বিশেষ প্রতিবেদন
পদ্মায় অন্যান্য মাছের তুলনায় ইলিশ বেশি পাওয়া যেত বলে এক কালে নদী অববাহিকায় হালদার ও দাস উপাধিধারী মালো জাতীয় মৎস্যজীবীদের আবাস গড়ে উঠেছিল। বর্তমান আগের মতো ইলিশ মেলে না বলে জেলে সম্প্রদায় অন্যান্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ছে। বদলে গেছে মাছের আড়ৎ। ইলিশ শিকারীদের পেশা বদলে গেছে। তারা হতাশ। মাছের বাজারে অন্যতম বৃহৎ যোগানদার হওয়া সত্বেও জেলেরা সীমাহীন দরিদ্র এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে অসহায়ভাবে। রূপালী ফসলের ঐতিহ্য ও উৎপাদনের মানচিত্রকে ধূসর করার জন্য অশুভ পরিস্থিতি অনেকাংশে দায়ী।
পাবনা জেলার দক্ষিণ সীমান্তে পদ্মা রয়েছে ৯০ কিলোমিটার জুড়ে। ঈশ্বরদী-পাবনা সদর ও সুজানগর উপজেলা অতিক্রম করে বেড়া উপজেলার নতিবপুরের দক্ষিণে যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে পদ্মা। এই ৪টি উপজেলার প্রায় ১৫টি পয়েন্টে ইলিশ বিক্রির আড়ৎ ছিল। জেলার ইতিহাস থেকে জানা গেছে, ১৯০৭ সালে পদ্মার উত্তর তীরে অবস্থিত তৎকালীন সারা ঘাট বন্দর থেকে ৭শ ২২ মণ ইলিশ বিভিন্ন স্থানে রফতানি করা হয়েছিল। এখানে ইলিশের প্রাচুর্যতা থাকায় এই ঘাটে স্থাপিত হয়েছিল একটি বরফ কল। প্রায় ৪ কেজি ওজনের ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল সুজানগরে। এখন সে সব ইতিহাস। মাঘ মাসে আগে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী সরস্বতী পূজার সময় এবং পরে মাঘী সপ্তমী তিথিতে ইলিশ মাছ পুজা করা হতো। এ ধারা এখন অনেক খানি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
মৎস বিশেষজ্ঞরা জানান, ইলিশ নদীর মোহনা এলাকায় বাস করে। প্রজনন মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) বা ডিম
ছাড়ার সময় উজানের দিকে যাত্রা শুরু করে। মেঘনা নদীর মোহনা এবং সুজানগরে-বেড়া উপজেলার সীমানা এলাকা বাইশ কোদালিয়ার মোহনা হতে ঝাঁক বেঁধে ইলিশ উজানে রওয়ানা দিত। কিন্তু এখন তলদেশ ভরাট। ডিম ছাড়ার পর পরই ইলিশ মোহনায় ফিরে আসে।
পদ্মার ইলিশের রূপ স্বাদ ও ঘ্রাণ মাছের তেলের ওপর নির্ভরশীল হলেও অন্যান্য নদীর ইলিশ থেকে পদ্মার ইলিশের স্বাদের গুনমান আলাদা রকমের। তাই দামও বেশি। জেলার জলজ পরিবেশসহ জলবায়ুগত উপাদানের ওপর এ মাছের উৎপাদন নির্ভরশীল। পদ্মা নদীর তলদেশের প্রকৃতি, পানির গভীরতা, পানি ও বাতাসের চাপ, স্্েরাত, তাপমাত্রা, আলো, পানিতে দ্রবীভূত গ্যাস সমূহ এবং সামাজিক সাড়া প্রভূতি গবেষণায় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীতে বিশাল বিশাল চর জেগে ওঠায় লোনা পানির ইলিশ মিষ্টি পানিতে ডিম ছাড়ার জন্য ঝাঁক বেঁধে আসতে পারছে না বলে পদ্মায় ইলিশ উৎপাদন কমে গেছে।
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। একক প্রজাতি হিসেবে সর্ব বৃহৎ এবং সর্বাপ্রেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এ মাছ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন পদ্ধতি সম্পর্কে নদী তীরবর্তী শিকারী জেলেরা যথেষ্ট সচেতন ছিলেন না। ইতিহাসে আরও উল্লেখ, ব্রিটিশ আমলে নদীয়া জেলার সদরপুরের কায়স্থ জমিদারেরা ঈশ্বরদী হতে বেড়ার বাইশ কোদালিয়ার মোহনা পর্যন্ত এই অংশটুকু জলকরের মালিক ছিলেন। তারাই জেলেদের কাছ থেকে বার্ষিক খাজনা আদায় করতেন।
জাতীয় মাছ ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ মাছে ভাতে বাঙালির শ্বাশত এই পরিচয়েই নিহিত রয়েছে আমাদের জীবনে মাছের গুরুত্ব। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা উপকুলীয় এলাকা ও মোহনা ইলিশের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। সরকার মৎস্য খাতের বিশেষ করে ইলিশের বিপুল সম্ভাবনা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে এর উন্নয়নে বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গৃহস্থের রান্নাঘরের গন্ডি পেরিয়ে ইলিশ এখন ব্র্যান্ড হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরছে।