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাবে।’

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর গবেষণা বলছে, একসময় চলনবিলে ৮১ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে ২৭টি প্রজাতিই চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি বিলুপ্তপ্রায় এবং ৫টি অতি বিপণœ। গবেষণায় দেখান হয়েছে, ১৯৮২ সালের আগে বিলের যেখানে বার্ষিক প্রাকৃতিকভাবে ২৫,০০০ টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হতো, ২০০৭ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২,২১৭ টনে। জলাশয় সংকোচন, কৃষিজমির রাসায়নিক বর্জ্য এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহারই মাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ।
চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিবেশকর্মী মিজানুর রহমান জানান, সনাতন জালে ছোট মাছ ও পোনা বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু আধুনিক সূক্ষ্ম জালের কারণে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
এদিকে এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনার আতাইকুলা, ডেমরা ও হাদলসহ বিভিন্ন গ্রামে ঘরে ঘরে নিষিদ্ধ জাল তৈরির কারখানা অবৈধভাবেই গড়ে উঠেছে। শুধু ডেমরা এলাকায়ই রয়েছে অন্তত ২ শতাধিক কারখানা। স্থানীয় নারীরাও বাড়িতে বসে দিনভর চায়না দুয়ারি জাল তৈরির কাজ করছেন।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, ‘সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বিলের পানি কমতে থাকলে মাছ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করে, আর তখনই জালের ব্যবহার বেড়ে যায়। কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মাছ। এখন বাজারে যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে তার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করা হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে।’ তাঁর মতে, চলনবিলেরপ্রাকৃতিক মাছ রক্ষা করতে হলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান করলেই হবে না, জনসাধারণকেই সচেতন হতে হবে। ক্ষতিকর জালের ব্যবহার, এবং মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার না কমালে আগামি দিনে বিলীন হওয়ার অবস্থায় চলে যাবে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন।
সূত্র : চলতি (অক্টোবর ২০২৬) সংখ্যা সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত