[১৯৮৭-এর নভেম্বর। সারাদেশ উত্তাল। সামরিক জান্তা এবং তার মিত্ররা গণআন্দোলন রুখতে পারছিল না। লাঠি-গুলি উপেক্ষা করে মানুষ রাজপথ কাঁপিয়ে শ্লোগান তুলছিলেন। সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠছিল। এই অবস্থায় জারি করা হয় জরুরি আইন। নিষিদ্ধ হয় সব ধরণের মিছিল, সমাবেশ এবং রাজনৈতিক কর্মকা-। একসঙ্গে চারজন চলাফেরাও নিষিদ্ধ করা হয়। দেখামাত্র গুলির হুকুম দেওয়া হয়। এমন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আত্মরক্ষার জন্য রাজনীতিকরা তড়িৎ পাবনা শহর থেকে উধাও হয়ে চলে যান প্রত্যন্ত গ্রামে। লড়াইয়ের ময়দান ফাঁকা হয়ে যায়। তবে শহরে রয়ে যান শুধু দু:সাহসিক সাংস্কৃতিক কর্মীরা। প্রয়োজনের তাগিদে তারাই তখন রচনা করেন সাড়া জাগানো ইতিহাস। এটি ছিল পাবনার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল এবং অনন্য ঘটনা। সেই ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়েই এ প্রতিবেদন। সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদক সংশ্লিষ্টদের স্মৃতিকথাসহ বিভিন্ন গ্রন্থ ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের আলোকে পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।]
[লেখাটি সম্প্রীতি’র ১৪ মে ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।]

ক’দিন আগে থেকেই পাবনার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ঘনঘন বৈঠকে বসছিল। স্মরণীয় দিন ছিল ২৬ নভেম্বর। গোয়েন্দারা হন্যে হয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠকদের অবস্থান খুঁজছিল। তাই খুব সতর্কভাবে বিকেলের দিকে গোপন বৈঠক ডাকা হয় বনমালী ইনস্টিটিউটে। কর্মচারিদের আগেই বলে রাখা ছিল। যথাসময়ে বৈঠকে বসেন ১১টি নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়ে গড়ে তোলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রধানরা। গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় উপস্থিত ছিলেন জোটের অন্যতম সংগঠক আবুল হোসেন খোকন, গণশিল্পীর মোসফেকা জাহান কণিকা, সমজিৎ পাল, মতিনুল হাসান মতিন, নূর উজ জামান খোকন, সাব্বির আহমেদ খান লেনিন, উদীচীর বিপ্লব ভট্টাচার্য, আবৃত্তি সংসদের সরোয়ার খান মিলন, থিয়েটার ৭৭-এর কোবাদ আলী, আবুল কাশেম, গৌতম দাস, রবিউল ইসলাম, অনুশীলন আশির আবদুল হান্নান শেলী, ফরিদুল ইসলাম খোকন, ড্রামা সার্কেলের গণেশ দাস, থিয়েটারের আমিনুর রহমান সোনাই, খেলাঘর আসরের অঞ্জন রায়, মহিলা পরিষদের মীরা রায়, গাংচিল সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের খালেদ হাসান মিলন, মিজানুর রহমান চাঁদ, মতি স্মৃতি সংঘ ও গোপালপুর ক্লাবের আরও কয়েকজন। আলোচনার পর ঠিক হয়, লিফলেট তৈরি করে দুই-তিনদিনের মধ্যে বিলি করা হবে। এর ড্রাফট করার দায়িত্ব আবুল হোসেন খোকনের। এরসঙ্গে ঠিক হলো ২৮ নভেম্বর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে সাংস্কৃতিক ও নাট্য কর্মিরা বিক্ষোভ মিছিল বের করবে। ব্যানারে লেখা থাকবে ‘হটাও এরশাদ বাঁচাও দেশ’। সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে গেল। সবাই যার যার মতো কর্মসূচি সফল করার কাজে বেরিয়ে পড়লেন।
২৭ নভেম্বর দিনভর বাছাবাছা কর্মি-সংগঠকদের প্রস্তুত করা হয়। সামরিক জান্তাবিরোধী এ মিছিলে সবাইকে রাখতে চাওয়া হয়নি। কারণ, কোনো রকম বিপদ ঘটলে বা হামলার শিকার হলে যাতে ব্যাকআপ না হারিয়ে যায়। তাই সব সংগঠন মিলে এভাবে হাতেগোনা ৫০/৬০ জনকে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এদিনই সন্ধ্যে বেলায় এলো বিপদজনক খবর। রেডিও-টিভিতে প্রচার হলো, সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। সব ধরনের সভা-সমাবেশ-মিছিল-রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ। একসঙ্গে চারজনের বেশি চলাচলও নিষিদ্ধ। সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকবে প্রতিদিন। কেউ বাইরে বের হওয়ামাত্র গুলি করা হবে। আরওসব বিধিনিষেধ জারির কথা প্রচার হলো।
সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মিরা গাঢাকা দিলেন। চলে গেলেন শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে। আশঙ্কা-বিডিআর এবং সামরিক বাহিনী কম্বিং অপারেশন চালাবে। রক্ষা পাওয়ার জন্যই তারা আত্মগোপনে গেলেন। মুহূর্তেই শহর নেতা-কর্মি শূন্য হয়ে পড়লো। আন্দোলনে থাকা অন্যসব পেশাজীবী সংগঠনের নেতা-সংগঠনকরাও শহর ছেড়ে চলে গেলেন।
রইলো শুধু সাংস্কৃতিক ও নাট্য সংগঠনের সংগঠকরা। এই বাস্তবতায় তারা কি করবে? বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো। তবে নিশ্চিত ছিল- গণশিল্পী থেকে কিছু না করলে আর কেউ কিছু করার চিন্তাও করবে না। তাই গণশিল্পীর উদ্যোক্তারা ভাবলেন, এই মুহূর্তে যদি গণশিল্পী ভূমিকা না রাখে তাহলে কালকের (২৮ নভেম্বর) কর্মসূচি হবে না।

তখন আবুল হোসেন খোকন এবং নূর উজ জামান খোকন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। তারপর দুজন বসলেন গণশিল্পীর সাধারণ সম্পাদক মোসফেকা জাহান কণিকার সঙ্গে। তারা সিদ্ধান্ত ঠিক করে ফেললেন। তা হলো- ২৮ নভেম্বর কর্মসূচি পালন করা হবেই। কোনো রকম পিছুহটা নয়। কথা পাকা করে অন্যদের মোটিভেট করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন দুজন। নূর উজ জামান খোকনকে অন্য দায়িত্ব দিয়ে আলাদা করে দিলেন আবুল হোসেন খোকন। তারপর যোগাযোগ করলেন উদীচী, থিয়েটার ৭৭, অনুশীলন আশি, থিয়েটার, খেলাঘর আসর, মহিলা পরিষদসহ সবগুলো সংগঠনের মূল নেতাদের সঙ্গে। প্রথমে অবশ্য সবাই ঝুঁকি নিতে আপত্তি করছিলেন। পরে রাজী হলেন। সন্ধ্যারাত থেকে গভীররাত পর্যন্ত চললো যোগাযোগ। মিছিলকারীদের প্রস্তুত করার কাজ এভাবে শেষ হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাঁরা জরুরি আইন ভেঙে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেবেন তারা ১৯৮৭-এর ২৮ নভেম্বর ঠিক সকাল ১০টায় মিলিত হবেন। পয়েন্ট বনমালী ইনস্টিটিউটের চত্তর। সেখানে তিন থেকে পাঁচ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করা হবে না। এর আগেই মিছিলকারীদের কাছাকাছি থাকতে হবে। ১০টা বাজামাত্র পয়েন্টে সবাই বিদ্যুৎ গতিতে চলে আসবে। আর তারপরই ঝটিকা মিছিল বের হবে। কোনোরকম দেরি বা কারও জন্য অপেক্ষা করা হবে না।
এরমধ্যে এক কা- ঘটে যায়। কেমন করে যেন গোয়েন্দারা মিছিলের কর্মসূচি জেনে যায়। তবে তাদের জানায় বড় রকমের ভুল ছিল। তারা জেনেছিল এডওয়ার্ড কলেজ থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠকদের মিছিল বের হবে। সেখানেই সবাই জড়ো হবে। তাই ১০টার আগে থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ-বিডিআর তাদের ট্রাক-কনভয়ের বহর নিয়ে এডওয়ার্ড কলেজ এলাকায় অবস্থান নিয়ে ফেলে। ওই জায়গার রাজপথে ব্যারিকেড বসায়। মিছিলের আগেই এ খবর উদ্যোক্তারা পেয়ে যান।
তখন কাটায় কাটায় ১০টা। মুহূর্তেই বিভিন্ন দিক থেকে একে একে চলে আসেন সাংস্কৃতিক জোটের আবুল হোসেন খোকন, গণশিল্পীর নূর উজ জামান খোকন, মোসফেকা জাহান কণিকা, সাইফুল হক লিটন, সমজিৎ পাল, মতিনুল হাসান মতিন, উত্তম দাস, নির্মল দাস, হেমন্ত দাস, আলমগীর হোসেন, সাব্বির আহমেদ খান লেনিন, কামাল আহমেদ, রেজানুর রহমান রোজ, আশরাফুল ইসলাম দাউদ, নাজমুল হক মণ্টু, ড্রামা সার্কেলের গণেশ দাস, থিয়েটার-৭৭-এর কোবাদ আলী, গৌতম দাস, আবুল কাশেম, রবিউল ইসলাম, অনুশীলন আশি’র আবদুুল হান্নান শেলী, ফরিদুল ইসলাম খোকন, উদীচীর অমীয় চক্রবর্তী, আবৃত্তি সংসদের সারোয়ার খান মিলন, গাংচিলের খালেদ হাসান মিলন, ভাস্কর চৌধুরী, মিজানুর রহমান চাঁদ, খেলাঘরের অঞ্জন রায়, গণশিল্পীর আশরাফুল ইসলাম বাবুলসহ আটান্ন-ষাট জনের মতো সংগঠক। দু’মিনিটও দেরি করা হয়নি। কারণ গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা টের পেয়ে যেতে পারে।

ঝটপট ব্যানার হাতে ধরেই গর্জে উঠা হয়, ‘জরুরি আইন মানি না মানবো না’ ‘সামরিক জান্তার গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’ ‘রাজাকার-স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ‘জামাত-শিবির-রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’ ‘শিল্পী-জনতা এক হও’ ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই লড়াই করে বাঁচতে চাই’ ‘হটাও এরশাদ বাঁচাও দেশ’। বোমা বিস্ফোরণের মতো গর্জন ছড়িয়ে পড়লো। আকাশ-বাতাসসহ চারদিক কেঁপে উঠলো। এই গগনবিদারি আওয়াজের ভেতর দিয়ে মিছিল ছুটলো উত্তরের ট্রাফিক মোড়ের দিকে। মিছিলের গতি ছিল ডবলমার্চের মতো। শুরুতেই সামনে পড়লো ছয় রাইফেলধারী টহল পুলিশের দল। মিছিল এসব ভ্রুক্ষেপ করলো না। কিন্তু ঘটনা ঘটলো পুলিশের ভেতর। ওরা হয়তো কল্পনাও করেনি জরুরি অবস্থার ভেতর কেউ মিছিল বের করার দুঃসাহস দেখাতে পারে! যেহেতু গুলি চালানোর হুকুম উপেক্ষা করে মিছিল বের করা হয়েছে, সেহেতু তৈরি না হয়ে নিশ্চয়ই এটা করা হয়নি। নিশ্চয়ই মিছিলকারীদের হাতে সাংঘাতিক অস্ত্রশস্ত্র আছে। পুলিশের উপর নিশ্চয়ই তারা আক্রমন চালাবে। এই ভেবে পুলিশের দল সটান দাঁড়িয়ে পড়লো, তারপর ঘুরেই রাইফেল হাতে খিঁচে দৌড় মারলো উত্তরে থানার পথে। মিছিলের বেশ সামনেই তারা বুটের বিকট শব্দ তুলে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলো। মনে হলো মিছিল যেন পুলিশের দলকে ধাওয়া করে চলেছে। তখন মিছিলকারীদের মধ্যেও হঠাৎ বুলেট গতি পেয়ে বসলো। কারণ সবার মধ্যে দুঃসাহস আর শক্তি বেড়ে গিয়েছিল। ট্রাফিক মোড় পেরিয়ে মিছিল ঢুকলো ডানের আতাইকুলা সড়কে। আর পুলিশ চলে গেল সোজা রাস্তায় থানার দিকে।
দেখার মতো ঘটনা আরও ঘটলো। দৃশ্য দেখে রাস্তা এবং দু’পাশের দোকান-পাটের মানুষ প্রথমে হাততালি দিলেন। তারপর হঠাৎই সম্বিত ফিরে পেলেন। তারা মুহূর্তেই দৌড়াদৌড়ি আর দোকানপাট বন্ধ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বুঝতে পারছিলেন এক্ষুণি সেনা, বিডিআর এবং পুলিশের বহর এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন কেউ রক্ষা পাবেন না। গুলির নির্দেশ এবং জরুরি আইন উপেক্ষা করে মিছিল করার পরিণতি তারা অনুমান করতে পারছিলেন। তাই এমন দ্রুত দোকানপাটের দরজা-কবাট-শার্টার বন্ধ করছিলেন যে সেগুলোর শব্দে গোটা এলাকায় এক হুলস্থুল কা- শুরু হলো। একে তো পুলিশের দৌড়, পেছনে দুর্দান্ত মিছিল, গগনবিদারি শ্লোগান, তার উপর দোকানপাট বন্ধের শব্দ আর ভয়ে দৌড়াদৌড়ি হুড়োহুড়িতে মহাশোরগোল বেঁধে গেল।
ঝটিকা মিছিল চারদিক কাঁপিয়ে আতাইকুলা সড়ক ধরে চাপা মসজিদ মোড় হয়ে ডানে বাঁক নিলো। তারপর বাজারের পথ দিয়ে চারতলা সড়ক ধরে সোজা গিয়ে উদয় হলো তিন কিলোমিটার দূরের টেকনিক্যাল মোড়ে। যে রাজপথ মাড়িয়ে মিছিল গেল সেই পথের চারপাশে ঘটলো আগের ঘটনাগুলোই। বিকট বিকট শব্দে দোকানপাট বন্ধ হলো। মানুষ সামরিক জান্তার গুলির ভয়ে দিকবিদিক ছুটলেন। রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেল।
মিছিল নির্বিবাদে টেকনিক্যাল পর্যন্ত পৌছে যায়। জোশ এসে যাওয়ায় সবাই অতিউৎসাহী। মিছিল ছুটলো ডানে।
ডানে, অর্থাৎ পশ্চিম দিকে পথের বাম ধারে ছিল কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার, সদর কোর্ট, পুলিশ সুপারের অফিস, ডিবি অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। আরেক পাশে পৌরসভা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন অফিস। ঝটিকা মিছিল গগনবিদারী শ্লোগানে প্রশাসনিক এলাকার রাজপথে ঢুকে পড়লো। নিয়ন্ত্রণহীন মিছিল ছুটলো পুলিশ লাইন বরারর। লাইনের বাম পাশ দিয়ে গেছে জজকোর্ট, আইনজীবী সমিতি অফিস, ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসে যাওয়ার পথ। আর ডানের রাজপথ চলে গেছে জেলখানার পাশ দিয়ে জেলাস্কুল-বাণী সিনেমা-টাউনহল হয়ে নতুন ব্রিজ ট্রাফিক মোড়ের দিকে। এটাই প্রধান সড়ক।
মিছিল এগুতেই দেখা গেল শত শত রায়ট পুলিশ রাইফেল, লাঠি আর ঢাল হাতে পুলিশ লাইন বরাবর কয়েক স্তরের বিশাল লাইন করে দাঁড়িয়ে। বাম পাশে জজকোর্টের পথে যাবার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। খোলা কেবল ডানের রাজপথ। তাই মিছিল এগিয়ে ডানেই ঢুকলো। লাইন করে থাকা পুলিশ নড়লো না, কোনো বাধাও দিলো না। এতে মিছিলের সাহস বেড়ে গেল। কিন্তু সেটা যে পুলিশী কৌশল ছিল- তা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই টের পাওয়া গেল। মিছিল এগুতেই পেছন দিকটার রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লো পুলিশের দল। ব্লক হয়ে গেল পেছন দিক। সামনে দেখা গেল জেলা স্কুলের সামনে হালকা মেশিনগান সজ্জিত পুলিশ এবং বিডিআরের ট্রাক এবং কনভয়ের ব্যারিকেড। তাদের অস্ত্রগুলো মিছিলের দিকে তাক করা। নিশ্চয়ই এডওয়ার্ড কলেজের অবস্থান তুলে এনে এখানে বসানো হয়েছে। বাম পাশে জেলখানার দিকে শত শত লাঠিধারী রায়ট পুলিশ। ডান পাশটায় পুলিশ না থাকলেও দোকানপাট, গুদাম, জঙ্গল, পুকুর ইত্যাদির প্রতিবন্ধক। সহজে সেদিকে যাবার নয়। অবশ্য এসব প্রতিবন্ধক পেরুতে পারলে দূরের দিকে ছিল পাকা বাড়িঘরের বসতি। অর্থাৎ মিছিলকে এভাবেই ফাঁদে আটকে ফেলা হলো। এবার বাম পাশে অবস্থান নেওয়া জেলখানার দিক থেকে পুলিশ বাহিনী মিছিলের ঠিক মাঝ বরাবর ঝাপিয়ে পড়লো। একইসঙ্গে পেছন দিক থেকেও তারা ঝাপিয়ে পড়লো। সামনে থেকেও এগিয়ে এলো। শত শত পুলিশের ঝটিকা হামলায় ৫৫/৫৮ জনের ঝটিকা মিছিল মুহূর্তেই ল-ভ- হয়ে গেল।

মিছিলের উপর পুলিশ হামলে পড়লো বটে! তবে ঘটনা ঘটলো অকল্পনীয়। পানিতে মাছের ঝাকের উপর তাক করে লাফ মেরে পড়লে যেমন একটা মাছও খুঁজে পাওয়া যায় না, পুলিশের অবস্থা হলো তাই-ই। ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা মিছিল থেকে একজনকেও ধরতে পারলো না। এমনকি কারও গায়ে আঁচরও দিতে পারলো না। মুহূর্তেই মিছিল উধাও হয়ে গেল। দেখা গেল পুলিশের নাগাল ছেড়ে তীরের মতো প্রায় সবাই ঢুকে পড়লো ডানের জঙ্গল, দোকানপাটের আনাচ-কানাচ এবং পুকুর-দালানের দিকে। শত শত পুলিশও পিছু নিলো।
গণশিল্পীর গণসঙ্গীত শিল্পী উত্তম দাস আর উদীচীর শিল্পী অমীয় চক্তবর্তী পুলিশকে পাশ কাটিয়ে এক ছুটে ঢুকেছিলেন জেলা স্কুলের গলিতে। তারপর হুট করে ডানের এক ওয়ার্কশপে। কারণ সামনের দিকে পুলিশ ছিলো। পেছনের পুলিশ ছুটতে ছুটতে ওয়ার্কশপের সামনে এসে ওদের খুঁজতে লাগলো। ওরা তখন ওয়ার্কশপের চেয়ারে বসে রীতিমতো খরিদ্দার হয়ে দোকানীর সঙ্গে কথা বলছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। সংগঠকরা টেরই পাননি যে সাদা পোশাকের অনেকেই পুলিশের লোক। লক্ষ্য করা যায় এদের কয়েকজনকে মিছিলের ভেতরেও দেখা গেছে। হয়তো জেলা প্রশাসন অফিসের ওইসব দিক থেকে মিছিলে ঢুকে পড়েছে। ওদেরই একজন দেখিয়ে দিলো উত্তম এবং অমীয়কে। পুলিশের দলকে বললো, ‘এরা মিছিলে ছিলো।’ পুলিশ এসে দুজনকে কলার চেপে ধরলো।
আরেকজন ধরা পড়লো। গাংচিল সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের মিজানুর রহমান চাঁদ। দৌড়ানোর সময় রাজপথ থেকেই পুলিশ তাকে ধরেছে।
বন্দিশালায় জাগরণের গান : সামরিক জান্তার প্রতি পুলিশও যে সন্তুষ্ট ছিল না- তার প্রমাণ পাওয়া গেল থানা হাজতে। উত্তম-অমীয় এবং চাঁদকে গ্রেফতারের পর নেওয়া হয় সদর থানায়। এক রাত রাখা হয়। পরদিন সকালে কোর্টে পাঠিয়ে জেলে ঢোকানো হয়।
থানা হাজতে নেওয়ার আগে তিনজনকে হাজির করা হয় ওসির সামনে। জানতে চাওয়া হয় নাম-পরিচয়। প্রথমেই উত্তম নাম জানিয়ে নিজের পরিচয় দেয় গণসঙ্গীত শিল্পী বলে। ওসি হা করে তাকিয়ে থাকেন। বলেন, ‘গানের শিল্পী? তিনজনই?’ জবাব ‘হ্যাঁ’। ওসি আরও অবাক! তিনি একবার কনস্টেবলের দিকে তাকান, আরেকবার শিল্পীদের দিকে তাকান। কিছুতেই যেন ঠাহর করতে পারছিলেন না- ঠিক আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা? কনস্টেবল জানায়, ‘জ্বি স্যার, এরা শিল্পী। মিছিল করছিল।’ ওসি আশ্চর্য হয়ে উত্তমের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘সত্যিই তোমরা মিছিল করেছো?’ জবাব ‘হ্যাঁ’। ‘কি দাবি তোমাদের’- ওসির প্রশ্ন। ‘আমরা মিলিটারি সরকার চাই না, পতন চাই’ উত্তমের জবাব। ওসি হতভম্বের পর হতভম্ব! হা করে তাকিয়ে পরখ করে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ান। তারপর পুলিশ সদস্যদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমরা কি করেছো? এতো কিছু থাকতে গানের শিল্পী ধরে নিয়ে এসেছো! দেশটায় কী যে হলো!’ তিনি অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে তিনজনকে হাজতে রেখে পরদিন কোর্টে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। একজনকে নথিপত্র ঠিক করতে বললেন। আর স্বগতোক্তি করতে লাগলেন, ‘খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, আমাদের দিয়ে লাঠিয়ালগিরি! শিল্পীরাও যাদের চায় না সেখানে তাদের জোর করে ক্ষমতায় থাকার দরকার কি? যত্তোসব!’
পুলিশ উত্তমদের বেশ সমীহ করে চলতে লাগলো। রাতে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন এসে বায়না ধরলো গান শোনাতে। স্বউৎসাহে উত্তম জানালো, ‘গান গাইতে হলে তো হারমোনিয়াম-ডুগি-তবলা দরকার।’ পুলিশ বেকায়দার পড়লো। পরে জানালো, ‘এখানে এসব পাওয়া যাবে না। এমনিই থালা-বাটি বাজিয়ে গান গাও।’ উত্তম বললো, ‘কি গান গাইবো?’ পুলিশ বললো, ‘যা ইচ্ছে গাও, তোমরা যে গান গাও, সেগুলোই শোনাও।’ পুলিশ থালা-বাটি এগিয়ে দিলো। বন্দিশালার ভেতর এসব দুহাতে বাজিয়ে উত্তম গণসঙ্গীত ধরলো, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা’ ‘নভেম্বরের ডাক শোনো, হাতে নাও রক্ত নিশান’ ‘আমরা গণশিল্পী দেশে আজ জেগেছি’। পুলিশ ডিউটি থেকে এগিয়ে এসে গান শুনতে লাগলো, আর মাঝে মাঝে বললো, ‘একটু আস্তে. লোকজন জড়ো হয়ে যাবে যে!’
জেলখানায় গিয়েও একই অবস্থা হলো। কেমন করে যেন আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল গণসঙ্গীতের শিল্পীরা ধরা পড়েছে। উত্তমদের জেলে ঢোকাতেই বন্দিরা গান গাওয়ার জন্য বায়না নিয়ে ছেঁকে ধরতে লাগলো। এরপর যে কদিন ওদের জেলে থাকতে হলো সে কদিন দফায় দফায় গানের আসরে বসতে হলো। এক জায়গার আসর শেষ হয় তো আরেক জায়গায় চললো এ গানের অনুষ্ঠান। আর মহানন্দে উত্তম-অমীয় যতো গণসঙ্গীত আছে তার সবই গাইলো। এমনিতেই জেলখানার বন্দিরা নানা কারণে গানের প্রতি সাংঘাতিক রকমে দুর্বল থাকেন। নিজেরাই কর্কশ গলায় গান গাওয়ার বৃথা চেষ্টা করে নিজেদের দুঃখ-সমস্যা ভুলে থাকেন। এ অবস্থায় জাতশিল্পী পেয়ে তাদের আনন্দ দেখে কে! তারা রুমে রুমে আসর বসিয়ে গোটা জেলখানা জমিয়ে ফেললেন। বাবু (সেন্ট্রি), জমাদার, ডিপুটি জেলার, জেলার, সুপারিনটেনডেন্ট কেউ বাদ গেলেন না এসব আসরে সায় মেলাতে। ফলে বন্দিশালা হয়ে উঠলো গণজাগরণশালা।

পরে ওদের মুক্ত করতে সব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কাগজপত্র ঠিক করে আবেদন জমা দেওয়ার পর জামিন মঞ্জুর হয়ে গেল। তিন শিল্পীকে জেলখানায় থাকতে হয়েছিল সপ্তাহখানেক। মুক্তির দিন গণশিল্পীর সদস্যরা সদলবলে জেল গেটে হাজির হয়ে ফুলের মালায় ওদের বরণ করে নিলেন। রাজপথে বিজয় মিছিল করলেন। কারণ মাত্র এ কদিনেই গণঅসস্তোষের মুখে জরুরি অবস্থা ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল। এরশাদ সরকার আতঙ্কে লেজ গুটিয়ে পলায়নপর অবস্থায় চলে এসেছিল।
বাকি ছিল মামলা থেকে তিন শিল্পীকে পুরোপুরি মুক্ত করা। এ মামলা চলছিল সদর কোর্টে রেজাউল করিম নামে এক ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে। কিন্তু তিনি যে ঘোরতরভাবে সামরিক শাসনবিরোধী- তা টের পাওয়া যায় বিচার কাজের সময়। পরে জানা গিয়েছিল, এই ম্যাজিস্ট্রেট নিজে সাহিত্যমনা এবং বেশ কটি বইয়ের লেখকও। বাড়ি নাটোরে। তিন শিল্পীকে কোর্টে তোলার পর তিনি যার পর নাই সরকারের উপর রেগে গেলেন। প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘শয়তানরা মানুষ চেনে না, শিল্পীদেরও ছাড়ে না। এই ডা-াবাজি আর কতোদিন? সময় কিন্তু শেষ।’ কয়েক দফা তারিখ ফেলে একদিন তিনি খচখচ করে মামলার কাগজে লিখে তিনজনকেই বেকসুর খালাশ দিয়ে দিলেন। পরে এই ঘটনার ইতি টানা হয় অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিশাল আয়োজনে তিন শিল্পীকে গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয়।